حِرَاسَةُ التَّوحِيدِ
তাওহীদের রক্ষণাবেক্ষণ
لِسَمَاحَةِ الشَّيْخِ العَلَّامَةِ
عَبْدِ العَزِيزِ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ بَازٍ
رَحِمَهُ اللهُ
সংকলন: মাননীয় শাইখ আল্লামা
আব্দুল ‘আযীয ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু বায রহিমাহুল্লাহ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
প্রথম পত্র:
বিশুদ্ধ আকিদা এবং এর পরিপন্থী বিষয়সমূহ
সমস্ত প্রশংসা এক আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম শেষ নবীর প্রতি, যার পরে কোনো নবী নেই এবং তার পরিবার ও সকল সাহাবীর উপর।
অতঃপর, যেহেতু বিশুদ্ধ আকীদা হলো ইসলাম ধর্মের মূল ও মিল্লাতের ভিত্তি, তাই দেখলাম এই বিষয়ে আলোচনা করা এবং এটি বয়ান ও স্পষ্ট করার জন্য লিখা ও সংকলন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআন ও সুন্নাহর শরয়ী প্রমাণ দ্বারা জানা যায়: কর্ম ও কথা তখনই বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা সঠিক বিশ্বাস থেকে প্রকাশ পায়। যদি আকীদা ভুল হয়, তাহলে তার থেকে তৈরি হওয়া সকল কর্ম ও কথা বাতিল হয়, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلۡإِيمَٰنِ فَقَدۡ حَبِطَ عَمَلُهُۥ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ﴾
আর কেউ ঈমানের সাথে কুফরী করলে তার কর্ম অবশ্যই নিস্ফল হবে এবং সে আখেরাতে ক্ষীতগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [আল-মায়েদাহ: ৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
﴿وَلَقَدۡ أُوحِيَ إِلَيۡكَ وَإِلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكَ لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ 65﴾
আর আপনার প্রতি ও আপনার পুর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, 'যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। [আয-যুমার, আয়াত: ৬৫]।
এ বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে। আল্লাহর স্পষ্ট কিতাব এবং তাঁর বিশ্বস্ত রাসূলের সুন্নাহ—তাঁর প্রতি তাঁর রবের পক্ষ থেকে সর্বোত্তম সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক— প্রমাণ করে যে সঠিক আকীদার সারমর্ম হলো: আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূলগণ, শেষ দিন এবং তাকদীরের ভালো ও মন্দের উপর ঈমান আনয়ন করা। এই ছয়টি বিষয় হল সঠিক আকীদার (বিশ্বাসের) ভিত্তি যা নিয়ে আল্লাহর সম্মানিত গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা নিয়ে আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পাঠিয়েছেন।
এই ছয়টি মূলনীতির উপর কিতাব ও সহীহ সুন্নাহতে অনেক দলীল বর্ণিত হয়েছে; উদাহরণস্বরূপ নিম্নে কয়েকটি পেশ করছি:
প্রথমত: আল্লাহর কিতাব থেকে দলীল, তন্মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿لَّيۡسَ ٱلۡبِرَّ أَن تُوَلُّواْ وُجُوهَكُمۡ قِبَلَ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ وَٱلۡكِتَٰبِ وَٱلنَّبِيِّـۧنَ...﴾
পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোই সৎকর্ম নয়, কিন্তু সৎকর্ম হলো যে ব্যক্তি আল্লাহ্, শেষ দিবস, ফেরেশ্তাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনবে। [আল-বাকারাহ: ১৭৭]
তিনি আরো বলেন,
﴿ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِ...﴾
রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহ্র উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না... [আল-বাকারাহ: ২৮৫]
তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَٰبِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا 136﴾
হে মুমিনগণ! তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি, এবং সে কিতাবের প্রতি যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন। আর সে গ্রন্থের প্রতিও যা তার পূর্বে তিনি নাযিল করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফিরিশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসের প্রতি কুফরী করে সে সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হলো। [আন-নিসা: ১৩৬]
তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ 70﴾
আপনি কি জানেন না যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন। এসবই তো আছে এক কিতাবে; নিশ্চয় তা আল্লাহ্র নিকট অতি সহজ। [আল-হজ: ৭০]
দ্বিতীয়ত: সুন্নাহ থেকে দলীল, তন্মধ্যে রয়েছে প্রসিদ্ধ সহীহ হাদীস যা ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে আমিরুল মুমেনীন উমার ইবনুল খাত্তাব -রাদিয়াল্লাহু আনহু- থেকে বর্ণনা করেছেন যে, জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন:
«الإِيمَانُ أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَاليَوْمِ الآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ».
“ঈমান হলো যে, তুমি আল্লাহর প্রতি, তাঁর মালায়েকা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, আখেরাত দিবস ও তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান আনবে।”1 হাদীস। ইমাম বুখারী ও মুসলিম সামান্য তারতম্যসহ আবূ হুরায়রা -রাদিয়াল্লাহু আনহু- থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
এগুলো থেকে একজন মুসলিমের উপর আল্লাহ তা‘আলা এবং পরকাল ও গায়েবের (অদৃশ্যের) অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে যা বিশ্বাস করা ওয়াজিব তার সবকিছু বের হয়ে আসে।
এই ছয়টি মূলনীতির বর্ণনা নিম্নরূপ:
প্রথম মূলনীতি: আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা। আর এটি কয়েকটি বিষয়কে শামিল করে, তন্মধ্যে:
এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় রয়েছে, তন্মধ্যে: এই ঈমান আনয়ন করা যে, তিনিই ইবাদতের যোগ্য সত্য ইলাহ, তিনি ছাড়া আর কেউ নন। কারণ তিনি বান্দাদের স্রষ্টা, তাদের প্রতি দয়াকারী, তাদের রিযিকের ব্যবস্থাকারী, তাদের গোপন ও প্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত। তিনি তাদের মধ্যকার আনুগত্যকারীদের পুরস্কৃত করতে ও অবাধ্যদের শাস্তি দিতে সক্ষম।
এই ইবাদতের জন্যই মানব ও জিন জাতিকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে এর আদেশ দিয়েছেন, যেমন তিনি বলেছেন:
﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ 56 مَآ أُرِيدُ مِنۡهُم مِّن رِّزۡقٖ وَمَآ أُرِيدُ أَن يُطۡعِمُونِ 57 إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلرَّزَّاقُ ذُو ٱلۡقُوَّةِ ٱلۡمَتِينُ 58﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।
আমি তাদের কাছ থেকে কোনো রিযিক চাই না এবং এটাও চাই না যে, তারা আমাকে খাওয়াবে ৫৭।
নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই তো রিযিকদাতা, প্রবল শক্তিধর, পরাক্রমশালী। [আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬-৫৮]
তিনি আরো বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ 21 ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَٰشٗا وَٱلسَّمَآءَ بِنَآءٗ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَٰتِ رِزۡقٗا لَّكُمۡۖ فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ 22﴾
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ‘ইবাদাত করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অধিকারী হও।
যিনি যমীনকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আসমানকে করেছেন ছাদ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনে-শুনে কাউকে আল্লাহ্র সমকক্ষ দাঁড় করিও না। [আল-বাকারা, আয়াত: ২১-২২]
এই সত্য ব্যাখ্যা করা ও এর প্রতি আহ্বান জানানোর জন্য এবং এর বিপরীত বিষয়গুলি হতে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَ...﴾
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর... [আন-নাহল: ৩৬]
তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ 25﴾
আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমরাই ইবাদাত কর। [আল-আম্বিয়া: ২৫]
তিনি আরও বলেন,
﴿الر كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ1 أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنَّنِي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ2﴾
আলিফ–লাম-রা, এ কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তার কাছ থেকে; যে, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের ইবাদাত করো না, নিশ্চয় আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা। [হুদ: ১-২]
এই ইবাদতের হাকীকত হলো: বান্দাগণ যেসব কথা ও কর্ম দিয়ে ইবাদত আঞ্জাম দেয়, সেগুলোআল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য একনিষ্ঠভাবে পালন করা, যেমন দোয়া, ভয়, আশা, সালাত, সিয়াম, যবেহ, মানত ও অন্যান্য সর্ব প্রকার ইবাদত। তা হতে হবে আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ বিনয়, তাঁর সওয়াব লাভের আকাঙ্ক্ষা, তাঁর শাস্তির ভয়, পরিপূর্ণ ভালোবাসা এবং তাঁর মহিমার সামনে নিজেকে বিনম্রভাবে সমর্পণের মাধ্যমে।
যে ব্যক্তি আল-কুরআনুল কারীম নিয়ে চিন্তা করবে সে দেখতে পাবে যে, তার বেশিরভাগই এই মহান নীতি বর্ণনা করে অবতীর্ণ হয়েছে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ 2 أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ3﴾
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ২-৩]
তিনি আরো বলেন,
﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ...﴾
আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে... [আল-ইসরা : ২৩]
তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿فَٱدۡعُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡكَٰفِرُونَ14﴾
সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [গাফির: ১৪]
অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নববী সুন্নাতের বিষয়ে চিন্তা করবে সে এই নীতির প্রতিও অনেক গুরুত্বারোপ দেখতে পাবে, তন্মধ্যে: দু’টি সহীহ গ্রন্থে মুয়ায -রাদিয়াল্লাহু আনহু-হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«حَقُّ اللهِ عَلَى العِبَادِ أَن يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا».
“বান্দার উপর আল্লাহর হক হচ্ছে: তারা শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।”2
আল্লাহর প্রতি ঈমানে আরও অন্তর্ভুক্ত হয়: আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর ইসলামের যে পাঁচটি প্রকাশ্য রোকন ফরজ করেছেন তার উপর ঈমান আনা।
এগুলো হলো: এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের সিয়াম রাখা এবং যারা সক্ষম তাদের জন্য আল্লাহর পবিত্র ঘরের হজ পালন করা। এবং আরও যেসব ফরয নিয়ে শরীয়ত এসেছে সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা।
এই রোকন বা স্তম্ভগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ হল এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মাবূদ (উপাস্য) নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। এই সাক্ষ্য দাবি করে ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্যই নিবিষ্ট করা এবং তিনি ছাড়া সবার জন্য তা অস্বীকার করা। এটিই হলো لا إله إلا الله কালিমার অর্থ। কারণ এর অর্থ যেমনটি আলিমগণ বলেছেন তা হল, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই। আর আল্লাহ ব্যতীত যা কিছুর ইবাদত করা হয় মানুষ বা ফেরেশতা বা জিন বা অন্য যে কোন কিছু, তারা সকলেই মিথ্যা উপাস্য; সত্য মাবূদ হলেন একমাত্র আল্লাহ, যেমন তিনি বলেছেন:
﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ...﴾
এজন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ্, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে তা তো অসত্য... [আল-হজ্জ: ৬২]
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা এই মূলনীতির জন্য দুই ধরনের সত্ত্বা - জিন ও মানবজাতি - সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন, এটি দিয়েই তাঁর রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং এটি দিয়েই তাঁর কিতাবগুলো নাযিল করেছেন। কাজেই বান্দার উচিত এটি নিয়ে ভালভাবে চিন্তা করা এবং অনেক গবেষণা করা যাতে তার কাছে স্পষ্ট হয় যে, অধিকাংশ মুসলিম এই মূলনীতি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে কত বড় মূর্খতায় পতিত হয়েছে যে, তারা আল্লাহর সাথে গায়রুল্লাহর ইবাদত পর্যন্ত করেছে এবং তাঁর একনিষ্ঠ অধিকার তাঁকে ছাড়া অন্যের জন্য উৎসর্গ করেছে। আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি।
আল্লাহর প্রতি ঈমানের আরেকটি অংশ হল, এই ঈমান আনয়ন করা যে, আল্লাহই সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা, সকল বিষয়ের পরিচালনাকারী এবং তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার দ্বারা তাদের উপর নিজ ইচ্ছামত সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী। তিনিই দুনিয়া ও আখিরাতের মালিক এবং সকল জগতের মালিক, তিনি ছাড়া কোন স্রষ্টা নেই, আর তিনি ছাড়া কোন রবও নেই। তিনি রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন বান্দাদের সংশোধন ও তাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহ্বান করার জন্য, যা তাদের ইহকাল ও পরকালে মুক্তি ও কল্যাণ বয়ে আনবে। তিনি পবিত্র এবং এসব কিছুতে তাঁর কোন শরীক নেই, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ 62﴾
আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। [আয-যুমার: ৬২]
তিনি আরো বলেন,
﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۭ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ54﴾
নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য,চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন।জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ কত বরকতময়! [আল-আরাফ: ৫৪]
আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের আরেকটি অংশ হল, মূল্যবান গ্রন্থে বর্ণিত এবং তাঁর বিশ্বস্ত রাসূল হতে প্রমাণিত তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলীর উপর ঈমান আনয়ন করা- বিকৃতি, বাতিলকরণ, আকার বয়ান ও উদাহরণ পেশ করা ছাড়াই।
﴿...لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾
কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা। [আশ-শূরা: ১১]
অতএব আল্লাহ তা‘আলার সিফাতগুলো যেভাবে এসছে কোন আকৃতি বর্ণনা করা ছাড়া সেভাবে রেখে দেওয়া ওয়াজিব। আর এগুলো যে মহান অর্থ নির্দেশ করে যা আল্লাহ সুবহানাহুর বিশেষণ তার উপর ঈমান আনয়ন করা। আরও ওয়াজিব হল সষ্টির সাথে এসব সিফাতের সাদৃশ্য বয়ান না করে যথাযথভাবে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনি আরও বলেন,
﴿فَلَا تَضۡرِبُواْ لِلَّهِ ٱلۡأَمۡثَالَۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ74﴾
কাজেই তোমরা আল্লাহ্র কোন সদৃশ স্থির করো না। নিশ্চয় আল্লাহ্ জানেন এবং তোমরা জান না। [আন-নাহাল: ৭৪]
এই হল আল্লাহর নাম ও সিফাতের বিষয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী এবং সুন্দরভাবে তাদের অনুসারী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকীদা। আর এটিই ইমাম আবুল হাসান আল-আশআরী তার " المقالات عن أصحاب الحديث وأهل السنة " (আল-মাকালাত 'আন আসহাবিল-হাদীস ওয়া আহলুস-সুন্নাহ) গ্রন্থে এবং অন্যান্য আলেমগণ বর্ণনা করেছেন।
আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমাম যুহরি ও মাকহুলকে আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কিত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বলেন: "এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবে বহাল রাখ3।
আওযায়ী রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, “আমরা এবং সকল তাবেঈ বলতাম যে, আল্লাহ তাঁর আরশে রয়েছেন এবং সুন্নাতে যেভাবে সিফাতসমূহ বর্ণিত হয়েছে সেভাবে আমরা ঈমান আনয়ন করি।”4
ওয়ালীদ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মালিক, আওযাঈ, লাইস ইবনু সাদ ও সুফিয়ান সাওরী রাহিমাহুমুল্লাহ-কে সিফাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তারা সবাই বলেন: এগুলো যেভাবে বর্ণিত হয়েছে- ধরন বর্ণনা না করে সেভাবে রেখে দাও।”5
যখন মালিকের উস্তাদ রাবিয়া ইবন আবু আবদুর রহমান রাহমাতুল্লাহি আলাইহিমাকে ইস্তিওয়া (আরশে ওঠা) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন: “ইস্তিওয়া অজানা নয় এবং ধরন বিবেকি বিষয় না, আর আল্লাহর তরফ থেকে রিসালাত এসেছে, রাসূলের দায়িত্ব তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং আমাদের দায়িত্ব তা সত্যায়ন করা”।6 যখন ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন: “ইস্তিওয়া -আরশে ওঠা- জানা আছে, কিন্তু পদ্ধতি অজানা। এতে বিশ্বাস করা ফরজ এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা একটি বিদআত। তারপর তিনি প্রশ্নকারীকে বললেন: আমি তোমাকে একজন খারাপ মানুষ ছাড়া আর কিছুই মনে করি না! তিনি তাকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।”7 এই অর্থ উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা - রাদিয়াল্লাহু আনহা - থেকেও বর্ণিত হয়েছে।8
ইমাম আবু আবদুর রহমান ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “আমরা জানি যে আমাদের রব সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক, তাঁর আসমানসমূহের উপরে তাঁর আরশে রয়েছেন”9।
এই বিষয়ে ইমামদের বক্তব্য অনেক এবং এই বক্তব্যে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যারা এই বিষয়টি অবগত হতে চান, তাদের উচিত এই বিষয়ে সুন্নি আলিমদের লেখা অধ্যয়ন করা, যেমন আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমদের "আস-সুন্নাহ", ইমাম মুহাম্মদ ইবনু খুজাইমাহ রচিত "আত-তাওহীদ", আবুল-কাসিম আল-লালাকাই আত-তাবারির "আস-সুন্নাহ", আবু বকর ইবন আবি আসিমের "আস-সুন্নাহ" এবং হামাহবাসীদের উদ্দেশ্যে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ-এর প্রদত্ত উত্তর, যা অত্যন্ত মূল্যবান ও উপকারী। এতে তিনি আহলে সুন্নাতের আকিদা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তাদের বক্তব্য থেকে অনেক উদ্ধৃতি এনেছেন এবং শরয়ী ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ দ্বারা আহলে সুন্নাতের বক্তব্যের সত্যতা এবং তাদের বিরোধীদের দাবির অসারতা প্রমাণ করেছেন।"
এইভাবে তার "আত-তাদমুরিয়া" নামক পুস্তিকায়;
তিনি বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বয়ান করেছেন এবং সুন্নিদের আকিদাকে বর্ণনাকৃত ও যুক্তিসঙ্গত প্রমাণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। আর যারা এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেছে তাদের এমনভাবে জবাব দিয়েছেন যা জ্ঞানী ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে যারা সত্য জানার আগ্রহ এবং ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে তার দিকে তাকাবে তাদের জন্য সত্যকে প্রকাশ করবে এবং মিথ্যাকে ধ্বংস করবে। সারাংশ: আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহের আকিদা হল; তারা আল্লাহর জন্য সেই জিনিসই সাব্যস্ত করেছেন যা তিনি তাঁর কিতাবে নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন, অথবা তাঁর রাসূল মুহাম্মদ - সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম - তার সুন্নাহে তাঁর জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, কোনরূপ সাদৃশ্য বয়ান করা ছাড়াই সাব্যস্ত করেন। আর তারা আল্লাহু সুবহানাহুকে তাঁর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য থেকে এমনভাবে পবিত্র ঘোষণা করেন যা (তা‘তীল) অর্থ অস্বীকার করা মুক্ত; ফলে তারা স্ববিরোধিতা থেকে সুরক্ষা লাভ করেছেন। এবং তারা সমস্ত দলিলের উপর আমল করেছেন আল্লাহর তাওফিকে। কারণ আল্লাহর রীতি হল যে সত্যকে দৃঢ়ভাবে ধরবে যা তিনি তাঁর রাসূলদের পাঠিয়েছেন এবং তাতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করবে ও তা অর্জনে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হবে, আল্লাহ তাকে এর তাওফিক দিবেন এবং তার সামনে দলিল স্পষ্ট করবেন, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿بَلۡ نَقۡذِفُ بِٱلۡحَقِّ عَلَى ٱلۡبَٰطِلِ فَيَدۡمَغُهُۥ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٞ...﴾
