الوَسَائِلُ المُفِيْدَةُ لِلحَيَاةِ السَّعِيْدَةِ
সৌভাগ্যময় জীবনের জন্য উপকারী উপায়সমূহ
الشَّيْخُ عَبْدُ الرَّحمَنِ بْنُ نَاصِرٍ السَّعْدِيُّ
رَحِمَهُ اللهُ
সংকলন
শাইখ আবদুর রহমান ইবন নাসের আস-সা‘দী
بِسْمِ اللهِ الرَّحمَنِ الرَّحِيمِ
সৌভাগ্যময় জীবনের জন্য উপকারী উপায়সমূহ
সংকলন
শাইখ আবদুর রহমান ইবন নাসের আস-সা‘দী (রহিমাহুল্লাহ)
ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল প্রশংসার মালিক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মাবূদ নেই; তাঁর কোন শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তার প্রতি এবং তার পরিবার-পরিজন ও সাহাবীবৃন্দের প্রতি।
অতঃপর:
মনের শান্তি ও আনন্দ অনুভব করা এবং অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করা প্রত্যেক ব্যক্তির অন্যতম লক্ষ্য। আর এর দ্বারাই পবিত্র জীবন অর্জিত হয় এবং আনন্দ ও প্রফুল্লতা পরিপূর্ণতা লাভ করে। তা অর্জনের জন্য রয়েছে দ্বীনি, স্বভাবগত ও আমলী উপায়-উপকরণসমূহ। আর এসব উপায়-উপকরণের সামগ্রীক সমন্বয় সাধন মুমিনগণ ব্যতীত অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হয় না। আর অন্যদের ক্ষেত্রে যদিও এর কোন একটি দিক অর্জিত হয়, এর কোন একটি উপায়-উপকরণ নিয়ে পণ্ডিতগণ চেষ্টা-সাধনা ও গবেষণা করার কারণে, কিন্তু তাদের থেকে বহু উপকারী, সুন্দর ও ফলপ্রসূ দিক হাতছাড়া হয়ে যায়।
কিন্তু আমি আমার এই পুস্তিকায় এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করব, যা এই মহান উদ্দেশ্য হাসিলের অন্যতম উপায় ও মাধ্যম বলে বিবেচিত হবে এবং যার জন্য প্রত্যেকেই চেষ্টা-সাধনা করে থাকে।
সুতরাং তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ঐসব উপায়-উপকরণের অধিকাংশ অর্জন করতে পারবে, সে সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে এবং উপভোগ করবে পবিত্রময় জীবন। পক্ষান্তরে তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তা অর্জনে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হবে, তার জীবন অতিবাহিত হবে দুঃখ-কষ্টে এবং তার হবে দূরাবস্থার জীবন। আবার তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি মাঝামাঝি পর্যায়ের হবে, সে আল্লাহ প্রদত্ত তাওফীক অনুযায়ী জীবনযাপন করবে। আর আল্লাহই তাওফীকদাতা, তাঁর সাহায্যেই সকল কল্যাণ অর্জিত হয় এবং অকল্যাণ প্রতিরোধ হয়।
(আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বহু আয়াতে নিজের
সম্মানার্থে বহুবচন ব্যবহার করেছেন,যা মূলত আরাবী ভাষার একটি রীতি।বাংলায় এরীতির ব্যাবহার না থাকায় সে সব আয়াতের অনুবাদে বইটিতে একবচনই ব্যবহার করা হয়েছে।সম্পাদক,আব্দুর রব আফ্ফান)
পরিচ্ছেদ: (১-২)ঈমান এবং সৎআমল
ঈমান ও সৎকর্ম: সৌভাগ্যময় জীবন লাভের অন্যতম প্রধান ও মূল উপায় হল ঈমান ও সৎকর্ম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿مَنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا مِّن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَلَنُحۡيِيَنَّهُۥ حَيَوٰةٗ طَيِّبَةٗۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ 97﴾
মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, অবশ্যই আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব। আর অবশ্যই আমি তাদেরকে তারা যা করত তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব। [আন-নাহাল ৯৭]
সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমান ও সৎ আমলের সমন্বয় সাধন করতে পারবে, তার জন্য আল্লাহ তা‘আলা ইহকালে পবিত্রময় জীবনের এবং ইহকাল ও পরকালে উত্তম প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আর এর কারণ সুস্পষ্ট। কেননা, মুমিনগণ আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ ঈমানের ফলে সৎকাজ করে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য মন-মানসিকতা ও নৈতিক চরিত্রকে সংশোধন করে। তাদের সাথে মৌলিক নীতিমালা রয়েছে, যার দ্বারা তারা তাদের নিকট উপস্থাপিত সকল প্রকার হাসি-আনন্দ, অস্থিরতা ও দুঃখ-বেদনার কারণসমূহ উপলব্ধি করতে পারে।
এই নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে, তার জন্য কৃতজ্ঞতা ও উপকারী ক্ষেত্রে তার যথাযথ ব্যবহার দ্বারা তারা পছন্দ ও চলার পথ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। সুতরাং এই দৃষ্টিকোণ থেকে তারা যখন তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করবে, তখন এর দ্বারা তাদের জন্য আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি, তার স্থায়িত্ব ও বরকতের ব্যাপারে আশা জাগরণ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীদের সাওয়াবের প্রত্যাশা তৈরি হবে। এর ফলে সৃষ্ট এই আনন্দের কল্যাণ ও বরকতের দ্বারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিষ্ঠিত হবে।
আর তারা উপলব্ধি করতে পারবে দুঃখ-কষ্ট, ক্ষয়-ক্ষতি ও দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে। এ ক্ষেত্রে তাদের পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে প্রতিরোধ করবে; আর যা লাঘব করা সম্ভব হবে তা লাঘব করবে এবং প্রতিরোধের কোন উপায় না থাকলে সর্বোত্তম ধৈর্যধারণ করবে। আর এর দ্বারা তাদের দুঃখ-কষ্টের প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে আসার যথাযথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও শক্তি-সামর্থ্য সঞ্চয় হবে। ধৈর্য এবং প্রতিদান ও সওয়াবের আশা পোষণ করা বড় মর্যাদাপূর্ণ কাজ, যেখানে দুঃখ-কষ্ট বিলিন হয়ে যায় এবং সেখানে আনন্দ, উত্তম আশা-আকাঙ্খা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও সওয়াবের প্রত্যাশা স্থান লাভ করে। যেমন বিশুদ্ধ হাদিসে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَلَيْسَ ذَلِكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ».
