إِقََامَةُ البَرَاهِينِ عَلَى
حُكْمِ مَنِ اسْتَغَاثَ بِغَيرِ اللهِ
আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনাকারীর বিধান সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠা
لِسَمَاحَةِ الشَّيْخِ العَلَّامَةِ
عَبْدِ العَزِيزِ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ بَازٍ
رَحِمَهُ اللهُ
সংকলন মাননীয় শাইখ
শাইখ আব্দুল ‘আযীয ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু বায
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
দ্বিতীয় পত্র:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বিপদে সাহায্য চাওয়ার হুকুম সম্পর্কে
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম আল্লাহর রাসূল-এর ওপর, তার পরিবার, সহচরবর্গ এবং যারা তার পথ অনুসরণ করে তাদের ওপর।
অতঃপর, কুয়েতের আল-মুজতামা পত্রিকা তাদের ১৫তম সংখ্যায়, যা ১৯/৪/১৩৯০ হিজরিতে প্রকাশিত হয়েছিল, "পবিত্র মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষে স্মরণিকা" শিরোনামে কিছু কবিতা প্রকাশ করেছিল। এই কবিতাগুলোতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণ, বিজয় এবং বিভক্তি ও মতানৈক্য থেকে মুক্তির জন্য তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছিল। এগুলো "আমিনা" ছদ্মনামে লিখিত হয়েছিল। উক্ত কবিতার কিছু অংশ হলো:
হে আল্লাহর রাসূল! বিশ্বকে রক্ষা করুন... যেখানে যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত হয় এবং তার শিখায় দগ্ধ হয়।
হে আল্লাহর রাসূল! উম্মতকে রক্ষা করুন... সন্দেহের অন্ধকারে তাদের পথ দীর্ঘ হয়েছে।
হে আল্লাহর রাসূল! উম্মতকে রক্ষা করুন... দুঃখের গোলকধাঁধায় তাদের উজ্জ্বলতা হারিয়ে গেছে।
এমনকি লেখিকা আরো বলেছে:
দ্রুত সাহায্য করুন যেমনি দ্রুত তা করেছিলেন... বদরের দিনে যখন আপনি আল্লাহকে আহবান করেছিলেন,
ফলে, দূর্বলরা রূপান্তরিত হলো চমৎকার বিজয়ীরূপে... নিশ্চয়ই আল্লাহর এমন বাহিনী রয়েছে যা আপনি দেখতে পান না।
(এইভাবে এই লেখিকা তার আহ্বান ও আর্তনাদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নিবেদন করেছে, তার কাছে উম্মতের বিজয় তরান্বিত করার আবেদন জানিয়েছে, এটা ভুলে গিয়ে—অথবা অজ্ঞতার কারণে—যে বিজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে, এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অন্য কোনো সৃষ্টির হাতে নয়। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে বলেছেন:)
﴿...وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ﴾
আর সাহায্য তো শুধু পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ্র কাছ থেকেই হয়। [আলে ইমরান: ১২৬] তিনি আরো বলেন:
﴿إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِنْ يَخْذُلْكُمْ فَمَنْ ذَا الَّذِي يَنْصُرُكُمْ مِنْ بَعْدِهِ...﴾
আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করলে তোমাদের উপর জয়ী হবার কেউ থাকবে না। আর তিনি তোমাদেরকে সাহায্য না করলে, তিনি ছাড়া কে এমন আছে যে তোমাদেরকে সাহায্য করবে? [আলে ইমরান: ১৬০]
এবং দু‘আ ও ফরিয়াদ তলব করার এ আমলটি হলো: ইবাদতের বিভিন্ন প্রকার থেকে একটি প্রকারকে গায়রুল্লাহর জন্য পালন করা। স্পষ্টভাবে কুরআন ও ইজমা দ্বারা জ্ঞাত বিষয় যে, এটি অনুমোদিত নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সৃষ্টিকূলকে সৃষ্টি করেছেন যেন তারা তাঁর ইবাদত করে। তিনি রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন সেই ইবাদতের ব্যাখ্যা ও এর প্রতি আহ্বান জানানোর জন্য, যেমন আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ56﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। [আয-যারিয়াত: ৫৬] তিনি আরো বলেন,
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ...﴾
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর... [আন-নাহল: ৩৬] তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ 25﴾
আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমরাই ইবাদাত কর। [আল-আম্বিয়া: ২৫] তিনি আরো বলেন:
﴿الر كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ1 أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنَّنِي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ2﴾
আলিফ–লাম-রা, এ কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তার কাছ থেকে;
যে, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের ইবাদাত করো না, নিশ্চয় আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা। [হুদ: ১, ২]
কাজেই আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতসমূহে স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি জিন ও মানুষকে একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি আরো স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এই ইবাদতের আদেশ দেওয়ার জন্য এবং এর বিপরীত কাজ থেকে নিষেধ করার জন্য। আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর কিতাবের আয়াতসমূহকে সুসংহত ও বিশদ করেছেন যেন তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করা হয়।
এ কথা কারো অজানা নয় যে, ইবাদত অর্থ: আল্লাহকে এক জানা এবং তাঁর আদেশ পালন করা ও নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা মাধ্যমে তার আনুগত্য করা। আল্লাহ তা‘আলা বহু আয়াতে এ সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেন এবং অবহিত করেছেন, যেমন: তাঁর বাণী:
﴿وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ...﴾
আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে... [আল-বায়্যিনাহ: ৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ...﴾
আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে... [আল-ইসরা: ২৩] তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ2 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ3﴾
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।
জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ২-৩]
এ বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে, যার সবগুলোই একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা এবং নবী-রাসূলগণসহ অন্য যে কারো ইবাদত পরিত্যাগ করার আবশ্যকতা প্রমাণ করে।
নিঃসন্দেহে দু‘আ হলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বজনীন ইবাদত। তাই একে একমাত্র আল্লাহর জন্যই খালেস করা আবশ্যক, যেমন তিনি বলেছেন:
﴿فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ14﴾
সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [গাফির: ১৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا18﴾
আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহ্র সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না। [আল-জিন: ১৮] এবং এই নির্দেশনা আল্লাহকে দো‘আয় একক গণ্য করার ব্যাপারে সকল সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য, নবীগণ এবং অন্যান্যদের জন্যও; আর আল্লাহর বাণী:
﴿وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذٗا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ106﴾
‘আর আপনি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবেন না, যা আপনার উপকারও করে না, অপকারও করে না, কারণ এটা করলে তখন আপনি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।’ [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬] এটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সম্বোধন। আর এটা জানা কথা যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে শিরক থেকে রক্ষা করেছেন, কিন্তু এর উদ্দেশ্য হল অন্যদের সতর্ক করা। তারপর আল্লাহ বললেন:
﴿وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ106﴾
‘আর আপনি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবেন না, যা আপনার উপকারও করে না, অপকারও করে না, কারণ এটা করলে তখন আপনি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।’ [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬] এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য হল অন্যদেরকে সতর্ক করা; কারণ এটা জানা বিষয় যে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূলকে শিরক থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কীকরণে কঠোরতা অবলম্বন করে বলেন:
﴿...فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ﴾
তখন আপনি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। যুলুম যখন সাধারণভাবে বলা হয়, তখন এর দ্বারা বড় শিরক বোঝানো হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿...وَالْكَافِرُونَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴾
আর কাফেররাই যালিম। [আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৪] তিনি আরো বলেন,
﴿...إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ﴾
নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম। [ সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩] যদি আদম সন্তানদের সরদার—আলাইহিস সালাম—অন্য কারো নিকট দোয়া করলে তিনি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হতেন, তবে অন্যদের কী অবস্থা হবে?!
সুতরাং এসব আয়াত সহ অন্যান্য আয়াত থেকে জানা গেল যে, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারো কাছে দু‘আ করা - যেমন মৃত, গাছ, মূর্তি ইত্যাদি - আল্লাহর সাথে শিরকের শামিল এবং এটা আল্লাহর ইবাদাতে তাওহীদের পরিপন্থি, যা আল্লাহ তা‘আলা জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করার এবং রাসূল প্রেরণ ও কিতাব নাযিল করার উদ্দেশ্য। এছাড়াও এটি “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই” এর অর্থের পরিপন্থি, যে অর্থ আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদাতকে অস্বীকার করে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ62﴾
এজন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ্, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে তা তো অসত্য। আর নিশ্চয় আল্লাহ্, তিনিই সমুচ্চ, সুমহান। [আল-হজ্জ: ৬২]
এটাই দ্বীনের মূলনীতি ও মীল্লাতের ভিত্তি, এবং এই মূলনীতি বিশুদ্ধ না হলে ইবাদাত বিশুদ্ধ হয় না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ65﴾
আর আপনার প্রতি ও আপনার পুর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, 'যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। [আয-যুমার: ৬৫] তিনি আরো বলেন:
﴿...وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾
আর যদি তারা শির্ক করত তবে তাঁদের কৃতকর্ম নিস্ফল হত [আল-আনআম: ৮৮]
এতে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন ইসলাম এবং (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই) এই সাক্ষ্য প্রদানের দুটি মহান মূলনীতি রয়েছে:
এক: আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত করা যাবে না, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; সুতরাং যে ব্যক্তি নবীগণ বা অন্য মৃত ব্যক্তিদের ডাকলো, অথবা মূর্তি, গাছ, পাথর বা অন্য কোন সৃষ্টিকে ডাকলো, অথবা তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলো, তাদের নিকট যবাই ও মান্নত করা দ্বারা নৈকট্য লাভের চেষ্টা করলো, তাদের জন্য সালাত আদায় করলো, তাদের জন্য সিজদা করলো; সে আল্লাহ ছাড়া তাদেরকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করলো ও তাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানালো, এবং “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই” এর অর্থকে সে অস্বিকার করলো।
দ্বিতীয়: আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা হবে শুধুমাত্র তাঁর নবী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীয়ত মোতাবেক। যে ব্যক্তি দ্বীনে এমন কিছু উদ্ভাবন করলো যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি; সে মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহর সাক্ষ্যদানের প্রকৃত অর্থ বাস্তবায়ন করেনি, এবং তার আমল তাকে কোনো উপকার করবে না ও তা কবুল করা হবে না। আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেছেন:
﴿وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا23﴾
আর আমরা তাদের কৃতকর্মের প্রতি অগ্রসর হয়ে সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব। [আল-ফুরকান: ২৩] আয়াতে উল্লেখিত আমল দ্বারা উদ্দেশ্য হল: যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক অবস্থায় মারা গেছে তার আমল।
এতে আরো অন্তর্ভুক্ত হবে: বিদ‘আতী আমল যার অনুমতি আল্লাহ দেননি, কিয়ামতের দিন তা বিক্ষিপ্ত ছাইয়ের মতো হবে। কারণ তা তাঁর পবিত্র শরী‘আতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ».
