মুসলিম উম্মতের সর্বসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দার্সসমূহ (বাংলা)

মুসলিম উম্মতের সর্বসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দার্‌স-সমূহ: এ গ্রন্থটি ছোট হলেও গ্রন্থকার এতে ফিকহে আকবার বা আকীদা এবং ফিকহে আসগার বা ফিকহের বিধি-বিধান বর্ণনা করেছেন। সাথে সাথে একজন মুসলিমের স্বভাব-চরিত্র ও আদব আখলাক কেমন হওয়া উচিত তাও ব্যক্ত করেছেন। গ্রন্থের শেষে তিনি শির্ক ও বিভিন্ন গুণাহের বর্ণনা দিয়েছেন। ফলে গ্রন্থটি একজন মুসলিমের আকীদা, ইবাদাত, চালচলন ও পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত তা নির্দেশ করেছে। সত্যিকার অর্থেই এটি মুসলিম উম্মার সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দারস।

  • earth ভাষা
    (বাংলা)
  • earth সংকলন:
    الشيخ عبد العزيز بن باز
PHPWord

 

 

 

الدُّرُوسُ المُهِمَّةُ لِعَامَّةِ الأُمَّةِ

 

 

সাধারণ মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ

 

 

لِسَمَاحَةِ الشَّيْخِ العَلَّامَةِ

عَبْدِ العَزِيزِ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ بَازٍ

رَحِمَهُ اللهُ

 

সম্মানিত শাইখ আল্লামা

আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায

রাহিমাহুল্লাহ

 


بِسْمِ اللهِ الرَّحمَنِ الرَّحِيمِ

সাধারণ মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ

সম্মানিত শাইখ আল্লামা

আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায

রাহিমাহুল্লাহ

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি

লেখকের ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক আর উত্তম পরিণাম শুধুমাত্র মুত্তাকীদের জন্য আল্লাহ সালাত সালাম বর্ষণ করুন তাঁর বান্দা রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মদ-এর উপর, এবং তাঁর পরিবারবর্গ সকল সাহাবীর উপর

 প্রশংসা এবং দরূদ সলামের পর:

পুস্তিকায় ইসলাম সম্পর্কে সর্বসাধারণের পক্ষে যে সব বিষয় অবগত হওয়া একান্ত অপরিহার্য সেগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে পুস্তিকাটিসাধারণ মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহশিরোনামে অভিহিত করেছি

আল্লাহ্ তাআলার কাছে প্রার্থনা জানাই তিনি যেন এর দ্বারা মুসলিম ভাইদের উপকৃত করেন এবং আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করে নেন নিশ্চয় তিনি মহান দাতা অতি মেহেরবান

আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায  সাধারণ মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ1 (আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বহু আয়াতে নিজ সম্মানার্থে বহুবচন ব্যবহার করেছেন,যা মূলত আরাবী ভাষার একটি রীতি। বাংলায় এরীতির ব্যাবহার না থাকায় সে সব আয়াতের অনুবাদে বইটিত একবচনই ব্যবহার করা হয়েছে।সম্পাদক,আব্দুর রব আফ্ফান)

প্রথম পাঠ: সূরা ফাতেহা এবং ছোট ছোট সূরাসমূহ

সূরা ফাতেহা এবং সূরা যাল্যালাহ থেকে সূরানাসপর্যন্ত ছোট ছোট সূরাসমূহের যতটা সম্ভব অধ্যয়ন, বিশুদ্ধ পঠন মুখস্থকরণ এবং এর মধ্যে যেসব বিষয়ের অনুধাবন অপরিহার্য সেগুলোর ব্যাখ্যা জানা

দ্বিতীয় পাঠ: ইসলামের রুকুনসমূহ

ইসলামের পাঁচ রুকুনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তম্মধ্যে প্রথম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুকুন হল:

شهادة أن لا إ له إلا الله وأنّ محمد رسول الله

একথার সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল

لا اله إلا الله

এর শর্তাবলীর বর্ণনাসহ সাক্ষ্যদানের বাক্যদ্বয়ের মর্মার্থ ব্যাখ্যা করা এর মর্মার্থ হল, ‘লা-ইলাহাদ্বারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয়, তাদের সবাইকে অস্বীকার করা এবংইল্লাল্লাহদ্বারা যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহুর জন্য প্রতিষ্ঠিত করা; এতে তাঁর কোন শরীক নেইলা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহএর শর্তাবলী হলো:

. ইলম (জ্ঞান) : যা অজ্ঞতার পরিপন্থী, .ইয়াক্বীন (দৃঢ় বিশ্বাস) যা সন্দেহের পরিপন্থী, . ইখলাছ (নিষ্ঠা) যা শিরকের পরিপন্থী, . সততা যা মিথ্যার পরিপন্থী, . মাহাব্বাত (ভালবাসা) যা বিদ্বেষের পরিপন্থী, . আনুগত্য যা অবাধ্যতা বা বর্জনের পরিপন্থী, . কবুল (গ্রহণ) যা প্রত্যাখ্যানের পরিপন্থী এবং . আল্লাহ তাআলা ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয় তার প্রতি কুফরী বা অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা এই শর্তগুলো নিম্নোক্ত আরবী কবিতার দুটি পংক্তির মধ্যে একত্রে সুন্দরভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে:

(علمٌ يقينٌ وإخلاصٌ وصدقُك مع *** محبةٍ وانقيادٍ والقبولِ لها) ইলম, ইয়াক্বীন, ইখলাস, তোমার সত্যায়ন *** মহব্বত, আনুগত্য কবুল এগুলোর সাথে অষ্টম শর্তটি বাড়ানো হয়েছে- তা হল তোমার অস্বীকৃতি সেগুলোকে *** আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করা হয়

এই সাথে

محمد رسول الله

(“মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল”) এই সাক্ষ্য বাক্যের অর্থ বিশ্লেষণ করা, এই বাক্যের দাবি হল: রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সব সংবাদ দিয়েছেন সে বিষয়ে তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, তিনি যেসব কাজের নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন বা বারণ করেছেন তা পরিহার করে চলা আর আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সব বিষয় প্রবর্তন করেছেন কেবল সেগুলোর মাধ্যমেই যাবতীয় ইবাদত সম্পাদন করা এরপর শিক্ষার্থীর সম্মুখে ইসলামের পঞ্চ ভিত্তির অপর বিষয়গুলোর বিশদ বিবরণ তুলে ধরা: সেগুলো হল: .সালাত . যাকাত , . রমজানের সিয়াম পালন, এবং . সামর্থবান লোকের পক্ষে বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জব্রত পালন করা

তৃতীয় পাঠ:আরকানে ঈমান বা ঈমানের রুকনসমূহ

 ঈমানের রুকনসমূহ ছয়টি,সেগুলো হল:

- বিশ্বাস স্থাপন করা আল্লাহর তাআলার উপর,

- তাঁর ফেরেশতাগণ,

- তাঁর অবতীর্ণ কিতাবসমূহ,

- তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ

- আখেরাতের দিনের উপর এবং

- বিশ্বাস স্থাপন করা ভাগ্যের উপর, যার ভালমন্দ সবকিছু আল্লাহ তাআলা হতেই নির্ধারিত হয়ে আছে

