PHPWord

 

 

 

التَّحْذِيرُ مِنَ البِدَعِ

 

 

বিদআত থেকে সতর্কীকরণ

 

 

 

لِسَمَاحَةِ الشَّيْخِ العَلَّامَةِ

عَبْدِ العَزِيزِ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ بَازٍ

رَحِمَهُ اللهُ

 

সংকলন মাননীয় শাইখ

শাইখ আব্দুলআযীয ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু বায

 


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

পঞ্চম পুস্তিকা:

মীলাদুন্নবী ও অন্যান্য মীলাদ উদযাপনের বিধান

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর এবং যারা তার পথ অনুসরণ করে তাদের ওপর।

অতঃপর: অনেকের পক্ষ থেকে বারবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মীলাদ উদযাপনের বিধান সম্পর্কে এবং এ সময় তার জন্য দাঁড়ানো, তাকে সালাম প্রদান করা ও মীলাদে যা কিছু করা হয় সে সম্পর্কে প্রশ্ন এসেছে।

এর উত্তর হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিবস অথবা অন্য কোনো মীলাদ উদযাপন করা জায়েয নয়; কারণ এটি দ্বীন ইসলামে সৃষ্ট নতুন বিদ‘আত। এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং তাদের অনুসরণকারী তাবে‘য়ীগণ উদযাপন করেননি; যারা শ্রেষ্ঠ যুগের মানুষ ছিলেন। তারা সুন্নাহ সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সবচেয়ে বেশি মহব্বত পোষণকারী ও তার শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণকারী ছিলেন। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে বলেছেন:

﴿...وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْ...﴾

রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ কর তা থেকে বিরত থাক

[আল-হাশর: ৭] তিনি আরো বলেন:

﴿...فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ﴾

কাজেই যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের উপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [আন-নূর: ৬৩] তিনি আরো বলেছেন:

﴿لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرٗا21﴾

অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আর্দশ, তার জন্য যে আসা রাখে আল্লাহ্ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহ্‌কে বেশী স্মরণ করে। [আল-আহযাব: ২১] তিনি আরো বলেন,

﴿وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ وَأَعَدَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي تَحۡتَهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ100﴾

আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ্‌ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তিনি তাদের জন্য তৈরী করেছেন জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এ তো মহাসাফল্য। [আত-তাওবাহ: ১০০] তিনি আরো বলেন,

﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا...﴾

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [আল-মায়েদা: ৩] এই অর্থে অনেক আয়াত রয়েছে। অথচ প্রমাণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنهُ فَهُوَ رَدٌّ».

“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” অর্থাৎ তার উপর এটি প্রত্যাখ্যাত হবে। অপর হাদিসে তিনি বলেন:

«عَلَيكُم بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيَّينَ مِنْ بَعدِي، تَمَسَّكُوا بِهَا، وَعَضُّوا عَلَيهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالةٌ».

“তোমাদের উপর আবশ্যক হলো আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত অনুসরণ করা। আর তোমরা তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা নতুন সৃষ্ট কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি নতুন সৃষ্ট কাজই বিদআত, আর সকল বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।” এই দুইটি হাদীসে বিদ‘আত সৃষ্টি এবং তা পালন করা থেকে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।

এ ধরনের মীলাদ উদযাপন থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করেননি এবং রাসূল আলাইহিস সালাম উম্মতের জন্য যা পালনীয় তা পৌঁছে দেননি! ফলে পরবর্তীরা এসে আল্লাহর শরীয়তে এমন কিছু সংযোজন করলো যা তিনি অনুমোদন করেননি; এই ধারণা থেকে যে এটি তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে। নিঃসন্দেহে, এটি একটি ভয়ানক বিপদ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতা। অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং তাদের ওপর নিআমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বাণী পৌঁছে দিয়েছেন এবং জান্নাতে পৌঁছানোর ও জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার কোনো পথ তিনি উম্মতের জন্য অপ্রকাশিত রাখেননি। যেমন সহীহ হাদীসে আবদুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَا بَعَثَ اللهُ مِن نَبِيٍ إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَيهِ أَن يَدُلَّ أُمَّتَهُ عَلَى خَيرِ مَا يَعْلَمُهُ لَهُم، وَيُنْذِرَهُمْ شَرَّ مَا يَعْلَمُهُ لَهُمْ».

“আল্লাহ্ যখনই কোন নবী প্রেরণ করেন, তখনই তার উপর আবশ্যক ছিল যে তিনি তার উম্মতের জন্য যা কল্যাণকর জানবেন তা তাদেরকে জানিয়ে দিবেন এবং তাদের জন্য যা ক্ষতিকর জানবেন তা থেকে তাদেরকে সতর্ক করবেন।” (সহীহ মুসলিম)।

এটা জানা কথা যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী এবং বাণী প্রচার ও উপদেশ প্রদানে সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ। যদি মীলাদ উদযাপন ধর্মের অংশ হতো যা আল্লাহর পছন্দ, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উম্মতের জন্য স্পষ্ট করতেন, অথবা নিজ জীবদ্দশায় তা পালন করতেন, অথবা তার সাহাবীগণ তা পালন করতেন। যেহেতু এর কিছুই ঘটেনি, তাই জানা গেল যে, এটি ইসলামের কোনো অংশ নয়, বরং এটি নতুন উদ্ভাবিত বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে সতর্ক করেছেন, যেমনটি হাদীসগুলোতে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়ে আরো অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে।

অনেক আলেম মীলাদ উদযাপনের বিরোধিতা করেছেন এবং এর থেকে সতর্ক করেছেন; উল্লেখিত দলীল ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে। কিছু পরবর্তী যুগের আলেম ভিন্নমত পোষণ করেছেন: তারা এটিকে বৈধ বলেছেন যদি এতে কোন অবৈধ কাজ না থাকে; যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রশংসা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং শরী‘আত যা প্রত্যাখ্যান করে এমন অন্যান্য বিষয়। তারা মনে করেছেন যে এটি একটি বিদআতে হাসানা।

অথচ শরী‘আতের মূলনীতি হলো: যে বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতবিরোধ হয়, তা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর দিকে প্রত্যার্পণ করা, যেমন আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেছেন:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا59﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, আরও আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের, অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থায় উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর। [আন-নিসা: ৫৯] তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَا ٱخۡتَلَفۡتُمۡ فِيهِ مِن شَيۡءٖ فَحُكۡمُهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ ...﴾

আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করা না কেন---তার ফয়সালা তো আল্লাহরই কাছে। [আশ-শূরা: ১০]

আমরা এই বিষয়টি তথা মীলাদ উদযাপনকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কিতাবের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছি, যেখানে আমরা দেখতে পাই যে, এ কিতাব আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছে যা তিনি নিয়ে এসেছেন সে বিষয়ে এবং যা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে আমাদের সতর্ক করেছে। আমাদেরকে এও জানিয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই উম্মতের জন্য তাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন। আর এই উদযাপন সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে আসেননি। সুতরাং এটি সেই দ্বীনের অংশ নয় যা আল্লাহ আমাদের জন্য পরিপূর্ণ করেছেন এবং যার ক্ষেত্রে আমাদেরকে রাসূলের অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

আমরা এটিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের দিকেও ফিরিয়ে দিয়েছি; কিন্তু সেখানে আমরা পাইনি যে তিনি কখনো এটি পালন করেছেন, বা এর আদেশ দিয়েছেন, বা তার সাহাবীগণ এটি পালন করেছেন। ফলে আমরা জানতে পারলাম যে এটি দ্বীনের কোন অংশ নয়, বরং এটি নতুন সৃষ্ট বিদআত এবং ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের তাদের উৎসবের ক্ষেত্রে অনুসরণের অন্তর্ভুক্ত।

এ থেকে প্রতিটি বিবেকবান ও সত্যের প্রতি আগ্রহী এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মীলাদ উদযাপন ইসলামের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং এটি নতুন সৃষ্ট বিদ‘আত, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিত্যাগ করতে এবং তা থেকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এবং জ্ঞানী ব্যক্তির উচিত নয় যে, বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক মানুষকে এটি উদযাপন করতে দেখে বিভ্রান্ত হওয়া; কারণ সত্যের পরিচয় অধিক সংখ্যক কর্মীর মাধ্যমে হয় না, বরং তা হয় শরীয়তের প্রমাণ দ্বারা, যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে বলেছেন:

﴿وَقَالُواْ لَن يَدۡخُلَ ٱلۡجَنَّةَ إِلَّا مَن كَانَ هُودًا أَوۡ نَصَٰرَىٰۗ تِلۡكَ أَمَانِيُّهُمۡۗ قُلۡ هَاتُواْ بُرۡهَٰنَكُمۡ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ111﴾

আর তারা বলে, ‘ইয়াহুদী অথবা নাসারা ছাড়া অন্য কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। এটা তাদের মিথ্যা আশা। বলুন, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর’। [আল-বাকারাহ: ১১১] তিনি আরো বলেন,

﴿وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ...﴾

আর যদি আপনি যমীনের অধিকাংশ লোকের কথামত চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্‌র পথ থেকে বিচ্যুত করবে... [আল-আনআম: ১১৬]

তারপর এই মীলাদ উদযাপনসমূহের অধিকাংশই বিদ‘আত হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য ন্যাক্কারজনক বিষয় থেকেও মুক্ত নয়; যেমন: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, গান-বাজনার ব্যবহার, মাদকদ্রব্য ও নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করা এবং অন্যান্য অশুভ কাজ থেকে। এতে অনেক সময় এমন কিছুও ঘটে থাকে যা তার চেয়েও ভয়াবহ, আর তা হলো বড় শিরক। এটি ঘটে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অথবা অন্য কোন অলীর ব্যাপারে অতিরঞ্জন করে এবং তাদেরকে ডাকা, তাদের নিকট ফরিয়াদ করা, তাদের থেকে মদদ চাওয়া ও তাদেরকে গায়েবের জ্ঞানী মনে করা ইত্যাদি কুফরী বিষয়ের মাধ্যমে, যা অনেক মানুষ সংঘটিত করে থাকে যখন তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মীলাদ বা তাদের ভাষায় অলীদের মীলাদ উদযাপন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:

«إِيَّاكُم وَالغُلُوُّ فِي الدِّينِ، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَن كَانَ قَبْلَكُم الغُلُوَّ فِي الدِّينِ».

“তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাক। কেননা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়িই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করেছে।” নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম আরো বলেছেন:

«لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، إِنَّمَا أَنَا عَبدٌ، فَقُولُوا: عَبدُ اللهِ وَرَسُولُه».

“তোমরা আমার বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমনটি খৃষ্টানরা ইবন মারইয়্যাম সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি কেবল একজন বান্দা। তাই তোমরা বল, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” ইমাম বুখারী উমর রাযি. থেকে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।

আর আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর বিষয় হলো: অনেক মানুষ এই বিদআতী উৎসবসমূহে উপস্থিত হতে সক্রিয় ও পরিশ্রমী হয়, এবং এগুলোর পক্ষে সাফাই গায়, অথচ আল্লাহ তাদের উপর যে জুম‘আ ও জামাতে উপস্থিত হওয়া ফরজ করেছেন তা থেকে পিছিয়ে থাকে, তাতে গুরুত্ব দেয় না এবং মনে করে না যে সে একটি বড় মুনকার কাজ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি ঈমানের দুর্বলতা, অন্তর্দৃষ্টির অভাব এবং নানা পাপ ও অবাধ্যতার কারণে হৃদয়ে যে ব্যাপক মরিচা পড়েছে তার ফল। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের এবং সকল মুসলমানদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।

এর মধ্যে রয়েছে: কিছু লোক মনে করে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মীলাদুন্নবীতে উপস্থিত হন; এজন্য তারা তাকে অভিবাদন জানায় এবং স্বাগত জানিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, যা সবচেয়ে বড় মিথ্যা এবং জঘন্য অজ্ঞতা। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তার কবর থেকে বের হবেন না, কারো সাথে যোগাযোগ করবেন না এবং তাদের সমাবেশে উপস্থিত হবেন না। বরং তিনি কিয়ামত পর্যন্ত তার কবরেই অবস্থান করবেন এবং তার রূহ তার রবের কাছে সম্মানিত স্থানে উচ্চ মর্যাদায় অবস্থান করছে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿ثُمَّ إِنَّكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ لَمَيِّتُونَ15 ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ16﴾

এরপর তোমরা নিশ্চয় মরবে,

তারপর কেয়ামতের দিন নিশ্চয় তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে। [আল-মুমিনূন: ১৫,১৬]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

«أَنَا أَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ القَبْرُ يَومَ القِيَامَةِ، وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ، وَأَوًّلُ مُشَفَّعٍ».

“কিয়ামতের দিন আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর বিদীর্ণ হবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি।” তার উপর তার রবের পক্ষ থেকে বর্ষিত হোক সর্বোত্তম সালাত ও সালাম।

এই দুইটি মহিমান্বিত আয়াত ও পবিত্র হাদীস এবং এ অর্থে বর্ণিত অন্যান্য আয়াত ও হাদীসসমূহ: সবই প্রমাণ করে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যান্য মৃত ব্যক্তিরা কেবল কিয়ামতের দিন তাদের কবর থেকে বের হবেন। এটি মুসলিম আলেমদের মধ্যে সর্বসম্মত বিষয়; এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উচিত এই বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং জাহিল ও অনুরূপ ব্যক্তিদের দ্বারা উদ্ভাবিত বিদ‘আত ও কুসংস্কার থেকে সতর্ক থাকা; যা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়। আল্লাহই সহায়ক, তারই উপর নির্ভরতা, এবং তার সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।

অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত ও সালাম পাঠ: এটি সর্বোত্তম নৈকট্য ও সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِيِّۚ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيۡهِ وَسَلِّمُواْ تَسۡلِيمًا56﴾

নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দোআ-ইসতেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও। [আল-আহযাব: ৫৬], নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

«مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً؛ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ بِهَا عَشْرًا».

“যে আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন।” এটি সকল সময়ে শরীয়তসম্মত এবং প্রতি ওয়াক্ত সালাতের শেষে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বরং অনেক আলেমের মতে, প্রতিটি সালাতের শেষ তাশাহহুদে এটি পাঠ করা ওয়াজিব। এর সুন্নাত হওয়া বহু ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব পায়; এর মধ্যে রয়েছে আজানের পর, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম উচ্চারণের সময় এবং জুমুআর দিন ও রাতে, যেমনটি অনেক হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে।

আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এবং সকল মুসলিমকে তার দ্বীনের গভীর বুঝ দান করেন ও তাতে দৃঢ় থাকার তাওফীক দান করেন এবং সকলকে সুন্নাতের অনুসরণ ও বিদআত থেকে সতর্ক থাকার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি দানশীল, মহানুভব।

আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবার পরিজন এবং সাহাবীদের ওপর।

 

 

***

 


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

ষষ্ঠ পুস্তিকা:

লাইলাতুল ইসরা ও মেরাজ উদযাপনের বিধান

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর এবং তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর।

অতঃপর: কোন সন্দেহ নেই যে, ইসরা এবং মি‘রাজ আল্লাহর মহান নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম, যা তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতার প্রমাণ এবং আল্লাহর নিকট তার বিশাল মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার অসীম ক্ষমতার নিদর্শন এবং তাঁর সকল সৃষ্টির উপর উচ্চতার প্রমাণ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:

﴿سُبۡحَٰنَ ٱلَّذِيٓ أَسۡرَىٰ بِعَبۡدِهِۦ لَيۡلٗا مِّنَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ إِلَى ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡأَقۡصَا ٱلَّذِي بَٰرَكۡنَا حَوۡلَهُۥ لِنُرِيَهُۥ مِنۡ ءَايَٰتِنَآۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ1﴾

পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ত্ৰমণ করালেন, আল-মসজিদুল হারাম থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমরা দিয়েছি বরকত, যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। [আল-ইসরা: ০১]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তাকে আসমানসমূহে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছিল, এমনকি তিনি সপ্তম আসমান অতিক্রম করে গেছিলেন। সেখানে তার প্রতিপালক আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তার সাথে যা ইচ্ছা কথা বললেন এবং তার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছিলেন, কিন্তু আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার তাঁর কাছে ফিরে গিয়ে তা সহজ করার আবেদন করলেন, অবশেষে তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এটি আদায় করার ক্ষেত্রে পাঁচ ওয়াক্ত, কিন্তু সওয়াবের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত; কারণ প্রতিটি নেক আমলের জন্য দশগুণ সওয়াব রয়েছে। আল্লাহর সমস্ত নিয়ামতের জন্য তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

যে রাতে ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে রজব বা অন্য কোনো মাসে সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে সহীহ হাদীসে উল্লেখ হয়নি। এর নির্দিষ্টতার ব্যাপারে যা কিছু এসেছে, তা হাদীস সম্পর্কে বিজ্ঞদের নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। এটি মানুষদের ভুলিয়ে দেওয়ার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার গভীর হিকমত রয়েছে। যদি এর নির্দিষ্টতা প্রমাণিত হতো, তবুও মুসলিমদের জন্য তা কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা জায়েয হতো না এবং তাদের জন্য তা উদযাপন করাও জায়েয হতো না; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম তা উদযাপন করেননি এবং তা কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করেননি। এবং যদি এ রাত উদযাপন করা শরীয়ত সম্মত হতো, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বা কাজের মাধ্যমে উম্মতের নিকট তা স্পষ্ট করতেন। যদি এমন কিছু ঘটতো, তবে তা জানা যেত ও প্রসিদ্ধ হতো এবং সাহাবীগণ তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। তারা তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে উম্মতের প্রয়োজনীয় সবকিছুই পৌঁছে দিয়েছেন এবং দ্বীনের কোনো বিষয়েই অবহেলা করেননি। বরং তারা সর্বপ্রথম কল্যাণের দিকে অগ্রগামী হয়েছেন। সুতরাং যদি এ রাত উদযাপন করা শরীয়ত সম্মত হতো, তবে তারাই এ কাজে অগ্রগামী হতেন। বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম কল্যাণকামী, তিনি রিসালত সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দিয়েছেন এবং আমানত আদায় করেছেন। সুতরাং যদি এই রাতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও উদযাপন করা আল্লাহর দ্বীনের অংশ হতো, তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উপেক্ষা করতেন না এবং গোপন রাখতেন না। যেহেতু এমন কিছু ঘটেনি, তাই জানা গেল যে, এর উদযাপন ও এটিকে গুরুত্বারোপ করা ইসলামের অংশ নয়। আল্লাহ এই উম্মতের জন্য তাদের দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং তাদের উপর তাঁর নিআমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। আর তিনি তাদের নিন্দা করেছেন যারা দ্বীনে এমন কিছু প্রবর্তন করে যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি। এ মর্মে তিনি তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে বলেছেন:

﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا...﴾

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [আল-মায়েদা: ৩] তিনি আরো বলেন:

﴿أَمۡ لَهُمۡ شُرَكَٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُۚ وَلَوۡلَا كَلِمَةُ ٱلۡفَصۡلِ لَقُضِيَ بَيۡنَهُمۡۗ وَإِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ21﴾

নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দীন থেকে শরীআত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি? আর ফয়সালার ঘোষণা না থাকলে এদের মাঝে অবশ্যই সিদ্ধান্ত হয়ে যেত। আর যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [আশ-শুরা: ২১]

সহীহ হাদিসসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বিদআত থেকে সতর্ক করেছেন এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, বিদআত হলো পথভ্রষ্টতা। এতে উম্মতকে বিদআতের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে এবং তাদেরকে তা থেকে দূরে থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত একটি হাদিস, যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ؛ فَهُوَ رَدٌّ».