“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
মোদ্দাকথা হলো: এই লেখিকা তাঁর ফরিয়াদ ও দু‘আ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিবেদন করেছে এবং সে বিশ্বজগতের রব থেকে বিমুখ হয়েছে, যাঁর হাতে বিজয়, ক্ষতি ও উপকার রয়েছে, এবং অন্য কারো হাতে এর কিছুই নেই।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি একটি মহা অন্যায় ও জঘণ্য কাজ। অথচ আল্লাহ্ তাঁর কাছে দু‘আ করতে আদেশ করেছেন এবং যারা তাঁকে ডাকে তাদের জন্য সাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যারা এ থেকে অহংকার করবে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশের হুমকি দিয়েছেন, যেমন তিনি বলেছেন:
﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ 60﴾
আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।' [গাফির: ৬০] তথা: লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়ে। এই আয়াতটি প্রমাণ করে, নিশ্চয় দু‘আ একটি ইবাদাত এবং যে ব্যক্তি এ থেকে অহংকার করবে তার ঠিকানা জাহান্নাম। যদি আল্লাহর কাছে দু‘আ থেকে বিমুখ হওয়ার পরিণতি এমন হয়, তবে যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে ডাকে তাদের অবস্থা কেমন হবে? অথচ তিনি নিকটবর্তী, সবকিছুর মালিক এবং সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। যেমন তিনি বলেছেন:
﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ 186﴾
আর আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে। [আল-বাকারাহ: ১৮৬] সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, দু‘আ-ই হলো ইবাদাত। তিনি তার চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বলেছেন:
«احْفَظِ اللهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظِ اللهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ، إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ، وَإِذَا اسْتَعْنَتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ».
“তুমি আল্লাহকে (বিধানসমূহকে) হেফাযত কর তাহলে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহর হকসমূহ রক্ষা কর, তাহলে তুমি তাকে তোমার সম্মুখে পাবে। যখন তুমি চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন তুমি সাহায্য প্রার্থনা করবে, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে।” তিরিমিযীসহ অন্যান্যরা হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو لِلهِ نِدًّا؛ دَخَلَ النَّارَ».
“যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা গেল যে, সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোন শরীককে ডাকে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সহীহ বুখারী) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো: কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন:
«أَنْ تَجْعَلَ لِلهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ».
“আল্লাহর জন্য সমকক্ষ সাব্যস্ত করা; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” হাদীসে উল্লেখিত আন-নিদ্দ (الند): অর্থ হলো সমকক্ষ ও সদৃশ। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে দু‘আ করে, অথবা তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, অথবা তার নামে মানত করে, বা তার জন্য যবেহ করে, অথবা পূর্বে উল্লেখিত বিষয় ব্যতীত অন্য কোনো ইবাদাত তার জন্য নিবেদন করে; সে তাকে শরীক সাব্যস্ত করল। চায় তা নবী, অথবা অলী, ফেরেশতা, জিন, মূর্তি, কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টি হোক।
এখানে কেউ বলতে পারে: জীবিত উপস্থিত মানুষের কাছে তার ক্ষমতাধীন বিষয়ে সাহায্য চাওয়া এবং তার ক্ষমতাধীন বাহ্যিক বিষয়াদিতে তার সহযোগিতা চাওয়ার বিধান কী? উত্তর: এটি শির্কের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং মুসলমানদের মধ্যে অনুমোদিত সাধারণ বিষয়গুলির অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা মূসার কাহিনীতে বলেছেন:
﴿...فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ...﴾
অতঃপর মূসার দলের লোকটি ওর শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল [আল-কাসাস: ১৫] তেমনিভাবে মহান আল্লাহ মূসার কাহিনীতে আরো বলেছেন:
﴿فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ...﴾
তখন তিনি ভীত সতর্ক অবস্থায় সেখান থেকে বের হয়ে পড়লেন... [আল-কাসাস: ২১] যেমন মানুষ যুদ্ধের সময় তার সঙ্গীদের কাছে সাহায্য চায়, এছাড়াও অন্যান্য বিষয়াদি যা মানুষের সামনে আসে এবং যেখানে তারা একে অপরের প্রয়োজন অনুভব করে।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন তার উম্মতকে জানিয়ে দেন যে, তিনি কারো জন্য কোনো উপকার বা ক্ষতির অধিকারী নন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন:
﴿قُلْ إِنَّمَا أَدْعُو رَبِّي وَلَا أُشْرِكُ بِهِ أَحَدًا21 قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا22﴾
বলুন, ‘আমি তো কেবল আমার রাবকেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।’
“বলুন, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি বা কল্যাণের মালিক নই৷” [আল-জিন: ২১,২২] তিনি আরো বলেন,
﴿قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ188﴾
বলুন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভালো মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আমি তো আর কিছুই নই।’ [আল-আরাফ: ১৮৮]
এই অর্থে অনেক আয়াত রয়েছে।
এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রব ব্যতীত কাউকে ডাকেন না। যেমন, বদরের দিনে তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিলেন এবং তার শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য চাইছিলেন, আর অনবরত দোয়া করছিলেন। তিনি বলছিলেন: «হে আমার রব! আপনি আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা পূর্ণ করুন»। এমনকি আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: যথেষ্ট, হে আল্লাহর রাসূল, নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা পূর্ণ করবেন। এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা এ সম্পর্কে আয়াত নাজিল করেছেন:
﴿إِذۡ تَسۡتَغِيثُونَ رَبَّكُمۡ فَٱسۡتَجَابَ لَكُمۡ أَنِّي مُمِدُّكُم بِأَلۡفٖ مِّنَ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ مُرۡدِفِينَ9﴾
স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকট উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন যে, ‘অবশ্যই আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক হাজার ফিরিশ্তা দিয়ে, যারা একের পর এক আসবে।’ [আল-আনফাল: ৯] মহান আল্লাহ এই আয়াতসমূহে তাদের সাহায্যের প্রার্থনার কথা উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে তিনি তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য করেছিলেন; বিজয়ের সুসংবাদ ও প্রশান্তির জন্য। মহান আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে বিজয় ফেরেশতাদের দ্বারা নয়, বরং তা তাঁর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ...﴾
আর সাহায্য তো শুধু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে... [আলে ইমরান: ১২৬] তিনি আরো বলেন:
﴿وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ123﴾
আর বদরের যুদ্ধে আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন অথচ তোমরা হীনবল ছিলে। কাজেই তোমরা আল্লাহ্র তাকওয়া অবলম্বন কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার। [আলে ইমরান: ১২৩] আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াতে স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি বদরের দিনে তাদের সাহায্যকারী ছিলেন। সুতরাং এটা জানা গেল যে, তাদেরকে যে অস্ত্র ও শক্তি প্রদান করা হয়েছিল এবং যে ফেরেশতাদের দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করা হয়েছিল, তা সবই ছিল সাহায্য, সুসংবাদ ও প্রশান্তির কারণ। কিন্তু সাহায্য সেগুলোর পক্ষ থেকে ছিল না, বরং তা শুধুমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই ছিল। তাহলে কিভাবে এই লেখিকা বা অন্য কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সাহায্য ও বিজয় প্রার্থনা করতে সাহস পায়, আর সমস্ত জগতের রব, যিনি সবকিছুর মালিক এবং সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়?
নিঃসন্দেহে এটি সবচেয়ে জঘন্য অজ্ঞতা, বরং সবচেয়ে বড় শিরক। অতএব, লেখিকার অবশ্যই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে খাঁটি তাওবা করা উচিত। খাঁটি তাওবা হলো এমন তাওবা যা কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল, সেগুলো হলো: এক: যা ঘটেছে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া। দুই: যা ঘটেছে তা থেকে বিরত থাকা, তিন: পুনরায় তা না করার দৃঢ় সংকল্প করা, এটি করতে হবে আল্লাহর মহত্ত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, একান্তভাবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য, তাঁর আদেশের প্রতি আনুগত্য স্বরূপ এবং যে বিষয়গুলো তিনি নিষেধ করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য। এটাই হচ্ছে খাঁটি তাওবা। এবং চতুর্থ আরেকটি বিষয় রয়েছে যা সৃষ্ট জীবের অধিকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর তা হলো: চার: অধিকার তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, অথবা তার সাথে মিটমাট করে নেয়া।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে তাওবা করার আদেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে তাওবা কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ31﴾
হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্র দিকে ফিরে আস, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [আন-নূর: ৩১]। তিনি খৃষ্টানদের ব্যাপারে বলেছেন:
﴿أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ74﴾
তবে কি তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে না ও তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [আল-মায়েদাহ: ৭৪] তিনি আরো বলেন,
﴿وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا68 يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا69 إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا70﴾
এবং তারা আল্লাহ্র সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না। আর আল্লাহ্ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। আর তারা ব্যভিচার করে না; যে এগুলো করে, সে শাস্তি ভোগ করবে।
কিয়ামতের দিন তার শাস্তি বর্ধিতভাবে প্ৰদান করা হবে এবং সেখানে সে স্থায়ী হবে হীন অবস্থায়;
তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, ফলে আল্লাহ্ তাদের গুণাহসমূহ নেক দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [আল-ফুরকান: ৬৮-৭০] তিনি আরো বলেন,
﴿وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ25﴾
আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন ও পাপসমূহ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন। [আশ-শুরা: ২৫]
সহীহ সূত্রে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الإِسْلَامُ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ، وَالتَّوْبَةُ تَجُبُّ مَا كَانَ قَبْلَهَا».