বরং আমরা সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়... [আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১৮]
তিনি আরো বলেন,
﴿وَلَا يَأۡتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئۡنَٰكَ بِٱلۡحَقِّ وَأَحۡسَنَ تَفۡسِيرًا33﴾
আর তারা আপনার কাছে যে বিষয়ই উপস্থিত করে না কেন, আমরা সেটার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আপনার কাছে নিয়ে আসি। [আল-ফুরকান, আয়াত: ৩৩]
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অধ্যায়ে আহলুস সুন্নাহের আকীদার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন; সে যা সাব্যস্ত করে এবং যা অস্বীকার করে সবকিছুর মধ্যে অনিবার্যভাবে বর্ণিত ও যুক্তিসঙ্গত প্রমাণের স্পষ্ট বিরোধিতায় পতিত হবে। হাফিয ইবনু কাসির- রাহিমাহুল্লাহ- এই বিষয়ে তার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থে খুব সন্দুর কথা উল্লেখ করেছেন। আর তা হল আল্লাহর নিম্নের বাণী সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে:
﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ...﴾
নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন... [আল-আরাফ: ৫৪]
মহান ফায়দার বিষয়টি বিবেচনা করে তার কথা এখানে উল্লেখ করা সঙ্গত হবে। তিনি বলেন:
এই বিষয়ে মানুষের অনেক মতামত আছে, এখানে সেগুলো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার জায়গা নয়। এই বিষয়ে আমরা আদর্শ পূর্বসূরী ইমামগণের পথ অনুসরণ করব, যেমন: ইমাম মালিক, আওযায়ী, সাওরী, লাইস ইবন সা'দ, শাফিঈ, আহমদ, ইসহাক ইবন রাহাওয়াইহ সহ পূর্ব ও পরবর্তী মুসলিম ইমামগণ। আর তা হল: আল্লাহর সিফাত যেমনভাবে এসেছে আকৃতি বয়ান, তুলনা করা ও বাতিল করা ছাড়া সেভাবে রেখে দেওয়া। মুশাব্বিহাদের মনে যে আপাত অর্থ আসে তা আল্লাহর থেকে না করা। কারণ, আল্লাহ তাঁর মাখলুকের কারো সদৃস নয়, এবং
﴿...لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾
কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা। [আশ-শূরা: ১১] বরং, বিষয়টি ইমামগণ যেমন বলেছেন তেমনই, যার মধ্যে রয়েছেন বুখারীর উস্তাদ নুয়াঈম ইবনু হাম্মাদ আল-খুজাঈ। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করল সে কুফরী করল এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ নিজেকে যা দিয়ে বিশেষিত করেছেন তা অস্বীকার করল সে কুফরী করল10, আল্লাহ নিজেকে এবং তাঁর রাসূল তাকে যা দিয়ে বিশেষিত করেছেন তাতে কোন তুলনা (সাদৃশ্য) নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি স্পষ্ট আয়াত এবং নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় প্রমাণিত বিষয়গুলিকে আল্লাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে সাব্যস্ত করে এবং আল্লাহ তা‘আলা থেকে ত্রুটিসমূহকে অস্বীকার করে সে হেদায়াতের পথ অনুসরণ করল11। এখানে ইবনু কাসীরের কথা শেষ হল।
আল্লাহর প্রতি ঈমানের মধ্যে আরও রয়েছে: এই বিশ্বাস করা যে, ঈমান হলো কথা ও আমলে সমন্বয়, যা সৎকাজের সাথে বৃদ্ধি পায় এবং পাপের সাথে হ্রাস পায়। আর শিরক ও কুফরের চেয়ে ছোট পাপের জন্য কোন মুসলিমকে কাফের ঘোষণা করা জায়েয নয়; যেমন ব্যভিচার, চুরি, সুদ, মদ্যপান, পিতামাতার অবাধ্যতা এবং অন্যান্য কবীরা গোনাহ, যদি না সেগুলো জায়েজ বলে করে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُ...﴾
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না; আর তার থেকে ছোট যাবতীয় গোনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন... [আন-নিসা: ৪৮] এবং যেহেতু এটি আল্লাহর রাসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুতাওয়াতির হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে - যার মধ্যে তার এই উক্তিও রয়েছে:
«إِنَّ اللهَ يُخْرِجُ مِنَ النَّارِ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيْمَانٍ».
“যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান থাকবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন।”12
দ্বিতীয় মূলনীতি: ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান, যার মধ্যে দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
এর মধ্যে দুটি জিনিস অন্তর্ভুক্ত: প্রথম বিষয়: সংক্ষিপ্তভাবে ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনা; এটি এইভাবে যে, আমরা বিশ্বাস করব আল্লাহর এমন ফেরেশতা আছে যাদের তিনি তাঁর আনুগত্য করার জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের বিশেষণ বর্ণনা করে বলেছেন যে:
﴿وَقَالُواْ ٱتَّخَذَ ٱلرَّحۡمَٰنُ وَلَدٗاۗ سُبۡحَٰنَهُۥۚ بَلۡ عِبَادٞ مُّكۡرَمُونَ 26 لَا يَسۡبِقُونَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ وَهُم بِأَمۡرِهِۦ يَعۡمَلُونَ27 يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ وَهُم مِّنۡ خَشۡيَتِهِۦ مُشۡفِقُونَ28﴾
আর তারা বলে, ‘দয়াময় (আল্লাহ্) সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ তিনি পবিত্র মহান! তারা তো তাঁর সম্মানিত বান্দা।
তারা তাঁর আগে বেড়ে কথা বলে না; তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে।
তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা সবই তিনি জানেন। আর তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্যই যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। [আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৬-২৮]
তারা অনেক প্রকারের; তাদের মধ্যে কেউ আরশ বহনের দায়িত্বপ্রাপ্ত; কেউ জান্নাত ও জাহান্নামের দায়িত্বপ্রাপ্ত; কেউ বান্দাদের আমল সংরক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। দ্বিতীয় বিষয়: বিস্তারিতভাবে ফেরেশতাদের উপর ঈমান আনা। আর তা হল: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের প্রতি আমরা ঈমান আনবো, যেমন ওহীর দায়িত্বপ্রাপ্ত জিব্রাইল, বৃষ্টির দায়িত্বপ্রাপ্ত মীকাইল, জাহান্নামের দায়িত্বপ্রাপ্ত মালিক এবং শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইসরাফিল। যেমনভাবে সহীহ হাদীসসমূহে তাদের উল্লেখ এসেছে। তন্মধ্যে সহীহ হাদীসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে প্রমাণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«خُلِقَتِ الـمَلَائِكَةُ مِن نُورٍ، وَخُلِقَ الجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ، وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُم».
“ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে আর জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াবিহিন অগ্নিশিখা হতে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্তু হতে যে সম্পর্কে তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে”।13 মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
তৃতীয় মুলনীতি: কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, যার মধ্যে দু’টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:
প্রথম বিষয়: সংক্ষিপ্তভাবে কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনা। আর তা হল: আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী ও রাসূলদের উপর অনেক কিতাব নাযিল করেছেন তাঁর হক বয়ান ও তাঁর দিকে আহ্বান করার জন্য, যেমন তিনি বলেছেন:
﴿لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا رُسُلَنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ وَأَنزَلۡنَا مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡمِيزَانَ لِيَقُومَ ٱلنَّاسُ بِٱلۡقِسۡطِ...﴾
অবশ্যই আমরা আমাদের রাসূলগণকে পাঠিয়েছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়ের পাল্লা, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্টা করে... [আল-হাদীদ: ২৫] তিনি আরো বলেন,
﴿كَانَ ٱلنَّاسُ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ فَبَعَثَ ٱللَّهُ ٱلنَّبِيِّـۧنَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ فِيمَا ٱخۡتَلَفُواْ فِيهِ...﴾
সমস্ত মানুষ ছিল একই উম্মত। অতঃপর আল্লাহ্ নবীগণকে প্রেরণ করেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং তাদের সাথে সত্যসহ কিতাব নাযিল করেন যাতে মানুষেরা যে বিষয়ে মতভেদ করত সে সবের মীমাংসা করতে পারেন... [আল-বাকারাহ: ২১৩]
দ্বিতীয় বিষয়:বিস্তারিতভাবে কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনা। আর তা হল: আল্লাহ যেসব কিতাবের নাম উল্লেখ করেছেন তার উপর ঈমান আনা, যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল, যবুর এবং কুরআন। আমরা বিশ্বাস করি যে, কুরআন হল এগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম, সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব। এই কিতাব এগুলোর উপর সাক্ষী ও সত্যারোপকারী। সমগ্র জাতির উপর এই কিতাব এবং এর সাথে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতে যা প্রমাণিত হয়েছে তার অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মদ - সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সমগ্র মানব ও জিন জাতির জন্য রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাঁর উপর এই কুরআন নাযিল করেছেন যেন এর দ্বারা তিনি বিচার করেন। এটিই অন্তরের সমস্যার জন্য নিরাময় এবং সবকিছুর স্পষ্টীকরণ, মুমিনদের জন্য পথনির্দেশনা ও রহমত স্বরূপ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿وَهَٰذَا كِتَٰبٌ أَنزَلۡنَٰهُ مُبَارَكٞ فَٱتَّبِعُوهُ وَٱتَّقُواْ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ155﴾
আর এ কিতাব, যা আমরা নাযিল করেছি – বরকতময়। কাজেই তোমারা তার অনুসরণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও। [আল-আনআম: ১৫৫] তিনি আরো বলেছেন:
﴿...وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُسۡلِمِينَ﴾
আর আমরা আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ, পথনির্দেশ, দয়া ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [আন-নাহল: ৮৯] তিনি আরো বলেন,
﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا ٱلَّذِي لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحۡيِۦ وَيُمِيتُۖ فَـَٔامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِ ٱلنَّبِيِّ ٱلۡأُمِّيِّ ٱلَّذِي يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَٱتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ158﴾
বলুন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই; তিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহ্র প্রতি ও তাঁর রাসূল উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।’ [আল-আরাফ: ১৫৮] এই অর্থে আরও অনেক আয়াত রয়েছে।
চতুর্থ মূলনীতি: রাসূলগণের প্রতি ঈমান
এর মধ্যে দুটি জিনিস অন্তর্ভুক্ত: প্রথম বিষয়: রাসূলগণের প্রতি সংক্ষেপে ঈমান আনা; আর তা হলো, আমরা বিশ্বাস করবো যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর বান্দাদের নিকট সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী এবং সত্যের দিকে আহ্বানকারী রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। যে তাদের ডাকে সাড়া দেবে সে সফল হবে, আর যে তাদের বিরোধিতা করবে সে হতাশ ও অনুতপ্ত হবে। তাদের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বোত্তম হলেন আমাদের নবী মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু বলেছেন:
﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَ...﴾
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর... [আন-নাহল: ৩৬] তিনি আরো বলেন,
﴿رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِ...﴾
সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে... [আন-নিসা: ১৬৫] তিনি আরো বলেন,
﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّـۧنَ...﴾
মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী... [আল-আযাব: ৪০]
দ্বিতীয় বিষয়: বিস্তারিতভাবে রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনা। আর তা হলো, আল্লাহ বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের প্রতি বিস্তারিতভাবে এবং নির্দিষ্টভাবে ঈমান আনা; যেমন নূহ, হুদ, সালিহ, ইবরাহীম এবং অন্যান্যরা, আল্লাহ তাদের উপর ও তাদের পরিবার এবং অনুসারীদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।
পঞ্চম মূলনীতি: আখিরাতের প্রতি ঈমান আনা
এর মধ্যে রয়েছে:
মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পর যা কিছু ঘটবে বলে সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা; যেমন কবরের ফিতনা, আযাব ও নিয়ামত এবং কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতা ও কষ্ট, সিরাত, মিযান, হিসাব, পুরস্কার এবং মানুষের মধ্যে আমলনামা ছড়িয়ে দেওয়া। তারপর কেউ তার ডান হাতে আমলনামা নেবে আর কেউ বাম হাতে অথবা পিছন থেকে আমলনামা নেবে।
এর অন্তর্ভুক্ত আরো বিষয় হলো: আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য প্রতিশ্রুত হাউজের প্রতি ঈমান, জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতি ঈমান, আর মুমিনদের তাদের সম্মানিত রবের দর্শন লাভ, তাদের সাথে তাঁর কথা বলা ইত্যাদি সহ যা আল-কুরআনুল কারীম ও রাসূল- সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ সুন্নাহে বর্ণিত হয়েছে সেসবের প্রতি ঈমান রাখা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাখ্যা অনুসারে তা বিশ্বাস করা ওয়াজিব।
ষষ্ঠ মূলনীতি: তাকদীরের প্রতি ঈমান
তাকদীরের উপর ঈমান চারটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে:
প্রথম বিষয়: এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা জানেন কী ছিল এবং কী হবে। তিনি তাঁর বান্দাদের অবস্থা, তাদের রিযিক, আয়ুষ্কাল, কর্ম এবং তাদের অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জানেন। এর কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই, তিনি পবিত্র ও মহান। যেমন তিনি বলেছেন:
﴿...وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ﴾
আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সব কিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ। [আল-বাকারাহ: ২৩১] তিনি আরও বলেন,
﴿...لِتَعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٞ وَأَنَّ ٱللَّهَ قَدۡ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عِلۡمَۢا﴾
... যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং জ্ঞানে আল্লাহ্ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন। [আত-তালাক: ১২]
দ্বিতীয় বিষয়: ঈমান আনা যে, আল্লাহ যা নির্ধারণ ও ফয়সালা করেছেন তা সবই তিনি লিখে রেখেছেন; যেমন তিনি বলেছেন:
﴿قَدۡ عَلِمۡنَا مَا تَنقُصُ ٱلۡأَرۡضُ مِنۡهُمۡۖ وَعِندَنَا كِتَٰبٌ حَفِيظُۢ 4﴾
অবশ্যই আমরা জানি মাটি ক্ষয় করে তাদের কতটুকু এবং আমাদের কাছে আছে সম্যক সংরক্ষণকারী কিতাব। [সূরা কাফ: ৪] তিনি আরো বলেন,
﴿...وَكُلَّ شَيۡءٍ أَحۡصَيۡنَٰهُ فِيٓ إِمَامٖ مُّبِينٖ﴾
আর আমরা প্রত্যেক জিনিস স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি [ইয়াসিন, আয়াত: ১২] তিনি আরো বলেন,
﴿أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ70﴾
আপনি কি জানেন না যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন। এসবই তো আছে এক কিতাবে; নিশ্চয় তা আল্লাহ্র নিকট অতি সহজ। [আল-হজ: ৭০]
তৃতীয় বিষয়: আল্লাহ তা‘আলার কার্যকর ইচ্ছার প্রতি ঈমান। কারণ তিনি যা চান তা হবে এবং যা চান না তা হবে না, যেমন আল্লাহ বলেছেন:
﴿...إِنَّ ٱللَّهَ يَفۡعَلُ مَا يَشَآءُ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ্ যা ইচ্ছে তা করেন। [আল-হাজ্জ: ১৮] তিনি আরও বলেন,
﴿إِنَّمَآ أَمۡرُهُۥٓ إِذَآ أَرَادَ شَيۡـًٔا أَن يَقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ82﴾
তাঁর ব্যাপার শুধু এই যে, তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছে করেন, তিনি বলেন, 'হও', ফলে তা হয়ে যায়। [ইয়াসীন: ৮২] তিনি আরো বলেছেন:
﴿وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ29﴾
আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন। [সূরা আত-তাকওয়ীর: ২৯]
চতুর্থ বিষয়: এ বিষয়ে ঈমান আনা যে, আল্লাহ তা‘আলা সকল সৃষ্টির স্রষ্টা; তিনি ব্যতীত অন্য কোন স্রষ্টা নেই এবং তিনি ব্যতীত অন্য কোন রব নেই; যেমন তিনি বলেছেন:
﴿ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَيۡءٖۖ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ وَكِيلٞ62﴾
আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। [আয-যুমার: ৬২] তিনি আরো বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ عَلَيۡكُمۡۚ هَلۡ مِنۡ خَٰلِقٍ غَيۡرُ ٱللَّهِ يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ فَأَنَّىٰ تُؤۡفَكُونَ3﴾
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্বরণ কর। আল্লাহ্ ছাড়া কি কোনো স্রষ্টা আছে, যে তোমাদেরকে আসমানসমূহ ও যমীন থেকে রিযিক দান করে? আল্লাহ্ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। কাজেই তোমাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে? [ফাতির: ৩]
কাজেই তাকদীরের প্রতি ঈমান এই চারটি বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকীদা, আর এর বিপরীতে যারা বিদআতী তারা এর কিছু অংশ অস্বীকার করেছে।
আহলুস সুন্নাহর বিশুদ্ধ আকীদার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল: আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য ঘৃণা করা, আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব করা এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা করা। এটি হল: الولاء والبراء-এর আকীদা, যা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং মুমিন মুমিনদের ভালোবাসে ও তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে এবং কাফেরদের ঘৃণা করে ও তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। এই উম্মতের মুমিনদের শীর্ষে আছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ, যেমনটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের নিকট প্রতিষ্ঠিত। তারা তাদেরকে ভালোবাসেন, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করেন এবং বিশ্বাস করেন যে নবীদের পরে তারাই সর্বোত্তম মানুষ, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«خَيْرُ القُرُونِ قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُم».
“সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ হচ্ছে আমার যুগ। অতঃপর এর পরবর্তী যুগ। অতঃপর এর পরবর্তী যুগ”14 সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন: আবু বকর সিদ্দিক, তারপর উমর ফারুক, তারপর উসমান যুন-নূরাইন, তারপর আলী মুরতাযা - রাদিয়াল্লাহু আনহুম -। তাদের পরে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের অবশিষ্টরা, তারপর অন্যান্য সাহাবীগণ। তারা সাহাবীদের মধ্যে কী ঘটেছিল তা নিয়ে আলোচনা করা থেকে বিরত থাকে এবং বিশ্বাস করে যে তারা এই বিষয়ে মুজতাহিদ ছিলেন, যে সঠিক তার জন্য দুটি সাওয়াব রয়েছে এবং যে ভুল করেছে তার একটি সওয়াব।
তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহলে বাইতের মুমিনদেরকে ভালোবাসে, তাদের মিত্র হিসেবে গ্রহণ করে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ উম্মুল মুমিনীনদের পক্ষাবলম্বন করে ও তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। তারা রাফেযীদের পথকে অস্বীকার করে, যারা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের ঘৃণা করে, অভিশাপ দেয় এবং নবীর পরিবারের প্রতি সীমালঙ্ঘন করে ও তাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদার চেয়েও উপরে তুলে ধরে। অনুরূপভাবে তারা কথা বা কাজের মাধ্যমে নবীর পরিবারকে কষ্ট দেয় এমন নওয়াসিবদের পথও পরিহার করে।
এসব যা আমরা উল্লেখ করেছি: সবই সেই সঠিক আকীদার অন্তর্ভুক্ত যা দিয়ে আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়েছেন। এটি হল সেই আকীদা যা বিশ্বাস করা, মেনে চলা ও যার উপর স্থির থাকা এবং যার বিপরীত বিষয় এড়িয়ে চলা ওয়াজিব। এটি হল মুক্তিপ্রাপ্ত দল, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশ্বাস, যার সম্পর্কে নবী - সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম - বলেছেন:
«لَا تَـزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الحَقِّ، لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ، حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ كَذَلِكَ».
“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং যারা তাদের অপদস্ত করবে তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি এভাবে আল্লাহর আদেশ (অর্থাৎ কিয়ামত) এসে পড়বে আর তারা তেমনই থাকবে।"15 অন্য বর্ণনায় এসেছে:
«لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الحَقِّ مَنْصُورَةٌ».
“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্যের উপর বিজয়ী হতে থাকবে"16 নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম আরো বলেছেন:
«افْتَرَقَتِ اليَهُودُ عَلَى إِحْدَى وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، وَافْتَرَقَتِ النَّصَارَى عَلَى اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، وَسَتَفْتَرِقُ هَذِهِ الأُمَّةُ عَلَى ثَلَاثِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً فَقَالَ الصَّحَابَةُ: مَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: مَنْ كَانَ عَلَى مِثْلِ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي».
“ইহুদীরা একাত্তরটি ফিরকাতে বিভক্ত হয়েছে, নাসারাগণ বাহাত্তরটি ফিরকাতে বিভক্ত হয়েছে, আর অচিরেই এই উম্মাত তিহাত্তরটি ফিরকাতে বিভক্ত হবে। তাদের একটি ছাড়া সকলেই জাহান্নামী। সাহাবীগণ বললেন: তারা কারা হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন: যারা আমি এবং আমার সাহাবাগণ যার উপরে রয়েছে তার উপরে থাকবে”17
বিশুদ্ধ আকীদার পরিপন্থী আকীদাসমূহ
যারা এই আকীদা থেকে বিচ্যুত এবং যারা এর বিপরীত মেরুতে চলমান; তারা অনেক প্রকার; তাদের মধ্যে মূর্তি, দেবদেবি, ফেরেশতা, ওলী, জিন, গাছ, পাথর এবং অন্যান্যদের পূজারী রয়েছে। এসব লোকেরা রাসূলদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি, বরং তাদের বিরোধিতা করেছে এবং তাদের অমান্য করেছে, যেমন কুরাইশ ও বিভিন্ন প্রকার আরব আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে করেছিল। তারা তাদের দেবতাদের কাছে তাদের চাহিদা পূরণ, অসুস্থদের সুস্থতা এবং তাদের শত্রুদের উপর বিজয় দান করার জন্য প্রার্থনা করত। তারা তাদের জন্য জবাই করত ও মান্নত করত। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিন্দা করলেন এবং তাদের ইবাদতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার নির্দেশ দিলেন, তখন তারা এতে অবাক হয়েছিল এবং তা অস্বীকার করেছিল। তারা বলেছিল:
﴿أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ5﴾
'সে কি বহু ইলাহকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? এটা তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার!' [ সূরা সোয়াদ: ৫]
তিনি - সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম - তাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকতে থাকেন, শিরকবাদের বিরুদ্ধে সতর্ক করতে থাকেন এবং তাদেরকে যার দিকে আহ্বান করছিলেন তাদের সামনে এর হাকীকত ব্যাখ্যা করতে থাকেন। অবশেষে আল্লাহ তাদের কিছু লোককে হেদায়েত দেন। তারপর তারা দলে দলে আল্লাহর ধর্মে প্রবেশ করেন, ফলে আল্লাহর রাসূল - সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম - এবং তার সাহাবীদের - রাদিয়াল্লাহু আনহুম - এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছিলেন তাদের ধারাবাহিক আহ্বান এবং দীর্ঘ সংগ্রামের পর আল্লাহর ধর্ম অন্যান্য সমস্ত ধর্মের উপর বিজয়ী হয়। এরপর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয় এবং সৃষ্টির অধিকাংশের উপর অজ্ঞতা প্রাধান্য পায়, ফলে তাদের অধিকাংশই নবী ও অলীদের সম্পর্কে অতিরঞ্জিত করে, তাদেরকে ডাকতে থাকে, তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং অন্যান্য ধরণের শিরকবাদের মাধ্যমে জাহিলি ধর্মে ফিরে যায়। তারা আরব কাফেরদের ন্যায় لا إله إلا الله তথা আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই- এর অর্থ পর্যন্ত জানল না! আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী।
এই শিরক আজ পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে; অজ্ঞতার বিস্তার এবং নবুয়তের যুগ থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির কারণে।
এই পরবর্তীদের ধারণা মূলত পূর্ববর্তীদের ধারণার মতোই, যা হল তাদের এই বক্তব্য:
﴿...هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ...﴾
এগুলো আল্লাহ্র কাছে আমাদের সুপারিশকারী। [ইউনুস: ১৮] এবং তাদের বাণী:
﴿...مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ...﴾
আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে [আয-যুমার: ৩] আল্লাহ এই ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছেন এবং বর্ণনা করেছেন, যে কেউ তাঁর পরিবর্তে অন্য কারো ইবাদত করে, সে শিরক এবং কুফর করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ...﴾
আর তারা আল্লাহ্ ছাড়া এমন কিছুর ‘ইবাদাত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এগুলো আল্লাহ্র কাছে আমাদের সুপারিশকারী। [সূরা ইউনুস: ১৮] আল্লাহু সুবহানাহু তাদের প্রতিবাদ করে বলেন:
﴿قُلۡ أَتُنَبِّـُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ18﴾
বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্কে আসমানসমূহ ও যমীনের এমন কিছুর সংবাদ দেবে যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, ‘পবিত্র এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধে। [সূরা ইউনুস: ১৮]
সুতরাং, আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তাঁকে ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করা, যেমন নবী, ওলী, অথবা অন্য কারো উপাসনা করা শিরকের সবচেয়ে বড় রূপ, যদিও যারা এটি করে তারা তা অন্য কিছু নামকরণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿...وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ...﴾
আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ [আয-যুমার: ৩] তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের কথার প্রত্যুত্তর করেছেন এই বাণী দ্বারা:
﴿...إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ৩]
এভাবে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন যে, প্রার্থনা, ভয়, আশা ইত্যাদির মাধ্যমে তিনি ছাড়া অন্য কারো উপাসনা করা তাঁর প্রতি কুফরির শামিল। আর তিনি তাদের এই কথায় তাদেরকে মিথ্যাবাদী করে দিলেন যে, তাদের উপাস্যরা তাদেরকে তাঁর নিকটবর্তী করবে।
অনুরুপভাবে যেসব কুফরি আকীদা সহীহ আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক এবং রাসূলদের আনীত বিষয়ের বিপরীত, তার মধ্যে রয়েছে আধুনিক যুগের নাস্তিকদের বিশ্বাস, যারা মার্কস, লেনিন এবং অন্যান্য নাস্তিকতা ও কুফরের প্রচারকদের অনুসরণ করে।তারা এটিকে সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, বার্থবাদ, অথবা অন্য যেকোনো নামে ডাকুক না কেন। কারণ এই নাস্তিকদের নীতির মধ্যে রয়েছে যে, কোন ইলাহ নেই এবং জীবন কেবল বস্তুগত বিষয়।
তাদের নীতিগুলির মধ্যে রয়েছে পরকাল, জান্নাত ও জাহান্নামকে অস্বীকার করা এবং সকল ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস। যে কেউ তাদের বইগুলি দেখবে এবং তারা কীসের উপর আছে তা অধ্যয়ন করবে সে নিশ্চিতভাবে তাদের কুফরী সম্পর্কে জানতে পারবে। কোন সন্দেহ নেই যে এই অবিশ্বাস সমস্ত আসমানী ধর্মের পরিপন্থী এবং এটি তার অনুসারীদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে সবচেয়ে খারাপ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
হকের বিপরীত আকীদাগুলোর মধ্যে রয়েছে যা কিছু সুফি বিশ্বাস করে যে, যাদের তারা অলি বলে ডাকে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে জগতের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে অংশীদার! আর তারা তাদের আকতাব, আওতাদ, আগওয়াস প্রভৃতি নামকরণ করে যেসব নাম তারা তাদের দেবতাদের জন্য উদ্ভাবন করেছে। এটি রুবুবিয়্যাতে শিরকের একটি রূপ এবং এটি আল্লাহর সাথে শিরকের সবচেয়ে জঘণ্য রূপগুলির একটি।
যে ব্যক্তি পূর্ববর্তী জাহেলি যুগের লোকদের শির্কের দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করবে এবং তা পরবর্তী যুগের শির্কের সাথে তুলনা করবে, সে দেখতে পাবে যে পরবর্তী যুগের শির্ক আরো বড় ও ভয়াবহ। এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ: জাহিলি যুগের আরবের কাফিররা দুটি বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা ছিল: প্রথম বিষয়: তারা রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে শরীক করত না, বরং তাদের শিরক ছিল ইবাদতের ক্ষেত্রে; কেননা তারা আল্লাহ্র রুবুবিয়্যাতকে স্বীকার করত, যেমন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُ...﴾
আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ [আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮৭] আল্লাহ তা‘য়ালা আরো বলেন:
﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ31﴾
বলুন, ‘কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে জীবনোপকরণ সরবারহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন এবং মৃতকে কে জীবিত হতে কে বের করেন এবং সব বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন?’ তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ্’। সুতরাং বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?’ [ইউনুস: ৩১] এই অর্থে অসংখ্য আয়াত রয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে: তাদের ইবাদতে শিরক সর্বদা ছিল না, বরং তা ঘটত স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে। কিন্তু সংকটের সময়ে তারা আল্লাহর জন্য ইবাদতকে একনিষ্ঠ করত, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ65﴾
অতঃপর তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা আনুগত্যে বিশুদ্ধ হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্কে ডাকে। তারপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়। [আল-আনকাবূত: ৬৫]
কিন্তু পরবর্তী যুগের মুশরিকরা দুই দিক থেকে পূর্ববর্তীদের চেয়ে অগ্রগামী হয়েছে: প্রথম দিকঃ তাদের মধ্যে কিছু লোকের রুবুবিয়্যাতে শিরকে লিপ্ত হওয়া। দ্বিতীয় দিক: তাদের শিরক সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থায়, যা তাদের সাথে মিশে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে জানা যায়। যেমন মিশরে হুসাইন ও বাদাওয়ীর কবরের কাছে, আদেনে ঈদরুসের কবরের কাছে, ইয়েমেনে হাদীর কবরের কাছে, শামে ইবনে আরাবীর কবরের কাছে, ইরাকে শেখ আব্দুল কাদের জিলানির কবরের কাছে এবং অন্যান্য প্রসিদ্ধ কবরগুলোর সামনে সাধারণ মানুষ যেভাবে বাড়াবাড়ি করছে এবং আল্লাহর একান্ত অধিকার থেকে অনেক কিছু তাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত করেছে, তা স্পষ্ট শিরক। খুব কম লোকই তাদের এই কাজের বিরোধিতা করে এবং তাদেরকে সেই তাওহীদের প্রকৃত সত্যটি বোঝায়, যা আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পূর্ববর্তী সকল রাসূলের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন!!