“মুমিনের কর্ম-কাণ্ডে অবাক হওয়ার বিষয় হল তার সকল কাজই মঙ্গলজনক। সে সুখ-শান্তি লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে; ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ-কষ্টে পতিত হলে সে ধৈর্যধারণ করে; ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর এই সুযোগ মুমিন ব্যতীত অন্য কারও ভাগ্যে জুটে না।” সহীহ মুসলিম।
সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দিলেন যে, মুমিনের প্রাপ্তি ও কল্যাণ, হাসি-আনন্দ এবং দুঃখ-কষ্ট সকল অবস্থায়ই সে তার কর্ম-কাণ্ডের সুফল দিগুণ ভোগ করবে। এ জন্যই আপনি দু’টি জিনিস পাবেন, যেগুলো কল্যাণ বা অকল্যাণের প্রতিনিধিত্ব করে। তবে উভয়ের অর্জন পদ্ধতির মধ্যে ব্যবধান অনেক। আর এই ব্যবধানটি হবে ঈমান ও সৎকর্মের ক্ষেত্রে উভয়ের পার্থক্য অনুযায়ী। এই গুণের অধিকারী ব্যক্তি এ দু’টি গুণ দ্বারা কল্যাণ ও অকল্যাণ লাভ করে, যা আমরা আলোচনা করেছি; যেমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, ধৈর্যধারণ ইত্যাদি। এতে করে তার জন্য আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়; আর দূর হয়ে যায় দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, হৃদয়ের সংকীর্ণতা ও জীবনের দুঃখ-কষ্ট এবং ইহজগতে তার জীবন হয়ে উঠে সুখময়। আর অপর ব্যক্তি অপকর্ম, দাম্ভিকতা ও স্বেচ্ছাচারিতা দ্বারা অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠে। ফলে তার নৈতিকতা বিনষ্ট হয় এবং অধৈর্য ও অতি লোভের কারণে তার নৈতিক চরিত্র পশুর চরিত্রের মত হয়ে পড়ে। এতদাসত্ত্বেও সে মানসিক ভাবে অশান্ত ও অস্থির হয়। তার এই অস্থিরতার পিছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে; যেমন তার প্রিয়াদেরকে হারানোর আশঙ্কা ও তাদের পক্ষ থেকে নতুন নতুন বহু দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আশঙ্কা; আরও একটি কারণ হচ্ছে নফসের অস্থিরতা, যা অর্জন করুক আর নাই করুক সার্বক্ষণিক আরও কিছু পেতে আগ্রহবোধ করে। সে যদি তাকদীরের কারণে নির্ধারিত অংশ পেয়েও যায়, তবুও সে উল্লেখিত কারণে অস্থির হয়ে উঠে। আর এসব উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক ও অসন্তুষ্টির কারণে সে দুঃখ-কষ্ট অনুভব করে। সুতরাং তার দুর্ভাগ্যময় জীবন, স্বজনপ্রীতি ও চিন্তারোগ এবং ভয়-ভীতি যা তাকে খারাপ অবস্থা ও বীভৎস কষ্টের দিকে ঠেলে দিয়েছে; তার এমন পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন করো না। কেননা সে সওয়াবের আশা করে না। আর তার নিকট ধৈর্যের মত এমন সম্পদও নেই যা তাকে শান্তনা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেবে।
আর এ ধরনের প্রত্যেকটি বর্ণনাই অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তব উদাহরণ। যেমন এই শ্রেণীর একটি বিষয়কে নিয়ে যখন আপনি চিন্তা-ভাবনা করবেনে এবং তাকে মানুষের বাস্তব অবস্থার সম্মুখে উপস্থাপন করবেন, তখন ঈমানের দাবি অনুযায়ী আমলকারী মুমিন ব্যক্তি ও যে ব্যক্তি এমন কাজ করেনি তাদের উভয়ের মধ্যে অনেক বড় ব্যবধান দেখতে পাবেন। আর সে বিষয়টি হল, আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক ও তিনি তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্ন প্রকারের যেসব অনুগ্রহ ও সম্মান দান করেছেন, তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে দ্বীন অনেক বেশি উৎসাহ প্রধান করেছে।
সুতরাং মুমিন যখন অসুস্থতা অথবা দারিদ্র অথবা অনুরূপ কোন মান-সম্মান বিনষ্টকারী বিপদ-মুসিবত দ্বারা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তখন তার ঈমান ও আল্লাহ প্রদত্ত রিযিকের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার কারণে আপনি তার চোখে-মুখে আনন্দের ঝলক দেখতে পাবেন এবং সে আন্তরিকভাবে এমন কিছু চাইবে না, যা তার ভাগ্যে নেই। এ অবস্থায় সে তার চেয়ে খারাপ অবস্থাশালী ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে শান্তনা অনুভব করে; তার চেয়ে ভাল অবস্থাশালী ব্যক্তির দিকে তাকাবে না। কোন কোন সময় তার আনন্দ, খুশি ও মনের প্রফুল্লতা আরও বৃদ্ধি পায় ঐ ব্যক্তির অবস্থা দেখে, যে ব্যক্তি দুনিয়াবী সকল উদ্দেশ্য হাসিল করেও পরিতৃপ্ত হতে পারেনি।
অনুরূপভাবে যে ব্যক্তির নিকট ঈমানের দাবি অনুযায়ী আমল নেই, সে যখন অভাব-অনটন দ্বারা অথবা দুনিয়াবী চাওয়া-পাওয়ার কিছু থেকে বঞ্চিত করার দ্বারা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, তখন তাকে আপনি দুঃখ-কষ্টে চরম বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে পাবেন।
আরেকটি দৃষ্টন্ত হল: যখন ভয় ও আতঙ্কের কারণসমূহ প্রকাশ পায় এবং মানুষ নানান অসুবিধা দ্বারা কষ্ট অনুভব করে, তখন তার মধ্যে বিশুদ্ধ ঈমান, দৃঢ় মনোবল, মানসিক প্রশান্তি এবং উদ্ভত এই সঙ্কট মোকাবিলায় চিন্তায়, কথায় ও কাজে সামর্থ্যবান হওয়ার মত গুণাবলী বিদ্যমান থাকে, ফলে সে নিজেকে এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আর এই পরিস্থিতি মানুষকে আনন্দ দেয় এবং তার হৃদয়কে মজবুত করে।
অনুরূপভাবে আপনি ঈমান হারা ব্যক্তিকে পাবেন সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থায়। যখন সে ভয় ও আতঙ্কের অবস্থায় পতিত হবে, তখন তার হৃদয় অস্বস্তি অনুভব করবে; স্নায়ুতন্ত্রগুলো দুশ্চিন্তায় উত্তেজিত হয়ে উঠবে; তার চিন্তাধার বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে, তার অভ্যন্তরে বিরাজ করবে ভয় ও আতঙ্ক এবং তার মধ্যে বিরাজ করবে বাহ্যিক আতঙ্ক ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। ফলে তার বাস্তব অবস্থা বর্ণনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর এ শ্রেণীর মানুষের যদি স্বভাবগত উপায়-উপকরণ বা উদ্দেশ্যসমূহ হাসিল না হয়, যা অর্জনে অনেক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন; তবে তাদের শক্তি-সামর্থ্য ভেঙ্গে পড়ে এবং স্নায়ুতন্ত্রগুলো উত্তেজিত হয়ে উঠে। আর এরূপ হয় ঈমানের ঘাটতির কারণে, যা ধৈর্যধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রখে। বিশেষ করে সঙ্কটকালে ও দুঃখ-দুর্দশার সময়ে।