“ইসলাম পূর্বের সকল পাপ ধ্বংস করে দেয়, আর তাওবাহ পূর্বের সকল পাপ মুছে দেয়।”
আমি এই সংক্ষিপ্ত কথাগুলো তুলে ধরেছি, কারণ শিরকের ভয়াবহতা অত্যন্ত গুরুতর, এবং এটি সবচেয়ে বড় গুনাহ।এছাড়াও, এই লেখিকার কথায় কেউ বিভ্রান্ত হতে পারে—সে আশঙ্কায় এবং আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের জন্য উপদেশ দেওয়া আবশ্যক হওয়ার কারণে। আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন এর দ্বারা উপকৃত করেন এবং আমাদের ও সকল মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করেন। আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করেন এবং এতে দৃঢ় থাকার তাওফিক দেন। আমাদের ও মুসলিমদেরকে নিজেদের মন্দ প্রবৃত্তি এবং খারাপ কাজের পরিণতি থেকে রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তিনিই এর অভিভাবক এবং এর উপর ক্ষমতাবান।
আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর সালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
তৃতীয় পত্র
জিন ও শয়তানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং তাদের জন্য মানত করার বিধান সম্পর্কে।
আব্দুল ‘আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায-এর পক্ষ থেকে যারা এই পুস্তিকাটি দেখবেন তাদের প্রতি, আল্লাহ আমাকে এবং তাদেরকে তাঁর দ্বীনের উপর অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন, আমীন।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
অতঃপর: কিছু ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন কিছু অজ্ঞ ব্যক্তির কাজ সম্পর্কে; যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারো কাছে দু‘আ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে; যেমন: জিনদের কাছে দু‘আ করা, তাদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা, তাদের জন্য মান্নত করা এবং তাদের জন্য যবেহ করা। এছাড়াও কিছু লোকের কথা: (হে সাতজন), অর্থাৎ: জিনদের সাতজন নেতা, তোমরা তাকে পাকড়াও করো, তার হাড় ভেঙে দাও, তার রক্ত পান করো, তাকে বিকৃত করো, হে সাতজন তার সাথে এমন করো, অথবা কিছু লোকের বলা: (তোমরা তাকে ধরে নাও, হে দুপুরের জিন, হে বিকেলের জিন), এগুলো দক্ষিণাঞ্চলে বহুল প্রচলিত আছে। এছাড়াও এর সাথে যুক্ত হয়: নবী, সৎকর্মশীল ও অন্যান্য মৃত ব্যক্তিদের কাছে দোয়া করা এবং ফেরেশতাদের কাছে দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনা করা। এগুলো সবই এবং এর অনুরূপ বিষয়সমূহ অনেকের মধ্যে বিদ্যমান যারা ইসলামের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে, অজ্ঞতা এবং পূর্ববর্তীদের অন্ধ অনুকরণের কারণে। সম্ভবত তাদের কেউ কেউ এতে নমনীয়তা প্রদর্শন করে এবং এ কথা বলে যুক্তি প্রদান করে: এটি এমন কিছু যা মুখে উচ্চারিত হয়, আমরা এর উদ্দেশ্য করি না এবং এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি না।
তিনি আমাকে আরও জিজ্ঞেস করেছেন: যে ব্যক্তি এ ধরনের কাজের সাথে জড়িত, তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, তাদের যবেহকৃত পশু, তাদের জানাযা আদায় করা এবং তাদের পেছনে সালাত আদায় করার হুকুম সম্পর্কে এবং জাদুকর ও গণকদের বিশ্বাস করার হুকুম সম্পর্কে; যারা রোগ ও তার কারণ সম্পর্কে জানার দাবি করে শুধুমাত্র রোগীর শরীরের কোনো কিছু যেমন পাগড়ি, পায়জামা, ওড়না ইত্যাদির উপর নজর দেয়ার মাধ্যমে।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সেই নবীর উপর যার পরে আর কোনো নবী নেই, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর এবং কিয়ামত অবধি যারা তাদের পথ অনুসরণ করবে তাদের ওপর।
অতঃপর: আল্লাহ্ তা'আলা জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন যেন তারা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করে, তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত না করে, প্রার্থনা ও সাহায্য কামনা, কুরবানি, মানত এবং অন্যান্য সকল ইবাদাত একমাত্র তাঁর জন্যই পালন করে। তিনি এ বিষয় দিয়েই রসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং তাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণনা, এর দিকে আহ্বান এবং মানুষকে আল্লাহর সাথে শিরক ও অন্যের ইবাদাত করা থেকে সতর্ক করার জন্য তিনি আসমানী কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন, যার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হল পবিত্র কুরআন। এটাই হলো সকল মূলনীতির মূল এবং দ্বীন ও মিল্লাতের ভিত্তি। আর তা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য দেয়া। এই সাক্ষ্যের অর্থ হলো: আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই। এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য উলূহিয়্যাহ ও ইবাদতকে নাকচ করে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্যই ইবাদতকে সাব্যস্ত করে, তিনি ছাড়া অন্যান্য সৃষ্টির জন্য নয়। এ বিষয়ে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহতে অনেক দলিল রয়েছে। তন্মধ্যে: আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ56﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। [আয-যারিয়াত: ৫৬] তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ...﴾
আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে... [আল-ইসরা: ২৩] আল্লাহর আরেকটি বাণী:
﴿وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ...﴾
আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে... [আল-বায়্যিনাহ: ৫] আল্লাহর আরেকটি বাণী:
﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ60﴾
আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।' [গাফির: ৬০] তিনি আরো বলেন,
﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ...﴾
আর আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই... [আল-বাকারাহ: ১৮৬]
আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতসমূহে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি জিন ও মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তাঁর বান্দাদেরকে পবিত্র কুরআনে ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন একমাত্র তাদের রবেরই ইবাদত করে।
মহান আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, দু‘আ একটি মহান ইবাদাত। যে ব্যক্তি এ থেকে অহংকার করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে কেবল তাঁকেই ডাকতে আদেশ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে তিনি নিকটবর্তী, তাদের দু‘আ কবুল করেন। তাই সকল বান্দার উপর আবশ্যক যে তারা কেবলমাত্র তাদের রবের কাছেই দু‘আ করবে; কারণ তা এমন একটি ইবাদাত যার জন্য তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যার আদেশ তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ162 لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ163﴾
বলুন, ‘আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।’
‘তাঁর কোনো শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।’ [আল-আনআম: ১৬২, ১৬৩]
আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করেছেন যে, তিনি যেন মানুষকে জানিয়ে দেন, তার সালাত ও তার নুসুক -অর্থাৎ যবেহ-, এবং তার জীবন ও মৃত্যু; সবকিছু সৃষ্টিজগতের রব আল্লাহর জন্য, তাঁর কোনো শরীক নেই। এর ভিত্তিতে: যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য যবেহ করল, সে আল্লাহর সাথে শির্ক করল, তেমনি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সালাত আদায় করলে। কেননা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সালাত ও যবেহকে একত্রে উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, এগুলো একমাত্র আল্লাহর জন্য, তাঁর কোনো শরীক নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য যেমন জিন, ফেরেশতা, মৃত ব্যক্তিদের জন্য যবেহ করে এবং তাদের নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে, সে যেন তার ন্যায় যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সালাত আদায় করল। সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ».
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া কারো জন্যে যবেহ করবে, আল্লাহ তাকে লানত করেছেন।” ইমাম আহমদ হাসান সনদে তারেক ইবন শিহাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مرَّ رَجُلَانِ عَلَى قَومٍ لَهُم صَنَمٌ لَا يَجُوزُهُ أَحَدٌ حَتَّى يُقرِّبَ لَهُ شَيئًا، فَقَالُوا لِأَحَدِهِمَا: قَرِّبْ. قَالَ: لَيسَ عِندِي شَيءٌ أَقَرِّبُهُ، قَالُوا: قَرِّبْ وَلَوْ ذَبَابًا، فَقَرَّبَ ذُبَابًا، فَخَلُّوا سَبِيلَهُ، فَدَخَلَ النَّارَ، وَقَالُوا لِلآخَرِ: قَرِّبْ. قَالَ: مَا كُنْتُ لِأُقَرِّبَ لِأَحَدٍ شَيْئًا دُونَ اللهِ جَلَّ جَلَالُهُ، فَضَرَبُوا عُنُقَه، فَدَخَلَ الجَنَّةَ».
“দু’জন লোক এমন একটি কওমের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল যাদের জন্য একটি মূর্তি নির্ধারিত ছিল। উক্ত মূর্তিকে কোনো কিছু নযরানা বা উপহার না দিয়ে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতে পারত না। তারা একজনকে বললো, ‘নযরানা দাও’। সে বললো, ‘আমার কাছে কিছু নেই যা আমি নযরানা দিতে পারি’। তারা বললো, ‘অন্ততঃ একটা মাছি হলেও নযরানা স্বরূপ দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তিকে উপহার দিলে তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিলো। এর ফলে মৃত্যুর পর সে জাহান্নামে গেলো। তারা অপরজনকে বললো, ‘নযরানা দাও’। সে বললো, ‘একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নৈকট্য লাভের জন্য আমি কাউকে কোনো নযরানা প্রদান করি না’। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিলো। মৃত্যুর পর সে জান্নাতে প্রবেশ করলো।”
অতএব, যদি কেউ মূর্তি বা এ জাতীয় কিছুর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মাছি বা এ জাতীয় কিছু উৎসর্গ করে সে মুশরিক হয় এবং জাহান্নামে প্রবেশের উপযুক্ত হয়, তাহলে যারা জিন, ফিরিশতা ও অলিদের আহ্বান করে, যারা তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তাদের জন্য মানত করে এবং যবাইয়ের মাধ্যমে তাদের নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে, তাদের সম্পদের হেফাজত, রোগীর আরোগ্য, বা তাদের পশু ও ফসলের নিরাপত্তা আশা করে, এবং যারা জিনের ক্ষতির ভয়ে বা এ জাতীয় কিছু কারণে তা করে, তাদের অবস্থা কেমন হবে?! নিঃসন্দেহে, যে ব্যক্তি এসব করে এবং এ জাতীয় কাজ করে, সে ঐ ব্যক্তির চেয়ে মুশরিক হওয়ার অধিক যোগ্য এবং জাহান্নামে প্রবেশের অধিক উপযুক্ত, যে মূর্তির জন্য মাছি উৎসর্গ করেছিল।
এ সম্পর্কে আরো যা এসেছে, তার মধ্যে আল্লাহর বাণী:
﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ2 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ3﴾
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।
জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ২-৩] তিনি আরো বলেন,
﴿وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ18﴾
আর তারা আল্লাহ্ ছাড়া এমন কিছুর ‘ইবাদাত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এগুলো আল্লাহ্র কাছে আমাদের সুপারিশকারী।‘ বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্কে আসমানসমূহ ও যমীনের এমন কিছুর সংবাদ দেবে যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, ‘পবিত্র এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধে। [সূরা ইউনুস: ১৮]
আল্লাহ সুবহানাহ এই দুই আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মুশরিকরা তাঁর পরিবর্তে মাখলুককে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছে, যাদের তারা ভয়, আশা, কুরবানি, মানত, দোয়া ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁর সাথে উপাসনা করে, এই ভেবে যে, সেই অভিভাবকরা তাদের উপাসকদের আল্লাহর নিকটবর্তী করবে এবং তাদের জন্য তাঁর কাছে সুপারিশ করবে। এরপর আল্লাহ সুবহানাহ তাদেরকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে দিয়েছেন, তাদের বাতিলতা স্পষ্ট করেছেন এবং তাদেরকে মিথ্যাবাদী, কাফের ও মুশরিক বলে আখ্যায়িত করেছেন, আর নিজেকে তাদের শিরক থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿...سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ﴾
পবিত্র এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধে। [আন-নাহল: ১] অতএব, জানা গেল, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন ফিরিশতা, নবী, জিন, গাছ বা পাথরকে ডাকে এবং তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, মানত ও যবাইয়ের মাধ্যমে তার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে, আল্লাহর কাছে তার সুপারিশের আশা করে, অথবা রোগীর আরোগ্য, সম্পদের হেফাজত, অনুপস্থিত ব্যক্তির নিরাপত্তা বা এ ধরনের কিছু আশা করে; সে এই মহা শিরক ও ভয়াবহ বিপদে পতিত হয়েছে, যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا48﴾
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে। [আন-নিসা: ৪৮] তিনি আরো বলেন,
﴿إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ72﴾
নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই। [আল-মায়েদাহ: ৭২]
শাফাআত কিয়ামতের দিন শুধুমাত্র তাওহীদ ও ইখলাসের অনুসারীরাই প্রাপ্ত হবে, মুশরিকরা নয়। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন বলা হয়েছিল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার শাফাআত দ্বারা সবচেয়ে সৌভাগ্যবান কে হবে? তখন তিনি বলেছিলেন:
«مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ».