সহীহ আকীদার বিপরীত বিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে নাম ও সিফাতের ক্ষেত্রে বিদ‘আতীদের আকীদা। যেমন জাহমিয়া, মু‘তাযিলা এবং যারা তাদের পথ অনুসরণ করে তারা আল্লাহর সিফাতসমূহ অস্বীকার করে এবং আল্লাহর জন্য উল্লেখিত পূর্ণতার সিফাতকে অকার্যকর করে দেয়। তারা আল্লাহকে এমন গুণে বর্ণনা করে যা অস্তিত্বহীন, জড়বস্তু এবং অসম্ভবের গুণ। আল্লাহ তাদের কথার ঊর্ধ্বে মহান।
এর অন্তর্ভুক্ত হয়: যারা কতক সিফাতকে অস্বীকার করে এবং কতক সিফাতকে সাব্যস্ত করে; যেমন আশআরীদের আকীদা। তারা যে গুণগুলো স্বীকার করেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে তাদের সেই একই নীতিকে মেনে চলা উচিত ছিল, যা তারা অস্বীকৃত গুণগুলোর ক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু তারা এর পরিবর্তে প্রমাণগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করেছে এবং তারা শ্রুতিগত ও বিবেকগত উভয় দলিলের বিরোধিতা করেছে। ফলে, তাদের এই বিশ্বাসে স্পষ্ট স্ববিরোধিতা রয়েছে।
পক্ষান্তরে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য তাই সাব্যস্ত করে যা তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন অথবা তাঁর রাসূল মুহাম্মদ - সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম - তাঁর জন্য যেসব নাম ও সিফাতসমূহ সাব্যস্ত করেছেন। আর তারা আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়া থেকে পবিত্র রেখেছেন এমনভাবে, যা তাঁর গুণাবলী অস্বীকার থেকে মুক্ত। ফলে, তারা সমস্ত দলীলের উপর আমল করেছেন, বিকৃতি করেননি ও অস্বীকার করেননি, এবং তারা সেই স্ববিরোধিতা থেকে নিরাপদ থেকেছেন যা অন্যদের মধ্যে ঘটেছে - যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
এটাই দুনিয়া ও আখিরাতে নাজাত ও সুখের পথ, এবং এটাই সরল পথ যা এই উম্মাতের পূর্বসূরী ও ইমামগণ অনুসরণ করেছেন। তাদের প্রথমভাগের সংশোধন যেভাবে সম্ভব হয়েছে, তাদের শেষভাগের সংশোধনও কেবল সেভাবেই সম্ভব হবে, আর তা হলো কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ এবং যা এদুটির বিরোধিতা করে তা পরিত্যাগ করা। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন উম্মাহকে তার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন, তাদের মধ্যে হেদায়াতের আহ্বানকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেন এবং তাদের নেতৃবৃন্দ ও আলিমদেরকে শিরকের বিরুদ্ধে লড়াই করার, তা নির্মূল করার ও এগুলোর মাধ্যম থেকে সতর্ক করার তৌফিক দান করেন... নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন এবং অতি সন্নিকটে। আল্লাহই তাওফীক দাতা, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক। বস্তুত তাঁর শক্তি ও তাওফিক ছাড়া ভালো কাজ করার ক্ষমতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার কোনো সাধ্য নেই। আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবার পরিজন এবং সাহাবীদের ওপর।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
দ্বিতীয় পত্র: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বিপদে সাহায্য চাওয়ার হুকুম সম্পর্কে
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম আল্লাহর রাসূল-এর ওপর, তার পরিবার, সহচরবর্গ এবং যারা তার পথ অনুসরণ করে তাদের ওপর।
অতঃপর, কুয়েতের আল-মুজতামা পত্রিকা তাদের ১৫তম সংখ্যায়, যা ১৯/৪/১৩৯০ হিজরিতে প্রকাশিত হয়েছিল, "পবিত্র মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষে স্মরণিকা" শিরোনামে কিছু কবিতা প্রকাশ করেছিল। এই কবিতাগুলোতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণ, বিজয় এবং বিভক্তি ও মতানৈক্য থেকে মুক্তির জন্য তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছিল। এগুলো "আমিনা" ছদ্মনামে লিখিত হয়েছিল। উক্ত কবিতার কিছু অংশ হলো:
হে আল্লাহর রাসূল! বিশ্বকে রক্ষা করুন... যেখানে যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিত হয় এবং তার শিখায় দগ্ধ হয়।
হে আল্লাহর রাসূল! উম্মতকে রক্ষা করুন... সন্দেহের অন্ধকারে তাদের পথ দীর্ঘ হয়েছে।
হে আল্লাহর রাসূল! উম্মতকে রক্ষা করুন... দুঃখের গোলকধাঁধায় তাদের উজ্জ্বলতা হারিয়ে গেছে।
এমনকি লেখিকা আরো বলেছে:
দ্রুত সাহায্য করুন যেমনি দ্রুত তা করেছিলেন... বদরের দিনে যখন আপনি আল্লাহকে আহবান করেছিলেন,
ফলে, দূর্বলরা রূপান্তরিত হলো চমৎকার বিজয়ীরূপে... নিশ্চয়ই আল্লাহর এমন বাহিনী রয়েছে যা আপনি দেখতে পান না।
(এইভাবে এই লেখিকা তার আহ্বান ও আর্তনাদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নিবেদন করেছে, তার কাছে উম্মতের বিজয় তরান্বিত করার আবেদন জানিয়েছে, এটা ভুলে গিয়ে—অথবা অজ্ঞতার কারণে—যে বিজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে, এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অন্য কোনো সৃষ্টির হাতে নয়। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে বলেছেন:)
﴿...وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ﴾
আর সাহায্য তো শুধু পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময় আল্লাহ্র কাছ থেকেই হয়। [আলে ইমরান: ১২৬] তিনি আরো বলেন:
﴿إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ وَإِنْ يَخْذُلْكُمْ فَمَنْ ذَا الَّذِي يَنْصُرُكُمْ مِنْ بَعْدِهِ...﴾
আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করলে তোমাদের উপর জয়ী হবার কেউ থাকবে না। আর তিনি তোমাদেরকে সাহায্য না করলে, তিনি ছাড়া কে এমন আছে যে তোমাদেরকে সাহায্য করবে? [আলে ইমরান: ১৬০]
এবং দু‘আ ও ফরিয়াদ তলব করার এ আমলটি হলো: ইবাদতের বিভিন্ন প্রকার থেকে একটি প্রকারকে গায়রুল্লাহর জন্য পালন করা। স্পষ্টভাবে কুরআন ও ইজমা দ্বারা জ্ঞাত বিষয় যে, এটি অনুমোদিত নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সৃষ্টিকূলকে সৃষ্টি করেছেন যেন তারা তাঁর ইবাদত করে। তিনি রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এবং কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন সেই ইবাদতের ব্যাখ্যা ও এর প্রতি আহ্বান জানানোর জন্য, যেমন আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ56﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। [আয-যারিয়াত: ৫৬] তিনি আরো বলেন,
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ...﴾
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর... [আন-নাহল: ৩৬] তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ 25﴾
আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমরাই ইবাদাত কর। [আল-আম্বিয়া: ২৫] তিনি আরো বলেন:
﴿الر كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ1 أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا اللَّهَ إِنَّنِي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ2﴾
আলিফ–লাম-রা, এ কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তার কাছ থেকে;
যে, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের ইবাদাত করো না, নিশ্চয় আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা। [হুদ: ১, ২]
কাজেই আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতসমূহে স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি জিন ও মানুষকে একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি আরো স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন এই ইবাদতের আদেশ দেওয়ার জন্য এবং এর বিপরীত কাজ থেকে নিষেধ করার জন্য। আল্লাহ্ তা'আলা খবর দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর কিতাবের আয়াতসমূহকে সুসংহত ও বিশদ করেছেন যেন তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করা হয়।
এ কথা কারো অজানা নয় যে, ইবাদত অর্থ: আল্লাহকে এক জানা এবং তাঁর আদেশ পালন করা ও নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকা মাধ্যমে তার আনুগত্য করা। আল্লাহ তা‘আলা বহু আয়াতে এ সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেন এবং অবহিত করেছেন, যেমন: তাঁর বাণী:
﴿وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ...﴾
আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে... [আল-বায়্যিনাহ: ৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ...﴾
আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে... [আল-ইসরা: ২৩] তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ2 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ3﴾
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।
জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ২-৩]
এ বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে, যার সবগুলোই একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা এবং নবী-রাসূলগণসহ অন্য যে কারো ইবাদত পরিত্যাগ করার আবশ্যকতা প্রমাণ করে।
নিঃসন্দেহে দু‘আ হলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বজনীন ইবাদত। তাই একে একমাত্র আল্লাহর জন্যই খালেস করা আবশ্যক, যেমন তিনি বলেছেন:
﴿فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ14﴾
সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [গাফির: ১৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا18﴾
আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহ্র সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না। [আল-জিন: ১৮] এবং এই নির্দেশনা আল্লাহকে দো‘আয় একক গণ্য করার ব্যাপারে সকল সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য, নবীগণ এবং অন্যান্যদের জন্যও; আর আল্লাহর বাণী:
﴿وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذٗا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ106﴾
‘আর আপনি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবেন না, যা আপনার উপকারও করে না, অপকারও করে না, কারণ এটা করলে তখন আপনি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।’ [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬] এটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সম্বোধন। আর এটা জানা কথা যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে শিরক থেকে রক্ষা করেছেন, কিন্তু এর উদ্দেশ্য হল অন্যদের সতর্ক করা। তারপর আল্লাহ বললেন:
﴿وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ106﴾
‘আর আপনি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবেন না, যা আপনার উপকারও করে না, অপকারও করে না, কারণ এটা করলে তখন আপনি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।’ [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬] এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য হল অন্যদেরকে সতর্ক করা; কারণ এটা জানা বিষয় যে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূলকে শিরক থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কীকরণে কঠোরতা অবলম্বন করে বলেন:
﴿...فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ﴾
তখন আপনি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। যুলুম যখন সাধারণভাবে বলা হয়, তখন এর দ্বারা বড় শিরক বোঝানো হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿...وَالْكَافِرُونَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴾
আর কাফেররাই যালিম। [আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৪] তিনি আরো বলেন,
﴿...إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ﴾
নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম। [ সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩] যদি আদম সন্তানদের সরদার—আলাইহিস সালাম—অন্য কারো নিকট দোয়া করলে তিনি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হতেন, তবে অন্যদের কী অবস্থা হবে?!
সুতরাং এসব আয়াত সহ অন্যান্য আয়াত থেকে জানা গেল যে, আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারো কাছে দু‘আ করা - যেমন মৃত, গাছ, মূর্তি ইত্যাদি - আল্লাহর সাথে শিরকের শামিল এবং এটা আল্লাহর ইবাদাতে তাওহীদের পরিপন্থি, যা আল্লাহ তা‘আলা জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করার এবং রাসূল প্রেরণ ও কিতাব নাযিল করার উদ্দেশ্য। এছাড়াও এটি “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই” এর অর্থের পরিপন্থি, যে অর্থ আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদাতকে অস্বীকার করে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ62﴾
এজন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ্, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে তা তো অসত্য। আর নিশ্চয় আল্লাহ্, তিনিই সমুচ্চ, সুমহান। [আল-হজ্জ: ৬২]
এটাই দ্বীনের মূলনীতি ও মীল্লাতের ভিত্তি, এবং এই মূলনীতি বিশুদ্ধ না হলে ইবাদাত বিশুদ্ধ হয় না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ65﴾
আর আপনার প্রতি ও আপনার পুর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, 'যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল তো নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। [আয-যুমার: ৬৫] তিনি আরো বলেন:
﴿...وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾
আর যদি তারা শির্ক করত তবে তাঁদের কৃতকর্ম নিস্ফল হত [আল-আনআম: ৮৮]
এতে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন ইসলাম এবং (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই) এই সাক্ষ্য প্রদানের দুটি মহান মূলনীতি রয়েছে:
এক: আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত করা যাবে না, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; সুতরাং যে ব্যক্তি নবীগণ বা অন্য মৃত ব্যক্তিদের ডাকলো, অথবা মূর্তি, গাছ, পাথর বা অন্য কোন সৃষ্টিকে ডাকলো, অথবা তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলো, তাদের নিকট যবাই ও মান্নত করা দ্বারা নৈকট্য লাভের চেষ্টা করলো, তাদের জন্য সালাত আদায় করলো, তাদের জন্য সিজদা করলো; সে আল্লাহ ছাড়া তাদেরকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করলো ও তাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ বানালো, এবং “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই” এর অর্থকে সে অস্বিকার করলো।
দ্বিতীয়: আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করা হবে শুধুমাত্র তাঁর নবী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরীয়ত মোতাবেক। যে ব্যক্তি দ্বীনে এমন কিছু উদ্ভাবন করলো যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি; সে মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহর সাক্ষ্যদানের প্রকৃত অর্থ বাস্তবায়ন করেনি, এবং তার আমল তাকে কোনো উপকার করবে না ও তা কবুল করা হবে না। আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেছেন:
﴿وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا23﴾
আর আমরা তাদের কৃতকর্মের প্রতি অগ্রসর হয়ে সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব। [আল-ফুরকান: ২৩] আয়াতে উল্লেখিত আমল দ্বারা উদ্দেশ্য হল: যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক অবস্থায় মারা গেছে তার আমল।
এতে আরো অন্তর্ভুক্ত হবে: বিদ‘আতী আমল যার অনুমতি আল্লাহ দেননি, কিয়ামতের দিন তা বিক্ষিপ্ত ছাইয়ের মতো হবে। কারণ তা তাঁর পবিত্র শরী‘আতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ».
“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
মোদ্দাকথা হলো: এই লেখিকা তাঁর ফরিয়াদ ও দু‘আ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিবেদন করেছে এবং সে বিশ্বজগতের রব থেকে বিমুখ হয়েছে, যাঁর হাতে বিজয়, ক্ষতি ও উপকার রয়েছে, এবং অন্য কারো হাতে এর কিছুই নেই।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি একটি মহা অন্যায় ও জঘণ্য কাজ। অথচ আল্লাহ্ তাঁর কাছে দু‘আ করতে আদেশ করেছেন এবং যারা তাঁকে ডাকে তাদের জন্য সাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যারা এ থেকে অহংকার করবে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশের হুমকি দিয়েছেন, যেমন তিনি বলেছেন:
﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ 60﴾
আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।' [গাফির: ৬০] তথা: লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হয়ে। এই আয়াতটি প্রমাণ করে, নিশ্চয় দু‘আ একটি ইবাদাত এবং যে ব্যক্তি এ থেকে অহংকার করবে তার ঠিকানা জাহান্নাম। যদি আল্লাহর কাছে দু‘আ থেকে বিমুখ হওয়ার পরিণতি এমন হয়, তবে যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে ডাকে তাদের অবস্থা কেমন হবে? অথচ তিনি নিকটবর্তী, সবকিছুর মালিক এবং সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। যেমন তিনি বলেছেন:
﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ 186﴾
আর আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে। [আল-বাকারাহ: ১৮৬] সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, দু‘আ-ই হলো ইবাদাত। তিনি তার চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বলেছেন:
«احْفَظِ اللهَ يَحْفَظْكَ، احْفَظِ اللهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ، إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ، وَإِذَا اسْتَعْنَتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ».
“তুমি আল্লাহকে (বিধানসমূহকে) হেফাযত কর তাহলে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহর হকসমূহ রক্ষা কর, তাহলে তুমি তাকে তোমার সম্মুখে পাবে। যখন তুমি চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন তুমি সাহায্য প্রার্থনা করবে, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে।” তিরিমিযীসহ অন্যান্যরা হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو لِلهِ نِدًّا؛ دَخَلَ النَّارَ».
“যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা গেল যে, সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোন শরীককে ডাকে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সহীহ বুখারী) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো: কোন গুনাহ সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন:
«أَنْ تَجْعَلَ لِلهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ».
“আল্লাহর জন্য সমকক্ষ সাব্যস্ত করা; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” হাদীসে উল্লেখিত আন-নিদ্দ (الند): অর্থ হলো সমকক্ষ ও সদৃশ। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে দু‘আ করে, অথবা তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, অথবা তার নামে মানত করে, বা তার জন্য যবেহ করে, অথবা পূর্বে উল্লেখিত বিষয় ব্যতীত অন্য কোনো ইবাদাত তার জন্য নিবেদন করে; সে তাকে শরীক সাব্যস্ত করল। চায় তা নবী, অথবা অলী, ফেরেশতা, জিন, মূর্তি, কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টি হোক।
এখানে কেউ বলতে পারে: জীবিত উপস্থিত মানুষের কাছে তার ক্ষমতাধীন বিষয়ে সাহায্য চাওয়া এবং তার ক্ষমতাধীন বাহ্যিক বিষয়াদিতে তার সহযোগিতা চাওয়ার বিধান কী? উত্তর: এটি শির্কের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং মুসলমানদের মধ্যে অনুমোদিত সাধারণ বিষয়গুলির অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তায়ালা মূসার কাহিনীতে বলেছেন:
﴿...فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ...﴾
অতঃপর মূসার দলের লোকটি ওর শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল [আল-কাসাস: ১৫] তেমনিভাবে মহান আল্লাহ মূসার কাহিনীতে আরো বলেছেন:
﴿فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ...﴾
তখন তিনি ভীত সতর্ক অবস্থায় সেখান থেকে বের হয়ে পড়লেন... [আল-কাসাস: ২১] যেমন মানুষ যুদ্ধের সময় তার সঙ্গীদের কাছে সাহায্য চায়, এছাড়াও অন্যান্য বিষয়াদি যা মানুষের সামনে আসে এবং যেখানে তারা একে অপরের প্রয়োজন অনুভব করে।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন তার উম্মতকে জানিয়ে দেন যে, তিনি কারো জন্য কোনো উপকার বা ক্ষতির অধিকারী নন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন:
﴿قُلْ إِنَّمَا أَدْعُو رَبِّي وَلَا أُشْرِكُ بِهِ أَحَدًا21 قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا22﴾
বলুন, ‘আমি তো কেবল আমার রাবকেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক করি না।’
“বলুন, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি বা কল্যাণের মালিক নই৷” [আল-জিন: ২১,২২] তিনি আরো বলেন,
﴿قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ188﴾
বলুন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভালো মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আমি তো আর কিছুই নই।’ [আল-আরাফ: ১৮৮]
এই অর্থে অনেক আয়াত রয়েছে।
এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রব ব্যতীত কাউকে ডাকেন না। যেমন, বদরের দিনে তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিলেন এবং তার শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য চাইছিলেন, আর অনবরত দোয়া করছিলেন। তিনি বলছিলেন: «হে আমার রব! আপনি আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা পূর্ণ করুন»। এমনকি আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: যথেষ্ট, হে আল্লাহর রাসূল, নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা পূর্ণ করবেন। এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা এ সম্পর্কে আয়াত নাজিল করেছেন:
﴿إِذۡ تَسۡتَغِيثُونَ رَبَّكُمۡ فَٱسۡتَجَابَ لَكُمۡ أَنِّي مُمِدُّكُم بِأَلۡفٖ مِّنَ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ مُرۡدِفِينَ9﴾
স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকট উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন যে, ‘অবশ্যই আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক হাজার ফিরিশ্তা দিয়ে, যারা একের পর এক আসবে।’ [আল-আনফাল: ৯] মহান আল্লাহ এই আয়াতসমূহে তাদের সাহায্যের প্রার্থনার কথা উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে তিনি তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য করেছিলেন; বিজয়ের সুসংবাদ ও প্রশান্তির জন্য। মহান আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে বিজয় ফেরেশতাদের দ্বারা নয়, বরং তা তাঁর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ...﴾
আর সাহায্য তো শুধু আল্লাহর কাছ থেকেই আসে... [আলে ইমরান: ১২৬] তিনি আরো বলেন:
﴿وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ123﴾
আর বদরের যুদ্ধে আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করেছিলেন অথচ তোমরা হীনবল ছিলে। কাজেই তোমরা আল্লাহ্র তাকওয়া অবলম্বন কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার। [আলে ইমরান: ১২৩] আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াতে স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি বদরের দিনে তাদের সাহায্যকারী ছিলেন। সুতরাং এটা জানা গেল যে, তাদেরকে যে অস্ত্র ও শক্তি প্রদান করা হয়েছিল এবং যে ফেরেশতাদের দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করা হয়েছিল, তা সবই ছিল সাহায্য, সুসংবাদ ও প্রশান্তির কারণ। কিন্তু সাহায্য সেগুলোর পক্ষ থেকে ছিল না, বরং তা শুধুমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই ছিল। তাহলে কিভাবে এই লেখিকা বা অন্য কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সাহায্য ও বিজয় প্রার্থনা করতে সাহস পায়, আর সমস্ত জগতের রব, যিনি সবকিছুর মালিক এবং সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়?