সুতরাং পুণ্যবান ও পাপী, মুমিন ও কাফির উভয়ে অর্জনীয় বীরত্ব অর্জন এবং এমন স্বভাব-চরিত্র, যা ভয়ানক পরিস্থিতিকে হালকা ও সহজ করে, তার ক্ষেত্রে সমান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মুমিন ব্যতিক্রম তার ঈমানী শক্তি, ধৈর্য, আল্লাহর উপর ভরসা ও নির্ভরশীলতা এবং তার সওয়াবের প্রত্যাশার কারণে। এসব বিষয়ের কারণে তার সাহস ও বীরত্ব আরও বৃদ্ধি পায়, আতঙ্কের চাপ কমে এবং তার নিকট কঠিন কাজগুলো সহজ হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...إِن تَكُونُواْ تَأۡلَمُونَ فَإِنَّهُمۡ يَأۡلَمُونَ كَمَا تَأۡلَمُونَۖ وَتَرۡجُونَ مِنَ ٱللَّهِ مَا لَا يَرۡجُونَۗ...﴾
যদি তোমরা যন্ত্রণা পাও তবে তারাও তো তোমাদের মতই যন্ত্রণা পায় এবং আল্লাহর কাছে তোমরা যা আশা কর ওরা তা আশা করে না। (সূরা আন-নিসা: ১০৪) আর তারা আল্লাহর বিশেষ সাহায্য লাভ করে এবং তার সাহায্য সকল প্রকার ভয়-ভীতিকে দূরীভূত করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...وَٱصۡبِرُوٓاْۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ﴾
আর ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সূরা আল-আনফাল: ৪৬)
(৩)সৃষ্টির প্রতি কথা ও কাজ দ্বারা ইহসান করা
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর করার অন্যতম উপায় হচ্ছে কথা, কাজ ও বিভিন্ন প্রকারের সৎকর্মের দ্বারা সৃষ্টির প্রতি ইহসান করা। উল্লেখিত প্রতিটি কাজই কল্যাণময় ও ইহসান। এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা পুণ্যবান ও পাপীর কর্ম-কাণ্ড অনুসারে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা দূর করেন। তবে মুমিনের জন্যই এ ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ অংশ রয়েছে। আর সে ব্যতিক্রম এই জন্য যে, তার ইহসানের কার্যক্রম পরিচালিত হয় ইখলাসের সাথে সওয়াবের প্রত্যাশায়।
ফলে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য কল্যাণকর কাজে অর্থ ব্যয় করা সহজ করে দেন; কেননা এর মাধ্যমে সে কল্যাণ প্রত্যাশা করে। আর তিনি তার ইখলাস ও আন্তরিকতার কারণে সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿لَّا خَيۡرَ فِي كَثِيرٖ مِّن نَّجۡوَىٰهُمۡ إِلَّا مَنۡ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوۡ مَعۡرُوفٍ أَوۡ إِصۡلَٰحِۭ بَيۡنَ ٱلنَّاسِۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ ٱبۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ ٱللَّهِ فَسَوۡفَ نُؤۡتِيهِ أَجۡرًا عَظِيمٗا114﴾
তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই, তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় সাদকাহ, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের; আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কেউ তা করলে তাকে অবশ্যই আমি মহা পুরস্কার দেব। (সূরা আন-নিসা: ১১৪)
সুতরাং তার থেকে সংঘটিত এ ধরনের সকল কর্মকাণ্ডকে আল্লাহ তা‘আলা কল্যাণময় বলে ঘোষণা করেছেন। আর কল্যাণ মানেই কল্যাণকে ত্বরান্বিত করে এবং অকল্যাণকে প্রতিরোধ করে। আর সওয়াব প্রত্যাশী মুমিনকে আল্লাহ মহাপুরস্কার দান করবেন। আর অন্যতম মহা পুরস্কার হচ্ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ-কষ্ট ইত্যাদি দূর করে দেয়া।
পরিচ্ছেদ:(৪) উপকারী কাজ-কর্ম ও জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত থাকা
স্নায়ুর টান থেকে উদ্ভূত দুশ্চিন্তা এবং মনকে ব্যস্ত করে রাখা কিছু বিরক্তিকর বিষয় দূর করার উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো: উপকারী কাজ-কর্ম ও জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত থাকা। কেননা, তা মনকে ঐসব কর্ম-কাণ্ড থেকে বিরত রাখে,যা তাকে অস্থির করে তোলে। এ জন্যই সে অনেক সময় ঐসব কারণকে ভুলে থাকবে, যা তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে বাধ্য করে। ফলে সে মানসিকভাবে আনন্দ অনুভব করবে এবং তার মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পাবে। আর এই কারণটিও মুমিন ও অন্যান্যদের মাঝে সমভাবে বিদ্যমান। কিন্তু মুমিন অন্যান্যদের থেকে ব্যতিক্রম তার ঈমান ও ইখলাসের সাথে সওয়াবের প্রত্যাশায় জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষাদান ব্যবস্থায় কর্মতৎপর হওয়ার পাশাপাশি উত্তম আমল করার কারণে। যদি তা ইবাদত কেন্দ্রিক হয়, তবে তা ইবাদত হিসেবেই গণ্য হবে। আর তা যদি দুনিয়াবী অথবা প্রকৃতিগত কোন কর্ম-কাণ্ড হয়ে থাকে, তবে তার ফলাফল নিয়তের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভর করবে। আর সে যদি এর দ্বারা আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে সাহায্য কামনা করে, তবে তার এ কাজের প্রভাবে দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা দূর হবে। সুতরাং অনেক মানুষকে মনের অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দ্বারা পরীক্ষা করা হয়; অতঃপর এর কারণে সে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়, তখন তার প্রতিষেধক ঔষধ হচ্ছে: “ঐ কারণটিকে ভুলে থাকা, যা তাকে পাপ-পঙ্কিলতা ও অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে এবং নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত রাখা।
আর যে কাজে ব্যক্তি নিয়োজিত হয় তা এমন হওয়া উচিত যা মনকে প্রশান্ত করে এবং আকর্ষণ করে, কারণ এটি এই উপকারী উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সর্বাধিক সহায়ক। -এ বিষয়ে আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।-
সকল চিন্তাকে দৈনন্দিন কাজের গুরুত্বের উপর একত্রিত করা: দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর করার অন্যতম উপায় হলো সকল চিন্তাকে বর্তমান দিনের কাজে গুরুত্বারোপের উপর একত্রিত করা এবং ভবিষ্যৎ ও অতীত কর্ম-কাণ্ড