চতুর্থ পাঠ: তাওহীদ শিরকের প্রকারভেদ

তাওহীতের প্রকারভেদের বর্ণনা

তাওহীদ (আল্লাহর একত্ব) তিন প্রকার যথা:

() তাওহীদে রবুবিয়্যাহ (আল্লাহর প্রভূত্বে তাওহীদ)

() তাওহীদে উলুহীয়্যাহ (আল্লাহর ইবাদতে তাওহীদ)

() তাওহীদে আসমা সিফাত (আল্লাহর নাম গুণাবলীতে তাওহীদ)

- তাওহীদুর রবুবিয়্যাহ: এর অর্থ এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ পাকই সবকিছুর স্রষ্টা এবং সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী, এতে তাঁর কোন শরীক নেই

- তাওহীদুল উলুহীয়্যাহ: এর অর্থ এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে আল্লাহ পাকই সত্যিকার মাবুদ, এতে তাঁর কোন শরীক নেই এটাই কালেমালা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহর মর্মার্থ কেননা, এর প্রকৃত অর্থ হলো: আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার আর কোন মাবুদ নেই সবপ্রকার ইবাদত যেমন, সালাত, সিয়াম ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহরই উদ্দেশ্যে নিবেদিত করা অপরিহার্য কোন প্রকার ইবাদত অন্য কারো উদ্দেশ্যে নিবেদিত করা বৈধ নয়

- তাওহীদুল আসমা সিফাত: এর অর্থ এই যে, কুরআন করীমে এবং বিশুদ্ধ হাদীসে আল্লাহ পাকের যেসব নাম গুণাবলীর উল্লেখ রয়েছে সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এগুলোকে আল্লাহ পাকের শানের উপযোগী পর্যায়ে এমনভাবে সব্যস্ত করা যাতে কোন অপব্যখ্যা, নিষ্ক্রিয়তা, উপমা অথবা বিশেষ কোন ধরন বা সাদৃশ্যপনার লেশ না থাকে যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন:

﴿قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ1 ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ2 لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ 3 وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدُۢ4﴾

বলুন, ‘তিনি আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়

2 আল্লাহ্ হচ্ছেনসামাদ' (তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী);

3 তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি

এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই )[সূরা আল-ইখলাস -] আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

﴿...لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ

কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা [আশ-শূরা : ১১] কোন কোন আলেম তাওহীদকে দুই প্রকারে বিভক্ত করেছেন এবং তাওহীদে আসমা ছিফাতকে তাওহীদে রবুবিয়্যার অন্তর্ভূক্ত করে ফেলেন এতে কোন বাধা নেই, কেননা, উভয় ধরনের প্রকার বিন্যাশের উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট

আর শিরক হল তিন প্রকার যথা : () বড় শিরক () ছোট শিরক এবং () সুক্ষ্ন বা গুপ্ত শিরক

বড় শিরকের ফলে মানুষের আমল নষ্ট হয়ে যায় এবং তাকে জাহান্নামে চিরকাল থাকতে হবে; যদি সে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

﴿...وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ

আর যদি তারা শির্ক করত তবে তাঁদের কৃতকর্ম নিস্ফল হত [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ৮৮] আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন:

﴿مَا كَانَ لِلۡمُشۡرِكِينَ أَن يَعۡمُرُواْ مَسَٰجِدَ ٱللَّهِ شَٰهِدِينَ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِم بِٱلۡكُفۡرِۚ أُوْلَٰٓئِكَ حَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ وَفِي ٱلنَّارِ هُمۡ خَٰلِدُونَ17﴾

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُ...﴾

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না; আর তার থেকে ছোট যাবতীয় গোনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন... [আন-নিসা : ৪৮] আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন:

﴿...إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ﴾

নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম আর যালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই [আল-মায়েদাহ: ৭২]

এই প্রকার শিরকের আওতায় পড়ে মৃত লোক প্রতিমার নিকট দু করা তাদের আশ্রয় প্রার্থনা করা, তাদের উদ্দেশ্যে মান্নত জবাই করা ইত্যাদি

ছোট শিরক বলতে, এমন কর্ম বুঝায় যাকে কুরআন বা হাদীসে শিরক বলে নামকরণ হয়েছে, তবে তা বড় শিরকের আওতায় পড়ে না যেমন কোন কোন কাজে রিয়া বা কপঠতার আশ্রয় গ্রহণ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করা, আল্লাহ এবং অমুক যা চাইছেন তা হয়েছেবলা ইত্যাদি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

«أَخْوَفُ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكَ الَأصْغَرَ» فَسُئِلَ عَنْهُ، فَقَالَ: «الرِّيَاءُ»

আমি তেমাদের ওপর যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হচ্ছে ছোট শির্ক তা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে, তিনি বলেন: রিয়া (লোক দেখানো)2 এই হাদীস ইমাম আহমদ, তাবারানী বায়হাকী মাহমূদ বিন লবীদ আনছারী (রা) থেকে জায়্যেদ সনদে বর্ণনা করেছেন আর তাবারানী কতিপয় জায়্যেদ সনদে মাহমুদ বিন লবীদ থেকে, তিনি রাফেবিন খাদীজ নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)থেকে বর্ণনা করেছেন:

তিনি সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«مَنْ حَلَفَ بِشَيْءٍ دُونَ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ».

যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে শপথ করবে সে অবশ্যই শিরক করবে3 ইমাম আহমদ বিশুদ্ধ সনদে উমর বিন খাত্তাব (রা) থেকে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন আবূ দাউদ তিরমিযীতে আব্দুল্লাহ বিন উমর থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদীসে আছে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

«مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ كَفَرَ أَوْ أَشْرَكَ».

যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করল, সে কুফুরী অথবা শির্ক করল4 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি বাণী:

«لَا تَقُولُوا: مَا شَاءَ اللَّهُ وَشَاءَ فُلانٌ، وَلَكِنْ قُولُوا: مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ فُلانٌ».

তোমরা বলো না যে, আল্লাহ যা চান এবং অমুক লোক যা চায় বরং তোমরা বলো, আল্লাহ যা চান, অতঃপর অমুক যা চায়5  হাদীসটি আবূ দাউদ বিশুদ্ধ সনদে হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রাযিয়াল্লাহ আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন

এই প্রকার শিরক অর্থাৎ ছোট শিরকের কারণে বান্দা মুরতাদ হয়না বা ইসলাম থেকে সে বের হয়ে যায় না এবং জাহান্নামে সে চিরস্থায়ীও থাকবে না, কিন্তু তা অপরিহার্য পূর্ণ তাওহীদের পরিপন্থী

তৃতীয় প্রকার হল, শিরকে খাফী অর্থাৎ সুক্ষ্ন শিরক: এর প্রমাণ নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণী:

«أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِي مِنَ المَسِيحِ الدَّجَّالِ؟» قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: «الشِّرْكُ الخَفِيُّ، يَقُومُ الرَّجُلُ فَيُصَلِّي فَيُزَيِّنُ صَلاتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ الرَّجُلِ إِلَيْهِ».