নিঃসন্দেহে এটি সবচেয়ে জঘন্য অজ্ঞতা, বরং সবচেয়ে বড় শিরক। অতএব, লেখিকার অবশ্যই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে খাঁটি তাওবা করা উচিত। খাঁটি তাওবা হলো এমন তাওবা যা কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল, সেগুলো হলো: এক: যা ঘটেছে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া। দুই: যা ঘটেছে তা থেকে বিরত থাকা, তিন: পুনরায় তা না করার দৃঢ় সংকল্প করা, এটি করতে হবে আল্লাহর মহত্ত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে, একান্তভাবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য, তাঁর আদেশের প্রতি আনুগত্য স্বরূপ এবং যে বিষয়গুলো তিনি নিষেধ করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য। এটাই হচ্ছে খাঁটি তাওবা। এবং চতুর্থ আরেকটি বিষয় রয়েছে যা সৃষ্ট জীবের অধিকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর তা হলো: চার: অধিকার তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, অথবা তার সাথে মিটমাট করে নেয়া।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে তাওবা করার আদেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে তাওবা কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ31﴾
হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্র দিকে ফিরে আস, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [আন-নূর: ৩১]। তিনি খৃষ্টানদের ব্যাপারে বলেছেন:
﴿أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ74﴾
তবে কি তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে না ও তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [আল-মায়েদাহ: ৭৪] তিনি আরো বলেন,
﴿وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا68 يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا69 إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا70﴾
এবং তারা আল্লাহ্র সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না। আর আল্লাহ্ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। আর তারা ব্যভিচার করে না; যে এগুলো করে, সে শাস্তি ভোগ করবে।
কিয়ামতের দিন তার শাস্তি বর্ধিতভাবে প্ৰদান করা হবে এবং সেখানে সে স্থায়ী হবে হীন অবস্থায়;
তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, ফলে আল্লাহ্ তাদের গুণাহসমূহ নেক দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [আল-ফুরকান: ৬৮-৭০] তিনি আরো বলেন,
﴿وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ25﴾
আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন ও পাপসমূহ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন। [আশ-শুরা: ২৫]
সহীহ সূত্রে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الإِسْلَامُ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ، وَالتَّوْبَةُ تَجُبُّ مَا كَانَ قَبْلَهَا».
“ইসলাম পূর্বের সকল পাপ ধ্বংস করে দেয়, আর তাওবাহ পূর্বের সকল পাপ মুছে দেয়।”
আমি এই সংক্ষিপ্ত কথাগুলো তুলে ধরেছি, কারণ শিরকের ভয়াবহতা অত্যন্ত গুরুতর, এবং এটি সবচেয়ে বড় গুনাহ।এছাড়াও, এই লেখিকার কথায় কেউ বিভ্রান্ত হতে পারে—সে আশঙ্কায় এবং আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের জন্য উপদেশ দেওয়া আবশ্যক হওয়ার কারণে। আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন এর দ্বারা উপকৃত করেন এবং আমাদের ও সকল মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করেন। আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করেন এবং এতে দৃঢ় থাকার তাওফিক দেন। আমাদের ও মুসলিমদেরকে নিজেদের মন্দ প্রবৃত্তি এবং খারাপ কাজের পরিণতি থেকে রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তিনিই এর অভিভাবক এবং এর উপর ক্ষমতাবান।
আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর সালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
তৃতীয় পত্র
জিন ও শয়তানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং তাদের জন্য মানত করার বিধান সম্পর্কে।
আব্দুল ‘আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায-এর পক্ষ থেকে যারা এই পুস্তিকাটি দেখবেন তাদের প্রতি, আল্লাহ আমাকে এবং তাদেরকে তাঁর দ্বীনের উপর অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন, আমীন।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
অতঃপর: কিছু ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন কিছু অজ্ঞ ব্যক্তির কাজ সম্পর্কে; যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারো কাছে দু‘আ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে; যেমন: জিনদের কাছে দু‘আ করা, তাদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা, তাদের জন্য মান্নত করা এবং তাদের জন্য যবেহ করা। এছাড়াও কিছু লোকের কথা: (হে সাতজন), অর্থাৎ: জিনদের সাতজন নেতা, তোমরা তাকে পাকড়াও করো, তার হাড় ভেঙে দাও, তার রক্ত পান করো, তাকে বিকৃত করো, হে সাতজন তার সাথে এমন করো, অথবা কিছু লোকের বলা: (তোমরা তাকে ধরে নাও, হে দুপুরের জিন, হে বিকেলের জিন), এগুলো দক্ষিণাঞ্চলে বহুল প্রচলিত আছে। এছাড়াও এর সাথে যুক্ত হয়: নবী, সৎকর্মশীল ও অন্যান্য মৃত ব্যক্তিদের কাছে দোয়া করা এবং ফেরেশতাদের কাছে দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনা করা। এগুলো সবই এবং এর অনুরূপ বিষয়সমূহ অনেকের মধ্যে বিদ্যমান যারা ইসলামের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে, অজ্ঞতা এবং পূর্ববর্তীদের অন্ধ অনুকরণের কারণে। সম্ভবত তাদের কেউ কেউ এতে নমনীয়তা প্রদর্শন করে এবং এ কথা বলে যুক্তি প্রদান করে: এটি এমন কিছু যা মুখে উচ্চারিত হয়, আমরা এর উদ্দেশ্য করি না এবং এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করি না।
তিনি আমাকে আরও জিজ্ঞেস করেছেন: যে ব্যক্তি এ ধরনের কাজের সাথে জড়িত, তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, তাদের যবেহকৃত পশু, তাদের জানাযা আদায় করা এবং তাদের পেছনে সালাত আদায় করার হুকুম সম্পর্কে এবং জাদুকর ও গণকদের বিশ্বাস করার হুকুম সম্পর্কে; যারা রোগ ও তার কারণ সম্পর্কে জানার দাবি করে শুধুমাত্র রোগীর শরীরের কোনো কিছু যেমন পাগড়ি, পায়জামা, ওড়না ইত্যাদির উপর নজর দেয়ার মাধ্যমে।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সেই নবীর উপর যার পরে আর কোনো নবী নেই, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর এবং কিয়ামত অবধি যারা তাদের পথ অনুসরণ করবে তাদের ওপর।
অতঃপর: আল্লাহ্ তা'আলা জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন যেন তারা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করে, তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত না করে, প্রার্থনা ও সাহায্য কামনা, কুরবানি, মানত এবং অন্যান্য সকল ইবাদাত একমাত্র তাঁর জন্যই পালন করে। তিনি এ বিষয় দিয়েই রসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং তাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণনা, এর দিকে আহ্বান এবং মানুষকে আল্লাহর সাথে শিরক ও অন্যের ইবাদাত করা থেকে সতর্ক করার জন্য তিনি আসমানী কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন, যার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হল পবিত্র কুরআন। এটাই হলো সকল মূলনীতির মূল এবং দ্বীন ও মিল্লাতের ভিত্তি। আর তা হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য দেয়া। এই সাক্ষ্যের অর্থ হলো: আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই। এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য উলূহিয়্যাহ ও ইবাদতকে নাকচ করে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্যই ইবাদতকে সাব্যস্ত করে, তিনি ছাড়া অন্যান্য সৃষ্টির জন্য নয়। এ বিষয়ে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহতে অনেক দলিল রয়েছে। তন্মধ্যে: আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ56﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। [আয-যারিয়াত: ৫৬] তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ...﴾
আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে... [আল-ইসরা: ২৩] আল্লাহর আরেকটি বাণী:
﴿وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ...﴾
আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে... [আল-বায়্যিনাহ: ৫] আল্লাহর আরেকটি বাণী:
﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ60﴾
আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।' [গাফির: ৬০] তিনি আরো বলেন,
﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ...﴾
আর আমার বান্দা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই... [আল-বাকারাহ: ১৮৬]
আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতসমূহে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি জিন ও মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তাঁর বান্দাদেরকে পবিত্র কুরআনে ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন একমাত্র তাদের রবেরই ইবাদত করে।
মহান আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, দু‘আ একটি মহান ইবাদাত। যে ব্যক্তি এ থেকে অহংকার করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে কেবল তাঁকেই ডাকতে আদেশ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে তিনি নিকটবর্তী, তাদের দু‘আ কবুল করেন। তাই সকল বান্দার উপর আবশ্যক যে তারা কেবলমাত্র তাদের রবের কাছেই দু‘আ করবে; কারণ তা এমন একটি ইবাদাত যার জন্য তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যার আদেশ তাদেরকে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ162 لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ163﴾
বলুন, ‘আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।’
‘তাঁর কোনো শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।’ [আল-আনআম: ১৬২, ১৬৩]
আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদেশ করেছেন যে, তিনি যেন মানুষকে জানিয়ে দেন, তার সালাত ও তার নুসুক -অর্থাৎ যবেহ-, এবং তার জীবন ও মৃত্যু; সবকিছু সৃষ্টিজগতের রব আল্লাহর জন্য, তাঁর কোনো শরীক নেই। এর ভিত্তিতে: যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য যবেহ করল, সে আল্লাহর সাথে শির্ক করল, তেমনি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সালাত আদায় করলে। কেননা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সালাত ও যবেহকে একত্রে উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, এগুলো একমাত্র আল্লাহর জন্য, তাঁর কোনো শরীক নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য যেমন জিন, ফেরেশতা, মৃত ব্যক্তিদের জন্য যবেহ করে এবং তাদের নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে, সে যেন তার ন্যায় যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সালাত আদায় করল। সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ».
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া কারো জন্যে যবেহ করবে, আল্লাহ তাকে লানত করেছেন।” ইমাম আহমদ হাসান সনদে তারেক ইবন শিহাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مرَّ رَجُلَانِ عَلَى قَومٍ لَهُم صَنَمٌ لَا يَجُوزُهُ أَحَدٌ حَتَّى يُقرِّبَ لَهُ شَيئًا، فَقَالُوا لِأَحَدِهِمَا: قَرِّبْ. قَالَ: لَيسَ عِندِي شَيءٌ أَقَرِّبُهُ، قَالُوا: قَرِّبْ وَلَوْ ذَبَابًا، فَقَرَّبَ ذُبَابًا، فَخَلُّوا سَبِيلَهُ، فَدَخَلَ النَّارَ، وَقَالُوا لِلآخَرِ: قَرِّبْ. قَالَ: مَا كُنْتُ لِأُقَرِّبَ لِأَحَدٍ شَيْئًا دُونَ اللهِ جَلَّ جَلَالُهُ، فَضَرَبُوا عُنُقَه، فَدَخَلَ الجَنَّةَ».
“দু’জন লোক এমন একটি কওমের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল যাদের জন্য একটি মূর্তি নির্ধারিত ছিল। উক্ত মূর্তিকে কোনো কিছু নযরানা বা উপহার না দিয়ে কেউ সে স্থান অতিক্রম করতে পারত না। তারা একজনকে বললো, ‘নযরানা দাও’। সে বললো, ‘আমার কাছে কিছু নেই যা আমি নযরানা দিতে পারি’। তারা বললো, ‘অন্ততঃ একটা মাছি হলেও নযরানা স্বরূপ দিয়ে যাও’। অতঃপর সে একটা মাছি মূর্তিকে উপহার দিলে তারা লোকটির পথ ছেড়ে দিলো। এর ফলে মৃত্যুর পর সে জাহান্নামে গেলো। তারা অপরজনকে বললো, ‘নযরানা দাও’। সে বললো, ‘একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নৈকট্য লাভের জন্য আমি কাউকে কোনো নযরানা প্রদান করি না’। এর ফলে তারা তার গর্দান উড়িয়ে দিলো। মৃত্যুর পর সে জান্নাতে প্রবেশ করলো।”
অতএব, যদি কেউ মূর্তি বা এ জাতীয় কিছুর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে মাছি বা এ জাতীয় কিছু উৎসর্গ করে সে মুশরিক হয় এবং জাহান্নামে প্রবেশের উপযুক্ত হয়, তাহলে যারা জিন, ফিরিশতা ও অলিদের আহ্বান করে, যারা তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, তাদের জন্য মানত করে এবং যবাইয়ের মাধ্যমে তাদের নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে, তাদের সম্পদের হেফাজত, রোগীর আরোগ্য, বা তাদের পশু ও ফসলের নিরাপত্তা আশা করে, এবং যারা জিনের ক্ষতির ভয়ে বা এ জাতীয় কিছু কারণে তা করে, তাদের অবস্থা কেমন হবে?! নিঃসন্দেহে, যে ব্যক্তি এসব করে এবং এ জাতীয় কাজ করে, সে ঐ ব্যক্তির চেয়ে মুশরিক হওয়ার অধিক যোগ্য এবং জাহান্নামে প্রবেশের অধিক উপযুক্ত, যে মূর্তির জন্য মাছি উৎসর্গ করেছিল।
এ সম্পর্কে আরো যা এসেছে, তার মধ্যে আল্লাহর বাণী:
﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ2 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ3﴾
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।
জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ২-৩] তিনি আরো বলেন,
﴿وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ18﴾
আর তারা আল্লাহ্ ছাড়া এমন কিছুর ‘ইবাদাত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এগুলো আল্লাহ্র কাছে আমাদের সুপারিশকারী।‘ বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্কে আসমানসমূহ ও যমীনের এমন কিছুর সংবাদ দেবে যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, ‘পবিত্র এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধে। [সূরা ইউনুস: ১৮]
আল্লাহ সুবহানাহ এই দুই আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মুশরিকরা তাঁর পরিবর্তে মাখলুককে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছে, যাদের তারা ভয়, আশা, কুরবানি, মানত, দোয়া ইত্যাদির মাধ্যমে তাঁর সাথে উপাসনা করে, এই ভেবে যে, সেই অভিভাবকরা তাদের উপাসকদের আল্লাহর নিকটবর্তী করবে এবং তাদের জন্য তাঁর কাছে সুপারিশ করবে। এরপর আল্লাহ সুবহানাহ তাদেরকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে দিয়েছেন, তাদের বাতিলতা স্পষ্ট করেছেন এবং তাদেরকে মিথ্যাবাদী, কাফের ও মুশরিক বলে আখ্যায়িত করেছেন, আর নিজেকে তাদের শিরক থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿...سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ﴾
পবিত্র এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধে। [আন-নাহল: ১] অতএব, জানা গেল, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন ফিরিশতা, নবী, জিন, গাছ বা পাথরকে ডাকে এবং তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, মানত ও যবাইয়ের মাধ্যমে তার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে, আল্লাহর কাছে তার সুপারিশের আশা করে, অথবা রোগীর আরোগ্য, সম্পদের হেফাজত, অনুপস্থিত ব্যক্তির নিরাপত্তা বা এ ধরনের কিছু আশা করে; সে এই মহা শিরক ও ভয়াবহ বিপদে পতিত হয়েছে, যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا48﴾
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে। [আন-নিসা: ৪৮] তিনি আরো বলেন,
﴿إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ72﴾
নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই। [আল-মায়েদাহ: ৭২]
শাফাআত কিয়ামতের দিন শুধুমাত্র তাওহীদ ও ইখলাসের অনুসারীরাই প্রাপ্ত হবে, মুশরিকরা নয়। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন বলা হয়েছিল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার শাফাআত দ্বারা সবচেয়ে সৌভাগ্যবান কে হবে? তখন তিনি বলেছিলেন:
«مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ».
“যে ব্যক্তি খালেস দিলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:
«لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَـبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَومَ القِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللهِ مَن مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا».
“প্রত্যেক নবীর জন্য এমন একটি দু’আ রয়েছে, যা গৃহীত হয়। প্রত্যেক নবী তার দু’আ পৃথিবীতে করেছেন, কিন্তু আমি আমার দু’আর অধিকার কিয়ামতের দিনে আমার উম্মাতের শাফায়াতের জন্য লুকিয়ে রেখেছি। ইনশাআল্লাহ, তা আমার উম্মাতের সেই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য হবে, যে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যবরণ করেছে।”
প্রথম যুগের মুশরিকরা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহ তাদের রব, স্রষ্টা ও রিযিকদাতা। কিন্তু তারা নবীগণ, অলীগণ, ফিরিশতাগণ, বৃক্ষ ও পাথর এবং এ জাতীয় অন্যান্য বস্তুর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করত, আল্লাহর নিকট তাদের সুপারিশের এবং তাদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায়, যেমন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ এ ব্যাপারে তাদের ওজর গ্রহণ করেননি, বরং তাঁর মহান কিতাবে তাদেরকে নিন্দা করেছেন এবং তাদেরকে কাফের ও মুশরিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের এই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন যে, এই ইলাহরা তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছাবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ক্ষমা করেননি, বরং এই শিরকের কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন যাতে তারা কেবল আল্লাহর জন্যই ইবাদতকে খালিস করে। আল্লাহর এর বাণীর প্রতি আমল করণার্থে:
﴿وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ...﴾
আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেত্না চুড়ান্ত ভাবে দূরীভূত না হয় এবং দীন একমাত্র আল্লাহ্র জন্য হয়ে যায়... [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৩] তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ، وَيُؤتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُم وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّ الإِسْلَامِ، وَحِسَابُهُم عَلَى اللهِ».