নিয়ে চিন্তা-ভাবনা বন্ধ করা। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চেয়েছেন। সুতরাং অতীতের কোন বিষয় নিয়ে
দুশ্চিন্তা করে লাভ নেই, যা কোন দিন ফিরিয়ে আনা ও তা লাভ করা সম্ভব নয়। আর ভবিষ্যতকালে
কোন দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় মগ্ন থাকাও ক্ষতিকর। অতএব বান্দার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো তার আজকের দিন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা এবং তার সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা ঐ দিন তথা বর্তমান সময়কে ভাল করার কাজে ব্যয় করা। কারণ, এই দিকে মনোযোগ দিলেই তার কর্ম-কাণ্ডসমূহ পরিপূর্ণ হবে এবং এর দ্বারা বান্দা দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করতে পারবে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন দো‘আ করতেন অথবা তাঁর উম্মতকে দো‘আ করতে বলতেন, তখন তিনি আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ কামনার সাথে সাথে যা পাওয়ার জন্য দো‘আ করা হয়, তা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানোর জন্য উৎসাহ প্রদান করতেন। আর যা দূর করার জন্য দো‘আ করা হত, তা থেকে দূরে সরে থাকতে উৎসাহ দিতেন। কেননা দো‘আ আমলের সঙ্গী। সুতরাং বান্দা দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষেত্রে তার উপকারী বিষয়ে চেষ্টা করবে এবং তার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করবে ও এই ব্যাপারে তাঁর নিকট সাহায্য চাইবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجِزْ، وَإِذَا أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلَا تَقُلْ: لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَذَا كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ: قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ، فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ».
“যা তোমার জন্য উপকারী, তা তুমি কামনা কর এবং আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। আর অক্ষমতা প্রকাশ করো না। কোন মসীবত এলে এ কথা বলো না যে, যদি আমি এরূপ এরূপ কাজ করতাম, তাহলে এরূপ হতো। বরং বল, আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন; কেননা ‘যদি’ (বলে আক্ষেপ করা) শয়তানের কর্মদ্বার খুলে দেয়।” সহীহ মুসলিম। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক অবস্থায় উপকারী কর্মের কামনা করতে, আল্লাহর সাহায্য চাইতে আদেশ করেছেন এবং দূর্বলতা ও অক্ষমতার নিকট আত্মসমর্পন না করতে নির্দেশ দিয়েছেন; যা ক্ষতিকারক অলসতা। তিনি আরও আদেশ করেছেন অতীতকালের বাস্তবায়িত বিষয় এবং আল্লাহর ফয়সালা ও তার নির্ধারিত ভাগ্যকে মেনে নেয়ার জন্য।
আর তিনি সকল কর্ম-কাণ্ডকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন: এক প্রকার কাজ হল বান্দা তা পুরাপুরি বা অংশবিশেষ অর্জনের চেষ্টা-প্রচেষ্টায় অথবা তা প্রতিরোধ করতে বা লাঘব করতে সক্ষম। সুতরাং এই ক্ষেত্রে বান্দা তার প্রচেষ্টার অব্যহত রাখবে এবং মাবুদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে। আরেক প্রকারের কাজ হল, যে ব্যাপারে তার ক্ষমতা নেই। সুতরাং তার ব্যাপারে শান্ত ও সন্তুষ্ট থাকবে এবং তা মেনে নেবে। আর কোন সন্দেহ নেই যে, এই নীতি মেনে চলা, আনন্দ অনুভব ও দুশ্চিন্তা দূর করার কারণ।
পরিচ্ছেদ:(৫) বেশি বেশি আল্লাহর যিকির
হৃদয়ের প্রফুল্লতা ও মনের প্রশান্তির এক বড় উপায় হল বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করা। কারণ, হৃদয়ের প্রফুল্লতা ও মনের প্রশান্তি কায়েম করতে এবং তার দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা দূর করতে যিকিরের আশ্চর্য ধরনের প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...أَلَا بِذِكۡرِ ٱللَّهِ تَطۡمَئِنُّ ٱلۡقُلُوبُ﴾
জেনে রাখ, আল্লাহ্র স্মরণেই মন প্রশান্ত হয় (সূরা আর-রা‘দ: ২৮) সুতরাং বান্দার বিশেষ এই উদ্দেশ্য অর্জন করতে ও তার প্রত্যাশিত সওয়াব ও প্রতিদান পেতে আল্লাহর যিকিরের বিরাট প্রভাব রয়েছে।
(৬) আল্লাহর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল প্রকার নিয়ামতের বর্ণনা করা
অনুরূপভাবে আল্লাহর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল প্রকার নিয়ামতের বর্ণনা করা; কারণ, তাঁর নিয়ামত সম্পর্কে জানা এবং সে বিষয়ের বর্ণনা দ্বারা আল্লাহ বান্দার দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা দূর করেন। আর তা বান্দাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য উৎসাহিত করে; যা বান্দার সর্বোচ্চ মরতবা ও মর্যাদা, যদিও সে অভাব-অনটন, অসুস্থতা প্রভৃতি প্রকারের বালা-মুসিবতে থাকে। কারণ, বান্দা যখন তার উপর আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতকে — যা গণনা বা হিসাব করা সম্ভব হবে না — তার উপর আপতিত অপছন্দনীয় ও কষ্টকর কর্ম-কাণ্ডের সাথে তুলনা করে, তখন নিয়ামতের সাথে কষ্টের কোন তুলনা-ই হয় না।
বরং বিপদ-মুসিবত দ্বারা যখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করেন; বান্দও সেই ব্যাপারে ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও আত্মসমার্পণের দায়িত্ব পালন করে, তখন বিপদের সেই চাপটি সহ্য করা সহজ হয়ে যায়। আর বান্দার সওয়াব ও প্রতিদানের আশা এবং ধৈর্য ও সন্তুষ্টির কর্তব্য পালন করার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করার দ্বারা সে তিক্ত বস্তুকে মিষ্টি বস্তু মনে করে। ফলে প্রতিদানের স্বাদ তাকে ধৈর্যের তিক্ততার কথা ভুলিয়ে দেয়।
(৭)জীবন উপকরেণর ক্ষেত্রে নিম্নমানের ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করা
এই বিষয়ে সবচেয়ে উপকারী বস্তু হল বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিক নির্দেশনার বাস্তবায়ন করা। তিনি বলেন:
«انْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلُ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ».