হে সাহাবীগণ, আমি কি তোমাদের সেই বিষয়ের খবর দিব না যা আমার দৃষ্টিতে তোমাদের পক্ষে মসীহ দাজ্জাল থেকেও ভয়ঙ্কর? সাহাবীগণ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, বলুন হে আল্লাহর রাসূল, তখন তিনি বললেন, সেটা হল সুক্ষ্ন (গুপ্ত) শিরক, কোন কোন ব্যক্তি সালাতে দাড়িয়ে নিজের সালাত সুন্দর করার চেষ্টা করে এই ভেবে যে অপর লোক তার প্রতি তাকাচ্ছে6 ইমাম আহমদ তার মুসনাদ গ্রন্থে এই হাদীসটি আবূ সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন

যাবতীয় শিরক মাত্র দুই প্রকারেও বিভক্ত করা যেতে পারে:

ছোট শিরক এবং বড় শিরক

সুক্ষ্ন বা গুপ্ত শিরক ছোট এবং বড় উভয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে কখনও তা বড় শিরকের পর্যায়ে পড়ে: যেমন মুনাফিকদের শিরক; তারা নিজেদের ভ্রান্ত বিশ্বাস গোপন রেখে প্রাণের ভয়ে কপঠতা বা রিয়ার প্রশ্রয়ে ইসলামের ভান করে চলে

আবার সুক্ষ্ন শিরক ছোট শিরকের পর্যায়েও পড়তে পারে: যেমন, ‘রিয়াবাকপঠতাযার উল্লেখ মাহমুদ বিন লবীদ আনছারী আবূ সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসদ্বয়ে রয়েছে আল্লাহই আমাদের তাওফীক দানকারী

পঞ্চম পাঠ: ইহসান প্রসঙ্গ

ইহসান হল: তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবে যেন তুমি আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছ, আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও তাহলে তোমার বিশ্বাস নিয়ে ইবাদত করা যে তিনি তোমাকে দেখছেন

ষষ্ঠ পাঠ: সালাতের শর্তাবলী

সেগুলো হল নয়টি যথা:

ইসলাম, বিবেক, (ভালো-মন্দ) পার্থক্য করার জ্ঞান, অপবিত্রতা হতে মুক্ত হওয়া, নাপাকী দূর করা, সতর ঢাকা, সালাতের ওয়াক্ত হওয়া, ক্বিবলার দিকে মুখ করা এবং নিয়ত করা

সপ্তম পাঠ: সালাতের রুকুনসমূহ

সালাতের রুকুন চৌদ্দটি; যথা:

() সমর্থ হলে দণ্ডায়মান হওয়া, () শুরুতে তাকবীরে তাহরীমা দেয়া , () সূরা ফাতেহা পড়া, () রুকুতে করা, () রুকু হতে উঠে সোজা দণ্ডায়মান হওয়া, () সপ্তাঙ্গের উপর ভর করে সিজদা করা, () সিজদা থেকে উঠা, () উভয় সিজদার মধ্যে বসা, () নামাজের সকল কর্ম সম্পাদনে স্থিরতা অবলম্বন করা, (১০) সকল রুকুন ধারাবাহিকভাবে তরতীবের সাথে সম্পাদন করা, (১১) শেষ বৈঠকে তাশাহুদ পড়া, (১২) তাশাহ্হুদের জন্য বসা, (১৩) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর দরুদ পড়া (১৪) ডানে বামে দুই সালাম প্রদান

 

অষ্টম পাঠ: সালাতের ওয়াজিবসমূহ

সালাতের ওয়াজিব আটটি:

() তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত অন্যান্য তাকবীরগুলো

() ইমাম এবং একা নামাজীর জন্য سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهবলা

() সকলের জন্য رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْد বলা

() রুকুতে سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْمِ বলা

() সিজদায় سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأعْلى বলা

() উভয় সিজদার মধ্যে رَبِّ اغْفِرْ لِيْ বলা

() প্রথম তাশাহ্হুদ পড়া

() প্রথম তাশাহ্হুদ পড়ার জন্য বসা

নবম পাঠ: তাশাহ্হুদ অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু এর বর্ণনা

সালাত আদায়কারী নিম্নরূপ বলবে:

«التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ، وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ، أَشْهَدُ أَلَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ».

অর্থ: “যাবতীয় ইবাদত অর্চনা মৌখিক, শারীরিক আর্থিক সমস্তই আল্লাহর জন্য, হে নবী আপনার উপর সকল নিরাপত্তা প্রশান্তি ,আল্লাহর রহমত বরকত অবতীর্ণ হোক আমাদের উপর এবং আল্লাহর নেক বান্দাগনের উপরও নিরাপত্তা প্রশান্তি অবতীর্ণ হোক আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মাবুদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা রাসূল

অত:পর নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর দরুদ বরকতের দু পড়তে গিয়ে বলবে:

«اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ».

(“হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীমআলাইহিস সালাম এবং ইবরাহীমআলাইহিস সালামের বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধরদের ওপর তেমনি বরকত দান করুন যেমনি আপনি বরকত দান করেছেন ইবরাহীমআলাইহিস সালাম এবং ইবরাহীমআলাইহিস সালামের বংশধরদের ওপর নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অতি মর্যাদার অধিকারী)

অত:পর শেষ তাশাহ্হুদে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবে জাহান্নামের আজাব কবরের আজাব থেকে, জীবন-মৃত্যূর ফেতনা থেকে এবং মসীহ দাজ্জালের ফেতনা থেকে তারপর আপন পছন্দমত আল্লাহর কাছে দু করবে, বিশেষ করে নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত দু গুলো ব্যবহার করা সর্বোত্তম তন্মধ্যে একটি হল নিম্নরূপ:

«اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ، اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ». 

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে তোমার যিকির, শুকরিয়া আদায় ভালভাবে তোমারই ইবাদত করার তাওফীক দাও আর, হে আল্লাহ! আমি আমার নিজের উপর অনেক বেশী যুলুম করেছি, আর তুমি ছাড়া গুনাহসমূহ মাফ করতে পারেনা, সুতরাং তুমি তোমার নিজ গুনে আমাকে মার্জনা করে দাও এবং আমার প্রতি রহম করো, তুমিতো মার্জনাকারী অতি দয়ালু

আর প্রথম তাশাহহুদের পর, যোহর, আসর, মাগরিব ইশার নামাজে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবে আর যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পড়ে, তবে তা উত্তম; কারণ ব্যপারে আমভাবে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে এরপর তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবে

দশম পাঠ: সালাতের সুন্নাতসমূহ

তন্মধ্যে কয়েকটি হল:

() শুরুতে সানা বা ইস্তেফতার দোয়া পাঠ করা

() দাড়ানো অবস্থায় রুকুর পূর্বে পরে ডান হাতের তালু বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর ধারণ করা