“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” সহীহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় এসেছে:

«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيهِ أَمْرَنَا؛ فَهُوَ رَدٌّ».

“যে কেউ এমন আমল করল যা আমাদের শরী‘আতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” সহীহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমু‘আর দিন তার খুতবায় বলতেন:

«أَمَا بَعْدَ، فَإِنَّ خَيرَ الحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ، وَخَيرَ الهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ ﷺ، وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ».

“অতঃপর, সবচেয়ে উত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। সবচেয়ে উত্তম হিদায়াত হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াত। সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে দ্বীনের মাঝে নতুন কিছু তৈরী করা (বিদ‘আত), আর প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।” ইমাম নাসায়ী জাইয়্যিদ সনদে এতে আরো বৃদ্ধি করেছেন:

«وَكُلَّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ».

“আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতা জাহান্নামে নিয়ে যায়।” সুনান গ্রন্থে এসেছে, ইরবায বিন সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন মর্মস্পর্শী ভাষণ দিলেন, তাতে অন্তর ভীত হলো এবং চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরল। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! মনে হচ্ছে এটি বিদায়ী ভাষণ। সুতরাং আমাদেরকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন:

«أُوصِيكُم بِتَقْوَى اللهِ وَالسَّمعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ تَأَمَّرَ عَلَيكُم عَبدٌ، فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُم فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيكُم بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخلُفَاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيِّينَ مِنْ بَعْدِي، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُم وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٍ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ».

“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন, শ্রবণ ও আনুগত্যের উপদেশ দিচ্ছি, যদিও তোমাদের উপর একজন ক্রীতদাসকে আমীর বানানো হয়। কারণ, তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে তারা অচিরেই প্রচুর মতবিরোধ দেখবে। তখন তোমাদের উপর আবশ্যক হবে আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত অনুসরণ করা। আর তোমরা তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা নতুন সৃষ্ট কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি নতুন সৃষ্ট কাজই বিদআত, আর সকল বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।

সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী সালাফে সালেহীন থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, তারা বিদআত থেকে সতর্ক করেছেন এবং তা থেকে বিরত থাকার কঠোর আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, এটি দ্বীনের মধ্যে সংযোজন ও এমন বিধান যাতে আল্লাহর অনুমোদন নেই। এটি আল্লাহর শত্রু ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ, যারা তাদের ধর্মে সংযোজন করেছে এবং এমন কিছু উদ্ভাবন করেছে, যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি। এছাড়াও, বিদআতের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো ইসলামকে অসম্পূর্ণ মনে করা এবং এটিকে পরিপূর্ণ না হওয়ার অপবাদ দেওয়া। এটি যে কত বড় বিভ্রান্তি ও নিন্দনীয় কাজ, তা স্পষ্ট। পাশাপাশি, এটি আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর বিপরীত অবস্থান গ্রহণের শামিল:

﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ...﴾

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম [আল-মায়েদা: ৩] তদ্রূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধিতা যা বিদ‘আত থেকে সতর্ক করে এবং তা থেকে পলায়ন করার নির্দেশ দেয়।

এ পর্যন্ত যা উল্লেখ করা হয়েছে, আমি আশা করি এতে সত্য অনুসন্ধানকারীর জন্য যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে, যা তাকে এই বিদআত—অর্থাৎ, ইসরা ও মিরাজের রাত উদযাপনকে অস্বীকার করার এবং তা থেকে সতর্ক থাকার জন্য যথেষ্ট হবে। তাছাড়া এটি ইসলামের কোনো অংশও নয়।

মুসলমানদের জন্য উপদেশ প্রদান এবং আল্লাহ তাদের জন্য যে দ্বীন নির্ধারণ করেছেন তা বর্ণনা করা এবং ইলম গোপন করার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে আল্লাহ যে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন তার জন্য; আমি আমার মুসলিম ভাইদেরকে এই বিদ‘আতের ব্যাপারে সতর্ক করার মনস্থির করেছি; যা অনেক স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি কিছু মানুষ এটিকে দ্বীনের অংশ মনে করছে।

আল্লাহর নিকট প্রার্থনা যে, তিনি যেন সকল মুসলিমের অবস্থা সংশোধন করে দেন, তাদেরকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন, এবং আমাদেরকে ও তাদেরকে হক আঁকড়ে ধরার ও তাতে দৃঢ় থাকার তাওফীক দান করেন,আর যা এর বিপরীত তা পরিত্যাগ করার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি এর অভিভাবক এবং এর উপর ক্ষমতাবান।

আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর সালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন।

 

 

***

 


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

সপ্তম পুস্তিকা:

মধ্য শাবানের রাত (শবে বরাত) উদযাপনের বিধান

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং আমাদের ওপর নি‘আমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ- এর ওপর, যিনি ছিলেন তাওবা ও রহমতের নবী।

অতঃপর: আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا...﴾

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [আল-মায়েদা: ৩] তিনি আরো বলেন,

﴿أَمۡ لَهُمۡ شُرَكَٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُ...﴾

নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দীন থেকে শরীআত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি... [আশ-শুরা: ২১] সহীহাইনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ؛ فَهُوَ رَدٌّ».

“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনো মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” এবং সহীহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার খুতবায় বলতেন:

«أَمَّا بَعْدُ: فَإِنَّ خَيرَ الحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ، وَخَيرَ الهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ، وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ».

“অতঃপর: নিশ্চয় সবচেয়ে উত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। সবচেয়ে উত্তম হিদায়াত হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াত। সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে (দ্বীনের মধ্যে) নবআবিস্কৃত কাজ (বিদ‘আত), আর প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।” এ বিষয়ে বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই উম্মতের জন্য তাদের দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং তাদের উপর তাঁর নিআমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। এবং তাঁর নবী -আলাইহিস সালাম- এর ইন্তেকাল হয়নি যতক্ষণ না তিনি সুস্পষ্টভাবে তা পৌঁছে দিয়েছেন এবং উম্মতের জন্য আল্লাহ যে কথা ও কাজে বিধান দিয়েছেন তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করেছেন যে, তার পরবর্তীতে মানুষ যা কিছু দ্বীনের মধ্যে সৃষ্টি করে এবং ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করে, তা সবই বিদ‘আত এবং তা সৃষ্টিকারীর দিকে প্রত্যাখ্যাত হবে, যদিও তার উদ্দেশ্য ভালো হয়। এই বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ বুঝতে পেরেছিলেন। তেমনি তাদের পর ইসলামের আলেমগণও বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তারা বিদ‘আতকে অস্বীকার করেছেন এবং তা থেকে সতর্ক করেছেন। যেমনটি, যারা সুন্নাহর মর্যাদা ও বিদ‘আতের অস্বীকৃতি নিয়ে লিখেছেন, যেমন ইমাম ইবনে ওয়াযযাহ, তারতূশী, আবু শামা প্রমূখগণ উল্লেখ করেছেন।

কিছু লোকের উদ্ভাবিত বিদআতের মধ্যে একটি হলো: মধ্য শা'বানের রাত উদযাপন করা এবং তার দিনকে সিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট করা। এর উপর নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল নেই। এ রাতের ফযীলত সম্পর্কে দুর্বল হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যার উপর নির্ভর করা জায়েয নয়।

পক্ষান্তরে এ রাতের সালাতের ফযীলত সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তা সবই ভিত্তিহীন, যেমনটি বহু আলেমগণ উল্লেখ করেছেন। ইনশাআল্লাহ, তাদের কিছু বক্তব্য সামনে উল্লেখ করা হবে।

এ বিষয়ে শাম অঞ্চলের কিছু সালাফ আলেম ও অন্যান্যদের আছারও বর্ণিত হয়েছে।

অধিকাংশ আলেমদের ঐক্যমতে, এ উদযাপন বিদ‘আত এবং এ সংক্রান্ত ফযীলতের হাদীসগুলো সবই দুর্বল, যার কিছু কিছু বানোয়াট। এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন: হাফিয ইবন রজব তার (লাতায়িফুল মাআরিফ) গ্রন্থে এবং অন্যান্যরা। জানা কথা যে, দুর্বল হাদীস কেবল সেই ইবাদতসমূহের ক্ষেত্রে আমল করা যেতে পারে, যেগুলোর মূল সহীহ দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু মধ্য শাবানের রাত উদযাপনের ব্যাপারে কোনো সহীহ ভিত্তি নেই- যাতে দুর্বল হাদীস দ্বারা একে সমর্থন করা যায়। এই মহান নীতিটি উল্লেখ করেছেন ইমাম আবু আব্বাস শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ।

হে পাঠক! আমি আপনার জন্য এই বিষয়ে কিছু আহলুল ইলমের বাণী উল্লেখ করছি, যাতে আপনি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন।