“যে ব্যক্তি খালেস দিলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:
«لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَـبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَومَ القِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللهِ مَن مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا».
“প্রত্যেক নবীর জন্য এমন একটি দু’আ রয়েছে, যা গৃহীত হয়। প্রত্যেক নবী তার দু’আ পৃথিবীতে করেছেন, কিন্তু আমি আমার দু’আর অধিকার কিয়ামতের দিনে আমার উম্মাতের শাফায়াতের জন্য লুকিয়ে রেখেছি। ইনশাআল্লাহ, তা আমার উম্মাতের সেই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য হবে, যে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যবরণ করেছে।”
প্রথম যুগের মুশরিকরা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহ তাদের রব, স্রষ্টা ও রিযিকদাতা। কিন্তু তারা নবীগণ, অলীগণ, ফিরিশতাগণ, বৃক্ষ ও পাথর এবং এ জাতীয় অন্যান্য বস্তুর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করত, আল্লাহর নিকট তাদের সুপারিশের এবং তাদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায়, যেমন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ এ ব্যাপারে তাদের ওজর গ্রহণ করেননি, বরং তাঁর মহান কিতাবে তাদেরকে নিন্দা করেছেন এবং তাদেরকে কাফের ও মুশরিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের এই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন যে, এই ইলাহরা তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছাবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ক্ষমা করেননি, বরং এই শিরকের কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন যাতে তারা কেবল আল্লাহর জন্যই ইবাদতকে খালিস করে। আল্লাহর এর বাণীর প্রতি আমল করণার্থে:
﴿وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ...﴾
আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেত্না চুড়ান্ত ভাবে দূরীভূত না হয় এবং দীন একমাত্র আল্লাহ্র জন্য হয়ে যায়... [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৩] তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ، وَيُؤتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُم وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الإِسْلَامِ، وَحِسَابُهُم عَلَى اللهِ».
“আমাকে লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করবে ও যাকাত প্রদান করবে। যখন তারা এ কাজগুলো সম্পাদন করবে, তখন তারা আমার নিকট থেকে তাদের রক্ত (জান) এবং মাল বাঁচিয়ে নেবে; কিন্তু ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব আল্লাহর ওপর ন্যস্ত হবে।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী:
«حَتَّى يَشْهَدُوا أَن لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ».
“যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই”: অর্থাৎ, তারা যেন একমাত্র আল্লাহকেই ইবাোতের জন্য নির্দিষ্ট করে এবং অন্য সমস্ত সত্তা থেকে তা মুক্ত রাখে।
মুশরিকরা জিনদের ভয় করত এবং তাদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করত, এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর এ বাণী নাযিল করেছেন:
﴿وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِنَ الْإِنْسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا6﴾
এও যে, কিছু কিছু মানুষ কিছু জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।’ [আল-জিন: ৬] তাফসীরবিদগণ এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: এ আয়াতের অর্থ হলো:
﴿...فَزَادُوهُمْ رَهَقًا﴾
ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিয়েছিল অর্থাৎ: আতঙ্ক ও ভয়; কারণ জিনেরা নিজেদের মধ্যে আত্মম্ভরিতা ও অহংকার করে, যখন তারা দেখে যে মানুষ তাদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছে। তখন তারা তাদেরকে ভয় ও আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে দেয়, যাতে তারা তাদের উপাসনা ও তাদের কাছে আশ্রয় গ্রহণ বাড়িয়ে দেয়।
অথচ আল্লাহ সুবহানাহু মুসলমানদেরকে এর পরিবর্তে বিকল্প স্বরূপ তাঁর নিকট এবং তাঁর পূর্ণাঙ্গ কালিমাসমূহ দ্বারা আশ্রয় গ্রহণের ব্যবস্থা দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন:
﴿وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ200﴾
আর যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা আপনাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। [আল-আরাফ: ২০০] মহান আল্লাহ আরো বলেন:
﴿قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ1﴾
বলুন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের’ সহীহ সূত্রে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«مَنْ نَزَلَ مَنْزِلًا فَقَالَ: (أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ)؛ لَم يَضُرَّهُ شَيءٌ حَتَّى يَرْتَحِلَ مِنْ مَنْزِلِهِ ذَلِكَ».
“যে ব্যক্তি কোথাও অবতরণ করে এ দো‘আটি পাঠ করে: “أعوذ بكلمات الله التامَّات من شر ما خلق”
অর্থ: (আল্লাহ পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের ওয়াসীলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্টসমূহ থেকে (তার কাছে) আশ্রয় চাই।); যতক্ষণ পর্যন্ত সে স্থান থেকে রওনা না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিছুই তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে, নাজাত প্রত্যাশী ও স্বীয় দ্বীনের হেফাযতে আগ্রহী এবং ছোট-বড় সকল শিরক থেকে নিরাপদ থাকতে আগ্রহী ব্যক্তি বুঝতে পারবে যে, মৃত, ফিরিশতা, জিন এবং অন্যান্য মাখলুকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, তাদেরকে আহবান করা ও তাদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা ইত্যাদি জাহেলী যুগের মুশরিকদের কাজ এবং আল্লাহর সাথে সবচেয়ে ঘৃণিত শির্ক। তাই এটি পরিত্যাগ করা, এ থেকে সতর্ক থাকা এবং এটি পরিত্যাগ করার জন্য পরস্পরকে উপদেশ দেওয়া ও যারা এটি করে তাদেরকে প্রতিহত করা ওয়াজিব।
আর যে ব্যক্তি এই শিরকী কাজগুলোর জন্য মানুষের মধ্যে পরিচিত, তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ নয়, তার যবাই করা পশু খাওয়া বৈধ নয়, তার জানাযার নামায পড়া বৈধ নয়, এবং তার পিছনে নামায পড়া বৈধ নয়, যতক্ষণ না সে আল্লাহর কাছে প্রকাশ্যে তাওবা করে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্য দু‘আ ও ইবাদাত খালিস করে। মৃলত দু‘আ হল ইবাদাত, বরং এর মগজ, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الدُّعَاءُ هُوَ العِبَادَةُ».
“দু‘আ-ই হচ্ছে ইবাদাত।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, তিনি বলেছেন:
«الدُّعَاءُ مُخُّ العِبَادَةِ».
“দু‘আ হচ্ছে ইবাদাতের মূল।” আর মুশরিকদের সাথে বিবাহের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ221﴾
আর মুশরিক নারীকে ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমরা বিয়ে করো না। মুশরিক নারী তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও, অবশ্যই মুমিন কৃতদাসী তার চেয়ে উত্তম। ঈমান না আনা পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের সাথে তোমরা বিয়ে দিওনা, মুশরিক পুরুষ তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও অবশ্যই মুমিন ক্রীতদাস তার চেয়ে উত্তম। তারা আগুনের দিকে আহবান করে। আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে নিজ ইচ্ছায় জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। আর তিনি মানুষের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা শিক্ষা নিতে পারে। [আল-বাকারাহ: ২২১] সুতরাং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুসলিমদেরকে মুশরিক নারীদেরকে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন, যারা মূর্তি, জিন, ফিরিশতা ইত্যাদির পূজারী, যতক্ষণ না তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতে একনিষ্ঠ হয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা বিশ্বাস করে এবং তার পথ অনুসরণ করে। অনুরূপভাবে মুশরিক পুরুষদের সাথে মুসলিম নারীদের বিবাহ দিতেও নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতে একনিষ্ঠ হয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশ্বাস করে এবং তার অনুসরণ করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সংবাদ দিয়েছেন যে, একজন মু’মিন দাসী একজন মুশরিক স্বাধীন নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও তার সৌন্দর্য ও বাকপটুতা দেখে শ্রোতা ও দর্শক মুগ্ধ হয়। এবং একজন মু’মিন দাস একজন মুশরিক স্বাধীন ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম, যদিও তার সৌন্দর্য, বাকপটুতা, সাহসিকতা ইত্যাদি দেখে শ্রোতা ও দর্শক মুগ্ধ হয়। এরপর আল্লাহ তায়ালা এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন:
﴿...أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ...﴾
তারা আগুনের দিকে আহবান করে। [আল-বাকারা: ২২১]। এর দ্বারা মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদের বোঝানো হয়েছে; কারণ তারা তাদের কথাবার্তা, কাজকর্ম, জীবনযাপন এবং চরিত্রের মাধ্যমে জাহান্নামের দিকে আহ্বানকারী। আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা তাদের চরিত্র, কাজকর্ম এবং জীবনযাপনের মাধ্যমে জান্নাতের দিকে আহ্বানকারী। তাহলে কিভাবে এরা এবং ওরা সমান হতে পারে!