() অঙ্গুলিসমুহ মিলিত করে সোজা অবস্থায় উভয় হাত উভয় কাঁধ বা কান বরাবর উত্তোলন করা এবং তা প্রথম তাকবীর বলার সময়, রুকুতে যাওয়ার এবং রুকু থেকে উঠার সময় এবং প্রথম তাশাহ্হুদ শেষে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর সময় করা

() রুকু এবং সিজদায় একাধিকবার তাসবীহ পড়া

() রুকু থেকে উঠে رَبِّ اغْفِرْ لِيْ বলার পর এবং উভয় সিজদার মধ্যে বসে মাগফিরাতের(আল্লাহুম্মাগফিরলী) দু পড়ার পর অতিরিক্ত দুআ বলা

() রুকু অবস্থায় পিঠ বরাবর মাথা রাখা

() সিজদাবস্থায় বাহুদ্বয় বক্ষের উভয় পার্শ্ব হতে এবং পেট উরুদ্বয় হতে উরুদ্বয়কে নলা হতে ব্যবধানে রাখা

() সিজদার সময় বাহুদ্বয় যমীন থেকে উপরে উঠিয়ে রাখা

() প্রথম তাশাহ্হুদ পড়ার সময় সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকে বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসা এবং ডান পা খাড়া করে রাখা

(১০) চার তিন রাকাত বিশিষ্ট সলাতের শেষ তাশাহ্হুদেতাওয়াররুককরে বসা: এর পদ্ধতি হল, পাছার ভরে জমিনের উপর বসে বাম পা ডান পার নীচে রেখে ডান পা খাড়া করে রাখা

(১১) প্রথম দ্বিতীয় তাশাহুদে বসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শাহাদাত অঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করা এবং দুআর সময় নাড়াচড়া করা

(১২) প্রথম তাশাহ্হুদের সময় মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরিবার-পরিজন এবং ইব্রাহীম () তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর দরুদ বরকতের দু করা

(১৩) শেষ তাশাহ্হুদে দু করা

(১৪) ফজর, জুমআ’, উভয় ঈদ ইস্তেসক্বার সালাতে এবং মাগরিব এশার সালাতের প্রথম দুই রাকাআতে উচ্চঃস্বরে ক্বিরাত পড়া

(১৫) জোহর আছরের সালাতে, মাগরিবের তৃতীয় রাকআতে এবং ইশার শেষ দুই রাকআতে চুপে চুপে ক্বিরাত পাড়া

(১৬) সূরা ফাতেহার অতিরিক্ত কুরআন পড়া

এই সাথে হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য সুন্নাতগুলোর প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে; যেমন : ইমাম, মুকতাদী একা নামাজীর পক্ষে রুকু থেকে উঠার পর (রাব্বানা ওয়ালাকাল হাম্) বলার সাথে অতিরিক্ত যা পড়া হয় তাও সুন্নাত এইভাবে রুকুতে অঙ্গুলিগুলো ফাঁক করে উভয় হাত হাঁটুর উপর রাখা সুন্নাত

একাদশ পাঠ: সালাত বাতেলকারী বিষয়সমূহ

সালাত নষ্ট করে তা আটটি:

() জেনে-বুঝে ইচ্ছাকৃত কথা বলা না জানার কারণে বা ভুলে কথা বললে তাতে নামাজ বাতেল হয় না

() হাসি,

() খাওয়া,

() পান করা,

) লজ্জাস্থানসহ নামাজে অবশ্যই আবৃত রাখতে হয় শরীরের এমন অংশ উন্মুক্ত হওয়া,

() কিবলার দিক হতে অন্যদিকে বেশী ফিরে যাওয়া,

() সালাতের মধ্যে পর পর অহেতুক কর্ম বেশী করা,

() অযু নষ্ট হওয়া

দ্বাদশ পাঠ: অযুর শর্তসমূহ

অযুর শর্ত মোট দশটি; যথা:

- ইসলাম, -বিবেক সম্পন্ন হওয়া, -ভাল-মন্দ পার্থক্যের জ্ঞান, - নিয়ত, -এই নিয়ত অযু শেষ না হওয়া পর্যন্ত বজায় রাখা, -অযু ওয়াজিব করে এমন কাজ বন্ধ করা, -তা বন্ধ হয়ে গেলে পানি অথবা ঢিলে ব্যবহার করা, -পানি পবিত্র হওয়া তা ব্যবহারের বৈধতা, -শরীরের চামড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছার প্রতিবন্ধকতা দূর করা, ১০- সর্বদা যার অযুভঙ্গ হয় তার পক্ষে সালাতের সময় উপস্থিত হওয়া

ত্রয়োদশ পাঠ: অযুর ফরযসমূহ

এগুলো মোট ছয়টি; যথা:

. মুখমন্ডল ধৌত করা; নাকে পানি দিয়ে ঝাড়া কুলি করা এর অন্তর্ভূক্ত, . কনুই পযর্ন্ত উভয় হাত ধৌত করা,

. সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা, কানও এর অন্তর্ভুক্ত, . টাকনু পর্যন্ত উভয় পা ধৌত করা, . অযুর কার্যাবলী পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা . এগুলো পরপর সম্পাদন করা উল্লেখ থাকে যে মুখমণ্ডল, উভয় হাত পা তিনবার করে ধৌত করা মুস্তাহাব এইভাবে তিনবার কুল্লি করা নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়া মুস্তাহাব তবে ফরয মাত্র একবারই কিন্তু মাথা মাসেহ একাধিকবার করা মুস্তাহাব নয় এই ব্যাপারে কতিপয় ছহীহ হাদীস বর্ণিত আছে

চতুর্দশ পাঠ: অযু ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ

আর তা হল মোট ছয়টি; যথা:

. মুত্রনালী পায়খানার রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হওয়া,

. দেহ থেকে স্পষ্ট অপবিত্র কোন পদার্থ নির্গত হওয়া,

. নিদ্রা বা অন্য কোন কারণে জ্ঞান হারা হওয়া,

. কোন আবরণ ব্যতীত হাত দ্বারা সম্মুখ বা পিছনের লজ্জাস্থান স্পর্শ করা,

. উটের মাংস ভক্ষণ করা এবং

. ইসলাম পরিত্যাগ করা

আল্লাহ পাক আমাদের অন্যান্য সব মুসলমানদের এথেকে পানাহ দান করুন

বিঃদ্রঃ মুর্দার গোসল দেওয়ার ব্যাপারে সঠিক মত হলো যে এতে অযু ভঙ্গ হয় না অধিকাংশ আলেমগণের এই অভিমত কারণ, অযু ভঙ্গের পক্ষে কোন প্রমাণ নেই তবে যদি গোসল দাতার হাত কোন আবরণ ব্যতিরেকে মুর্দার লজ্জাস্থান স্পর্শ করে তাহলে তার উপর অযু ওয়াজেব হয়ে যাবে

কোন আবরণ ব্যতিরেকে মুর্দার লজ্জাস্থানে যাতে হাত স্পর্শ না করে তৎপ্রতি গোসল দাতার অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে

অনুরূপভাবে নারী স্পর্শে কোন ভাবেই অযু ভঙ্গ হয়না, তা কামভাব সহকারে হোক বা বিনা কামভাবে হোক আলেমগণের সঠিক অভিমত এটাই কোন কিছু বের না হলে অযু নষ্ট হয় না এর প্রমাণ নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার কোন কোন স্ত্রীকে চুমু খাওয়ার পর সালাত আদায় করেছেন, অথচ পুনরায় অযু করেননি

উল্লেখযোগ্য যে, সূরা নিসা সূরা মায়েদার দুই আয়াতে যে স্পর্শের কথা বলা হয়েছে:

﴿...أَوۡ لَٰمَسۡتُمُ ٱلنِّسَآءَ...﴾

অথবা তোমরা নারীদেরকে স্পর্শ কর [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৩] [আল-মায়েদা: ] তা সহবাসের অর্থে বলা হয়েছে আলেমগণের সঠিক অভিমত তাই ইবন আব্বাস সহ পূর্ববর্তী পরবর্তী একদল আলেমেরও এই অভিমত আল্লাহ পাকই আমাদের তাওফীক দাতা

 

পঞ্চদশ পাঠ: প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে ইসলামী চরিত্রে বিভূষিত হওয়া

ইসলামী চরিত্রের মধ্যে রয়েছে: সততা, বিশ্বস্থতা, নৈতিক চারিত্রিক পবিত্রতা, লজ্জা, সাহস, দানশীলতা, প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা, আল্লাহ তাআলা কর্তৃক হারামকৃত বিষয় থেকে দূরে থাকা, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার, সাধ্যমত অভাবগ্রস্থ লোকের সাহায্য করা এবং অন্যান্য সৎচরিত্রাবলী যেগুলোর বিধিবদ্ধ হওয়া সম্পর্কে পবিত্র কুরআন সুন্নায় প্রমাণ পাওয়া যায়

ষষ্ঠদশ পাঠ: ইসলামী আদব-কায়দাগুলো পালন করা 

এর মধ্যে রয়েছে: সালম প্রদান, হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা, ডান হাতে পানাহার করা, পানাহারের শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং শেষে আল-হামদুলিল্লাহ বলা, হাঁচি দেয়ার পরআলহামদু লিল্লাহবলা এবং এর উত্তরে অপরজন কর্তৃকইয়ারহামুকাল্লাহ’ (আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন) বলা অসুস্থ বুক্তিকে দেখতে যাওয়া এবং জানাযার নামাজ দাফনে অংশগ্রহণ করা মসজিদে বা ঘরে প্রবেশ বের হওয়ার সময়, সফরকালে, পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ছোট-বড় সকলের সাথে ব্যবহার কালে শরীয়তের আদাবসমূহ পালন করে চলা, নবজাত শিশুর জন্মে অভিনন্দন জানানো, বিবাহ উপলক্ষে বরকতের দু করা এবং বিপদে মুত্যূতে সান্তনা সহানুভূতি প্রকাশ করাসহ বস্ত্র পরিধান তা খোলা এবং জুতা ব্যবহারের সময় ইসলামী আদাব-কায়দা মেনে চলা

সপ্তদশ পাঠ: শিরক বিভিন্ন প্রকার পাপ থেকে সতর্কতা

তারমধ্যে সাতটি ধ্বংসকারী বড় পাপ: আল্লাহর সাথে শিরক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ পাক নিষিদ্ধ করে রেখেছেন, এতিমের সম্পদ অবৈধ পন্থায় ভক্ষণ করা, সুদ গ্রহণ করা, যুদ্ধের দিন ময়দান থেকে পৃষ্ট প্রদর্শন করে পালায়ন করা, এবং সতী-সাধ্বী মুমিনা সরলমনা নারীদের প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া

বড় বড় পাপের মধ্যে আরও রয়েছে; যেমন: মাতাপিতার অবাধ্য হওয়া, রক্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা, মিথ্যা শপথ করা, প্রতিবেশীকে যন্ত্রনা দেওয়া, রক্ত, সম্পদ মান-সম্মানের উপর জুলুম করা, মাদক সেবন করা, জুয়া খেলা,গিবত করা,চোগলখোরী করা ইত্যাদি যা আল্লাহ পাক অথবা তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন

অষ্টাদশ পাঠ: মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থাপনা জানাযার নামাজ পড়া

নিম্নে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রথম: কোন ব্যক্তির মৃত্যু আসন্ন হলে তাকে কালেমা

(لا إلَهَ إلا الله) এর তালকীন দেয়া শরীয়তসম্মত রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন:

«لَقِّنُوا مَوْتَاكُمْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ»

তোমরা তোমাদের মৃত আসন্ন ব্যক্তিদেরলা ইলাহা ইল্লাল্লাহএর তালকীন দাও7 সহীহ মুসলিম এই হাদীসে মৃতদের বলতে সব মরণাপন্ন লোকদের কথা বলা হয়েছে যাদের উপর মৃত্যুর লক্ষণাদি ষ্পষ্ঠ হয়ে উঠেছে

দ্বিতীয়: কোন মুসলমানের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তার চক্ষুদ্বয় মুদিত এবং উভয় চোয়াল বেঁধে রাখতে হয় যেহেতু ব্যাপারে সুন্নাতের দলীল এসেছে

তৃতীয়: মৃত মুসলমানের গোসল করানো ওয়াজিব তবে যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর শহীদের গোসল করানো হয় না, না তার উপর জানাজার নামাজ পড়া হয়; বরং তার পরিহিত বস্ত্রেই তাকে দাফন করা হয় কেননা, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উহুদের যুদ্ধে মৃতদের গোসল করাননি এবং তাদের জানাযাও পড়েননি

চতুর্থ: মৃতের গোসল করানোর পদ্ধতি

গোসল করানোর সময় প্রথমে মৃত ব্যক্তিক লজ্জাস্থান আবৃত করে নিবে তারপর তাকে একটু উঠিয়ে আস্তে আস্তে তার পেটের উপর চাপ দিবে পরে গোসলদানকারী ব্যক্তি নিজের হাতে একটা নেকড়া বা অনুরূপ কিছু পেচিয়ে নিবে যাতে মৃতের মলমুত্র থেকে নিজেকে রক্ষা করে নিতে পারে তারপর মৃত ব্যক্তিকে সে নামাজের অজু করাবে এবং তার মাথা দাঁড়ি বরই পাতা বা অনুরূপ কিছুর পানি দিয়ে ধৌত করবে অত:পর তার দেহের ডান পার্শ্ব, তারপর বাম পার্শ্ব ধৌত করবে এইভাবে দ্বিতীয় তৃতীয়বার ধৌত করবে প্রতিবার হাত দিয়ে পেটের উপর চাপ দিবে কিছু বের হলে তা ধৌত করে নিবে এবং তুলা বা অনুরূপ কিছু দিয়ে স্থানটি বন্ধ করে রাখবে এতে যদি বন্ধ না হয় তাহলে পুড়ামাটি অথবা আধুনিক কোন ডাক্তারি পদ্ধতি অনুসারে যেমন প্লাষ্টার বা অন্য কিছু দিয়ে বন্ধ করতে হবে