“তোমরা তোমাদের চেয়ে নিম্নমানের ব্যক্তির দিকে তাকাও। আর তোমাদের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির দিকে তাকিও না। কারণ, তা অধিক উপযুক্ত যে তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে করবে না।” সহীহ মুসলিম। সুতরাং যখন বান্দার চোখের সামনে এই বিশেষ নির্দেশনা থাকে, তখন সে নিজেকে সুস্থতা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট আনুসাঙ্গিক বিষয়ে এবং রিজিক ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট আনুসাঙ্গিক বিষয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর সৃষ্ট বান্দাদের অনেকের চেয়ে উন্নত মনে করে। ফলে তার অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা দূর হয় এবং তার আনন্দ ও আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি তার সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়; যাতে সে অন্যদের চেয়ে অগ্রগামী।
আল্লাহর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য, দ্বীনি ও দুনিয়াবী নিয়ামতের প্রতি বান্দার চেতনা যত দীর্ঘ হবে, তখন সে তার রবকে এমন নজরে দেখবে যে, তিনি তাকে অনেক কল্যাণ দান করেছেন এবং তার থেকে বহু অকল্যাণ দূর করেছেন।কোন সন্দেহ নেই , এগুলো তার দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনাসমূহ দূর করে এবং হাসি-খুশি ও আনন্দকে আবশ্যক করে।
পরিচ্ছেদ:(8) দুশ্চিন্তার কারণ দূরকরণ ও সুখ-শান্তি অর্জনের উপায় অবলম্বনে সচেষ্ট হওয়া:
দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা দূর করার এবং সুখ-শান্তি অর্জন করার অন্যতম উপায় হচ্ছে দুশ্চিন্তার কারণ দূরকরণে ও সুখ-শান্তি অর্জনের উপায় অবলম্বনে সচেষ্ট হওয়া। আর তা করতে হবে ব্যক্তির অতীতে ঘটে যাওয়া দুঃখ-কষ্ট ভুলে যাওয়ার মাধ্যমে, যা তার পক্ষে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব এবং তাকে বুঝতে হবে যে, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা অনর্থক ও অসম্ভব কাজ। আর এ ধরনের কাজ আহাম্মকী ও পাগলামী। সুতরাং তার মনকে অতীতে ঘটে যাওয়া দুঃখ-কষ্ট নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় ব্যস্ত না হতে সাহায্য করবে এবং ঠিক একইভাবে তার মনকে ভবিষ্যৎ জীবনের কাল্পনিক অভাব-অনটন, ভয়-ভীতি ইত্যাদিতে পতীত হওয়ার দুঃখ-কষ্টের চিন্তায় অস্থির না হতে চেষ্টা করবে। সুতরাং তাকে জানতে হবে যে, ভবিষ্যৎ বিষয়াদি অজ্ঞাত ও অস্পষ্ট; তার মধ্যে ভাল, মন্দ আশা-হতাশা এবং দুঃখ-বেদনা সবই থাকতে পারে। আর তা মহাপরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর হাতে, তার কোন কিছুই বান্দাদের হাতে নয়। বান্দা শুধু তা থেকে কল্যাণসমূহ অর্জনে এবং অকল্যাণসমূহ থেকে আত্মরক্ষায় সচেষ্ট থাকতে পারে। আর বন্দাকে আরও জানতে হবে যে, সে যখন ভবিষ্যৎ বিষয় নিয়ে তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও চিন্তা-ভাবনা থেকে ফিরে আসবে; তার ভাল-মন্দের ব্যাপারে তার প্রতিপালকেরই উপর ভরসা করবে এবং এই ব্যাপারে তার প্রতি আস্থাশীল হবে, তখন তার অন্তর শান্তি অনুভব করবে; তার অবস্থার উন্নতি হবে এবং তার সকল দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর হয়ে যাবে।
(৯) আল্লাহর নিকট দোয়া করা : ভবিষ্যৎ বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার সবচেয়ে উপকারী পন্থা হল এই দো‘আটি পাঠ করা; যার দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করতেন। তিনি বলতেন:
«اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِيَ الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي، وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِيَ الَّتِي إِلَيْهَا مَعَادِي، وَاجْعَلِ الْحَيَاةَ زِيَادَةً لِي فِي كُلِّ خَيْرٍ، وَالْمَوْتَ رَاحَةً لِي مِنْ كُلِّ شَرٍّ».
“হে আল্লাহ! তুমি আমার দীনকে সংশোধন করে দাও, যা আমার সকল কর্মের হিফাযতকারী। তুমি আমার দুনিয়াকে সংশোধন করে দাও, যার মধ্যে আমার জীবন-জীবিকা রয়েছ এবং তুমি আমার আখেরাতকে সংশোধন করে দাও, যেখানে আমার প্রত্যাবর্তন হবে। আর তুমি প্রতিটি কল্যাণের জন্য আমার হায়াতকে বাড়িয়ে দাও এবং খারাপ বা অকল্যাণ থেকে আমার জন্য মৃত্যুকে আনন্দদায়ক করে দাও।” (সহীহ মুসলিম।) অনুরূপভাবে তিনি আরও বলতেন:
«اللَّهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُو فَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ وَأَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ».