আর মুশরিকদের জানাযা পড়ার ব্যাপারে: আল্লাহ্ জাল্লা ওয়া আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,
﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ84﴾
আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না; তারা তো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। [আত-তাওবাহ: ৮৪] আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতে স্পষ্ট করেছেন যে, মুনাফিক ও কাফিরের জানাযার সালাত আদায় করা যাবে না; কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে। তেমনি তাদের পিছনে সালাত আদায় করা যাবে না এবং তাদের মুসলিমদের ইমাম বানানো যাবে না; তাদের কুফরী ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এবং মুসলিমদের সাথে তাদের বিরাট শত্রুতার কারণে। কারণ তারা সালাত ও ইবাদাত আদায়কারী নয়; কেননা কুফর ও শিরক কোনো আমলকে অবশিষ্ট রাখে না। আমরা আল্লাহর কাছে এর থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করি। আর মুশরিকদের যবেহ করা পশু খাওয়ার ব্যাপারে, আল্লাহ্ তা‘আলা মৃত পশু ও মুশরিকদের যবেহ করা পশু হারাম করেছেন বলে স্পষ্ট করেছেন:
﴿وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ121﴾
আর যাতে আল্লাহ্র নাম নেয়া হয়নি তার কিছুই তোমারা খেও না; এবং নিশ্চয় তা গর্হিত। নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে প্ররোচনা দেয়; আর যদি তোমারা তাদের অনুগত্য কর, তবে তোমারা অবশ্যই মুশরিক। [আল-আনআম: ১২১] কাজেই আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদের মৃত জন্তু এবং মুশরিকের যবেহ করা পশু খেতে নিষেধ করেছেন; কারণ এটি নাপাক, তাই তার যবেহ করা পশু মৃতের হুকুমে, যদিও সে আল্লাহর নাম নেয়; কারণ তার নাম নেওয়া বাতিল, এর কোনো প্রভাব নেই; কারণ এটি ইবাদত, আর শিরক ইবাদতকে নষ্ট করে ও বাতিল করে দেয়, যতক্ষণ না মুশরিক আল্লাহর কাছে তওবা করে। আল্লাহ্ তো আহলে কিতাবের খাদ্যকে বৈধ করেছেন, যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন:
﴿...وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَهُمْ...﴾
ও যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য হালাল এবং তোমাদের খাদ্যদ্রব্য তাদের জন্য বৈধ। [আল-মায়েদাহ: ৫] কারণ তারা আসমানী ধর্মের সাথে নিজেদের সম্পর্কিত করে এবং দাবী করে যে তারা মূসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালামের অনুসারী, যদিও তারা এতে মিথ্যাবাদী। অথচ আল্লাহ তাদের ধর্মকে রহিত করেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করে তা বাতিল করেছেন। কিন্তু আল্লাহ —জাল্লা শানুহু— আমাদের জন্য আহলে কিতাবের খাদ্য ও তাদের নারীদেরকে হালাল করেছেন; এতে গভীর প্রজ্ঞা ও উপকারী রহস্য রয়েছে, যা আলেমগণ স্পষ্ট করেছেন। আর এটি মুশরিকদের বিপরীতে; যারা নবী, অলী ও অন্যান্য মৃত ব্যক্তি ও মূর্তির ইবাদাত করে; কেননা তাদের ধর্মের কোনো ভিত্তি নেই ও এতে কোনো সন্দেহ নেই। বরং তা মূল থেকেই বাতিল। তাই তাদের যবাই করা পশু মৃত বলে গণ্য হবে এবং তা খাওয়া বৈধ নয়।
আর যখন কেউ কাউকে বলে: (জিন তোমাকে ধরেছে), (জিন তোমাকে নিয়ে গেছে), (শয়তান তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে) ইত্যাদি, তখন এটি গালমন্দ ও অপমানের একটি রূপ, যা মুসলমানদের মধ্যে নিষিদ্ধ, যেমন অন্যান্য সব ধরনের গালমন্দও নিষিদ্ধ। তবে এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়, যদি না ঐ বলার সময় সে বিশ্বাস করে যে জিনেরা আল্লাহর অনুমতি ও ইচ্ছা ছাড়া মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কাজেই যে ব্যক্তি জিন বা অন্য কোনো মাখলূকের ব্যাপারে এমন বিশ্বাস পোষণ করে, সে এই বিশ্বাসের কারণে কাফির; কেননা আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুর মালিক এবং সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তিনিই উপকারকারী ও অপকারকারী, তাঁর অনুমতি ও ইচ্ছা এবং পূর্ব নির্ধারণ ছাড়া কিছুই ঘটে না। যেমন তিনি তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই মহান মূলনীতি সম্পর্কে মানুষকে জানাতে আদেশ করে বলেছেন:
﴿قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ188﴾
বলুন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভালো মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আমি তো আর কিছুই নই।’ [আল-আরাফ: ১৮৮] যদি সৃষ্টির সেরা ও উত্তম ব্যক্তি নবী—আলাইহিস সালাম—নিজের জন্য কোন উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা না রাখেন; আল্লাহ যা চান তা ছাড়া, তবে অন্য সৃষ্টির কী অবস্থা হবে?! এই অর্থে বহু আয়াত রয়েছে।
আর গণক, জ্যোতিষী, যাদুকর এবং তাদের মতো যারা গাইবী বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দেয় তাদের কাছে কোন বিষয় জিজ্ঞেস করা নিকৃষ্টকাজ এবং তা জায়েয নয়। তাদেরকে বিশ্বাস করা আরও কঠিন নিন্দনীয়, বরং এটি কুফরের একটি শাখা; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيءٍ؛ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ يَومًا».
“যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে আসলো এবং তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করল; তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল করা হবে না।” (সহীহ মুসলিম) সহীহ মুসলিমে আরও রয়েছে, মু’আবিয়া বিন হাকাম আস-সুলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
«أَنَّ النَّبيَّ ﷺ نَهَى عَنْ إِتْيَانِ الكُهَّانِ وَسُؤَالِهِم».
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা থেকে নিষেধ করেছেন।”
সুনান গ্রন্থকারগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন:
«مَنْ أَتَى كَاهِنًا، فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ؛ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ».
“যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসে, আর সে যা বলে তা সত্য বলে বিশ্বাস করে, তাহলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা কিছু নাযিল হয়েছে, সে যেন তা অস্বীকার করল।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে। সুতরাং মুসলমানদের কর্তব্য হলো: গণক, জ্যোতিষী এবং অন্যান্য যাদুকরদের থেকে সতর্ক থাকা, যারা গায়েবের খবর দেয় এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তা চিকিৎসার নামে হোক বা অন্য কোনো নামে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ থেকে নিষেধ করেছেন ও সতর্ক করেছেন। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়: কিছু মানুষ চিকিৎসার নামে অদৃশ্য বিষয়ের যা দাবি করে, যেমন রোগীর পাগড়ি বা রোগিণীর ওড়না শুঁকে বলা হয়: এই রোগী বা এই রোগিণী এই কাজ করেছে, অদৃশ্য বিষয়ের মধ্যে যা রোগীর পাগড়ি বা এর মতো জিনিসে কোনো প্রমাণ নেই। এর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, যাতে তারা বলে: সে চিকিৎসা এবং রোগের বিভিন্ন প্রকার ও তার কারণ সম্পর্কে জ্ঞানী। হয়তো তাদের কিছু ওষুধও দেয়, এবং কখনো কখনো আল্লাহর ইচ্ছায় তা আরোগ্য লাভ করে, ফলে তারা মনে করে যে তা তার ওষুধের কারণে হয়েছে। এবং কখনো কখনো রোগের কারণ হতে পারে কিছু জিন ও শয়তান, যারা সেই চিকিৎসার দাবিদার ব্যক্তির সেবা করে এবং তাকে কিছু অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জানায় যা তারা জানতে পারে। ফলে সে এর উপর নির্ভর করে এবং জিন ও শয়তানদের তাদের উপাসনার উপযোগী কিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করে, তাই তারা সেই রোগী থেকে সরে যায় এবং যে কষ্ট দ্বারা তাদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল তা ত্যাগ করে। এটি জিন ও শয়তান এবং যারা তাদেরকে ব্যবহার করে, তাদের সম্পর্কে একটি পরিচিত বিষয়।
মুসলমানদের জন্য আরও আবশ্যক হলো: এ থেকে সতর্ক থাকা, এবং একে পরিত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার উপর নির্ভর করা এবং সকল বিষয়ে তাঁর উপর ভরসা করা। শরিয়তসম্মত ঝাড়ফুঁক এবং হালাল ওষুধ গ্রহণে কোনো আপত্তি নেই, এবং এমন চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নেওয়া, যারা রোগীর উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এবং তার রোগ নিশ্চিত করে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও যুক্তিসঙ্গত উপায়ে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন:
«مَا أَنْزَلَ اللهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً، عَلِمَهُ مَنْ علِمه، وَجَهِلَهُ مَنْ جَهِلَهُ».
“আল্লাহ এমন কোন রোগ পাঠাননি, যার জন্য তিনি আরোগ্য বিধান নাযিল করেননি। যে সেটা জানতে পেরেছে, সে জানতে পেরেছে, আর যে জানতে পারেনি, সে অজ্ঞতার মধ্যে থেকেছে।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:
«لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فإِذَا أُصِيبَ دَوَاءٌ الدَّاءَ بََرَأَ بِإِذْنِ اللهِ».
“প্রত্যেক রোগের জন্য ঔষধ আছে, যখন সেই রোগের ঔষধ প্রয়োগ করা হয়, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় আরোগ্য লাভ হয়।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:
«عِبَادَ اللهِ، تَدَاوَوا وَلَا تَدَاوَوا بِحَرَامٍ».