তারপর পুনরায় অজু করাবে যদি তিনবারে পরিস্কার না হয় তাহলে পাঁচ থেকে সাতবার ধৌত করাবে এরপর কাপড় দ্বারা শুকিয়ে নিবে এবং সিজদার অঙ্গ অপ্রকাশ্য স্থানসমূহে সুগন্ধি লাগাবে আর যদি সমস্ত শরীরে সুগন্ধি লাগানো যায় তাহলে আরো ভালো এই সাথে তার কাফনগুলো ধুপ-ধুনা দিয়ে সুগন্ধি করে নিবে যদি তার গোফ বা নখ লম্বা থাকে তা কেটে নিবে, তবে চুল বিন্যাস করবেনা আর তার লজ্জাস্থানের চুল পরিস্কার করবে না বা তাকে খাতনা করাবে না যেহেতু বিষয়ে কোন প্রমাণ নেই স্ত্রীলোক হলে তার চুল তিনগুচ্ছে বিভক্ত করে পিছনের দিকে ছেড়ে রাখবে

পঞ্চম: মৃত্যের কাফন:

সাদা বর্ণের তিনখানা কাপড়ে পুরুষের কাফন দেওয়া উত্তম জামা বা পাগড়ী এ্রর অন্তর্ভূক্ত নয় এইভাবে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ্রর কাফন দেয়া হয়েছিল মৃতকে এর ভিতরে পর্যায়ক্রমে রাখা হয় একটা জামা, একটা ইজার একটা লেফাফার দ্বারা কাফন দিলেও চলে

স্ত্রীলোকের কাফন পাঁচ টুকরা কাপড়ে দেওয়া হয়, সেগুলো হলো-চাদর, মুখবরণ, ইজার দুই লেফাফা ছোট বালকের কাফন এক থেকে তিন কাপড়ের মধ্যে দেওয়া যায় এবং ছোট বালিকার কাফন এক জামা দুই লেফাফায় দেওয়া হয়

সকলের পক্ষে একখানা কাপড়ই ওয়াজেব যা মৃত্যের সম্পূর্ণ শরীর আবৃত করে রাখতে পারে তবে মৃত ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় হলে তাকে বরই পাতার সিদ্ধ পানি দিয়ে গোসল দিতে হয় এবং তাকে তার ইজার চাদর অথবা অন্য কাপড়ে কাফন দিলেও চলে তবে তার মস্তক চেহারা আবৃত করা যাবে না বা তার কোন অঙ্গে সুগন্ধিও লাগানো যাবে না কেননা, ক্বিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পাঠ করতে করতে উত্থিত হবে এই সম্পর্কে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণিত আছে আর যদি ইহরামরত যদি মহিলা হয় তাহলে অন্যান্য মহিলার ন্যায় তার কাফন হবে তবে তার গায়ে সুগন্ধি লাগানো যাবেনা এবং নেকাব দিয়ে চেহারা বা মোজা দিয়ে তার হস্তদ্বয় আবৃত করা যাবেনা, বরং কাফনের কাপড় দিয়েই আবৃত করা হবে ইতিপূর্বে মেয়েলোকের কাফন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে

যষ্ঠম: মৃত ব্যক্তির গোসল, দাফন করা তার উপর জানাযার নামাজ পড়ার অধিকতর হকদার ব্যক্তি

মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় যাকে অছিয়ত করে যাবে সেই হবে তার গোসল, দাফন করা তার উপর জানাযার নামাজ পড়ার অধিকতর হকদার তারপর তার পিতা, তারপর তার পিতামহ, তারপর তার বংশে অধিকতর ঘনিষ্ট লোকের হক হবে

এইভাবে মহিলা যাকে অছিয়ত করবে সেই হবে উপরোক্ত কাজগুলো সম্পাদনের অধিকতর হকদার তারপর তার মাতা, তারপর দাদী, তারপর পর্যায়ক্রমে বংশের অধিকতর ঘনিষ্ট মেয়েরা হবে স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে একে অপরের গোসল দিতে পারে আবূ বকর সিদ্দিক রাজিয়াআল্লাহু আনহুকে তাঁর স্ত্রী গোসল দিয়েছিলেন এবং আলী রাজিয়াল্লাহু আনহু তাঁর স্ত্রী ফাতিমা রাজিয়াল্লাহু আনহাকে গোসল দিয়েছিলেন

সপ্তম: জানাযার সালাতের পদ্ধতি

জানাযার নামাজে চার তাকবীর দেওয়া প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতেহা পড়াএর সাথে যদি ছোট কোন সূরা বা দু এক আয়াত কুরআন শরীফ পড়া হয় তা হলে ভাল কারণ, এই সম্পর্কে ইবন আব্বাস (রাজিয়াল্লাহু আনহু) থেকে ছহীহ হাদীস বর্ণিত আছে এরপর দ্বিতীয় তাকবীর দেওয়া হলে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর সে দরূদ পড়তে হয় যা নামাজে তাশাহুদের (আত্তাহিয়্যাতুর) সাথে পড়া হয় তারপর তৃতীয় তাকবীর দিয়ে নিম্নলিখিত দু করা হয়:

«اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحيِّنَا وَمَيِّتِنَا، وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا، وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الْإِيمَانِ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ، وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلًا خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَعَذَابِ النَّارِ، وَافْسَحْ لَهُ فِي قَبْرِهِ، وَنَوِّرْ لَهُ فِيهِ، اللَّهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ وَلَا تُضِلَّنَا بَعْدَهُ».

অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত মৃত, উপস্থিত, অনুপস্থিত, ছোট, বড়, নর নারীদেরকে ক্ষমা করো, হে আল্লাহ! আমাদের মাঝে যাদের তুমি জীবিত রেখেছো তাদেরকে ইসলামের উপর জীবিত রাখো, আর যাদেরকে মৃত্যু দান করো তাদেরকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করো হে আল্লাহ! তুমি এই মৃত্যুকে ক্ষমা করো, তার উপর রহম করো, তাকে পূর্ণ নিরাপত্তায় রাখো, তাকে মার্জনা করো, মার্যাদার সাথে তার আতিথেয়তা করো তার বাসস্থানটি প্রশস্থ করে দাও, তুমি তাকে ধৌত করে দাও, পানি বরফ শিশির দিয়ে, তুমি তাকে গুনাহ হতে এমনভাবে পরিস্কার করো যেমন সাদা কাপড় ধৌত করে ময়লামুক্ত করা হয় তার এই (দুনিয়ার) বাসস্থানের বদলে উত্তম বাসস্থান প্রদান করো, তার এই পরিবার হতে উত্তম পরিবার দান করো, তুমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও, আর তাকে কবরের আযাব এবং জাহান্নামের আযাব হতে বাঁচাও তার কবর প্রশস্ত করে দাও এবং তার জন্য তা আলোকময় করে দাও হে আল্লাহ! আমাদেরকে তার সওয়াব হতে বঞ্চিত করোনা এবং তার মৃত্যূর পর আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করো না অত:পর চতুর্থ তাকবীর দিয়ে ডান দিকে এক সালামের মাধ্যমে নামাজ শেষ করা হবে