“হে আল্লাহ! আমি শুধু তোমার রহমতেরই প্রত্যাশা করি, সুতরাং তুমি এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার দায়িত্বে ছেড়ে দিয়ো না। আর তুমি আমার সকল বিষয় সংশোধন করে দাও; তুমি ছাড়া কোন সত্য মাবূদ নেই।” (আবু দাউদ, হাদিসটির সনদ সহীহ) সুতরাং বান্দা যখন এমন দো‘আ বিশুদ্ধ নিয়তে মনোযোগ দিয়ে তার বাস্তব দিক নিয়ে চিন্তা-গবেষণাসহ পাঠ করবে, যার মধ্যে তার দ্বীনি ও দুনিয়াবী ভবিষ্যৎ কল্যাণ নিহিত রয়েছে, তখন আল্লাহ তার প্রার্থনা, প্রত্যাশা ও সে জন্য তার কাজ করাকে বাস্তবে রূপ দেবেন এবং তার দুশ্চিন্তা, খুশি ও আনন্দে রূপান্তরিত হবে।
পরিচ্ছেদ:(9)সবচেয়ে খারাপ সম্ভাবনার পূর্বানুমান
দুঃখ ও উদ্বেগ দূর করার সবচেয়ে উপকারী কারণগুলোর একটি হলো— যখন আল্লাহর বান্দার উপর কোনো বিপদ-আপদ নেমে আসে, তখন সে যেন সেটিকে হালকা করার চেষ্টা করে। আর এর উপায় হলো— সে যেন সবচেয়ে খারাপ যে সম্ভাবনা ঘটতে পারে, তা কল্পনা করে এবং নিজের মনকে সে অবস্থার জন্য প্রস্তুত করে। যখন সে এটা করবে, তখন যা কিছু হালকা করা সম্ভব, সে চেষ্টা করবে তা হালকা করার, সাধ্য অনুযায়ী। এভাবে মানসিক প্রস্তুতি এবং কার্যকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে তার দুঃখ-উদ্বেগ দূর হয়ে যাবে। আর তার সেই প্রচেষ্টা পরিণত হবে কল্যাণ অর্জন এবং ক্ষতি থেকে বাঁচার এক সহজ উপায় হিসেবে।
সুতরাং যখন তাকে ভয়-ভীতি, রোগ-ব্যাধি, অভাব-অনটন ও বিভিন্ন প্রকার পছন্দনীয় বস্তুর ঘাটতির কারণসমূহ আচ্ছন্ন করে ফেলবে, তখন সে যেন এতেই প্রশান্তি লাভ করে এবং নিজেকে এই পরিবেশ অথবা তার চেয়ে আরও কঠিন পরিবেশকে প্রস্তুত করে। কারণ, দুঃখ-কষ্টের সম্ভাবনাময় পরিবেশের জন্য কোন ব্যক্তি নিজেকে প্রস্তুত করলে তার জন্য তা থেকে উত্তরণ সহজ হয় এবং তার ভয়াবহতা হ্রাস পায়। বিশেষ করে যখন সে নিজেকে তার সাধ্যানুযায়ী দুঃখ-কষ্ট প্রতিরোধে ব্যস্ত রাখে, তখন সে বিপদ-মুসিবত দূর করার জন্য ফলপ্রসূ চেষ্টা-সাধনার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয় এবং দুঃখ-কষ্টের মূলোৎপাটনে আল্লাহর উপর ভরসা ও উত্তম আস্থা রেখে নতুন নতুন শক্তি ও কৌশল প্রয়োগে নিজেকে ব্যতিব্যস্ত রাখে। কোন সন্দেহ নেই যে, বান্দার ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন প্রতিদান লাভের আশা-আকাঙ্খার সাথে সাথে সুখ-শান্তি ও হৃদয়ের প্রসারতা ও উদারতার গুণ অর্জনে এসব কর্ম-কাণ্ডের বিরাট উপকারিতা রয়েছে। আর এটা অভিজ্ঞতালব্ধ দৃষ্টান্ত, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষ থেকে এরূপ ঘটনা অনেক সংঘটিত হয়।
পরিচ্ছেদ:(10)মনোবল বৃদ্ধি এবং কল্পনাপ্রসূত অস্বস্তি ও আবেগ-উত্তেজনা বর্জন করা
মানসিক ও শারীরিক রোগমুক্তির অন্যতম উপায় হচ্ছে মনোবল বৃদ্ধি এবং কল্পনাপ্রসূত অস্বস্তি ও আবেগ-উত্তেজনা বর্জন করা, যা দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার জন্ম দেয়। রাগ ও অস্থিরতা বেদনাদায়ক কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি করণ। যে ব্যক্তি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার বা প্রিয় জিনিস হারানোর আশঙ্কা করে, তা তাকে দুশ্চিন্তা, দুঃখ, মানসিক ও শারীরিক রোগ, এবং স্নায়বিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। আর এর খারাপ প্রভাবগুলো মানুষ বহু প্রত্যক্ষ করেছে।
আল্লাহর উপর ভরসা করা: (১২)আর যখন বান্দার অন্তর আল্লাহ নির্ভরশীল হয় ও সে আল্লাহর উপর ভরসা করে, কল্পনা-জল্পনার নিকট আত্মসমর্পন না করে, দুশ্চিন্তা ও খারাপ কল্পনার অধিকারী হয় না এবং আল্লাহর প্রতি আস্থাশীল হয় ও তার অনুগ্রহের আশা করে, এসব দ্বারা তখন তার দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনাসমূহ প্রতিরোধ হয় এবং তার অনেক মানসিক ও শারীরিক রোগ দূর হয়ে যায়। আর তার বর্ণনাতীত মানসিক শক্তি, উদারতা ও প্রফুল্লতা অর্জিত হয়। সুতরাং অনেক হাসপাতাল ভরপুর হয়েছে দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনাগ্রস্ত মানসিক রোগীদের দ্বারা, এসবের কারণে দুর্বল ব্যক্তি ছাড়াও অনেক শক্তিশালী লোকের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে এবং অনেকে আহাম্মক ও পাগলে পরিণত করেছে। তার প্রভাব থেকে শুধু ঐ ব্যক্তিই বেঁচে গেছে, যাকে আল্লাহ ক্ষমা করেছেন এবং মানসিক শক্তি বৃদ্ধি ও মনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করার ফলপ্রসূ উপায় অবলম্বনের যথাযথ চেষ্টা-প্রচেষ্টা করার তাওফীক দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُۥٓۚ...﴾
...আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তার জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট... (সূরা আত-তালাক: ৩) অর্থাৎ তিনি তার দ্বীন ও দুনিয়ার সকল দুশ্চিন্তার বিষয়েও যথেষ্ট।
সুতরাং আল্লাহর উপর ভরসাকারী ব্যক্তি মানসিকভাবে শক্তিশালী, যাকে কোন কুধারণা প্রভাবিত করতে পারে না এবং কোন ঘটনা-দুর্ঘটনা তাকে বিরক্ত করতে পারে না তার এই জ্ঞান থাকার কারণে যে, নিশ্চয় এটা মানসিক দুর্বলতা এবং অবাস্তব ভয়-ভীতির কারণে সংঘটিত হয়েছে। সে এও জানে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনি তার সকল দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে সে আল্লাহর প্রতি আস্থাশীল হয় এবং তাঁর প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকে। এতে তার দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর হয়; দুঃখ সুখে পরিণত হয়; দুঃখ-কষ্ট আনন্দে রূপান্তর হয় এবং ভয়-ভীতি পরিণত হয় নিরাপত্তায়। সুতরাং আমরা আল্লাহ তা‘আলার নিকট সুস্থতা কামনা করছি এবং আরও প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদের উপর অনুগ্রহ করেন মানসিক শক্তি ও তাঁর উপর পূর্ণ ভরসায় অটল থাকার দ্বারা, যে ভরসার কারণে আল্লাহ তার সকল কল্যাণের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং সকল অকল্যাণ ও ক্ষয়-ক্ষতির প্রতিরোধ করবেন।
পরিচ্ছেদ:(11)অন্যদের দোষ-ত্রুটি সহ্য করার জন্য মনকে প্রস্তুত করা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا خُلُقًا آخَرَ».