“আল্লাহর বান্দারা, তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর; তবে হারাম বস্তুর মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করবে না।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
আমরা আল্লাহ -জল্লা জালালুহু- এর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সকল মুসলিমের অবস্থা সংশোধন করে দেন, তাদের হৃদয় ও দেহকে সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে আরোগ্য দান করেন, তাদেরকে হেদায়াতের উপর একত্রিত করেন, এবং আমাদেরকে ও তাদেরকে বিভ্রান্তিকর ফিতনা এবং শয়তান ও তার অনুসারীদের আনুগত্য থেকে রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান, এবং মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র সাহায্য ছাড়া কোন শক্তি ও ক্ষমতা নেই।
আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর সালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
চতুর্থ পত্র:
বিদ‘আতী ও শিরকী আওরাদ (তন্ত্র-মন্ত্র) দ্বারা ইবাদতের হুকুম
আব্দুল আজিজ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায এর পক্ষ থেকে সম্মানিত ভাই (.........) এর প্রতি, আল্লাহ তাকে সকল কল্যাণের তাওফীক দান করুন, আমীন।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
অতঃপর; আপনার গুরুত্বপূর্ণ পত্রটি আমার নিকট পৌঁছেছে, আল্লাহ আপনাকে তাঁর হিদায়াতের সাথে সংযুক্ত করুন। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আপনার দেশে কিছু লোক রয়েছে যারা এমন কিছু অযীফা পালন করে যার পক্ষে আল্লাহর নিকট থেকে কোন প্রমাণ অবতীর্ণ হয়নি। যার মধ্যে কিছু রয়েছে বিদ‘আতি এবং কিছু শিরকী। তারা এসবকে আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এবং অন্যদের সাথে সম্পৃক্ত করে। তারা যিকিরের মজলিসে বা মাগরিবের সালাতের পর মসজিদে ঐসব অযীফা পাঠ করে। তারা দাবি করে যে এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। যেমন তারা বলে: বিহাক্কিল্লাহ, রিজালাল্লাহ, আঈনুনা বিআউনিল্লাহ, ওয়া কূ-নূ আউনানা বিল্লাহ। আরো যেমন তারা বলে: ‘হে আ‘কতাবগণ, হে আসিয়াদগণ, আমাদের ব্যাপারে সাহায্যকারী আমাদের ডাকে সাড়া দাও, আল্লাহর কাছে শাফা‘আত করুন, এই আপনার দাস দাঁড়িয়ে আছে, আপনার দরজায় নিবেদিত, তার ত্রুটির জন্য ভীত, আমাদেরকে সাহায্য করুন হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য আপনারা ছাড়া আর কেউ নেই, আপনাদের পক্ষ থেকেই প্রয়োজন পূরণ হয়, আপনারাই আল্লাহর প্রিয়জন, হামযা সাইয়্যিদুশ শুহাদার মাধ্যমে, এবং আপনাদের মধ্যে কে আমাদের সাহায্যকারী, আমাদের সাহায্য করুন হে আল্লাহর রাসূল।’ অনুরূপ তাদের এ জাতীয় কথাও: “হে আল্লাহ! আপনি তার উপর রহমত বর্ষণ করুন যাকে আপনি আপনার মহিমাময় রহস্যের উন্মোচনের কারণ বানিয়েছেন এবং আপনার রহমতের আলো বিকিরণের কারণ বানিয়েছেন। ফলে তিনি হয়ে গেছেন রাব্বানী দরবারের প্রতিনিধি এবং আপনার স্বীয় রহস্যের খলিফা।”
আপনাদের আগ্রহ ছিল বিদ‘আত কি, শিরক কি তা বর্ণনা করার প্রতি এবং যে ইমাম এই দোয়া দ্বারা দোয়া করে তার পেছনে সালাত আদায় করা সহীহ কি না, এই সবকিছু জানা ছিল?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সেই ব্যক্তির উপর যার পরে কোনো নবী নেই, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর এবং কিয়ামত অবধি যারা তার হিদায়াতের পথে চলবে তাদের ওপর।
অতঃপর, জেনে রাখুন যে, -আল্লাহ আপনাকে তাওফীক দান করুন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সৃষ্টিকূলকে সৃষ্টি করেছেন এবং রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা হয়, যার কোনো শরীক নেই, এবং তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করা হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ56﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। [আয-যারিয়াত: ৫৬]
ইবাদত -যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে- হচ্ছে: আল্লাহ সুবহানাহু ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা; আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান সহকারে, আল্লাহর জন্য কাজের মধ্যে একনিষ্ঠতা সহকারে, আল্লাহর প্রতি পরম ভালোবাসা এবং একমাত্র তাঁর প্রতি পূর্ণ বিনয় সহকারে; যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ...﴾
আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে... [আল-ইসরা: ২৩] অর্থাৎ: তিনি নির্দেশ দিয়েছেন ও অসিয়ত করেছেন যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করা হয়। তিনি আরো বলেন,
﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ2 الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ3 مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ4 إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ5﴾
সকল ‘হাম্দ’ আল্লাহ্র, যিনি সৃষ্টিকুলের রব,
দয়াময়, পরম দয়ালু,
বিচার দিনের মালিক।
আমরা শুধু আপনারই ‘ইবাদাত করি, এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি, [আল-ফাতিহা: ২-৫] সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই আয়াতসমূহের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে, একমাত্র তিনিই ইবাদতের হকদার এবং একমাত্র তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। তিনি আরো বলেন,
﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ2 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ...﴾
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।
“জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য।” [আয-যুমার: ২-৩] তিনি আরো বলেন,
﴿فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ14﴾
সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [গাফির: ১৪] তিনি আরো বলেন,
﴿وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا18﴾
আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহ্র সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না। [আল-জিন: ১৮] এ বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে, যার সবগুলোই একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদাত করা আবশ্যকতার প্রমাণ করে।
এটি জানা কথা যে, দু‘আ তার বিভিন্ন প্রকারসহ ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কারো জন্য জায়েয নেই যে, সে তার রব ব্যতীত অন্য কারো কাছে দু‘আ করবে, সাহায্য চাইবে বা ফরিয়াদ করবে। এই মহিমান্বিত আয়াতসমূহ এবং এ অর্থে যা এসেছে তার উপর আমল স্বরূপ। এটি সাধারণ বিষয়াদি এবং বাহ্যিক কারণসমূহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যা জীবিত উপস্থিত মাখলুকের ক্ষমতাধীন। কেননা সেগুলো ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং দলীল ও ইজমার ভিত্তিতে জীবিত সক্ষম মানুষের নিকট সাহায্য চাওয়া বৈধ, তার ক্ষমতাধীন সাধারণ বিষয়াদির ক্ষেত্রে; যেমন তার সন্তান বা চাকর বা কুকুর ইত্যাদি বিষয়ের অনিষ্ট দূর করতে তার নিকট সাহায্য ও সহযোগিতা চাওয়া। এবং জীবিত উপস্থিত সক্ষম মানুষের নিকট সাহায্য চাওয়া, অথবা অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট বাহ্যিক কারণসমূহের মাধ্যমে যেমন পত্রালাপ ইত্যাদির মাধ্যমে তার ঘর নির্মাণে, অথবা তার গাড়ি মেরামতে, অথবা এ জাতীয় অন্যান্য বিষয়ে সাহায্য চাওয়া। তন্মধ্যে: জিহাদ ও যুদ্ধে সঙ্গীদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং অনুরূপ বিষয়। এবং এই অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হলো মূসা আলাইহিস সালামের কাহিনী সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:
﴿...فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ...﴾
অতঃপর মূসার দলের লোকটি ওর শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল [আল-কাসাস: ১৫]
অতএব, মৃত, জিন, ফিরিশতা, গাছপালা ও পাথর ইত্যাদির নিকট ফরিয়াদ করা বড় শির্কের অন্তর্ভুক্ত, যা প্রাচীন মুশরিকদের তাদের দেবতাদের যেমন: উজ্জা, লাত ও অন্যান্যদের সাথে করা কাজের সমতুল্য। তেমনি জীবিতদের মধ্যে যাদেরকে অলী মনে করা হয় তাদের নিকট এমন বিষয়ে ফরিয়াদ ও সাহায্য চাওয়া যা আল্লাহ ছাড়া কেউ করতে সক্ষম নয়; যেমন রোগীদের সুস্থতা, হৃদয়ের হিদায়াত, জান্নাতে প্রবেশ, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং অনুরূপ বিষয়।
উপরোক্ত আয়াতসমূহ এবং এ অর্থে বর্ণিত অন্যান্য আয়াত ও হাদীসসমূহ: সবগুলোই প্রমাণ করে যে, সকল বিষয়ে আল্লাহর প্রতি অন্তরকে নিবদ্ধ করা এবং একমাত্র আল্লাহর জন্যই ইবাদাত বিশুদ্ধ রাখা আবশ্যক; কারণ বান্দাদের এ জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে তাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে -যেমন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন:
﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا...﴾
আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোনো কিছুকে তাঁর শরীক করো না... [আন-নিসা: ৩৬] তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ...﴾
আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে... [আল-বায়্যিনাহ: ৫] এবং মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«حَقُّ اللهِ عَلَى العِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا».
"‘বান্দার উপর আল্লাহর হক হচ্ছে তারা তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।’ সহীহ বুখারী ও মুসলিম। ইবনে মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو لِلهِ نِدًّا؛ دَخَلَ النَّارَ».
“যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা গেল যে, সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোন শরীককে ডাকে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সহীহ বুখারী।) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তাকে বলেলেন:
«إِنَّكَ تَأْتِي قَومًا أَهْلَ كِتَابٍ، فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُم إِلَيهِ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ».
“তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ। সুতরাং তুমি তাদেরকে সর্বপ্রথম এ দাওয়াত দিবে যে, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে:
«اُدْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللهِ».
"তাদেরকে এ কথার দাওয়াত দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল।" বুখারীর অপর এক বর্ণনায় এসেছে:
«فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُم إِلَى أَنْ يُوَحِّدُوا اللهَ».
(সর্বপ্রথম যে বিষয়ে তুমি তাদেরকে দাও‘আত দিবে তা হচ্ছে: তারা যেন আল্লাহর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করে।) সহীহ মুসলিমে তারিক ইবনু আশইয়াম আল আশজায়ী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ قَالَ: لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مِن دُونِ اللهِ؛ حَرُمَ مَالُهُ وَدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللهِ جَلَّ جَلَالُهُ».
"যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলল এবং আল্লাহ ব্যতীত যার ইবাদত করা হয়, তার সাথে কুফরী করল তার জান ও মাল নিরাপদ এবং তার হিসাব আল্লাহর জিম্মায়।" এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
আর এই তাওহীদ হচ্ছে দ্বীন ইসলামের মূল, এটি হচ্ছে মিল্লাতের ভিত্তি, সকল বিষয়ের শীর্ষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরয। এটি হচ্ছে মানব ও জিন জাতি সৃষ্টির হিকমত এবং সকল রাসূলগণের প্রেরণের হিকমত, যেমন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে এ বিষয়ে প্রমাণ এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণী:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ56﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। [আয-যারিয়াত: ৫৬] এ সম্পর্কীত দলীলের মধ্যে আরও রয়েছে: আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ...﴾
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর... [আন-নাহল: ৩৬] তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ25﴾
আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমরাই ইবাদাত কর। [আল-আম্বিয়া: ২৫] আল্লাহ জাল্লা জালালুহু নূহ, হুদ, সালিহ ও শু‘আইব আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কে বলেন, তারা তাদের কওমকে বলেছিলেন:
﴿...اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ...﴾
আল্লাহ্র ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই [আল-আরাফ, আয়াত: ৫৯] আর এটাই সকল রাসূলগণের দাওয়াত, যেমন পূর্ববর্তী দুই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলদের শত্রুরাও স্বীকার করেছে যে, রাসূলগণ তাদেরকে ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্বের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদাত করা হয়, তাদেরকে বর্জন করতে বলেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা আদ জাতির কাহিনীতে উল্লেখ করেছেন যে, তারা হুদ আলাইহিস সালামকে বলেছিল:
﴿...أَجِئْتَنَا لِنَعْبُدَ اللَّهَ وَحْدَهُ وَنَذَرَ مَا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا...﴾
...তুমি কি আমাদের কাছে এ উদ্দেশ্যে এসেছ যে, আমরা যেন এক আল্লাহ্র ইবাদত করি এবং আমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদত করত তা ছেড়ে দেই... [আল-আরাফ: ৭০] মহান ও পবিত্র আল্লাহ কুরাইশদের সম্পর্কে বলেন, যখন আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছিলেন এবং তাদেরকে আল্লাহ ছাড়া সব ফেরেশতা, অলী, মূর্তি ও গাছপালা ইত্যাদি পূজা করত তা পরিত্যাগ করতে বলেছিলেন, তখন তারা বলেছিলেন:
﴿أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ5﴾
'সে কি বহু ইলাহকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? এটা তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার!' [সোয়াদ: ৫] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাদের সম্পর্কে আরো বলেন,
﴿إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ35 وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوٓاْ ءَالِهَتِنَا لِشَاعِرٖ مَّجۡنُونِۭ36﴾
তাদেরকে 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ বলা হলে তারা অহংকার করত
এবং বলত, 'আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে বর্জন করব?' [আস-সাফফাত, আয়াত: ৩৫-৩৬] এ বিষয়টি প্রমাণকারী আরো অনেক আয়াত রয়েছে।
আমরা যেসব আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করেছি তা থেকে তোমার জন্য স্পষ্ট হবে - আল্লাহ আমাকে ও তোমাকে দ্বীনের ফিকহ ও রব্বুল আলামিনের হক সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি দান করুন - যে, এই দো‘আসমূহ এবং বহু রকমের ফরিয়াদ - যা তুমি তোমার প্রশ্নে উল্লেখ করেছ - সবই বড় শিরকের প্রকারভুক্ত; কারণ এগুলো আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত এবং মৃত ও অনুপস্থিতদের নিকট এমন বিষয় প্রার্থনা করা যা কেবলমাত্র আল্লাহর ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। এটি পূর্ববর্তীদের শিরকের চেয়েও নিকৃষ্ট; কারণ পূর্ববর্তীরা কেবল স্বাচ্ছন্দ্যের সময়েই শিরক করত। তবে যখন তারা সংকটে পতিত হতো তখন তারা আল্লাহর জন্য ইবাদাতকে একনিষ্ঠ করতো। কেননা তারা জানত যে তিনিই তাদেরকে সংকট থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম, অন্য কেউ নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা তার সুস্পষ্ট কিতাবে ঐ মুশরিকদের সম্পর্কে বলেছেন:
﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ65﴾
অতঃপর তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা আনুগত্যে বিশুদ্ধ হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্কে ডাকে। তারপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়। [আল-আনকাবূত: ৬৫] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অন্য এক আয়াতে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন:
﴿وَإِذَا مَسَّكُمُ ٱلضُّرُّ فِي ٱلۡبَحۡرِ ضَلَّ مَن تَدۡعُونَ إِلَّآ إِيَّاهُۖ فَلَمَّا نَجَّىٰكُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ أَعۡرَضۡتُمۡۚ وَكَانَ ٱلۡإِنسَٰنُ كَفُورًا67﴾
আর সাগরে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ করে তখন শুধু তিনি ছাড়া অন্য যাদেরকে তোমরা ডেকে থাক তারা হারিয়ে যায়; অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। আর মানুষ খুবই অকৃতজ্ঞ। [আল-ইসরা: ৬৭]
যদি এই পরবর্তী যুগের মুশরিকদের কেউ বলে: আমরা তো উদ্দেশ্য করি না যে এরা নিজের শক্তি দ্বারা উপকার করে, আমাদের রোগ নিরাময় করে, কল্যাণ বা ক্ষতি করে, বরং আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাদের সুপারিশ কামনা করি?