জানাযার নামাজে প্রত্যেক তাকবীরের সাথে হাত উঠানো মুস্তাহাব যদি মৃত ব্যক্তি নারী হয় তাহলে اَللهُمَّ اغْفِرْلَهُ এর পরিবর্তে اَللهُمَّ اغْفِرْلَهَا অর্থাৎ আরবী স্ত্রীলিঙ্গের সর্বনাম যোগ করে পড়তে হয় আর যদি মৃত্যের সংখ্যা দুই হয় তাহলে اَللهُمَّ اغْفِرْلَهُمَا.. الخ এবং এর বেশী হলে .... اَللهُمَّ اغْفِرْلَهُمْ অর্থাৎ সংখ্যা হিসেবে সর্বনাম ব্যবহার করতে হয় মৃত যদি শিশু হয় তাহলে উপরোক্ত মাগফিরাতের দুআর পরিবর্তে এই দোয়া পড়া হবে:

«اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ فَرَطًا وَذُخْرًا لِوَالِدَيْهِ، وَشَفِيعًا مُجَابًا، اللَّهُمَّ ثَقِّلْ بِهِ مَوَازِينَهُمَا، وَأَعْظِمْ بِهِ أُجُورَهُمَا، وَأَلْحِقْهُ بِصَالِحِ سَلَفِ الْمُؤْمِنِينَ، وَاجْعَلْهُ فِي كَفَالَةِ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، وَقِهِ بِرَحْمَتِكَ عَذَابَ الْجَحِيمِ».

অর্থ: “হে আল্লাহ ! এই বাচ্ছাকে তার পিতা-মাতার জন্যফারাত” (অগ্রবর্তী নেকী) যুখর” (সযত্বে রক্ষিত সম্পদ) হিসাবে কবুল করো এবং তাকে এমন সুপারিশকারী বানাও যার সুপারিশ কবুল করা হয় হে আল্লাহ ! এই (বাচ্চার) দ্বারা তার পিতা-মাতার সওয়াবের ওজন আরো ভারী করে দাও এবং এর দ্বারা তাদের নেকী আরো বড় করে দাও আর একে নেক্কার মুমিনদের অন্তর্ভূক্ত করে দাও এবং ইব্রাহীম () এর যিম্মায় রাখো, একে তোমার রহমতের দ্বারা দোযখের আযাব হতে বাঁচাও

সুন্নাত হলো ইমাম মৃত পুরুষের মাথা বরাবর দাঁড়াবে এবং মহিলা হলে তার দেহের মধ্যমাংশ বরাবর দাঁড়াবে

মৃত্যের সংখ্যা একাধিক হলে পুরুষের মৃতদেহ ইমামের নিকটবর্তী থাকবে এবং স্ত্রীলোকের মৃতদেহ কিবলার নিকটবর্তী থাকবে তাদের সাথে বালক-বালিকা হলে পুরুষের পর স্ত্রীলোকের আগে বালক স্থান পাবে, তারপর স্ত্রীলোক এবং সর্বশেষে বালিকার স্থান হবে বালকের মাথা পুরুষের মাথা বরাবর এবং স্ত্রীলোকের মধ্যমাংশ পুরুষের মাথা বরাবর রাখা হবে এইভাবে বালিকার মাথা স্ত্রীলোকের মাথা বরাবর এবং বালিকার মধ্যমাংশ পুরুষের মাথা বরাবর রাখা হবে সব মুছাল্লীগণ ইমামের পিছনে দাঁড়াবে তবে যদি কোন লোক ইমামের পিছনে দাঁড়াবার স্থান না পায় তাহলে সে ইমামের ডান পার্শ্বে দাঁড়াতে পারে

অষ্টম: মৃতের দাফন প্রক্রিয়া

শরীয়ত মতে কবর একজন পরুষের মধ্যভাগ পরিমাণ গভীর এবং কেবলার দিক দিয়ে লহদ (বগলী কবর) আকারে করতে হবে মৃতকে তার ডান পার্শ্বের উপর সামান্য কাত করে লাহাদে শায়িত করবে তারপর কাফনের গিট খুলে দিবে, তবে কাপড় খুলবে না, বরং এইভাবেই ছেড়ে দিবে মৃত ব্যক্তি পুরুষ হোক আর নারী হোক কবরে রাখার পর তার চেহারা উন্মুক্ত করা যাবেনা এরপর ইট খাড়া করে সেগুলো কাদা দিয়ে জমাট করে রাখবে, যাতে ইটগুলো স্থির থাকে এবং মৃতকে পতিত মাটি থেকে রক্ষা করে

যদি ইট না পাওয়া যায় তাহলে অন্য কিছূ যেমন, তক্তা, পাথর খণ্ড অথবা কাঠ মৃতের উপর খাড়া করে রাখবে যাতে মাটি থেকে তাকে রক্ষা করে তারপর এর উপর মাটি ফেলা হবে এবং এই মাটি ফেলার সময়:

«بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ»

(আল্লাহর নামে এবং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দ্বীনের উপর রাখলাম) বলা মুস্তাহাব কবর এক বিঘত পরিমাণ উচু করবে এবং এর উপরে সম্ভব হলে কঙ্কর রেখে পানি ছিটিয়ে দিবে

মৃতের দাফন করতে যারা শরীক হবে তাদের পক্ষে কবরের পার্শ্বে দাড়িয়ে মৃতের জন্য দু করার বৈধতা রয়েছে এর প্রমাণ, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন দাফন কাজ শেষ করতেন তখন তিনি কবরের পার্শে দাড়াতেন এবং লোকদের বলতেন:

«اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ، وَاسْأَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ، فَإِنَّهُ الْآنَ يُسْأَلُ».

তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং সওয়াল-জোয়াবের সময় অটল থাকার জন্য দু কর; কেননা, এখনই তার সওয়াল-জওয়াব শুরু হবে8

নবম: দাফনের পূর্বে যে মৃত্যের জানাযা পড়া হয় নাই সে ব্যক্তির দাফনের পর নামাজ পড়া যেতে পারে

কেননা, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তা করেছেন তবে এই নামাজ একমাস বা তার কম সময়ের মধ্যে হতে হবে, এর বেশী হলে কবরে গিয়ে নামাজ পড়া বৈধ হবে না কেননা, দাফনের একমাস পর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোন মৃতের নামাজ পড়েছেন এমন কোন হাদীস পাওয়া যায় নাই

দশম: উপস্থিত লোকদের জন্য মৃত্যের পরিবার-পরিজনের পক্ষে খাদ্য প্রস্তুত করা জায়েজ নয়; কেননা প্রসিদ্ধ সাহাবী হজরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ আল-বাজালী (রা) বলেন:

«كُنَّا نَعُدُّ الِاجْتِمَاعَ إِلَى أَهْلِ الْمَيِّتِ وَصَنْعَةَ الطَّعَامِ بَعْدَ الدَّفْنِ مِنَ النِّيَاحَة».