“আমাকে লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করবে ও যাকাত প্রদান করবে। যখন তারা এ কাজগুলো সম্পাদন করবে, তখন তারা আমার নিকট থেকে তাদের রক্ত (জান) এবং মাল বাঁচিয়ে নেবে; কিন্তু ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব আল্লাহর ওপর ন্যস্ত হবে।” নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী:
«حَتَّى يَشْهَدُوا أَن لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ».
“যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই”: অর্থাৎ, তারা যেন একমাত্র আল্লাহকেই ইবাোতের জন্য নির্দিষ্ট করে এবং অন্য সমস্ত সত্তা থেকে তা মুক্ত রাখে।
মুশরিকরা জিনদের ভয় করত এবং তাদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করত, এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর এ বাণী নাযিল করেছেন:
﴿وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِنَ الْإِنْسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا6﴾
এও যে, কিছু কিছু মানুষ কিছু জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।’ [আল-জিন: ৬] তাফসীরবিদগণ এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: এ আয়াতের অর্থ হলো:
﴿...فَزَادُوهُمْ رَهَقًا﴾
ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিয়েছিল অর্থাৎ: আতঙ্ক ও ভয়; কারণ জিনেরা নিজেদের মধ্যে আত্মম্ভরিতা ও অহংকার করে, যখন তারা দেখে যে মানুষ তাদের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছে। তখন তারা তাদেরকে ভয় ও আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে দেয়, যাতে তারা তাদের উপাসনা ও তাদের কাছে আশ্রয় গ্রহণ বাড়িয়ে দেয়।
অথচ আল্লাহ সুবহানাহু মুসলমানদেরকে এর পরিবর্তে বিকল্প স্বরূপ তাঁর নিকট এবং তাঁর পূর্ণাঙ্গ কালিমাসমূহ দ্বারা আশ্রয় গ্রহণের ব্যবস্থা দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন:
﴿وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ200﴾
আর যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা আপনাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় চাইবেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। [আল-আরাফ: ২০০] মহান আল্লাহ আরো বলেন:
﴿قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ1﴾
বলুন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের’ সহীহ সূত্রে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«مَنْ نَزَلَ مَنْزِلًا فَقَالَ: (أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ)؛ لَم يَضُرَّهُ شَيءٌ حَتَّى يَرْتَحِلَ مِنْ مَنْزِلِهِ ذَلِكَ».
“যে ব্যক্তি কোথাও অবতরণ করে এ দো‘আটি পাঠ করে: “أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ”
অর্থ: (আল্লাহ পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের ওয়াসীলায় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্টসমূহ থেকে (তার কাছে) আশ্রয় চাই।); যতক্ষণ পর্যন্ত সে স্থান থেকে রওনা না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো কিছুই তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে, নাজাত প্রত্যাশী ও স্বীয় দ্বীনের হেফাযতে আগ্রহী এবং ছোট-বড় সকল শিরক থেকে নিরাপদ থাকতে আগ্রহী ব্যক্তি বুঝতে পারবে যে, মৃত, ফিরিশতা, জিন এবং অন্যান্য মাখলুকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, তাদেরকে আহবান করা ও তাদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা ইত্যাদি জাহেলী যুগের মুশরিকদের কাজ এবং আল্লাহর সাথে সবচেয়ে ঘৃণিত শির্ক। তাই এটি পরিত্যাগ করা, এ থেকে সতর্ক থাকা এবং এটি পরিত্যাগ করার জন্য পরস্পরকে উপদেশ দেওয়া ও যারা এটি করে তাদেরকে প্রতিহত করা ওয়াজিব।
আর যে ব্যক্তি এই শিরকী কাজগুলোর জন্য মানুষের মধ্যে পরিচিত, তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ নয়, তার যবাই করা পশু খাওয়া বৈধ নয়, তার জানাযার নামায পড়া বৈধ নয়, এবং তার পিছনে নামায পড়া বৈধ নয়, যতক্ষণ না সে আল্লাহর কাছে প্রকাশ্যে তাওবা করে এবং একমাত্র আল্লাহর জন্য দু‘আ ও ইবাদাত খালিস করে। মৃলত দু‘আ হল ইবাদাত, বরং এর মগজ, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الدُّعَاءُ هُوَ العِبَادَةُ».
“দু‘আ-ই হচ্ছে ইবাদাত।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, তিনি বলেছেন:
«الدُّعَاءُ مُخُّ العِبَادَةِ».
“দু‘আ হচ্ছে ইবাদাতের মূল।” আর মুশরিকদের সাথে বিবাহের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ221﴾
আর মুশরিক নারীকে ঈমান না আনা পর্যন্ত তোমরা বিয়ে করো না। মুশরিক নারী তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও, অবশ্যই মুমিন কৃতদাসী তার চেয়ে উত্তম। ঈমান না আনা পর্যন্ত মুশরিক পুরুষদের সাথে তোমরা বিয়ে দিওনা, মুশরিক পুরুষ তোমাদেরকে মুগ্ধ করলেও অবশ্যই মুমিন ক্রীতদাস তার চেয়ে উত্তম। তারা আগুনের দিকে আহবান করে। আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে নিজ ইচ্ছায় জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন। আর তিনি মানুষের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন, যাতে তারা শিক্ষা নিতে পারে। [আল-বাকারাহ: ২২১] সুতরাং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুসলিমদেরকে মুশরিক নারীদেরকে বিবাহ করতে নিষেধ করেছেন, যারা মূর্তি, জিন, ফিরিশতা ইত্যাদির পূজারী, যতক্ষণ না তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতে একনিষ্ঠ হয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা বিশ্বাস করে এবং তার পথ অনুসরণ করে। অনুরূপভাবে মুশরিক পুরুষদের সাথে মুসলিম নারীদের বিবাহ দিতেও নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতে একনিষ্ঠ হয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশ্বাস করে এবং তার অনুসরণ করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সংবাদ দিয়েছেন যে, একজন মু’মিন দাসী একজন মুশরিক স্বাধীন নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও তার সৌন্দর্য ও বাকপটুতা দেখে শ্রোতা ও দর্শক মুগ্ধ হয়। এবং একজন মু’মিন দাস একজন মুশরিক স্বাধীন ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম, যদিও তার সৌন্দর্য, বাকপটুতা, সাহসিকতা ইত্যাদি দেখে শ্রোতা ও দর্শক মুগ্ধ হয়। এরপর আল্লাহ তায়ালা এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন:
﴿...أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ...﴾
তারা আগুনের দিকে আহবান করে। [আল-বাকারা: ২২১]। এর দ্বারা মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদের বোঝানো হয়েছে; কারণ তারা তাদের কথাবার্তা, কাজকর্ম, জীবনযাপন এবং চরিত্রের মাধ্যমে জাহান্নামের দিকে আহ্বানকারী। আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা তাদের চরিত্র, কাজকর্ম এবং জীবনযাপনের মাধ্যমে জান্নাতের দিকে আহ্বানকারী। তাহলে কিভাবে এরা এবং ওরা সমান হতে পারে!
আর মুশরিকদের জানাযা পড়ার ব্যাপারে: আল্লাহ্ জাল্লা ওয়া আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,
﴿وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ84﴾
আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না; তারা তো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। [আত-তাওবাহ: ৮৪] আল্লাহ্ তা'আলা এই আয়াতে স্পষ্ট করেছেন যে, মুনাফিক ও কাফিরের জানাযার সালাত আদায় করা যাবে না; কারণ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে। তেমনি তাদের পিছনে সালাত আদায় করা যাবে না এবং তাদের মুসলিমদের ইমাম বানানো যাবে না; তাদের কুফরী ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এবং মুসলিমদের সাথে তাদের বিরাট শত্রুতার কারণে। কারণ তারা সালাত ও ইবাদাত আদায়কারী নয়; কেননা কুফর ও শিরক কোনো আমলকে অবশিষ্ট রাখে না। আমরা আল্লাহর কাছে এর থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করি। আর মুশরিকদের যবেহ করা পশু খাওয়ার ব্যাপারে, আল্লাহ্ তা‘আলা মৃত পশু ও মুশরিকদের যবেহ করা পশু হারাম করেছেন বলে স্পষ্ট করেছেন:
﴿وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ121﴾
আর যাতে আল্লাহ্র নাম নেয়া হয়নি তার কিছুই তোমারা খেও না; এবং নিশ্চয় তা গর্হিত। নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে প্ররোচনা দেয়; আর যদি তোমারা তাদের অনুগত্য কর, তবে তোমারা অবশ্যই মুশরিক। [আল-আনআম: ১২১] কাজেই আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদের মৃত জন্তু এবং মুশরিকের যবেহ করা পশু খেতে নিষেধ করেছেন; কারণ এটি নাপাক, তাই তার যবেহ করা পশু মৃতের হুকুমে, যদিও সে আল্লাহর নাম নেয়; কারণ তার নাম নেওয়া বাতিল, এর কোনো প্রভাব নেই; কারণ এটি ইবাদত, আর শিরক ইবাদতকে নষ্ট করে ও বাতিল করে দেয়, যতক্ষণ না মুশরিক আল্লাহর কাছে তওবা করে। আল্লাহ্ তো আহলে কিতাবের খাদ্যকে বৈধ করেছেন, যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন:
﴿...وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَهُمْ...﴾
ও যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য হালাল এবং তোমাদের খাদ্যদ্রব্য তাদের জন্য বৈধ। [আল-মায়েদাহ: ৫] কারণ তারা আসমানী ধর্মের সাথে নিজেদের সম্পর্কিত করে এবং দাবী করে যে তারা মূসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালামের অনুসারী, যদিও তারা এতে মিথ্যাবাদী। অথচ আল্লাহ তাদের ধর্মকে রহিত করেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করে তা বাতিল করেছেন। কিন্তু আল্লাহ —জাল্লা শানুহু— আমাদের জন্য আহলে কিতাবের খাদ্য ও তাদের নারীদেরকে হালাল করেছেন; এতে গভীর প্রজ্ঞা ও উপকারী রহস্য রয়েছে, যা আলেমগণ স্পষ্ট করেছেন। আর এটি মুশরিকদের বিপরীতে; যারা নবী, অলী ও অন্যান্য মৃত ব্যক্তি ও মূর্তির ইবাদাত করে; কেননা তাদের ধর্মের কোনো ভিত্তি নেই ও এতে কোনো সন্দেহ নেই। বরং তা মূল থেকেই বাতিল। তাই তাদের যবাই করা পশু মৃত বলে গণ্য হবে এবং তা খাওয়া বৈধ নয়।
আর যখন কেউ কাউকে বলে: (জিন তোমাকে ধরেছে), (জিন তোমাকে নিয়ে গেছে), (শয়তান তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে) ইত্যাদি, তখন এটি গালমন্দ ও অপমানের একটি রূপ, যা মুসলমানদের মধ্যে নিষিদ্ধ, যেমন অন্যান্য সব ধরনের গালমন্দও নিষিদ্ধ। তবে এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়, যদি না ঐ বলার সময় সে বিশ্বাস করে যে জিনেরা আল্লাহর অনুমতি ও ইচ্ছা ছাড়া মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কাজেই যে ব্যক্তি জিন বা অন্য কোনো মাখলূকের ব্যাপারে এমন বিশ্বাস পোষণ করে, সে এই বিশ্বাসের কারণে কাফির; কেননা আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুর মালিক এবং সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তিনিই উপকারকারী ও অপকারকারী, তাঁর অনুমতি ও ইচ্ছা এবং পূর্ব নির্ধারণ ছাড়া কিছুই ঘটে না। যেমন তিনি তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই মহান মূলনীতি সম্পর্কে মানুষকে জানাতে আদেশ করে বলেছেন:
﴿قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ188﴾
বলুন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভালো মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আমি তো আর কিছুই নই।’ [আল-আরাফ: ১৮৮] যদি সৃষ্টির সেরা ও উত্তম ব্যক্তি নবী—আলাইহিস সালাম—নিজের জন্য কোন উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা না রাখেন; আল্লাহ যা চান তা ছাড়া, তবে অন্য সৃষ্টির কী অবস্থা হবে?! এই অর্থে বহু আয়াত রয়েছে।
আর গণক, জ্যোতিষী, যাদুকর এবং তাদের মতো যারা গাইবী বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দেয় তাদের কাছে কোন বিষয় জিজ্ঞেস করা নিকৃষ্টকাজ এবং তা জায়েয নয়। তাদেরকে বিশ্বাস করা আরও কঠিন নিন্দনীয়, বরং এটি কুফরের একটি শাখা; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيءٍ؛ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ يَومًا».
“যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে আসলো এবং তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করল; তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল করা হবে না।” (সহীহ মুসলিম) সহীহ মুসলিমে আরও রয়েছে, মু’আবিয়া বিন হাকাম আস-সুলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
«أَنَّ النَّبيَّ ﷺ نَهَى عَنْ إِتْيَانِ الكُهَّانِ وَسُؤَالِهِم».
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্যোতিষীর কাছে যাওয়া এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা থেকে নিষেধ করেছেন।”
সুনান গ্রন্থকারগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন:
«مَنْ أَتَى كَاهِنًا، فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ؛ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ».
“যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে আসে, আর সে যা বলে তা সত্য বলে বিশ্বাস করে, তাহলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা কিছু নাযিল হয়েছে, সে যেন তা অস্বীকার করল।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে। সুতরাং মুসলমানদের কর্তব্য হলো: গণক, জ্যোতিষী এবং অন্যান্য যাদুকরদের থেকে সতর্ক থাকা, যারা গায়েবের খবর দেয় এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তা চিকিৎসার নামে হোক বা অন্য কোনো নামে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ থেকে নিষেধ করেছেন ও সতর্ক করেছেন। এতে অন্তর্ভুক্ত হয়: কিছু মানুষ চিকিৎসার নামে অদৃশ্য বিষয়ের যা দাবি করে, যেমন রোগীর পাগড়ি বা রোগিণীর ওড়না শুঁকে বলা হয়: এই রোগী বা এই রোগিণী এই কাজ করেছে, অদৃশ্য বিষয়ের মধ্যে যা রোগীর পাগড়ি বা এর মতো জিনিসে কোনো প্রমাণ নেই। এর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, যাতে তারা বলে: সে চিকিৎসা এবং রোগের বিভিন্ন প্রকার ও তার কারণ সম্পর্কে জ্ঞানী। হয়তো তাদের কিছু ওষুধও দেয়, এবং কখনো কখনো আল্লাহর ইচ্ছায় তা আরোগ্য লাভ করে, ফলে তারা মনে করে যে তা তার ওষুধের কারণে হয়েছে। এবং কখনো কখনো রোগের কারণ হতে পারে কিছু জিন ও শয়তান, যারা সেই চিকিৎসার দাবিদার ব্যক্তির সেবা করে এবং তাকে কিছু অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জানায় যা তারা জানতে পারে। ফলে সে এর উপর নির্ভর করে এবং জিন ও শয়তানদের তাদের উপাসনার উপযোগী কিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করে, তাই তারা সেই রোগী থেকে সরে যায় এবং যে কষ্ট দ্বারা তাদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল তা ত্যাগ করে। এটি জিন ও শয়তান এবং যারা তাদেরকে ব্যবহার করে, তাদের সম্পর্কে একটি পরিচিত বিষয়।
মুসলমানদের জন্য আরও আবশ্যক হলো: এ থেকে সতর্ক থাকা, এবং একে পরিত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার উপর নির্ভর করা এবং সকল বিষয়ে তাঁর উপর ভরসা করা। শরিয়তসম্মত ঝাড়ফুঁক এবং হালাল ওষুধ গ্রহণে কোনো আপত্তি নেই, এবং এমন চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নেওয়া, যারা রোগীর উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এবং তার রোগ নিশ্চিত করে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও যুক্তিসঙ্গত উপায়ে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন:
«مَا أَنْزَلَ اللهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً، عَلِمَهُ مَنْ علِمه، وَجَهِلَهُ مَنْ جَهِلَهُ».
“আল্লাহ এমন কোন রোগ পাঠাননি, যার জন্য তিনি আরোগ্য বিধান নাযিল করেননি। যে সেটা জানতে পেরেছে, সে জানতে পেরেছে, আর যে জানতে পারেনি, সে অজ্ঞতার মধ্যে থেকেছে।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:
«لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ، فإِذَا أُصِيبَ دَوَاءٌ الدَّاءَ بََرَأَ بِإِذْنِ اللهِ».
“প্রত্যেক রোগের জন্য ঔষধ আছে, যখন সেই রোগের ঔষধ প্রয়োগ করা হয়, তখন আল্লাহর ইচ্ছায় আরোগ্য লাভ হয়।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:
«عِبَادَ اللهِ، تَدَاوَوا وَلَا تَدَاوَوا بِحَرَامٍ».