“কোন মুমিন বান্দা কোন মুমিন বান্দীকে ঘৃণা করবে না। তার কোন আচরণকে সে অপছন্দ করলেও তার অন্য কোন আচরণকে সে পছন্দ করবে।” (সহীহ মুসলিম)
দুইটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা:
প্রথম: স্ত্রী, নিকটাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও কর্মচারী এমনকি যাদের সাথেই আপনার সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে তাদের প্রতি আচার-ব্যবহারের দিকনির্দেশনা। আপনার মনকে অভ্যস্ত করে তোলা উচিত যে, প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে দোষ-ত্রুটি অথবা এমন কোন বিষয় রয়েছে যা আপনি অপছন্দ করেন; সুতরাং আপনি যখন তাকে এই অবস্থায় পাবেন, তখন আপনি বর্তমান পরিস্থিতি ও আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে তুলনামূলক পর্যালোচনা করুন। আপনার উচিৎ হবে তার মধ্যকার ভাল দিকগুলো ও বিশেষ ও সাধারণ উদ্দেশ্যসমূহের উল্লেখ করে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করা এবং ভালবাসাকে স্থায়ী রূপ দেয়া। আর এভাবে মন্দ দিকগুলোকে উপেক্ষা এবং ভাল দিকগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার মাধ্যমে বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক স্থায়ী হয় এবং তার জন্য শান্তি ও আনন্দ পরিপূর্ণ হয়।
দ্বিতীয়: দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা দূর করা; হৃদ্যতা বজায় রাখা; ওয়াজিব ও মুস্তাহাব অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা অব্যহত রাখা এবং উভয় দিক তথা ইহকালীন ও পরকালীন জগতে শান্তি অর্জন করা। আর যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছেন, তা পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করে না; বরং তার বিপরীত বিষয়কে পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করে; অতঃপর খারাপ ও মন্দসমূহের দিকে দৃষ্টি দেয় এবং উত্তম ও সুন্দর বিষয়ের ক্ষেত্রে অন্ধের ভূমিকা পালন করে। ফলে সে নিশ্চিতভাবে অস্থিরতা অনুভব করে; তার মধ্যে ও যিনি তার সাথে ভালবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চান, তাদের উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায় এবং তাদের উপর পরস্পরের অধিকার সংরক্ষণের যে দায়িত্ব রয়েছে, তার সিংহভাগ দায়িত্ব পালন সঙ্কোচিত হয়ে যায়।
উচ্চ হিম্মতের অধিকারী ব্যক্তিদের অনেকেই বিভিন্ন প্রকার দুর্যোগ ও বিপদ-মুসিবতের সময় নিজেদেরকে ধৈর্যধারণ ও শান্ত থাকার প্রবোধ দেয়। উচ্চ হিম্মতের অধিকারী ব্যক্তিদের অনেকেই বিভিন্ন প্রকার বড় বড় দুর্যোগ ও বিপদ-মুসিবতের সময় নিজেদেরকে ধৈর্যধারণ ও শান্ত থাকার প্রবোধ দেয়। কিন্তু তারাই আবার অনেক তুচ্ছ বিষয়ে অস্থির হয়ে উঠে। এর একমাত্র কারণ হল, তারা বড় বড় বিষয়ের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে তেমন উক্ত শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারে না। ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদের শান্তি ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটে। সুতরাং বুদ্ধিমান লোক নিজেকে ছোট ও বড় সকল বিষয়েই সচেতন ও অভ্যাস্ত করে এবং এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার নিকট সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করে। এক মুহূর্তের জন্যও সে নিজেকে নিজের দিকে সোপর্দ করে না। ফলে তার নিকট ছোট-বড় সকল সমস্যাই সহজ হয়ে যায় ফলে সে প্রশান্ত হৃদয়ে বহাল তবিয়তে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে থাকে।
পরিচ্ছেদ: (12) দুশ্চিন্তায় মগ্ন না হওয়া
প্রতিটি বুদ্ধিমান ব্যক্তি জানেন, তার প্রকৃত সৌভাগ্য ও শান্তিময় জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। সুতরাং তার জন্য উচিত হবে না, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতায় জড়িয়ে সে সংক্ষিপ্ত জীবনকে নষ্ট করা। অপরদিকে সঠিক জীবনের বিপরীত জীবনব্যবস্থা তার হায়াতকে সঙ্কুচিত করে দেয় এইভাবে যে, দুশ্চিন্তা ও পাপ-পঙ্কিলতার কারণেই তার জীবন থেকে বহু সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। আর এ ক্ষেত্রে পুণ্যবান ও পাপীর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু এই গুণটি (সৎগুণটি) প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে মুমিন ব্যক্তির জন্য ইহকালে ও পরকালে পরিপূর্ণ ও উপকারী অংশ বরাদ্ধ রয়েছে।
(13)আল্লাহর নিয়ামতসমূহ ও আক্রান্ত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা
বুদ্ধিমান ব্যক্তির আরও কর্তব্য হল, যখন সে দুঃখ-কষ্ট পাবে অথবা ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা করবে, তখন সে তার অর্জিত অপরাপর দ্বীনি ও দুনিয়াবী নিয়ামতসমূহ এবং আপতিত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনার সময় তার নিকট এ কথা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, দুঃখ-কষ্টের চেয়ে নিয়ামত অনেক বেশি, আর তার কষ্ট অতি সামান্য।
একইভাবে, সে যেন তার উপর যে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করে তার সাথে যে নিরাপত্তার অনেক সম্ভাবনার তুলনা করে। সে যেন দুর্বল সম্ভাবনাকে শক্তিশালী ও বহু সম্ভাবনার উপর প্রাধান্য না দেয়। এর মাধ্যমে তার দুশ্চিন্তা ও ভয় দূর হয়ে যাবে। সে যেন তার উপর যে সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য ক্ষতি হতে পারে তা বিবেচনা করে এবং তার মনকে সেই অবস্থার জন্য প্রস্তুত করে যদি তা ঘটে। আর যা এখনও ঘটেনি তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে এবং যা ঘটে গেছে তা দূর করতে বা হ্রাস করতে চেষ্টা করবে।