মৃত্যের পরিবার-পরিজনের নিকট সমবেত হওয়া এবং দাফনের পর খাদ্য প্রস্তুত করাকে আমরা মৃত্যের উপরনিয়াহা’ (বিলাপ) বলে গণ্য করতাম9 (এই হাদীস ইমাম আহমদ হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন)

তবে মৃতের পরিবার-পরিজনের জন্য বা তাদের মেহমানদের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করতে আপত্তি নেই এভাবে তাদের জন্য মৃত্যের আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে খাদ্য সরবাহ করা জায়েজ আছে এর প্রমাণ, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে যখন হযরত জাফর বিন আবূ তালিব (রাঃ) এর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে তখন তিনি স্বীয় পরিবারবর্গকে বললেন: : “জাফর পরিবারের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে পাঠাওআরো বললেন যে,

«إِنَّهُ أَتَاهُمْ مَا يَشْغَلُهُمْ».

তাদের উপর এমন মুছিবত নেমে আসছে যা তাদেরকে খাদ্য প্রস্তুত থেকে বিরত করে ফেলেছে10

মৃত্যের পরিবার-পরিজনের জন্য যে খাদ্য পাঠানো হয় তা খাওয়ার জন্য প্রতিবেশীদের বা অন্যদের আহবান করা বৈধ এর জন্য কোন নির্দিষ্ট সময়-সীমা আছে বলে আমাদের জানা নেই

একাদশ: কোন স্ত্রীলোকের পক্ষে স্বামী ব্যতীত কোন মৃত্যের উপর তিন দিনের বেশী শোক প্রকাশ জায়েয নয়

স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর উপর চারমাস দশ দিন পর্যন্ত শোক প্রকাশ ওয়াজিব তবে গর্ভবর্তী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত শোক পালন করতে হয় এই সম্পর্কে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস আছে

পুরুষের পক্ষে কোন মৃত্যের উপর সে আত্মীয় হোক আর অনাত্মীয় হোক শোক পালন জায়েয নয়

দ্বাদশ: সময়ে সময়ে পুরুষদের পক্ষে কবর জিয়ারত করা শরীয়তসম্মত এবং এর উদ্দেশ্য হবে মৃতদের জন্য দু, রহমাত কামনা এবং মরণ মরনোত্তর অবস্থা স্মরণ করা

কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«زُورُوا الْقُبُورَ، فَإِنَّهَا تُذَكِّرُكُمُ الْآخِرَةَ».

তোমরা কবর জিয়ারত কর, কেননা, তা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে11 সহীহ মুসলিম

রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সাহাবীগণকে শিক্ষা দিয়ে বলতেন যে, তারা যখন কবর জিয়ারতে যাবে তখন যেন বলে:

«السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ، نَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ، يَرْحَمُ اللَّهُ الْمُتَقَدِّمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ».

তোমাদের প্রতি সালাম হোক হে কবরবাসী মুমিন-মুসলমানগণ, ইনশা আল্লাহ আমরাও অবশ্যই তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি, আমরা আমাদের এবং তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর নিকট শান্তি নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি আল্লাহ অগ্রগামী পশ্চাতগামী আমাদের সবার প্রতি দয়া করুন12

মহিলাদের পক্ষে কবর জিয়ারত বৈধ নয় কেননা, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবর জিয়ারতকারীনী নারীদের অভিশাপ করেছেন এতদ্ব্যতীত মেয়েদের কবর জিয়ারতে ফেতনা অধৈর্য সৃষ্টির ভয় রয়েছে অনুরূপভাবে মেয়েদের পক্ষে কবর পর্যন্ত জানাযার অনুগমন করা বৈধ নয় কেননা, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে এত্থেকে বারণ করেছেন তবে মসজিদে বা মুসল্লায় মৃত্যের উপর জানাযার নামাজ পড়া নারী পুরুষ সকলের জন্য বৈধ

সাধ্যমত এই পাঠসমূহ সংকলনের কাজ এখানেই সমাপ্ত হল আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী মুহাম্মাদ এবং তার পরিবার সাহাবীগণের ওপর সালাত সালাম বর্ষন করুন

 

সূচিপত্র

 

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি 2

লেখকের ভূমিকা 2

প্রথম পাঠ: সূরা ফাতেহা এবং ছোট ছোট সূরাসমূহ 3

দ্বিতীয় পাঠ: ইসলামের রুকুনসমূহ 3

তৃতীয় পাঠ:আরকানে ঈমান বা ঈমানের রুকনসমূহ 5

চতুর্থ পাঠ: তাওহীদ শিরকের প্রকারভেদ 5

পঞ্চম পাঠ: ইহসান প্রসঙ্গ 11

ষষ্ঠ পাঠ: সালাতের শর্তাবলী 12

সপ্তম পাঠ: সালাতের রুকুনসমূহ 12

অষ্টম পাঠ: সালাতের ওয়াজিবসমূহ 12

নবম পাঠ: তাশাহ্হুদ অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু এর বর্ণনা 13

দশম পাঠ: সালাতের সুন্নাতসমূহ 15

একাদশ পাঠ: সালাত বাতেলকারী বিষয়সমূহ 17

দ্বাদশ পাঠ: অযুর শর্তসমূহ 18

ত্রয়োদশ পাঠ: অযুর ফরযসমূহ 18

চতুর্দশ পাঠ: অযু ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ 19

পঞ্চদশ পাঠ: প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষে ইসলামী চরিত্রে বিভূষিত হওয়া 21

ষষ্ঠদশ পাঠ: ইসলামী আদব-কায়দাগুলো পালন করা  21

সপ্তদশ পাঠ: শিরক বিভিন্ন প্রকার পাপ থেকে সতর্কতা 22

অষ্টাদশ পাঠ: মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থাপনা জানাযার নামাজ পড়া 22

***


মুসনাদে আহমাদ (/৪২৮), তবারানি মুজামুল 'আল-কাবীর'-(/৩৩৮) এবং বায়হাকী 'আশ-শু'আব' (১৪/৩৫৫) 'মাজমাউয যাওয়ায়িদ'- (/১২১) বলা হয়েছে: এটি আহমাদ বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ সহীহ হাদীসের বর্ণনাকারী

মুসনাদে আহমাদ ( /৪৭)

সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ৩২৫১), তিরমিযী (হাদীস নং ১৫৩৫)

সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ৪৯৮০), আহমাদ (/৩৮৪)

ইবনে মাজাহ (৪২০৪), আহমাদ (/৩০)

সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯১৬-৯১৭)

সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং: ৩২২১), হাকিম (/৩৯৯)

ইবনে মাজাহ (১৬১২), আহমাদ (/২০৪)..

মুসলিম: আল-জানায়েয পর্ব (৯৭৬), নাসায়ী: আল-জানায়েয পর্ব (২০৩৪), আবু দাউদ: আল-জানায়েয পর্ব (৩২৩৪), ইবনে মাজাহ: মা জাআ ফিল-জানায়েজ (১৫৬৯) এবং আহমাদ (/৪৪১)

ইবনে মাজাহ (হাদীস নং ১৫৬৯), শাইখ আলবানী এটিকে সহীহ বলেছেন

সহীহ মুসলিম (975)

মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওয়িয়াহ’ (/২৮৮-২৯৮)