“আল্লাহর বান্দারা, তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর; তবে হারাম বস্তুর মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করবে না।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
আমরা আল্লাহ -জল্লা জালালুহু- এর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সকল মুসলিমের অবস্থা সংশোধন করে দেন, তাদের হৃদয় ও দেহকে সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে আরোগ্য দান করেন, তাদেরকে হেদায়াতের উপর একত্রিত করেন, এবং আমাদেরকে ও তাদেরকে বিভ্রান্তিকর ফিতনা এবং শয়তান ও তার অনুসারীদের আনুগত্য থেকে রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান, এবং মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র সাহায্য ছাড়া কোন শক্তি ও ক্ষমতা নেই।
আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর সালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
চতুর্থ পত্র:
বিদ‘আতী ও শিরকী আওরাদ (তন্ত্র-মন্ত্র) দ্বারা ইবাদতের হুকুম
আব্দুল আজিজ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায এর পক্ষ থেকে সম্মানিত ভাই (.........) এর প্রতি, আল্লাহ তাকে সকল কল্যাণের তাওফীক দান করুন, আমীন।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
অতঃপর; আপনার গুরুত্বপূর্ণ পত্রটি আমার নিকট পৌঁছেছে, আল্লাহ আপনাকে তাঁর হিদায়াতের সাথে সংযুক্ত করুন। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আপনার দেশে কিছু লোক রয়েছে যারা এমন কিছু অযীফা পালন করে যার পক্ষে আল্লাহর নিকট থেকে কোন প্রমাণ অবতীর্ণ হয়নি। যার মধ্যে কিছু রয়েছে বিদ‘আতি এবং কিছু শিরকী। তারা এসবকে আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এবং অন্যদের সাথে সম্পৃক্ত করে। তারা যিকিরের মজলিসে বা মাগরিবের সালাতের পর মসজিদে ঐসব অযীফা পাঠ করে। তারা দাবি করে যে এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। যেমন তারা বলে: বিহাক্কিল্লাহ, রিজালাল্লাহ, আঈনুনা বিআউনিল্লাহ, ওয়া কূ-নূ আউনানা বিল্লাহ। আরো যেমন তারা বলে: ‘হে আ‘কতাবগণ, হে আসিয়াদগণ, আমাদের ব্যাপারে সাহায্যকারী আমাদের ডাকে সাড়া দাও, আল্লাহর কাছে শাফা‘আত করুন, এই আপনার দাস দাঁড়িয়ে আছে, আপনার দরজায় নিবেদিত, তার ত্রুটির জন্য ভীত, আমাদেরকে সাহায্য করুন হে আল্লাহর রাসূল, আমার জন্য আপনারা ছাড়া আর কেউ নেই, আপনাদের পক্ষ থেকেই প্রয়োজন পূরণ হয়, আপনারাই আল্লাহর প্রিয়জন, হামযা সাইয়্যিদুশ শুহাদার মাধ্যমে, এবং আপনাদের মধ্যে কে আমাদের সাহায্যকারী, আমাদের সাহায্য করুন হে আল্লাহর রাসূল।’ অনুরূপ তাদের এ জাতীয় কথাও: “হে আল্লাহ! আপনি তার উপর রহমত বর্ষণ করুন যাকে আপনি আপনার মহিমাময় রহস্যের উন্মোচনের কারণ বানিয়েছেন এবং আপনার রহমতের আলো বিকিরণের কারণ বানিয়েছেন। ফলে তিনি হয়ে গেছেন রাব্বানী দরবারের প্রতিনিধি এবং আপনার স্বীয় রহস্যের খলিফা।”
আপনাদের আগ্রহ ছিল বিদ‘আত কি, শিরক কি তা বর্ণনা করার প্রতি এবং যে ইমাম এই দোয়া দ্বারা দোয়া করে তার পেছনে সালাত আদায় করা সহীহ কি না, এই সবকিছু জানা ছিল?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সেই ব্যক্তির উপর যার পরে কোনো নবী নেই, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর এবং কিয়ামত অবধি যারা তার হিদায়াতের পথে চলবে তাদের ওপর।
অতঃপর, জেনে রাখুন যে, -আল্লাহ আপনাকে তাওফীক দান করুন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সৃষ্টিকূলকে সৃষ্টি করেছেন এবং রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা হয়, যার কোনো শরীক নেই, এবং তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করা হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ56﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। [আয-যারিয়াত: ৫৬]
ইবাদত -যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে- হচ্ছে: আল্লাহ সুবহানাহু ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা; আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান সহকারে, আল্লাহর জন্য কাজের মধ্যে একনিষ্ঠতা সহকারে, আল্লাহর প্রতি পরম ভালোবাসা এবং একমাত্র তাঁর প্রতি পূর্ণ বিনয় সহকারে; যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ...﴾
আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে... [আল-ইসরা: ২৩] অর্থাৎ: তিনি নির্দেশ দিয়েছেন ও অসিয়ত করেছেন যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করা হয়। তিনি আরো বলেন,
﴿الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ2 الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ3 مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ4 إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ5﴾
সকল ‘হাম্দ’ আল্লাহ্র, যিনি সৃষ্টিকুলের রব,
দয়াময়, পরম দয়ালু,
বিচার দিনের মালিক।
আমরা শুধু আপনারই ‘ইবাদাত করি, এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি, [আল-ফাতিহা: ২-৫] সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই আয়াতসমূহের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে, একমাত্র তিনিই ইবাদতের হকদার এবং একমাত্র তারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। তিনি আরো বলেন,
﴿إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ2 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ...﴾
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।
“জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য।” [আয-যুমার: ২-৩] তিনি আরো বলেন,
﴿فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ14﴾
সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [গাফির: ১৪] তিনি আরো বলেন,
﴿وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا18﴾
আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহ্র সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না। [আল-জিন: ১৮] এ বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে, যার সবগুলোই একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদাত করা আবশ্যকতার প্রমাণ করে।
এটি জানা কথা যে, দু‘আ তার বিভিন্ন প্রকারসহ ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কারো জন্য জায়েয নেই যে, সে তার রব ব্যতীত অন্য কারো কাছে দু‘আ করবে, সাহায্য চাইবে বা ফরিয়াদ করবে। এই মহিমান্বিত আয়াতসমূহ এবং এ অর্থে যা এসেছে তার উপর আমল স্বরূপ। এটি সাধারণ বিষয়াদি এবং বাহ্যিক কারণসমূহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যা জীবিত উপস্থিত মাখলুকের ক্ষমতাধীন। কেননা সেগুলো ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং দলীল ও ইজমার ভিত্তিতে জীবিত সক্ষম মানুষের নিকট সাহায্য চাওয়া বৈধ, তার ক্ষমতাধীন সাধারণ বিষয়াদির ক্ষেত্রে; যেমন তার সন্তান বা চাকর বা কুকুর ইত্যাদি বিষয়ের অনিষ্ট দূর করতে তার নিকট সাহায্য ও সহযোগিতা চাওয়া। এবং জীবিত উপস্থিত সক্ষম মানুষের নিকট সাহায্য চাওয়া, অথবা অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট বাহ্যিক কারণসমূহের মাধ্যমে যেমন পত্রালাপ ইত্যাদির মাধ্যমে তার ঘর নির্মাণে, অথবা তার গাড়ি মেরামতে, অথবা এ জাতীয় অন্যান্য বিষয়ে সাহায্য চাওয়া। তন্মধ্যে: জিহাদ ও যুদ্ধে সঙ্গীদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং অনুরূপ বিষয়। এবং এই অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হলো মূসা আলাইহিস সালামের কাহিনী সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:
﴿...فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ...﴾
অতঃপর মূসার দলের লোকটি ওর শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য প্রার্থনা করল [আল-কাসাস: ১৫]
অতএব, মৃত, জিন, ফিরিশতা, গাছপালা ও পাথর ইত্যাদির নিকট ফরিয়াদ করা বড় শির্কের অন্তর্ভুক্ত, যা প্রাচীন মুশরিকদের তাদের দেবতাদের যেমন: উজ্জা, লাত ও অন্যান্যদের সাথে করা কাজের সমতুল্য। তেমনি জীবিতদের মধ্যে যাদেরকে অলী মনে করা হয় তাদের নিকট এমন বিষয়ে ফরিয়াদ ও সাহায্য চাওয়া যা আল্লাহ ছাড়া কেউ করতে সক্ষম নয়; যেমন রোগীদের সুস্থতা, হৃদয়ের হিদায়াত, জান্নাতে প্রবেশ, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং অনুরূপ বিষয়।
উপরোক্ত আয়াতসমূহ এবং এ অর্থে বর্ণিত অন্যান্য আয়াত ও হাদীসসমূহ: সবগুলোই প্রমাণ করে যে, সকল বিষয়ে আল্লাহর প্রতি অন্তরকে নিবদ্ধ করা এবং একমাত্র আল্লাহর জন্যই ইবাদাত বিশুদ্ধ রাখা আবশ্যক; কারণ বান্দাদের এ জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে তাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে -যেমন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন:
﴿وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا...﴾
আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোনো কিছুকে তাঁর শরীক করো না... [আন-নিসা: ৩৬] তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ...﴾
আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে... [আল-বায়্যিনাহ: ৫] এবং মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«حَقُّ اللهِ عَلَى العِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلَا يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا».
"‘বান্দার উপর আল্লাহর হক হচ্ছে তারা তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।’ সহীহ বুখারী ও মুসলিম। ইবনে মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو لِلهِ نِدًّا؛ دَخَلَ النَّارَ».
“যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা গেল যে, সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোন শরীককে ডাকে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সহীহ বুখারী।) সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তাকে বলেলেন:
«إِنَّكَ تَأْتِي قَومًا أَهْلَ كِتَابٍ، فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُم إِلَيهِ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ».
“তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের নিকট যাচ্ছ। সুতরাং তুমি তাদেরকে সর্বপ্রথম এ দাওয়াত দিবে যে, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে:
«اُدْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللهِ».
"তাদেরকে এ কথার দাওয়াত দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল।" বুখারীর অপর এক বর্ণনায় এসেছে:
«فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُم إِلَى أَنْ يُوَحِّدُوا اللهَ».
(সর্বপ্রথম যে বিষয়ে তুমি তাদেরকে দাও‘আত দিবে তা হচ্ছে: তারা যেন আল্লাহর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করে।) সহীহ মুসলিমে তারিক ইবনু আশইয়াম আল আশজায়ী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ قَالَ: لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مِن دُونِ اللهِ؛ حَرُمَ مَالُهُ وُدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللهِ جَلَّ جَلَالُهُ».
"যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলল এবং আল্লাহ ব্যতীত যার ইবাদত করা হয়, তার সাথে কুফরী করল তার জান ও মাল নিরাপদ এবং তার হিসাব আল্লাহর জিম্মায়।" এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
আর এই তাওহীদ হচ্ছে দ্বীন ইসলামের মূল, এটি হচ্ছে মিল্লাতের ভিত্তি, সকল বিষয়ের শীর্ষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরয। এটি হচ্ছে মানব ও জিন জাতি সৃষ্টির হিকমত এবং সকল রাসূলগণের প্রেরণের হিকমত, যেমন পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে এ বিষয়ে প্রমাণ এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণী:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ56﴾
আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে। [আয-যারিয়াত: ৫৬] এ সম্পর্কীত দলীলের মধ্যে আরও রয়েছে: আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ...﴾
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর... [আন-নাহল: ৩৬] তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ25﴾
আর আপনার পূর্বে আমরা যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমরাই ইবাদাত কর। [আল-আম্বিয়া: ২৫] আল্লাহ জাল্লা জালালুহু নূহ, হুদ, সালিহ ও শু‘আইব আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কে বলেন, তারা তাদের কওমকে বলেছিলেন:
﴿...اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ...﴾
আল্লাহ্র ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই [আল-আরাফ, আয়াত: ৫৯] আর এটাই সকল রাসূলগণের দাওয়াত, যেমন পূর্ববর্তী দুই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলদের শত্রুরাও স্বীকার করেছে যে, রাসূলগণ তাদেরকে ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্বের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদাত করা হয়, তাদেরকে বর্জন করতে বলেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা আদ জাতির কাহিনীতে উল্লেখ করেছেন যে, তারা হুদ আলাইহিস সালামকে বলেছিল:
﴿...أَجِئْتَنَا لِنَعْبُدَ اللَّهَ وَحْدَهُ وَنَذَرَ مَا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا...﴾
...তুমি কি আমাদের কাছে এ উদ্দেশ্যে এসেছ যে, আমরা যেন এক আল্লাহ্র ইবাদত করি এবং আমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদত করত তা ছেড়ে দেই... [আল-আরাফ: ৭০] মহান ও পবিত্র আল্লাহ কুরাইশদের সম্পর্কে বলেন, যখন আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছিলেন এবং তাদেরকে আল্লাহ ছাড়া সব ফেরেশতা, অলী, মূর্তি ও গাছপালা ইত্যাদি পূজা করত তা পরিত্যাগ করতে বলেছিলেন, তখন তারা বলেছিলেন:
﴿أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ5﴾
'সে কি বহু ইলাহকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? এটা তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার!' [সোয়াদ: ৫] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাদের সম্পর্কে আরো বলেন,
﴿إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ35 وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوٓاْ ءَالِهَتِنَا لِشَاعِرٖ مَّجۡنُونِۭ36﴾
তাদেরকে 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ বলা হলে তারা অহংকার করত
এবং বলত, 'আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে বর্জন করব?' [আস-সাফফাত, আয়াত: ৩৫-৩৬] এ বিষয়টি প্রমাণকারী আরো অনেক আয়াত রয়েছে।
আমরা যেসব আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করেছি তা থেকে তোমার জন্য স্পষ্ট হবে - আল্লাহ আমাকে ও তোমাকে দ্বীনের ফিকহ ও রব্বুল আলামিনের হক সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি দান করুন - যে, এই দো‘আসমূহ এবং বহু রকমের ফরিয়াদ - যা তুমি তোমার প্রশ্নে উল্লেখ করেছ - সবই বড় শিরকের প্রকারভুক্ত; কারণ এগুলো আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত এবং মৃত ও অনুপস্থিতদের নিকট এমন বিষয় প্রার্থনা করা যা কেবলমাত্র আল্লাহর ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। এটি পূর্ববর্তীদের শিরকের চেয়েও নিকৃষ্ট; কারণ পূর্ববর্তীরা কেবল স্বাচ্ছন্দ্যের সময়েই শিরক করত। তবে যখন তারা সংকটে পতিত হতো তখন তারা আল্লাহর জন্য ইবাদাতকে একনিষ্ঠ করতো। কেননা তারা জানত যে তিনিই তাদেরকে সংকট থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম, অন্য কেউ নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা তার সুস্পষ্ট কিতাবে ঐ মুশরিকদের সম্পর্কে বলেছেন:
﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ65﴾
অতঃপর তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা আনুগত্যে বিশুদ্ধ হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্কে ডাকে। তারপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়। [আল-আনকাবূত: ৬৫] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অন্য এক আয়াতে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন:
﴿وَإِذَا مَسَّكُمُ ٱلضُّرُّ فِي ٱلۡبَحۡرِ ضَلَّ مَن تَدۡعُونَ إِلَّآ إِيَّاهُۖ فَلَمَّا نَجَّىٰكُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ أَعۡرَضۡتُمۡۚ وَكَانَ ٱلۡإِنسَٰنُ كَفُورًا67﴾
আর সাগরে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ করে তখন শুধু তিনি ছাড়া অন্য যাদেরকে তোমরা ডেকে থাক তারা হারিয়ে যায়; অতঃপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। আর মানুষ খুবই অকৃতজ্ঞ। [আল-ইসরা: ৬৭]
যদি এই পরবর্তী যুগের মুশরিকদের কেউ বলে: আমরা তো উদ্দেশ্য করি না যে এরা নিজের শক্তি দ্বারা উপকার করে, আমাদের রোগ নিরাময় করে, কল্যাণ বা ক্ষতি করে, বরং আমরা আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাদের সুপারিশ কামনা করি?