(14)মানুষের কষ্টদায়ক কথা বা আচরণ তাদেরই ওপর বর্তায়, যতক্ষণ না তুমি তা নিয়ে ব্যস্ত হও
উপকারী বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আপনি জেনে রাখবেন যে, মানুষ যদি আপনাকে কষ্ট দেয়, বিশেষ করে মন্দ কথার দ্বারা, তবে তাতে আপনার কোন ক্ষতি হবে না; বরং তাদেরই ক্ষতি হবে। কিন্তু আপনি যদি সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত করে রাখেন, তখন তা আপনার ক্ষতি করবে, যেমনিভাবে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুতরাং আপনি যদি তাতে কোন পরোয়া না করেন, তবে তা আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
(15)উপকারী চিন্তাধারার মাধ্যমে তোমার জীবনকে সুন্দর করো: আপনি জেনে রাখুন যে, আপনার জীবন নিজ চিন্তা-চেতনার অনুসারী। সুতরাং আপনার চিন্তা-চেতনা যদি আপনার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য উপকারী বিষয়ে হয়ে থাকে, তবে আপনার জীবন হবে সুন্দর, সৌভাগ্যময়। আর যদি তা না হয়, তবে ব্যাপারটি হবে তার বিপরীত। অর্থাৎ তখন আপনার জীবন হবে অসুন্দর ও দুর্ভাগ্যময়।
(16)সকল কাজ বা আচরণ হবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে, মানুষের জন্য নয়
দুশ্চিন্তা দূর করার সবচেয়ে উপকারী উপায়গুলোর অন্যতম একটি হল, আপনি নিজেকে এই মনোভাব নিয়ে প্রস্তুত করুন যে আপনি শুধুমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা আশা করবেন। যদি আপনি এমন কারো প্রতি ভালো আচরণ করেন যার আপনার উপর অধিকার আছে বা যার আপনার উপর কোন অধিকার নেই, তবে মনে করুন যে এটি আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহর সাথে একটি লেনদেন। তাই আপনি যাকে অনুগ্রহ করেছেন তার কৃতজ্ঞতা নিয়ে চিন্তা করবেন না, যেমন আল্লাহ তার বিশেষ বান্দাদের সম্পর্কে বলেছেন:
﴿إِنَّمَا نُطۡعِمُكُمۡ لِوَجۡهِ ٱللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنكُمۡ جَزَآءٗ وَلَا شُكُورًا 9﴾
এবং বলে, ‘শুধু আল্লাহর সস্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমি তোমাদেরকে খাবার দান করি, আমরা তোমাদের কাছ থেকে প্রতিদান চাই না, কৃতজ্ঞতাও নয়। (সূরা আল-ইনসান: ৯)
এই আয়াতটি পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্তুতির সাথে আচার-আচরণ ও লেন-দেনের ক্ষেত্রে এবং তাদের সাথে তোমার সম্পর্ক শক্তিশালী করার ব্যাপারে জোর দিয়েছে। সুতরাং যখন তোমার হৃদয় তাদের থেকে অনিষ্ট দূর করতে প্রস্তুত হয়, তখন তোমার অন্তর সুখ ও শান্তি অনুভব করে।
আর সুখ-শান্তির অন্যতম দাবি হল মান-মর্যাদা অর্জন ও তার জন্য কোন রকম অস্থিরতা ছাড়াই মনের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা; মান-মর্যাদা অর্জনের ব্যর্থতার ধাপগুলো সফলতায় রূপ দিতে ধীরনীতি অবলম্বন করা, আর এটাই বুদ্ধিদীপ্ত কাজ এবং মন্দ কাজের পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন কর্মসুচী গ্রহণ করা। আর এর দ্বারা প্রকৃত হৃদ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং মনের পঙ্কিলতা দূর হবে।
(17)ক্ষতিকর জিনিস বাদ দিয়ে উপকারী কাজে মনোনিবেশ করা
ফলপ্রসূ কার্যাবলীকে আপনার দু’চোখের সামনে রাখুন এবং তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করুন। ক্ষতিকারক কোন কর্মের প্রতি দৃষ্টি দেবেন না, যাতে আপনি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট আনয়নকারী উপায়-উপকরণসমূহ ভুলে থাকতে পারেন। আর এ বিষয়ে মানসিক প্রশান্তি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ প্রদানের মাধ্যমে সহযোগিতা গ্রহণ করুন।
(18)তাৎক্ষণিকভাবে বা কালবিলম্ব না করে কাজ শেষ করা
উপকারী কার্যাবলীর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসমূহ সম্পাদন করা এবং ভবিষ্যতকে কর্মমুক্ত রাখা। কারণ, কর্মসমূহ যখন যথাসময়ে সম্পাদন হবে না, তখন আপনার নিকট পূর্বের কাজসমূহ অবশিষ্ট থেকে যাবে এবং তার সাথে নিয়মিত কর্মসমূহ যোগ হবে; ফলে কাজের চাপ বেড়ে যাবে। সুতরাং আপনি যখন প্রতিটি কাজ যথাসময়ে সম্পাদন করবেন, তখন আপনি ভবিষ্যৎ কর্মসূচী নিয়ে ভালভাবে চিন্তা-গবেষণা করে পূর্ণ কর্মস্পৃহা নিয়ে কাজটি করতে সক্ষম হবেন।
(19)পরামর্শের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার বা গুরুত্বের ক্রম ঠিক করা
আর আপনার উচিত হবে উপকারী কর্মসমূহ থেকে গুরুত্বের আলোকে একটার পর একটা বাছাই করা এবং যে কাজে আপনার আকর্ষণ ও আগ্রহ বেশি, তা নির্ণয় করা। সুতরাং তার ব্যতিক্রম হলে অস্বস্তি ও বিরক্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। আর এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ চিন্তা ও সঠিক পরামর্শের মাধ্যমে সহযোগিতা নেবেন। কারণ, যে ব্যক্তি পরামর্শ নিয়ে কাজ করে, সে লজ্জিত হয় না। আর যে কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন, তা নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করুন। সুতরাং যখন কল্যাণকর কাজটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর উপর ভরসাকারীদেরকে ভালবাসেন।
আর সমস্ত প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব এক আল্লাহর জন্য নিবেদিত।
আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নেতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীবৃন্দের প্রতি।
সূচিপত্র
***