সম্মানিত আলেমগণ -(রহিমাহুমুল্লাহ)- সর্বসম্মতিক্রমে একমত যে, মানুষের মধ্যে যে বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, সেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কিতাব ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া আবশ্যক। যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয় বা এ দুইয়ের একটির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, সেটিই অনুসরণযোগ্য শরীয়ত। আর যা কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত, তা বর্জন করা আবশ্যক। আর যে ইবাদত এ দুইয়ের মধ্যে উল্লেখিত হয়নি, তা বিদ‘আত এবং তা করা জায়েয নয়, তার দিকে আহবান ও উৎসাহিত করা তো দূরের কথা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا59﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, আরও আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের, অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থায় উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর। [আন-নিসা: ৫৯] তিনি আরো বলেন,

﴿وَمَا ٱخۡتَلَفۡتُمۡ فِيهِ مِن شَيۡءٖ فَحُكۡمُهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ...﴾

আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করা না কেন---তার ফয়সালা তো আল্লাহরই কাছে... [আশ-শূরা: ১০] তিনি আরো বলেন,

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡ...﴾

বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন... [আলে ইমরান: ৩১] তিনি আরো বলেন:

﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا65﴾

কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়। [আন-নিসা: ৬৫] এ বিষয়ে আরো অনেক আয়াত রয়েছে, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মতবিরোধের বিষয়গুলো কিতাব ও সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক এবং এ দুয়ের ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক। আর এটাই ঈমানের দাবি এবং দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দাদের জন্য কল্যাণকর ও উত্তম পরিণাম।

হাফিয ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ তার কিতাব (লাতায়িফুল মাআরিফ)-এ এই বিষয়ে পূর্ববর্তী কথার পর বলেন:

“মধ্য শা‘বানের রাতের ফযীলত সম্পর্কে শামের তাবেঈগণ যেমন খালিদ ইবনু মা‘দান, মাকহুল, লুকমান ইবনু আমির প্রমুখ এ রাতকে গুরুত্ব দিতেন এবং ইবাদতে সাধনা করতেন। তাদের থেকেই লোকেরা এ রাতের ফযীলত ও মহিমা গ্রহণ করেছে। বলা হয় যে: তাদের কাছে এ বিষয়ে কিছু ইসরাইলি বর্ণনা পৌঁছেছিল। যখন এই বিষয়টি বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসিদ্ধ হয়ে গেল, তখন মানুষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই বর্ণনাগুলো গ্রহণ করে এবং এ রাতকে সম্মানিত মনে করতে শুরু করে। বসরার কিছু ইবাদতগুজার ও অন্যদের মধ্যেও এ মত গ্রহণকারীদের একটি দল ছিল। তবে এটিকে হিজাযের অধিকাংশ আলেম প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাদের মধ্যে আতা, ইবনু আবি মুলাইকা রয়েছেন। এটা আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম মদিনার ফকীহদের থেকে বর্ণনা করেছেন। এটি ইমাম মালিকের অনুসারী ও অন্যদের মত। তারা বলেছেন: এটি সম্পূর্ণরূপে বিদ‘আত।

শামের আলেমগণ এ রাতটি যাপনের পদ্ধতি সম্পর্কে দুইটি মতে মতানৈক্য করেছেন:

প্রথমত: মসজিদে সমষ্টিগতভাবে এ রাতে জেগে আমল করা মুস্তাহাব। এই রাতে খালিদ ইবনু মাআদান, লুকমান ইবনু আমির এবং অন্যান্যরা তাদের সুন্দরতম পোশাক পরিধান করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন ও সুরমা লাগাতেন এবং মসজিদে অবস্থান করতেন। ইসহাক ইবনু রাহুইয়া তাদের সাথে একমত পোষণ করেছেন। তিনি মসজিদে জামাতের সাথে কিয়ামুল্লাইল করা সম্পর্কে বলেছেন: “এটি বিদ‘আত নয়।” হারব আল-কিরমানী তার মাসায়েলে এটি উল্লেখ করেছেন।

দ্বিতীয়ত: মসজিদে সালাত, কিসসা ও দো‘আর জন্য একত্র হওয়া মাকরূহ, তবে ব্যক্তিগতভাবে সালাত আদায় করা মাকরূহ নয়। এটি হলো শামের ইমাম, ফকীহ ও আলেম আওযাঈর মত। আর এ মতটিই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় অধিকতর নিকটবর্তী।” তিনি এও বলেন যে: 'ইমাম আহমদ এর পক্ষ থেকে মধ্য শা'বানের রাত সম্পর্কে কোনো বক্তব্য জানা যায় না। তবে তার ঈদের রাতের কিয়ামের দুই বর্ণনার মধ্যে একটি থেকে মধ্য শা'বানের রাতের কিয়াম মুস্তাহাব হওয়ার দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। কারণ (এক বর্ণনায়) তিনি জামাতে কিয়ামকে মুস্তাহাব বলেননি; কেননা এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হয়নি। আবার তিনি এটিকে অপর বর্ণনায় মুস্তাহাব বলেছেন, আবদুর রহমান ইবনু ইয়াজীদ ইবনু আসওয়াদ এর উপর আমল করার কারণে, যিনি তাবেঈদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তেমনি মধ্য শাবানের রাতের কিয়াম, এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তার সাহাবীদের থেকে কিছুই প্রমাণিত হয়নি। তবে শামের প্রসিদ্ধ ফকীহ তাবেঈদের একটি দল থেকে এটি প্রমাণিত।

হাফিয ইবন রজব রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য শেষ হলো, এবং এতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মধ্য শা'বানের রাত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তার সাহাবীদের থেকে কিছুই প্রমাণিত হয়নি।

আর এ রাতে একাকী কিয়ামুল্লাইল আদায় করা মুস্তাহাব মর্মে ইমাম আওযায়ী রহিমাহুল্লাহর মত প্রদান এবং হাফিয ইবনু রজবের এই মতটি গ্রহণ করা নিতান্তই দুর্বল ও অপ্রচলিত; কারণ কোনো বিষয় যদি শরী‘আতসম্মত হওয়ার ব্যাপারে শরী‘আতী দলীল দ্বারা প্রমাণিত না হয়, তবে মুসলিমের জন্য তা আল্লাহর দ্বীনে নতুন কিছু সৃষ্টি করা জায়েয নয়, তা একাকী হোক বা জামাতে, গোপনে বা প্রকাশ্যে হোক; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ সাধারণ উক্তির কারণে:

«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيهِ أَمْرُنَا؛ فَهُوَ رَدٌّ».

“যে কেউ এমন আমল করল যা আমাদের শরী‘আতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” এ ছাড়াও আরো অন্যান্য দলীল যা বিদ‘আতকে প্রত্যাখ্যান ও তা থেকে সতর্ক থাকার প্রমাণ বহন করে।

ইমাম আবু বকর তারতুশী রহিমাহুল্লাহ তার ‘কিতাবুল হাওয়াদিস ওয়াল বিদা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:

“ইবনু ওয়াদ্দাহ হতে বর্ণিত, যায়েদ ইবনু আসলাম বলেন: আমরা আমাদের কোনো শায়খ বা ফকীহকে মধ্য শা‘বানের দিকে মনোযোগ দিতে দেখিনি, এবং মাকহুলের হাদীসের প্রতিও মনোযোগ দিতে দেখিনি, এবং তারা এর জন্য অন্য রাতের ওপর কোনো বিশেষ ফযীলত দেখেননি।”

ইবনু আবী মুলায়কাহকে বলা হলো, যিয়াদ আন-নুমাইরী বলে: “ মধ্য শা'বানের রাতের সওয়াব লাইলাতুল-কদরের সওয়াবের সমান।” তিনি উত্তরে বললেন: “যদি আমি তা শুনতাম এবং আমার হাতে লাঠি থাকতো, তবে আমি তাকে আঘাত করতাম।” আর যিয়াদ ছিলেন একজন কাহিনীকার। (কথা শেষ)

আল্লামা শাওকানী -রাহিমাহুল্লাহ- তার «আল-ফাওয়ায়েদ আল-মাজমুআ» গ্রন্থে যা বলেছেন তা হলো:

“হাদীস: “হে আলী, যে ব্যক্তি শাবান মাসের মধ্যরাতে একশত রাকাত সালাত আদায় করবে এবং প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা ও সূরা ইখলাস দশবার করে পাঠ করবে; আল্লাহ তার সকল প্রয়োজন পূরণ করবেন।” এর শেষ পর্যন্ত। এটি মাওযু, বানোয়াট হাদিস এবং এর বর্ণনায় যে সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা এমন যে, কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তি এর মাওযু হওয়া নিয়ে সন্দেহ করবে না এবং এর বর্ণনাকারীগণ অজ্ঞাত। এটি আরো দ্বিতীয় ও তৃতীয় সনদে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সবই মাওযু এবং এর বর্ণনাকারীগণ অজ্ঞাত। তিনি 'মুখতাসার' গ্রন্থে বলেছেন: মধ্য শা'বান রাতের সালাতের হাদীসটি বাতিল। ইবনু হিব্বানে বর্ণিত আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীস: “যখন মধ্য শা'বানের রাত আসে, তখন তার রাতে সালাত আদায় কর এবং দিনে রোযা রাখ”, এটি দুর্বল। তিনি 'আল-লাআলি'গ্রন্থে বলেছেন: 'মধ্য শাবানের রাতে একশো রাকাত সালাত, প্রত্যেক রাকাতে দশবার ইখলাস' এর দীর্ঘ ফযীলত থাকা সত্ত্বেও, দাইলামি ও অন্যান্যদের মতে এটি মাওযু। এবং এর তিনটি সনদের অধিকাংশ বর্ণনাকারী অজ্ঞাত দুর্বল। তিনি বললেন: «এবং সূরা ইখলাস ত্রিশবার পাঠ করার মাধ্যমে বারো রাকাত সালাত আদায় করা» বিষয়ক হাদিসটি মাওযু, «এবং চৌদ্দ রাকাত» সালাত আদায় সংক্রান্ত হাদিসটিও মাওযু।