উত্তর হল: তাকে বলা হবে, এটাই ছিল প্রাচীন কাফিরদের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল না যে তাদের ইলাহরা সৃষ্টি করে বা রিযিক দেয়, বা নিজেরা উপকার বা ক্ষতি করতে পারে। কারণ আল্লাহ তাদের সম্পর্কে কুরআনে যা উল্লেখ করেছেন তা এই ধারণাকে বাতিল করে দেয়। তারা তাদের সুপারিশ ও মর্যাদা চেয়েছিল, এবং আল্লাহর নিকট তারা যেন নৈকট্য এনে দেয় তা চেয়েছিল, যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ...﴾
আর তারা আল্লাহ্ ছাড়া এমন কিছুর ‘ইবাদাত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এগুলো আল্লাহ্র কাছে আমাদের সুপারিশকারী। [ইউনুস: ১৮] ফলে আল্লাহ তা‘আলা এই বাণী দ্বারা তাদের কথার প্রত্যুত্তর করেছেন:
﴿...قُلۡ أَتُنَبِّـُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ﴾
বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্কে আসমানসমূহ ও যমীনের এমন কিছুর সংবাদ দেবে যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, ‘পবিত্র এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধে। [ইউনুস: ১৮] অতঃপর তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আসমান ও যমীনে তাঁর নিকট কোনো সুপারিশকারী জানেন না, যেমনটি মুশরিকরা ধারণা করে। করে। আর আল্লাহ্ যেটির অস্তিত্ব জানেন না, তার কোনো অস্তিত্ব নেই; কারণ তাঁর কাছে কোনো কিছুই গোপন থাকে না। তিনি আরো বলেন,
﴿تَنزِيلُ ٱلۡكِتَٰبِ مِنَ ٱللَّهِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡحَكِيمِ 1 إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ2 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ3﴾
এ কিতাব পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকে নাযিল হওয়া।
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।
জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ১-৩]
এখানে দ্বীনের অর্থ হল: ইবাদত, যা হল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা -যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে-। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনা, ভয় ও আশা, কুরবানি ও মানত। এছাড়া এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: সালাত ও সিয়াম, এবং অন্যান্য যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আদেশ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা স্পষ্ট করেছেন যে, ইবাদত একমাত্র তাঁরই জন্য। আর বান্দাদের উপর তাঁর জন্য ইবাদতকে ইখলাস করা আবশ্যক; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইবাদত তাঁর জন্য ইখলাস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা এই উম্মতের সকল সদস্যের জন্য নির্দেশ।
তারপরে আল্লাহ কাফেরদের ব্যাপারে স্পষ্ট করেছেন এবং বলেছেন:
﴿...وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ...﴾
আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।' [আয-যুমার: ৩] ফলে আল্লাহু সুবহানাহু তাদের প্রতিবাদ করে বলেন:
﴿...إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ৩] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই মহিমান্বিত আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফিররা আল্লাহর পরিবর্তে অলিদের ইবাদত করে কেবল এ জন্য যে, যেন তারা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়; আর এটাই প্রাচীন ও আধুনিক কাফিরদের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা বাতিল করেছেন তাঁর এ বাণীতে:
﴿...إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ৩] আল্লাহ সুবহানাহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন: তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা যে, তাদের উপাস্যরা তাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি পৌঁছে দেবে, এবং তারা যে ইবাদত এই মিথ্যা উপাস্যদের জন্য উৎসর্গ করেছে, তা তাদের কুফরের প্রমাণ। এভাবে, যার সামান্যতম বোধশক্তি আছে সে বুঝতে পারবে যে, প্রাচীন কাফেরদের কুফরি ছিল তাদের নবী, অলী, গাছপালা, পাথর এবং অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুসমূহকে আল্লাহর সাথে তাদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করার কারণে। আর তারা বিশ্বাস করে যে তারা আল্লাহ্র অনুমতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, যেমন মন্ত্রীরা রাজাদের কাছে সুপারিশ করে। তারা আল্লাহ্কে রাজা ও নেতাদের সাথে তুলনা করে। এবং তারা বলে: যেমনভাবে রাজা ও নেতার কাছে যার কোনো প্রয়োজন থাকে, সে তার ঘনিষ্ঠজন ও মন্ত্রীদের মাধ্যমে সুপারিশ করে, তেমনিভাবে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করি তাঁর নবী ও অলীদের ইবাদতের মাধ্যমে। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কারণ আল্লাহর তাআলার কোনো সমকক্ষ নেই, এবং তাকে তাঁর কোন সৃষ্টির সাথে তুলনা করা যায় না। তাঁর কাছে কেউ সুপারিশ করতে পারে না তাঁর অনুমতি ছাড়া, এবং তিনি শুধুমাত্র তাওহীদবাদীর জন্যই অনুমতি দেন। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান ও সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞাত, তিনি সবচেয়ে দয়ালু, কারো ভয় করেন না এবং কারো থেকে ভীত নন। কারণ তিনি স্বীয় বান্দাদের ওপর সর্বশক্তিমান, এবং তাদের মধ্যে ইচ্ছামতো পরিচালনা করেন। এর বিপরীতে, দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ ও নেতারা সবকিছু করতে সক্ষম নয়। তাই তারা এমন কাউকে প্রয়োজন অনুভব করে, যারা তাদের সাহায্য করতে পারে—যেমন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সেনাবাহিনী। তারা জানে না কার কী প্রয়োজন, তাই এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন হয় যারা তাদের কাছে জনগণের চাহিদা পৌঁছে দেয়, তাদের কাছে অনুরোধ পৌঁছে দেয় ও তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু মহান রব আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সমস্ত সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি তাদের মায়েদের চেয়েও তাদের প্রতি অধিক দয়ালু। তিনি ন্যায়বিচারক, যিনি তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও ক্ষমতার আলোকে সবকিছু যথাস্থানে স্থাপন করেন। তাই কোন দিক থেকেই তাকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করা যায় না। এ কারণেই আল্লাহ স্বীয় কিতাবে স্পষ্ট করেছেন যে, মুশরিকরা স্বীকার করেছে যে, তিনিই স্রষ্টা, রিযিকদাতা ও পরিচালনাকারী এবং তিনিই বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন, কষ্ট দূর করেন, জীবন ও মৃত্যু দান করেন এবং অন্যান্য কাজ করেন। বস্তুত মুশরিকদের সাথে রাসূলদের বিরোধ ছিল একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদতকে খালেস করার ব্যাপারে, যেমন আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেছেন:
﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُ...﴾
আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ [আয-যুখরুফ: ৮৭] তিনি আরো বলেন,
﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ31﴾
বলুন, ‘কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে জীবনোপকরণ সরবারহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন এবং মৃতকে কে জীবিত হতে কে বের করেন এবং সব বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন?’ তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ্’। সুতরাং বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?’ [ইউনুস: ৩১] এই অর্থে অনেক আয়াত রয়েছে।
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে ঐ সকল আয়াত যা প্রমাণ করে যে, রাসূলগণ ও জাতিসমূহের মধ্যে বিরোধের বিষয় ছিল একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদতকে খালিস করা। যেমন তিনি বলেন:
﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَ...﴾
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর... [আন-নাহল: ৩৬] এবং এ অর্থে আরো যেসব আয়াত এসেছে। আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পবিত্র কিতাবের বহু স্থানে শাফা‘আতের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন, যেমন তিনি বলেন:
﴿...مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِ...﴾
কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? [আল-বাকারাহ: ২৫৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿وَكَم مِّن مَّلَكٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ لَا تُغۡنِي شَفَٰعَتُهُمۡ شَيۡـًٔا إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ أَن يَأۡذَنَ ٱللَّهُ لِمَن يَشَآءُ وَيَرۡضَىٰٓ26﴾
আর আসমানসমূহে বহু ফিরিশতা রয়েছে; তাদের সুপারিশ কিছুমাত্র ফলপ্রসূ হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতির পর, যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন ও যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট। [আন-নাজম: ২৬]
ফিরিশতাদের গুণাবলী সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন:
﴿...وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ وَهُم مِّنۡ خَشۡيَتِهِۦ مُشۡفِقُونَ﴾
আর তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্যই যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। [আল-আম্বিয়া: ২৮]
এবং তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের থেকে কুফর পছন্দ করেন না, বরং তিনি তাদের থেকে কৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন। আর কৃতজ্ঞতা হলো তাঁর তাওহীদ ও আনুগত্যের সাথে কাজ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿إِن تَكۡفُرُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَنِيٌّ عَنكُمۡۖ وَلَا يَرۡضَىٰ لِعِبَادِهِ ٱلۡكُفۡرَۖ وَإِن تَشۡكُرُواْ يَرۡضَهُ لَكُمۡ...﴾
যদি তোমরা কুফরী কর তবে (জেনে রাখ) আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না এবং যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তবে তিনি তোমাদের জন্য তা-ই পছন্দ করেন... [আয-যুমার: ৭]
ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার শাফাআত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে? তিনি বললেন:
«مَنْ قَالَ: لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ».