এই হাদীস দ্বারা কিছু ফকীহগণ যেমন ইহইয়াউল উলূমের লেখক এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ প্রতারিত হয়েছেন। মধ্য শা‘বানের রাতের সালাতের বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে, যার সবই বাতিল ও মাওযু। এটি তিরমিযীর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসের বিপরীত নয়, যেখানে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাকি কবরস্থানে গমন করেন এবং মধ্য শা‘বানের রাতে মহান রব দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন ও কিলাব গোত্রের ভেড়ার পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক লোককে ক্ষমা করেন। কারণ আলোচ্য বিষয় হলো—এই রাতের বিশেষ নামাজ সংক্রান্ত তৈরি করা (মনগড়া) আমল সম্পর্কে। যদিও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার এ হাদীসটি দুর্বল এবং সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। যেমন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর রাতের সালাত বিষয়ক উল্লেখিত হাদীসটিও এই সালাতের বাতিল হওয়াকে খণ্ডন করে না, যদিও এতে দুর্বলতা রয়েছে যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি।

হাফিয ইরাকী বলেন: “লাইলাতুন নিসফের সালাতের হাদীসটি মাওযু এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যারোপ।” ইমাম নববী তার গ্রন্থ (আল-মাজমু’) এ বলেন: ‘সালাতুর রাগায়িব নামে পরিচিত সালাত, যা বারো রাকাত, মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে, রজব মাসের প্রথম শুক্রবার রাতে আদায় করা হয় এবং মধ্য শা‘বানের রাতের সালাত যা একশ রাকাত, এই দুই সালাত বিদ‘আত ও নিন্দনীয়। এগুলো (কূতুল কুলূব) এবং (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন) গ্রন্থে উল্লেখিত হওয়ায় বিভ্রান্ত হবেন না, এবং তাতে উল্লেখিত হাদীসের কারণে বিভ্রান্ত হবেন না, কেননা এগুলো সবই বাতিল। কিছু ইমাম যাদের উপর এর হুকুম স্পষ্ট হয়নি এবং যারা এটা মুস্তাহাব হওয়া সম্পর্কে পুস্তিকা রচনা করেছেন, তাদের দ্বারাও বিভ্রান্ত হবেন না, কেননা তারা এতে ভুল করেছেন।’

শাইখ ইমাম আবু মুহাম্মাদ আবদুর রহমান ইবন ইসমাইল

আল-মাকদিসী এগুলো বাতিল প্রমাণে একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা অত্যন্ত সুন্দর ও উৎকৃষ্ট। এই বিষয়ে আলিমদের বক্তব্য অনেক এবং যদি আমরা এই বিষয়ে আমাদের জানা সমস্ত বক্তব্য উল্লেখ করতে যাই, তবে সে আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে। তবে আমরা যেটুকু উল্লেখ করেছি, আশা করা যায় তা সত্য অনুসন্ধানকারীর জন্য যথেষ্ট ও সন্তোষজনক হবে।

উপরোক্ত আয়াতসমূহ, হাদীসসমূহ এবং আলেমদের বক্তব্য থেকে সত্যের অনুসন্ধানকারী ব্যক্তির জন্য স্পষ্ট হয় যে, মধ্য শা‘বানের রাত উদযাপন করা, তা সালাতের মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনোভাবে, এবং এ দিনের রোযা নির্দিষ্ট করা; অধিকাংশ আলেমদের নিকট একটি নিন্দনীয় বিদ‘আত, যার শরয়ী কোনো ভিত্তি নেই। বরং এটি সাহাবীগণের যুগের পর ইসলামের নামে আবিস্কৃত হয়েছে। এ বিষয়ে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সত্যের অনুসন্ধানকারীর জন্য আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর এ বাণীই যথেষ্ট:

﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ...﴾

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম [আল-মায়েদা: ৩] এবং এ অর্থে আরো যে আয়াতসমূহ এসেছে। তাছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী:

«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ».

“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” এবং এ অর্থে বর্ণিত অন্যান্য হাদীস।

সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَا تَخُصُّوا لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ بِقِيَامٍ مِنْ بَيْنِ اللَّيَالِي، وَلَا تَخُصُّوا يَوْمَهَا بِالصِّيَامِ مِنْ بَيْنِ الْأَيَّامِ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ فِي صَوْمٍ يَصُومُهُ أَحَدُكُمْ».

“রাতসমূহের মাঝে তোমরা কেবল জুমূআর রাতকে কিয়ামের জন্য নির্ধারন করে নিও না। অনুরূপভাবে দিনসমূহের মধ্যে কেবল জুমু’আর দিনকে সিয়াম পালনের জন্য নির্দিষ্ট করে নিও না। তবে তা যদি কারো নিয়মিত সাওম পালন করার দিনে পড়ে তাহলে সে সাওম পালন করতে পারবে।” অতএব যদি কোনো রাতকে বিশেষ ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা বৈধ হতো, তবে জুমুআর রাত অন্য রাতের চেয়ে অগ্রগণ্য হতো; কারণ, এ দিনটি হচ্ছে যেসব দিনে সূর্য ওঠে তার মধ্যে উত্তম; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী। কাজেই যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন নির্দিষ্ট রাতগুলোতে কিয়াম করার ব্যাপারে সতর্ক করেন, তখন তা প্রমাণ করে যে অন্যান্য রাতগুলোতে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা আরও বেশি অনুচিত, কোন রাতকে নির্দিষ্ট কোন ইবাদতের সাথে খাস করা জায়েয নয়; যদি না নির্দিষ্ট করার জন্য কোনো সহীহ দলিল থাকে।

যেহেতু লাইলাতুল কদর এবং রমযানের রাতগুলোতে কিয়াম করা ও ইবাদতে সাধনা করা শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে, সেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে জানিয়েছে, উম্মতকে কিয়াম করার জন্য উৎসাহিত করেছেন, এবং তিনি নিজেও তা পালন করেছেন, যেমন সহীহাইন-এ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন:

«مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

“যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় কিয়ামুল লাইল পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়।” সুতরাং যদি মধ্য শা‘বানের রাত, বা রজব মাসের প্রথম জুমুআর রাত, বা ইসরা ও মিরাজের রাতকে কোন উৎসব বা ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা শরীয়ত সম্মত হতো, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই উম্মতকে এর প্রতি নির্দেশনা দিতেন, অথবা নিজেই তা পালন করতেন। যদি এমন কিছু ঘটতো, তবে সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম তা উম্মতের কাছে পৌঁছে দিতেন এবং তা গোপন করতেন না। তারা ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ এবং নবীগণের পর সর্বোত্তম কল্যাণকামী। আল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাদের সন্তুষ্ট করুন।

তুমি একটু আগেই আলেমদের কথায় জেনেছ যে, রজব মাসের প্রথম জুমুআর রাত ও মধ্য শা‘বানের রাতের ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কিছুই প্রমাণিত হয়নি, এবং সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও কিছু প্রমাণিত হয়নি। সুতরাং জানা গেল যে, এ দু’টি রাত উদযাপন করা ইসলামে নতুন উদ্ভাবিত বিদ‘আত। অনুরূপভাবে এ রাতগুলোকে কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করাও একটি নিন্দনীয় বিদ‘আত। অনুরূপভাবে রজব মাসের সাতাশতম রাত, যা কিছু লোক মনে করে যে এটি ইসরা ও মিরাজের রাত, তা কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা জায়েয নয়, যেমন এ রাত উদযাপন করাও জায়েয নয়; পূর্বোক্ত প্রমাণের কারণে। এটি প্রযোজ্য হত যদি রাতটি নির্দিষ্টভাবে জানা যেত, সুতরাং আলেমদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী ইসরার রাতটি সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না- তাহলে বিষয়টি কেমন হতে পারে?! আর যে ব্যক্তি বলেছেন: এটি হলো রজব মাসের সাতাশতম রাত, তার এ কথা ভিত্তিহীন এবং সহীহ হাদীসে এর কোনো প্রমাণ নেই। আর জনৈক ব্যক্তি উত্তম বলেছেন যে:

“সবচেয়ে উত্তম বিষয় হলো হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত পূর্ববর্তী বিষয়সমূহ... আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নতুন উদ্ভাবিত বিদ‘আতসমূহ।”

আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের এবং সকল মুসলিমকে সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার এবং তাতে দৃঢ় থাকার তাওফীক দান করেন, আর যা এর বিরোধী তা থেকে সতর্ক থাকার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি দানশীল, মহানুভব।

আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আল্লাহর বান্দা ও রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবার পরিজন এবং সব সাহাবীর ওপর।

 

***

 


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

অষ্টম পত্র:

একটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অসিয়তের ব্যাপারে জরুরী সতর্কবার্তা, যা সম্বন্ধ করা হয়েছে

মসজিদে নববীর খাদেম শাইখ আহমদ-এর দিকে।

এটি আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায এর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি যারা এই পুস্তিকাটি পাঠ করবেন, আল্লাহ তাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে রক্ষা করুন এবং আমাদের ও তাদেরকে মূর্খ-সীমালঙ্ঘনকারীদের মিথ্যা অপবাদ থেকে রক্ষা করুন, আমীন।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

অতঃপর, আমি মসজিদে নববী শরীফের খাদেম শাইখ আহমদ এর নামে একটি বক্তব্য সম্পর্কে অবগত হয়েছি, যার শিরোনাম: “মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মসজিদে নববী শরীফের খাদেম শাইখ আহমদ এর পক্ষ হতে অসিয়ত”, এতে তিনি বলেছেন:

“এক শুক্রবার রাতে আমি জেগে ছিলাম এবং কুরআন তিলাওয়াত করছিলাম। এরপর আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ পাঠ করলাম। যখন তা শেষ করলাম, তখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম। স্বপ্নে আমি সেই মহান ব্যক্তিত্বকে দেখলাম, যিনি কুরআনের আয়াত এবং মহৎ বিধান নিয়ে এসেছেন, বিশ্বজগতের জন্য রহমত, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বললেন: হে শেখ আহমদ, আমি বললাম: লাব্বাইক, হে রাসূলুল্লাহ, হে আল্লাহর সবচেয়ে সম্মানিত সৃষ্টি! তিনি আমাকে বললেন, “আমি মানুষের কু-কর্মের কারণে লজ্জিত, এবং আমি আমার রবের ও ফেরেশতাদের সম্মুখীন হতে পারছি না; কারণ জুমু‘আ থেকে জুমু‘আ পর্যন্ত এক লক্ষ ষাট হাজার লোক ইসলামের বাইরে মারা গেছে।” অতঃপর তিনি কিছু পাপের কথা উল্লেখ করলেন, যা মানুষের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। অতঃপর তিনি বললেন: - এই অসিয়তটি তাদের প্রতি দয়ালু, পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে। অতঃপর তিনি কিয়ামাতের কিছু আলামত উল্লেখ করলেন, তারপর বললেন: - হে শেখ আহমদ, তাদেরকে এই অসিয়ত জানিয়ে দাও; কারণ এটি লওহে মাহফুজ থেকে তাকদীরের কলম দ্বারা লিপিবদ্ধ। যে ব্যক্তি এটি লিখবে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে, বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠাবে; তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মিত হবে। আর যে এটি লিখবে না এবং পাঠাবে না, তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ হারাম হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি এটি লিখবে; যদি সে গরীব হয়, আল্লাহ তাকে ধনী করবেন, অথবা যদি সে ঋণগ্রস্ত হয়, আল্লাহ তার ঋণ পরিশোধ করবেন, অথবা তার উপর কোনো গুনাহ থাকলে আল্লাহ তাকে এবং তার পিতামাতাকে এ অসিয়তের বরকতে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যে এটি লিখবে না, তার মুখ দুনিয়া ও আখিরাতে কালো হবে।’ তিনি আরো বললেন: ‘আল্লাহর নামে তিনবার কসম করে বলছি, এটাই সত্য। আর যদি আমি মিথ্যাবাদী হই, তাহলে যেন ইসলামহীন দুনিয়া থেকে বিদায় নেই। যে ব্যক্তি এতে বিশ্বাস করবে, সে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে। আর যে এতে অবিশ্বাস করবে, সে কাফির হবে।”

এটি হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আরোপিত মিথ্যা অসিয়াতের সারাংশ। আমরা বহু বছর ধরে বহুবার এই মিথ্যা অসিয়াত শুনেছি, যা মাঝে মাঝে মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়, যদিও এর শব্দগুলিতে ভিন্নতা রয়েছে। এই মিথ্যাবাদী লোকটি বলে: সে স্বপ্নে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছে এবং তার থেকে এই উপদেশ গ্রহণ করেছে। প্রিয় পাঠক! আমরা যে শেষ প্রচারপত্রের কথা উল্লেখ করেছি, তাতে মিথ্যাবাদী দাবি করেছে যে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘুমানোর প্রস্তুতির সময় দেখেছে। এর অর্থ হচ্ছে: সে তাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে!

এই মিথ্যাবাদী উক্ত অসিয়তে বহু বিষয় দাবি করেছে; যা সবচেয়ে স্পষ্ট মিথ্যা এবং সবচেয়ে স্পষ্ট অসত্য। ইনশাআল্লাহ, আমি শীঘ্রই এই বক্তব্যে আপনাকে এ সম্পর্কে সতর্ক করব। আমি পূর্ববর্তী বছরগুলোতে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছি এবং মানুষকে দেখিয়েছি যে এটি সবচেয়ে স্পষ্ট মিথ্যা এবং সবচেয়ে স্পষ্ট অসত্য। যখন আমি এই শেষ প্রচারপত্রটি দেখলাম, তখন এর অসারতা প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও এবং এর মিথ্যাবাদীর মিথ্যাচারের ঔদ্ধত্য সত্ত্বেও এ সম্পর্কে লেখার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। আমি কখনো ভাবিনি যে এর অসারতা এমন কারো কাছে প্রচারিত হবে যার ন্যূনতম অন্তর্দৃষ্টি বা সুস্থ প্রকৃতি রয়েছে। কিন্তু অনেক ভাই আমাকে জানিয়েছেন যে, এটি অনেক মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং তারা এটি নিজেদের মধ্যে বিনিময় করেছে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ এটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে; তাই আমি মনে করি আমার মতো লোকদের জন্য এ সম্পর্কে লেখা আবশ্যক, এর মিথ্যা হওয়া স্পষ্ট করার জন্য এবং এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে আরোপিত মিথ্যা যাতে কেউ প্রতারিত না হয়। আর জ্ঞান ও ঈমানের অধিকারী অথবা সঠিক স্বভাব ও সুস্থ বিবেকের অধিকারী যে কেউ এগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, সে বুঝতে পারবে যে, বহু দিক থেকে এটি মিথ্যা ও রটনা হিসেবে পরিগণিত।

আমি শাইখ আহমাদ রাহিমাহুল্লাহর কিছু আত্মীয়কে এই মিথ্যা অসিয়ত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা আমাকে উত্তর দিলেন যে, এটি শাইখ আহমাদের উপর আরোপিত মিথ্যা এবং মূলত তিনি কখনো এটি বলেননি। উল্লেখিত শেখ আহমদ কিছুদিন পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, উল্লেখিত শেখ আহমদ অথবা তার চেয়েও বড় কেউ দাবি করে যে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে বা জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে এবং তাকে এই অসিয়ত করেছে, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারব যে, সে মিথ্যাবাদী অথবা যে তাকে এ কথা বলেছে সে শয়তান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নন। এর কারণ অনেকগুলো, তন্মধ্যে:

প্রথমত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার মৃত্যুর পর জাগ্রত অবস্থায় দেখা যায় না। মূর্খ সুফিদের মধ্যে যারা দাবি করে যে, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে, অথবা তিনি মীলাদুন্নবীতে উপস্থিত হন, অথবা এ ধরনের কিছু ঘটে; তারা চরম ভুল করেছে এবং তাদের ওপর চরম বিভ্রান্তি চাপানো হয়েছে। তারা একটি বড় ভুলে পড়েছে এবং কিতাব, সুন্নাহ ও আলেমদের ঐক্যমতের বিরোধিতা করেছে; কারণ মৃতরা কেবল কিয়ামতের দিন কবর থেকে বের হবে, দুনিয়ায় নয়। আর যে ব্যক্তি এর বিপরীত কথা বলে, সে স্পষ্ট মিথ্যাবাদী অথবা বিভ্রান্ত, সে সঠিক পথ চিনতে পারেনি যা সালাফে সালেহীন চিনেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ও তাদের অনুসারীগণ যার অনুসরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿ثُمَّ إِنَّكُم بَعۡدَ ذَٰلِكَ لَمَيِّتُونَ15 ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ16﴾

এরপর তোমরা নিশ্চয় মরবে,

“তারপর কেয়ামতের দিন নিশ্চয় তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে।” [আল-মুমিনূন: ১৫, ১৬] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

«أَنَا أَوَّلُ مَنْ تَنْشَقُّ عَنْهُ الْأَرْضُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ».

“কিয়ামতের দিন আমিই প্রথম ব্যক্তি যার জন্য জমিন বিদীর্ণ হবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি।” এ বিষয়ে অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো সত্যের বিপরীত কিছু বলেন না; জীবিত অবস্থায় বা মৃত্যুর পর। এই অসিয়ত তার শরীয়তের স্পষ্ট বিরোধিতা করে, যার অনেকগুলো কারণ রয়েছে - যা সামনে আসছে -। বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখা যেতে পারে। যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার মহিমান্বিত রূপে স্বপ্নে দেখেছে, সে তাকেই দেখেছে; কারণ শয়তান তার রূপ ধারণ করতে পারে না, যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে। কিন্তু আসল বিষয়টি নির্ভর করে দর্শনকারীর ঈমান, তার সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, স্মৃতিশক্তি, ধর্মনিষ্ঠা এবং বিশ্বস্ততার উপর। সে কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার প্রকৃত রূপে দেখেছে, নাকি অন্য কোনো রূপে?

যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় বলা কোনো হাদীস এমন সূত্র থেকে আসে যা নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ রাবীদের দ্বারা প্রমাণিত নয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তার দ্বারা দলীল প্রমাণ করা যাবে না। অথবা যদি তা নির্ভরযোগ্য ও সঠিক রাবীদের দ্বারা আসে, কিন্তু এমন রাবীর বর্ণনার সাথে বিরোধ করে যিনি তাদের চেয়ে অধিক হিফযকারী এবং বিশ্বাসযোগ্য, এবং যার সাথে উভয় বর্ণনাকে একত্র করা সম্ভব নয়, তবে একটিকে মানসূখ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং অন্যটি নাসেখ বা রহিতকারী হিসেবে কার্যকর গণ্য হবে, যেখানে শর্তসাপেক্ষে তা সম্ভব হয়। আর যদি একত্র করা বা মানসূখ করা সম্ভব না হয়, তবে কম হিফযকারী ও কম ন্যায়পরায়ণ রাবীর বর্ণনাকে পরিত্যক্ত করতে হবে এবং তা শায বলে গণ্য করতে হবে, যা দ্বারা আমল করা যাবে না।

তাহলে কিভাবে এমন একটি অসিয়ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে যার প্রণেতা অজানা, যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে তা প্রচার করেছেন, এবং যার ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততা অজানা? এই অবস্থায় এটি পরিত্যাজ্য এবং এর প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়, যদিও এতে এমন কিছু না থাকে যা শরীয়তের বিরোধী। তাহলে কিভাবে যখন অসিয়তটি এমন অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে যা এর অসারতা প্রমাণ করে এবং এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে মিথ্যা আরোপকারী, এবং এমন একটি ধর্মীয় বিধান অন্তর্ভুক্ত করে যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি?!

অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ قَالَ عَلَيَّ مَا لَمْ أَقُلْ؛ فَلْيَتَـبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ».

“যে ব্যক্তি আমার ওপর এমন কিছু বলবে যা আমি বলিনি, সে যেন তার অবস্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নিল।” এ অসিয়তের রটনাকারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে এমন কিছু বলেছে যা তিনি বলেননি, এবং তার উপর গুরুতর মিথ্যাচার করেছে। সুতরাং সে এই বিরাট শাস্তির জন্য সে কতই না উপযুক্ত, এবং যদি সে তওবা না করে ও মানুষের কাছে এই অসিয়তের মিথ্যাচার প্রকাশ না করে, তবে সে এ শাস্তির কতই না প্রাপ্য। কারণ যে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে মিথ্যা প্রচার করে এবং তা ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত করে, তার তওবা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন সে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করবে এবং দেখাবে; যাতে মানুষ তার মিথ্যাচার থেকে ফিরে আসা এবং নিজেকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করা সম্পর্কে জানতে পারে; আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكۡتُمُونَ مَآ أَنزَلۡنَا مِنَ ٱلۡبَيِّنَٰتِ وَٱلۡهُدَىٰ مِنۢ بَعۡدِ مَا بَيَّنَّٰهُ لِلنَّاسِ فِي ٱلۡكِتَٰبِ أُوْلَٰٓئِكَ يَلۡعَنُهُمُ ٱللَّهُ وَيَلۡعَنُهُمُ ٱللَّٰعِنُونَ159 إِلَّا ٱلَّذِينَ تَابُواْ وَأَصۡلَحُواْ وَبَيَّنُواْ فَأُوْلَٰٓئِكَ أَتُوبُ عَلَيۡهِمۡ وَأَنَا ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ160﴾

নিশ্চয় যারা গোপন করে আমরা যেসব সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়াত নাযিল করেছি, মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পর, তাদেরকে আল্লাহ্‌ লা'নত করেন এবং লা'নতকারীগণও তাদেরকে লা'নত করেন।

তবে যারা তাওবা করেছে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করেছে এবং সত্যকে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে। অতএব, এদের তাওবা আমি কবুল করব। আর আমি অধিক তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [আল-বাকারাহ: ১৫৯, ১৬০] এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা স্পষ্ট করেছেন যে, যে কেউ সত্য কিছু গোপন করে, তার তওবা শুধুমাত্র নিজের সংশোধন ও সুস্পষ্ট ঘোষণার পরই গ্রহণযোগ্য হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করে তাদের উপর নি‘আমাতকে সম্পূর্ণ করেছেন। আর তার নিকট পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত ওহী করেছেন এবং পূর্ণতা ও সুস্পষ্টভাবে বর্ণনার তিনি তার মৃত্যু দিয়েছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন:

﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا...﴾

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [আল-মায়েদা: ৩]

এই অসিয়তের মিথ্যাচারকারী চতুর্দশ শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়েছিল, যে নতুন একটি ধর্মের আড়ালে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে তার বিধান গ্রহণকারীদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের প্রতিশ্রুতি এবং তার বিধান গ্রহণ না করাদের কারণে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া ও জাহান্নামে প্রবেশের শাস্তি নির্ধারিত হবে বলে দাবি করেছে। সে চায় যে এই মিথ্যা অসিয়তকে কুরআনের চেয়ে মহৎ ও উত্তম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে; যেহেতু সে মিথ্যা দাবি করেছে: যে ব্যক্তি এটি লিখবে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে, বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠাবে; তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মিত হবে। আর যে এটি লিখবে না এবং পাঠাবে না, তার জন্য কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুপারিশ হারাম হয়ে যাবে। এটি সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যা, এই মিথ্যা অসিয়তের মিথ্যাচারের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ এবং এর মিথ্যাবাদীর লজ্জাহীনতা ও মিথ্যা বলার ওপর তার দুঃসাহসের প্রমাণ; কারণ যে ব্যক্তি কুরআন কারীম লিখে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রেরণ করে, যদি সে কুরআন কারীমের ওপর আমল না করে তবে তার জন্য এই মর্যাদা অর্জিত হয় না। তাহলে এই মিথ্যার লেখক ও তা এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রেরণকারীর জন্য কিভাবে এই মর্যাদা অর্জিত হবে?! যে ব্যক্তি কুরআন লিখেনি এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠায়নি, যদি সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান রাখে এবং তার শরী‘আতের অনুসরণ করে, সে তার শাফা‘আত থেকে বঞ্চিত হবে না। এই এক মিথ্যাই এই অসিয়তটির অসারতা প্রমাণ করতে যথেষ্ট, এবং এর প্রচারকারীর মিথ্যাচার, তার লজ্জাহীনতা, নির্বুদ্ধিতা এবং তিনি যে সঠিক পথের বিষয়ে রাসুল (সা.) এর শিক্ষা জানতেন না, তার প্রমাণ বহন করে।

এ অসিয়তে উল্লেখিত বিষয়গুলোর বাইরে আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যা সবই এর অসারতা ও মিথ্যাচার প্রমাণ করে। এর রটনাকারী যদি হাজারবার বা তারও বেশি শপথ করে এর সত্যতার পক্ষে, কিংবা নিজের উপর সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ও কঠোরতম নিন্দা ডেকে আনে, তবুও সে সত্যবাদী হবে না, এবং এটি সত্য হবে না। বরং আল্লাহর কসম, এটি সবচেয়ে বড় ও নিকৃষ্ট মিথ্যাচারগুলোর একটি। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এবং আমাদের কাছে উপস্থিত ফেরেশতাদেরকে সাক্ষী রাখছি। এবং মুসলিমদের মধ্যে যারা এই লেখাটি সম্পর্কে জানতে পারবে তাদেরকেও- আমাদের পক্ষ থেকে এটি সেই সাক্ষ্য, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রভুর কাছে উপস্থিত হবো: যে এই অসিয়তটি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামে মিথ্যা ও রটনা, আল্লাহ তাআলা এই মিথ্যুককে অপমানিত করুন এবং তার সঙ্গে সেই আচরণ করুন যা তার প্রাপ্য।

এই অসিয়তের মিথ্যা ও অসারতা প্রমাণ করার জন্য পূর্বে উল্লেখিত বিষয় ছাড়াও এতে বর্ণিত মূলপাঠও অনেক বিষয় প্রমাণ করে, তন্মধ্যে:

প্রথম বিষয়: এতে বলা হয়েছে: (কারণ শুক্রবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এক লক্ষ ষাট হাজার লোক ইসলামের বাইরে মারা গেছে); কারণ এটি গায়েবী বিষয়, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর অহী বন্ধ হয়ে গেছে। আর তিনি জীবিত অবস্থায় গায়েব জানতেন না, তাহলে মৃত্যুর পর কিভাবে জানবেন; কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِي خَزَآئِنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ...﴾

বলুন , ‘আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমর নিকট আল্লাহ্‌র ভান্ডারসমূহ আছে, আর আমি গায়েবোও জানি না... [আল-আনআম: ৫০] আল্লাহর আরেকটি বাণী:

﴿قُل لَّا يَعۡلَمُ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلۡغَيۡبَ إِلَّا ٱللَّهُ...﴾

বলুন, ‘আল্লাহ্‌ ব্যতীত আসমান ও যমীনে কেউই গায়েব জানে না...’ [আন-নামল: ৬৫] সহীহ হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«يُذَادُ رِجَالٌ عَنْ حَوْضِي يَوْمَ القِيَامَةِ، فَأَقُولُ: يَا رَبِّ! أَصْحَابِي أَصْحَابِي، فَيُقَالُ لِي: إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ، فَأَقُولُ كَمَا قَالَ العَبْدُ الصَّالِحُ: ﴿وَكُنتُ عَلَيۡهِمۡ شَهِيدٗا مَّا دُمۡتُ فِيهِمۡۖ فَلَمَّا تَوَفَّيۡتَنِي كُنتَ أَنتَ ٱلرَّقِيبَ عَلَيۡهِمۡۚ وَأَنتَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ شَهِيدٌ [المائدة: 117]».

“কিয়ামতের দিন আমার হাউয থেকে কতিপয় লোককে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে। তখন আমি বলব: হে আমার রব! এরা আমার সঙ্গী, আমার সঙ্গী। তখন আমাকে বলা হবে: তোমার পরে তারা কী ধরণের নতুন কাজের উদ্ভাবন (বিদআত) করেছিল, তা তুমি জানো না। তখন আমি সৎকর্মশীল ব্যক্তির (ঈসা) মতো বলব: ‘এবং আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের কাজকর্মের সাক্ষী; কিন্তু যখন আপনি আমাকে তুলে নিলেন, তখন আপনিই তো ছিলেন তাদের কাজকর্মের পর্যবেক্ষক এবং আপনিই সকল বিষয়ে সাক্ষী।’ [মায়েদা: ১১৭]”

দ্বিতীয় বিষয়: -এই অসিয়তের অসারতা ও মিথ্যা প্রমাণকারী বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলে-: এতে বলা হয়েছে: (যে ব্যক্তি এটি লিখবে; যদি সে গরীব হয়, আল্লাহ তাকে ধনী করবেন, অথবা যদি সে ঋণগ্রস্ত হয়, আল্লাহ তার ঋণ পরিশোধ করবেন, অথবা তার উপর কোনো গুনাহ থাকলে আল্লাহ তাকে এবং তার পিতামাতাকে এ অসিয়তের বরকতে ক্ষমা করবেন) ইত্যাদি। এটি সবচেয়ে বড় মিথ্যাচারগুলোর একটি এবং এর রটনাকারীর মিথ্যাচারের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ। তার আল্লাহ ও বান্দাদের প্রতি লজ্জাহীনতার প্রমাণ; কারণ এই তিনটি বিষয় কুরআন কারীম শুধু লেখার মাধ্যমে অর্জিত হয় না, তাহলে কিভাবে তা এই মিথ্যা অসিয়ত লেখকের জন্য হতে পারে?! বরং এই কপট ব্যক্তি মানুষকে ধোঁকা দিতে এবং তাদেরকে এই উপদেশের সাথে জড়িয়ে রাখতে চায়; যাতে তারা এটি লিখে এবং এই মিথ্যা ফজিলতের সাথে জড়িয়ে থাকে। আর যেন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে উপায় নির্ধারণ করেছেন এবং যেগুলোকে ধন-সম্পদ অর্জন, ঋণমুক্তি ও গুনাহ মাফের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, তা তারা পরিত্যাগ করে। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই অপমানের কারণ এবং প্রবৃত্তি ও শয়তানের আনুগত্য থেকে।

তৃতীয় বিষয়: -এই অসিয়তের অসরাতার প্রমাণকারী হলো: এতে বলা হয়েছে: (আর আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যে এটি লিখবে না, তার মুখ দুনিয়া ও আখিরাতে কালো হবে)। এটিও সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যাচারগুলোর একটি এবং এই অসিয়তের মিথ্যার ও এর রটনাকারীর মিথ্যাবাদীতার প্রমাণের স্পষ্ট প্রমাণ। কিভাবে একজন বুদ্ধিমান মানুষ মেনে নিতে পারে যে, কোন অজ্ঞাত ব্যক্তি চতুর্থ শতাব্দীতে এমন একটি মিথ্যা অসিয়ত রচনা করবে, যা সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে তৈরি করেছে এবং দাবি করছে যে, যে এটি লিখবে না, তার মুখ দুনিয়া ও আখিরাতে কালো হয়ে যাবে, আর যে এটি লিখবে সে দারিদ্র্যের পর ধনী হবে, ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হবে, এবং তার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে!!

আল্লাহ কতই না পবিত্র, এটি একটি মহা অপবাদ!! প্রমাণ ও বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয় যে, এই মিথ্যাবাদীর কথা মিথ্যা, সে আল্লাহর উপর বড় দুঃসাহস দেখিয়েছে এবং আল্লাহ ও মানুষের কাছে তার লজ্জার অভাব রয়েছে। বহু মানুষই তো তা লেখেনি, অথচ তাদের মুখ কালো হয়নি। অপরদিকে বিশাল সংখ্যক লোক রয়েছে, যারা বহুবার তা লিখেছে, তবুও তাদের ঋণ পরিশোধ হয়নি, তাদের দারিদ্র্য দূর হয়নি। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই হৃদয়ের বিভ্রান্তি ও পাপের কলুষতা থেকে। এগুলো এমন গুণাবলী ও প্রতিদান যা শরীয়ত সেই ব্যক্তির জন্যও নির্ধারণ করেনি যিনি সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব কুরআন মাজীদ লিখেছেন। তাহলে কিভাবে তা সেই ব্যক্তির জন্য হতে পারে যে এ মিথ্যা অসিয়ত লিখেছে যা বিভিন্ন প্রকারের বাতিল ও বহু প্রকারের কুফরীতে ভরপুর? সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ কত সহনশীল সেই ব্যক্তির প্রতি যে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যার দুঃসাহস দেখায়।

চতুর্থ বিষয়: -এই অসিয়তের মিথ্যা ও এর রটনাকারীর মিথ্যাবাদীতা প্রমাণের স্পষ্ট একটি প্রমাণ হলো-: এতে বলা হয়েছে: (যে ব্যক্তি এতে বিশ্বাস করবে, সে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে। আর যে এতে অবিশ্বাস করবে, সে কাফির হবে), এটিও মিথ্যার প্রতি এক অতি দুঃসাহসী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যাচার; এই মিথ্যাবাদী সকল মানুষকে তার মিথ্যাটি বিশ্বাস করার জন্য আহ্বান করছে এবং দাবি করছে যে, এর মাধ্যমে তারা জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচবে এবং যে কেউ এটিকে মিথ্যা বলবে, সে কাফির হয়ে যাবে। এই মিথ্যাবাদী আল্লাহর ওপর মিথ্যার দুঃসাহস দেখিয়েছে, আল্লাহর কসম, সে সত্যের বিপরীত কথা বলেছে। যে কেউ এটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে, সে-ই কাফির হওয়ার যোগ্য, যে এটিকে মিথ্যা বলবে সে নয়; কারণ এটি একটি মিথ্যা, বাতিল ও ভিত্তিহীন মিথ্যাচার। আমরা আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে এটি মিথ্যা এবং এর রটনাকারী একজন মিথ্যুক, যে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মানুষের জন্য নতুন শরীয়ত প্রবর্তন করতে চায় এবং তাদের দীনে এমন কিছু প্রবেশ করাতে চায় যা তার অংশ নয়। আল্লাহ এই উম্মতের জন্য এই মিথ্যা রটনার চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বেই দীনকে পূর্ণ ও সম্পূর্ণ করেছেন। সুতরাং আপনারা সতর্ক থাকুন: হে পাঠকবৃন্দ ও ভাইয়েরা, এবং এই ধরনের মিথ্যাচারকে বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকুন, যেন এগুলো আপনাদের মধ্যে প্রচলিত না হয়। কেননা সত্যের উপর নূর থাকে যা তার অনুসন্ধানকারীর কাছে বিভ্রান্তিকর হয় না। সুতরাং প্রমাণ দ্বারা সত্যকে অনুসন্ধান করুন এবং আপনাদের কাছে যা অস্পষ্ট তা সম্পর্কে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞাসা করুন। মিথ্যাবাদীদের শপথে প্রতারিত হবেন না, কেননা লাঞ্ছিত ইবলিস আপনাদের পিতা আদম ও মাতা হাওয়ার কাছে শপথ করেছিল যে, সে তাদের কল্যাণকামী, অথচ সে ছিল সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক ও মিথ্যাবাদী। যেমন আল্লাহ তা'আলা তার সম্পর্কে বলেছেন:

﴿وَقَاسَمَهُمَآ إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ ٱلنَّٰصِحِينَ21﴾

আর সে তাদের উভয়ের কাছে শপথ করে বলল, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের শুভাকাংখীদের একজন।' [আল-আরাফ: ২১] অতএব, তার থেকে সতর্ক থাকুন এবং তার অনুসারীদের মধ্যে যারা মিথ্যাচার করে তাদের থেকেও সতর্ক থাকুন। তাদের কতই না মিথ্যা শপথ, বিশ্বাসঘাতক চুক্তি, এবং বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্ট করার জন্য সুসজ্জিত কথাবার্তা রয়েছে! তবে এ মিথ্যাবাদী যে প্রকাশ্য অন্যায়কার্যের কথা উল্লেখ করেছে, তা সত্যিই ঘটছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ এ থেকে চূড়ান্ত সতর্কতা প্রদান করেছে। এতে রয়েছে পথনির্দেশনা ও পরিপূর্ণতা।

আর কিয়ামতের শর্তাবলী সম্পর্কে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা হাদীস শরীফে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামতের আলামতসমূহ কি হবে, এবং কুরআন মাজীদেও এর কিছু উল্লেখ রয়েছে। যে ব্যক্তি তা জানতে চায়, সে তা সঠিকভাবে সুনান গ্রন্থ এবং ইলম ও ঈমানের অধিকারী আলেমদের রচনাবলীতে পাবে। মানুষের এ ধরনের মিথ্যাবাদী ও বিভ্রান্তিকর ব্যক্তির ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, যারা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দেয়। আল্লাহ আমাকে, আপনাদেরকে এবং সকল মুসলিমদেরকে শয়তানের ক্ষতি, বিভ্রান্তিকর ফিতনা, পথভ্রষ্টদের ভ্রষ্টতা এবং আল্লাহর শত্রুদের মিথ্যা প্ররোচনা থেকে রক্ষা করুন- যারা আল্লাহর নূরকে তাদের মুখের মাধ্যমে নিভিয়ে দিতে চায় এবং মানুষের ধর্মকে বিভ্রান্ত করতে চায়। আল্লাহ তার নূরকে পূর্ণ করবেন এবং তার দ্বীনকে সাহায্য করবেন, যদিও শয়তান এবং তাদের অনুসারী কাফের ও নাস্তিকরা তা অপছন্দ করে। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করেন, এবং তাদেরকে হক অনুসরণ করার, তাতে দৃঢ় থাকার এবং সকল পাপ থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে তওবা করার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু এবং সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক। আর সুউচ্চ ও সুমহান আল্লাহর তাওফীক ব্যতীত মন্দ কাজ থেকে বাঁচার সামর্থ্য কিংবা ভাল কাজ করার কোন শক্তি আমাদের নেই।

সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের রব আল্লাহর জন্য, আর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর বান্দা ও রাসূল সত্যবাদী আল-আমীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবারবর্গ, সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা সঠিকভাবে তাদের অনুসরণ করবে তাদের সকলের ওপর।

 

***