“যে ব্যক্তি খালেস দিলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে।” অথবা তিনি বলেছেন:
«مِنْ نَفْسِهِ».
“তার অন্তর থেকে।”
সহীহ বুখারীতে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا».
“প্রত্যেক নবীর জন্য এমন একটি দু’আ রয়েছে, যা গৃহীত হয়। প্রত্যেক নবী তার দু’আ দুনিয়াতে করেছেন, কিন্তু আমি আমার দু’আটিকে কিয়ামত দিবসে আমার উম্মাতের শফায়াতের জন্য রেখে দিয়েছি। আমার উম্মতের যে ব্যাক্তি কোন প্রকার শিরক না করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে ইনশাআল্লাহ আমার এ দোয়া পাবে।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
আমরা যে সমস্ত আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করেছি, তা প্রমাণ করে যে ইবাদাত একমাত্র আল্লাহরই হক এবং তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা জায়েয নয়, না নবীদের জন্য, না অন্য কারো জন্য। আর শাফাআত মহান আল্লাহর মালিকানাধীন বিষয়, যেমনটি তিনি বলেছেন:
﴿قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَٰعَةُ جَمِيعٗا...﴾
বলুন, 'সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন...' [আয-যুমার: ৪৪] আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এবং যার জন্য শাফা‘আত করা হচ্ছে তার প্রতি সন্তুষ্টি ছাড়া কেউই শাফা‘আতের উপযুক্ত নয়। আর তিনি কেবল তাওহীদেই সন্তুষ্ট হন -যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে-। কাজেই এর ভিত্তিতে: মুশরিকদের জন্য শাফাআতে কোনো অংশ নেই। আল্লাহ তা‘আলা তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেছেন:
﴿فَمَا تَنفَعُهُمۡ شَفَٰعَةُ ٱلشَّٰفِعِينَ 48﴾
ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোনো উপকার করবে না ৪৮। [আল-মুদ্দাসসির: ৪৮] তিনি আরো বলেন,
﴿...مَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ حَمِيمٖ وَلَا شَفِيعٖ يُطَاعُ﴾
যালিমদের জন্য কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং এমন কোনো সুপারিশকারীও নেই যার সুপারিশ গ্রাহ্য হবে। [গাফির: ১৮]
এবং জানা কথা যে, সাধারণভাবে জুলুম বলতে আল্লাহর সাথে শিরক করাকেই বোঝায়, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...وَٱلۡكَٰفِرُونَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ﴾
আর কাফেররাই যালিম। [আল-বাকারাহ: ২৫৪] তিনি আরো বলেন,
﴿...إِنَّ ٱلشِّرۡكَ لَظُلۡمٌ عَظِيمٞ﴾
নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম। [ সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩]
আপনি প্রশ্নে যা উল্লেখ করেছেন- যেমন কিছু সুফিরা মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে বলে থাকে: "হে আল্লাহ! তার প্রতি রহমত বর্ষণ কর যাকে তুমি তোমার প্রভুত্বের গোপন রহস্য উদঘাটনের মাধ্যম বানিয়েছ এবং তোমার রহমতের আলো বিকিরণের কারণ বানিয়েছো। ফলে সে হয়ে গেছে রাব্বানী দরবারের প্রতিনিধি এবং তোমার স্বীয় রহস্যের খলিফা... ইত্যাদি।”
উত্তর হলো: বলা যায় যে, এই কথাবার্তা ও অনুরূপ বিষয়সমূহ কৃত্রিমতা ও অতিরঞ্জনের অন্তর্ভুক্ত; যা থেকে আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন; যেমনটি মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«هَلَكَ المُتَنَطِّعُونَ» قَالَهَا ثَلَاثًا.
“সীমালঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হোক।” এটি তিনবার বলেছেন।
ইমাম খাত্তাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: মুতানাত্তি: যিনি কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত গভীরতা অনুসন্ধান করেন, কষ্টসাধন করে তার অনুসন্ধান করেন। এটি হল এমন ব্যক্তিদের মতবাদ যারা অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রবেশ করে এবং এমন বিষয়ে আলোচনা করে যা তাদের বুদ্ধি দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না।
আবু সা'দাত ইবনুল আছীর বলেন: তারা হলেন কথা অতিমাত্রায় অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করা ব্যক্তিরা, যারা তাদের কণ্ঠের গভীরতম স্থান থেকে কথা বলেন। এটি 'নাত' শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে, যা মুখের উপরের গহ্বরকে বোঝায়। পরে এটি প্রতিটি অতিরঞ্জনমূলক কথা ও কাজ করা ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
আর এই ভাষাবিদ দুই ইমাম যা উল্লেখ করেছেন, তা থেকে আপনার এবং যাদের ন্যূনতম অন্তর্দৃষ্টি আছে তাদের জন্য স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমাদের নবী ও সর্দার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত ও সালাম পেশ করার এই পদ্ধতি কৃত্রিমতা ও কঠোরতার অন্তর্ভুক্ত, যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একজন মুসলিমের জন্যে শরীয়তসম্মত হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সালাত ও সালাম পাঠের প্রমাণিত পদ্ধতি অনুসরণ করা, এবং এতে অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই।
এর মধ্যে রয়েছে: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, কা‘ব বিন উজরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আমাদেরকে আপনার উপর সালাত পাঠ করতে আদেশ করেছেন; তাহলে আমরা কিভাবে আপনার উপর সালাত পাঠ করবো? তিনি বললেন:
«قُولُوا: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ».
“তোমরা বলো:
হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদের উপর এবং মুহাম্মাদের বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদের উপর এবং মুহাম্মাদের বংশধরদের উপর বরকত দান করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের বংশধরদের উপর বরকত দান করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী।”
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুমাইদ আস-সাঈদী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তারা বললেন: হে রাসূলুল্লাহ! আমরা কিভাবে আপনার উপর সালাত প্রেরণ করব? তিনি বললেন:
«قُولُوا: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ».
“তোমরা বলো:
“হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ এবং তার স্ত্রীগণ ও সন্তানদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীমের বংশের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ এবং তার স্ত্রীগণ ও সন্তানদের উপর তেমনি বরকত দান করুন যেমনি বরকত দান করেছেন ইবরাহীমের বংশের উপর। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী।”
আর সহীহ মুসলিমে আবূ মাসউদ আনসারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, বশীর বিন সা‘দ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাদেরকে আপনার উপর সালাত পেশ করতে আদেশ করেছেন; তবে কীভাবে আপনার উপর সালাত পেশ করবো? তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন, তারপর বললেন:
«قُولُوا: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ؛ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ؛ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ فِي العَالَمِينَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَالسَّلَامُ كَمَا عَلِمتُم».
তোমরা বলো:
আর সালাম তো যেমনটি তোমরা জেনেছো।”
এই শব্দসমূহ এবং এজাতীয় অন্যান্য শব্দ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে। মুসলিমদের উচিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত ও সালাম পাঠানোর ক্ষেত্রে এগুলোই ব্যবহার করা; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে শব্দসমূহ তার জন্য উপযুক্ত সে সম্পর্কে অধিক অবগত যেমন তিনি সর্বাধিক জ্ঞানী যে শব্দসমূহ তার রবের জন্য উপযুক্ত।
পক্ষান্তরে, কৃত্রিম ও নব উদ্ভাবিত শব্দসমূহ এবং এমন শব্দসমূহ যা ভুল অর্থের সম্ভাবনা রাখে-যেমন প্রশ্নে উল্লেখিত শব্দসমূহ- সেগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়; কেননা এতে কৃত্রিমতা রয়েছে এবং সেগুলি ভুল অর্থে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। তাছাড়া এগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে শব্দসমূহ পছন্দ করেছেন এবং তার উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন তার বিপরীত, যিনি সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী, সর্বাধিক কল্যাণকামী এবং সর্বাধিক কৃত্রিমতা মুক্ত। তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বোত্তম সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।
আশা করি, আমরা যা উল্লেখ করেছি, তা তাওহীদের প্রকৃত রূপ, শিরকের প্রকৃত রূপ, এবং এই বিষয়ে প্রাচীন মুশরিকদের অবস্থা ও আধুনিক মুশরিকদের অবস্থার মধ্যে পার্থক্য, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর প্রযোজ্য সালাতের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট ও সন্তোষজনক হবে সত্যের অনুসন্ধানকারীর জন্য। পক্ষান্তরে, যার সত্য জানার ইচ্ছা নেই; সে তো তার প্রবৃত্তির অনুসারী। আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেন:
﴿فَإِن لَّمۡ يَسۡتَجِيبُواْ لَكَ فَٱعۡلَمۡ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهۡوَآءَهُمۡۚ وَمَنۡ أَضَلُّ مِمَّنِ ٱتَّبَعَ هَوَىٰهُ بِغَيۡرِ هُدٗى مِّنَ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ50﴾
তারপর তারা যদি আপনার ডাকে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবেন তারা তো শুধু নিজেদের খেয়াল-খুশীরই অনুসরণ করে। আর আল্লাহ্র পথ নির্দেশ অগ্রাহ্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার চেয়ে বেশী বিভ্রান্ত আর কে? আল্লাহ্ তো যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না। [আল-কাসাস: ৫০]
আল্লাহ সুবহানাহু এই মহিমান্বিত আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে হিদায়াত ও সত্য ধর্ম দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার ব্যাপারে মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত।
এক: আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি সাড়া প্রদানকারী।
দ্বিতীয়: সে তার প্রবৃত্তির অনুসারী; অতঃপর মহান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর হিদায়াত ছেড়ে যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউ নেই।
সুতরাং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্তি দান করেন এবং আমাদের, আপনাদের ও আমাদের সকল মুসলিম ভাইদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সাড়া দেয়ার তাওফীক দান করেন, তাঁর শরীয়তকে সম্মান করার এবং যা তাঁর শরীয়তের বিরোধী, যেমন বিদআত ও প্রবৃত্তি, তা থেকে সতর্ক থাকার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি দানশীল, মহানুভব।
আর আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসুল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবারবর্গ, সাহাবাগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত সৎভাবে তার অনুসরণকারীদের প্রতি শান্তি নাযিল করুন!
***