উত্তর হল: তাকে বলা হবে, এটাই ছিল প্রাচীন কাফিরদের উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল না যে তাদের ইলাহরা সৃষ্টি করে বা রিযিক দেয়, বা নিজেরা উপকার বা ক্ষতি করতে পারে। কারণ আল্লাহ তাদের সম্পর্কে কুরআনে যা উল্লেখ করেছেন তা এই ধারণাকে বাতিল করে দেয়। তারা তাদের সুপারিশ ও মর্যাদা চেয়েছিল, এবং আল্লাহর নিকট তারা যেন নৈকট্য এনে দেয় তা চেয়েছিল, যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
﴿وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ...﴾
আর তারা আল্লাহ্ ছাড়া এমন কিছুর ‘ইবাদাত করছে যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, ‘এগুলো আল্লাহ্র কাছে আমাদের সুপারিশকারী। [ইউনুস: ১৮] ফলে আল্লাহ তা‘আলা এই বাণী দ্বারা তাদের কথার প্রত্যুত্তর করেছেন:
﴿...قُلۡ أَتُنَبِّـُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ﴾
বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্কে আসমানসমূহ ও যমীনের এমন কিছুর সংবাদ দেবে যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, ‘পবিত্র এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধে। [ইউনুস: ১৮] অতঃপর তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আসমান ও যমীনে তাঁর নিকট কোনো সুপারিশকারী জানেন না, যেমনটি মুশরিকরা ধারণা করে। করে। আর আল্লাহ্ যেটির অস্তিত্ব জানেন না, তার কোনো অস্তিত্ব নেই; কারণ তাঁর কাছে কোনো কিছুই গোপন থাকে না। তিনি আরো বলেন,
﴿تَنزِيلُ ٱلۡكِتَٰبِ مِنَ ٱللَّهِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡحَكِيمِ 1 إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ بِٱلۡحَقِّ فَٱعۡبُدِ ٱللَّهَ مُخۡلِصٗا لَّهُ ٱلدِّينَ2 أَلَا لِلَّهِ ٱلدِّينُ ٱلۡخَالِصُۚ وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ3﴾
এ কিতাব পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকে নাযিল হওয়া।
নিশ্চয় আমরা আপনার কাছে এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। কাজেই আল্লাহর 'ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।
জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ১-৩]
এখানে দ্বীনের অর্থ হল: ইবাদত, যা হল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা -যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে-। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনা, ভয় ও আশা, কুরবানি ও মানত। এছাড়া এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: সালাত ও সিয়াম, এবং অন্যান্য যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আদেশ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা স্পষ্ট করেছেন যে, ইবাদত একমাত্র তাঁরই জন্য। আর বান্দাদের উপর তাঁর জন্য ইবাদতকে ইখলাস করা আবশ্যক; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইবাদত তাঁর জন্য ইখলাস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা এই উম্মতের সকল সদস্যের জন্য নির্দেশ।
তারপরে আল্লাহ কাফেরদের ব্যাপারে স্পষ্ট করেছেন এবং বলেছেন:
﴿...وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ...﴾
আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।' [আয-যুমার: ৩] ফলে আল্লাহু সুবহানাহু তাদের প্রতিবাদ করে বলেন:
﴿...إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ৩] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই মহিমান্বিত আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফিররা আল্লাহর পরিবর্তে অলিদের ইবাদত করে কেবল এ জন্য যে, যেন তারা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়; আর এটাই প্রাচীন ও আধুনিক কাফিরদের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা বাতিল করেছেন তাঁর এ বাণীতে:
﴿...إِنَّ ٱللَّهَ يَحۡكُمُ بَيۡنَهُمۡ فِي مَا هُمۡ فِيهِ يَخۡتَلِفُونَۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ كَٰذِبٞ كَفَّارٞ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [আয-যুমার: ৩] আল্লাহ সুবহানাহু স্পষ্ট করে দিয়েছেন: তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা যে, তাদের উপাস্যরা তাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি পৌঁছে দেবে, এবং তারা যে ইবাদত এই মিথ্যা উপাস্যদের জন্য উৎসর্গ করেছে, তা তাদের কুফরের প্রমাণ। এভাবে, যার সামান্যতম বোধশক্তি আছে সে বুঝতে পারবে যে, প্রাচীন কাফেরদের কুফরি ছিল তাদের নবী, অলী, গাছপালা, পাথর এবং অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুসমূহকে আল্লাহর সাথে তাদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করার কারণে। আর তারা বিশ্বাস করে যে তারা আল্লাহ্র অনুমতি ও সন্তুষ্টি ব্যতীত তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, যেমন মন্ত্রীরা রাজাদের কাছে সুপারিশ করে। তারা আল্লাহ্কে রাজা ও নেতাদের সাথে তুলনা করে। এবং তারা বলে: যেমনভাবে রাজা ও নেতার কাছে যার কোনো প্রয়োজন থাকে, সে তার ঘনিষ্ঠজন ও মন্ত্রীদের মাধ্যমে সুপারিশ করে, তেমনিভাবে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করি তাঁর নবী ও অলীদের ইবাদতের মাধ্যমে। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কারণ আল্লাহর তাআলার কোনো সমকক্ষ নেই, এবং তাকে তাঁর কোন সৃষ্টির সাথে তুলনা করা যায় না। তাঁর কাছে কেউ সুপারিশ করতে পারে না তাঁর অনুমতি ছাড়া, এবং তিনি শুধুমাত্র তাওহীদবাদীর জন্যই অনুমতি দেন। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান ও সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞাত, তিনি সবচেয়ে দয়ালু, কারো ভয় করেন না এবং কারো থেকে ভীত নন। কারণ তিনি স্বীয় বান্দাদের ওপর সর্বশক্তিমান, এবং তাদের মধ্যে ইচ্ছামতো পরিচালনা করেন। এর বিপরীতে, দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ ও নেতারা সবকিছু করতে সক্ষম নয়। তাই তারা এমন কাউকে প্রয়োজন অনুভব করে, যারা তাদের সাহায্য করতে পারে—যেমন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সেনাবাহিনী। তারা জানে না কার কী প্রয়োজন, তাই এমন ব্যক্তিদের প্রয়োজন হয় যারা তাদের কাছে জনগণের চাহিদা পৌঁছে দেয়, তাদের কাছে অনুরোধ পৌঁছে দেয় ও তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু মহান রব আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সমস্ত সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি তাদের মায়েদের চেয়েও তাদের প্রতি অধিক দয়ালু। তিনি ন্যায়বিচারক, যিনি তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও ক্ষমতার আলোকে সবকিছু যথাস্থানে স্থাপন করেন। তাই কোন দিক থেকেই তাকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করা যায় না। এ কারণেই আল্লাহ স্বীয় কিতাবে স্পষ্ট করেছেন যে, মুশরিকরা স্বীকার করেছে যে, তিনিই স্রষ্টা, রিযিকদাতা ও পরিচালনাকারী এবং তিনিই বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন, কষ্ট দূর করেন, জীবন ও মৃত্যু দান করেন এবং অন্যান্য কাজ করেন। বস্তুত মুশরিকদের সাথে রাসূলদের বিরোধ ছিল একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদতকে খালেস করার ব্যাপারে, যেমন আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেছেন:
﴿َوَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُ...﴾
আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ [আয-যুখরুফ: ৮৭] তিনি আরো বলেন,
﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ31﴾
বলুন, ‘কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে জীবনোপকরণ সরবারহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন এবং মৃতকে কে জীবিত হতে কে বের করেন এবং সব বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন?’ তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ্’। সুতরাং বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?’ [ইউনুস: ৩১] এই অর্থে অনেক আয়াত রয়েছে।
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে ঐ সকল আয়াত যা প্রমাণ করে যে, রাসূলগণ ও জাতিসমূহের মধ্যে বিরোধের বিষয় ছিল একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদতকে খালিস করা। যেমন তিনি বলেন:
﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَ...﴾
আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর... [আন-নাহল: ৩৬] এবং এ অর্থে আরো যেসব আয়াত এসেছে। আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পবিত্র কিতাবের বহু স্থানে শাফা‘আতের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন, যেমন তিনি বলেন:
﴿َ...مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِ...﴾
কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? [আল-বাকারাহ: ২৫৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿وَكَم مِّن مَّلَكٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ لَا تُغۡنِي شَفَٰعَتُهُمۡ شَيۡـًٔا إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ أَن يَأۡذَنَ ٱللَّهُ لِمَن يَشَآءُ وَيَرۡضَىٰٓ26﴾
আর আসমানসমূহে বহু ফিরিশতা রয়েছে; তাদের সুপারিশ কিছুমাত্র ফলপ্রসূ হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতির পর, যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন ও যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট। [আন-নাজম: ২৬]
ফিরিশতাদের গুণাবলী সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন:
﴿...وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ وَهُم مِّنۡ خَشۡيَتِهِۦ مُشۡفِقُونَ﴾
আর তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্যই যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। [আল-আম্বিয়া: ২৮]
এবং তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের থেকে কুফর পছন্দ করেন না, বরং তিনি তাদের থেকে কৃতজ্ঞতা পছন্দ করেন। আর কৃতজ্ঞতা হলো তাঁর তাওহীদ ও আনুগত্যের সাথে কাজ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿إِن تَكۡفُرُواْ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَنِيٌّ عَنكُمۡۖ وَلَا يَرۡضَىٰ لِعِبَادِهِ ٱلۡكُفۡرَۖ وَإِن تَشۡكُرُواْ يَرۡضَهُ لَكُمۡ...﴾
যদি তোমরা কুফরী কর তবে (জেনে রাখ) আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না এবং যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তবে তিনি তোমাদের জন্য তা-ই পছন্দ করেন... [আয-যুমার: ৭]
ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার শাফাআত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে? তিনি বললেন:
«مَنْ قَالَ: لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ».
“যে ব্যক্তি খালেস দিলে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে।” অথবা তিনি বলেছেন:
«مِنْ نَفْسِهِ».
“তার অন্তর থেকে।”
সহীহ বুখারীতে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ، فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ، وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لِأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَهِيَ نَائِلَةٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا».
“প্রত্যেক নবীর জন্য এমন একটি দু’আ রয়েছে, যা গৃহীত হয়। প্রত্যেক নবী তার দু’আ দুনিয়াতে করেছেন, কিন্তু আমি আমার দু’আটিকে কিয়ামত দিবসে আমার উম্মাতের শফায়াতের জন্য রেখে দিয়েছি। আমার উম্মতের যে ব্যাক্তি কোন প্রকার শিরক না করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে ইনশাআল্লাহ আমার এ দোয়া পাবে।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
আমরা যে সমস্ত আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করেছি, তা প্রমাণ করে যে ইবাদাত একমাত্র আল্লাহরই হক এবং তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা জায়েয নয়, না নবীদের জন্য, না অন্য কারো জন্য। আর শাফাআত মহান আল্লাহর মালিকানাধীন বিষয়, যেমনটি তিনি বলেছেন:
﴿قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَٰعَةُ جَمِيعٗا...﴾
বলুন, 'সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন...' [আয-যুমার: ৪৪] আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এবং যার জন্য শাফা‘আত করা হচ্ছে তার প্রতি সন্তুষ্টি ছাড়া কেউই শাফা‘আতের উপযুক্ত নয়। আর তিনি কেবল তাওহীদেই সন্তুষ্ট হন -যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে-। কাজেই এর ভিত্তিতে: মুশরিকদের জন্য শাফাআতে কোনো অংশ নেই। আল্লাহ তা‘আলা তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেছেন:
﴿فَمَا تَنفَعُهُمۡ شَفَٰعَةُ ٱلشَّٰفِعِينَ 48﴾
ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোনো উপকার করবে না ৪৮। [আল-মুদ্দাসসির: ৪৮] তিনি আরো বলেন,
﴿...مَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ حَمِيمٖ وَلَا شَفِيعٖ يُطَاعُ﴾
যালিমদের জন্য কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং এমন কোনো সুপারিশকারীও নেই যার সুপারিশ গ্রাহ্য হবে। [গাফির: ১৮]
এবং জানা কথা যে, সাধারণভাবে জুলুম বলতে আল্লাহর সাথে শিরক করাকেই বোঝায়, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...وَٱلۡكَٰفِرُونَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ﴾
আর কাফেররাই যালিম। [আল-বাকারাহ: ২৫৪] তিনি আরো বলেন,
﴿...إِنَّ ٱلشِّرۡكَ لَظُلۡمٌ عَظِيمٞ﴾
নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম। [ সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩]
আপনি প্রশ্নে যা উল্লেখ করেছেন- যেমন কিছু সুফিরা মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে বলে থাকে: "হে আল্লাহ! তার প্রতি রহমত বর্ষণ কর যাকে তুমি তোমার প্রভুত্বের গোপন রহস্য উদঘাটনের মাধ্যম বানিয়েছ এবং তোমার রহমতের আলো বিকিরণের কারণ বানিয়েছো। ফলে সে হয়ে গেছে রাব্বানী দরবারের প্রতিনিধি এবং তোমার স্বীয় রহস্যের খলিফা... ইত্যাদি।”
উত্তর হলো: বলা যায় যে, এই কথাবার্তা ও অনুরূপ বিষয়সমূহ কৃত্রিমতা ও অতিরঞ্জনের অন্তর্ভুক্ত; যা থেকে আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন; যেমনটি মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«هَلَكَ المُتَنَطِّعُونَ» قَالَهَا ثَلَاثًا.
“সীমালঙ্ঘনকারীরা ধ্বংস হোক।” এটি তিনবার বলেছেন।
ইমাম খাত্তাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: মুতানাত্তি: যিনি কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত গভীরতা অনুসন্ধান করেন, কষ্টসাধন করে তার অনুসন্ধান করেন। এটি হল এমন ব্যক্তিদের মতবাদ যারা অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রবেশ করে এবং এমন বিষয়ে আলোচনা করে যা তাদের বুদ্ধি দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না।
আবু সা'দাত ইবনুল আছীর বলেন: তারা হলেন কথা অতিমাত্রায় অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করা ব্যক্তিরা, যারা তাদের কণ্ঠের গভীরতম স্থান থেকে কথা বলেন। এটি 'নাত' শব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে, যা মুখের উপরের গহ্বরকে বোঝায়। পরে এটি প্রতিটি অতিরঞ্জনমূলক কথা ও কাজ করা ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
আর এই ভাষাবিদ দুই ইমাম যা উল্লেখ করেছেন, তা থেকে আপনার এবং যাদের ন্যূনতম অন্তর্দৃষ্টি আছে তাদের জন্য স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমাদের নবী ও সর্দার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত ও সালাম পেশ করার এই পদ্ধতি কৃত্রিমতা ও কঠোরতার অন্তর্ভুক্ত, যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একজন মুসলিমের জন্যে শরীয়তসম্মত হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সালাত ও সালাম পাঠের প্রমাণিত পদ্ধতি অনুসরণ করা, এবং এতে অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই।
এর মধ্যে রয়েছে: সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, কা‘ব বিন উজরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আমাদেরকে আপনার উপর সালাত পাঠ করতে আদেশ করেছেন; তাহলে আমরা কিভাবে আপনার উপর সালাত পাঠ করবো? তিনি বললেন:
«قُولُوا: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ».
“তোমরা বলো:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদের উপর এবং মুহাম্মাদের বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদের উপর এবং মুহাম্মাদের বংশধরদের উপর বরকত দান করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের বংশধরদের উপর বরকত দান করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী।”
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুমাইদ আস-সাঈদী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তারা বললেন: হে রাসূলুল্লাহ! আমরা কিভাবে আপনার উপর সালাত প্রেরণ করব? তিনি বললেন:
«قُولُوا: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ».
“তোমরা বলো:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى أَزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.
“হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ এবং তার স্ত্রীগণ ও সন্তানদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীমের বংশের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ এবং তার স্ত্রীগণ ও সন্তানদের উপর তেমনি বরকত দান করুন যেমনি বরকত দান করেছেন ইবরাহীমের বংশের উপর। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী।”
আর সহীহ মুসলিমে আবূ মাসউদ আনসারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, বশীর বিন সা‘দ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আমাদেরকে আপনার উপর সালাত পেশ করতে আদেশ করেছেন; তবে কীভাবে আপনার উপর সালাত পেশ করবো? তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন, তারপর বললেন:
«قُولُوا: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ؛ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ؛ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ فِي العَالَمِينَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَالسَّلَامُ كَمَا عَلِمتُم».
তোমরা বলো:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ؛ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ؛ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى آلِ إِبرَاهِيمَ فِي العَالَمِينَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.
আর সালাম তো যেমনটি তোমরা জেনেছো।”
এই শব্দসমূহ এবং এজাতীয় অন্যান্য শব্দ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে। মুসলিমদের উচিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত ও সালাম পাঠানোর ক্ষেত্রে এগুলোই ব্যবহার করা; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে শব্দসমূহ তার জন্য উপযুক্ত সে সম্পর্কে অধিক অবগত যেমন তিনি সর্বাধিক জ্ঞানী যে শব্দসমূহ তার রবের জন্য উপযুক্ত।
পক্ষান্তরে, কৃত্রিম ও নব উদ্ভাবিত শব্দসমূহ এবং এমন শব্দসমূহ যা ভুল অর্থের সম্ভাবনা রাখে-যেমন প্রশ্নে উল্লেখিত শব্দসমূহ- সেগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়; কেননা এতে কৃত্রিমতা রয়েছে এবং সেগুলি ভুল অর্থে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। তাছাড়া এগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে শব্দসমূহ পছন্দ করেছেন এবং তার উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন তার বিপরীত, যিনি সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী, সর্বাধিক কল্যাণকামী এবং সর্বাধিক কৃত্রিমতা মুক্ত। তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বোত্তম সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।
আশা করি, আমরা যা উল্লেখ করেছি, তা তাওহীদের প্রকৃত রূপ, শিরকের প্রকৃত রূপ, এবং এই বিষয়ে প্রাচীন মুশরিকদের অবস্থা ও আধুনিক মুশরিকদের অবস্থার মধ্যে পার্থক্য, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর প্রযোজ্য সালাতের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট ও সন্তোষজনক হবে সত্যের অনুসন্ধানকারীর জন্য। পক্ষান্তরে, যার সত্য জানার ইচ্ছা নেই; সে তো তার প্রবৃত্তির অনুসারী। আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেন:
﴿فَإِن لَّمۡ يَسۡتَجِيبُواْ لَكَ فَٱعۡلَمۡ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهۡوَآءَهُمۡۚ وَمَنۡ أَضَلُّ مِمَّنِ ٱتَّبَعَ هَوَىٰهُ بِغَيۡرِ هُدٗى مِّنَ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ50﴾
তারপর তারা যদি আপনার ডাকে সাড়া না দেয়, তাহলে জানবেন তারা তো শুধু নিজেদের খেয়াল-খুশীরই অনুসরণ করে। আর আল্লাহ্র পথ নির্দেশ অগ্রাহ্য করে যে ব্যক্তি নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে তার চেয়ে বেশী বিভ্রান্ত আর কে? আল্লাহ্ তো যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না। [আল-কাসাস: ৫০]
আল্লাহ সুবহানাহু এই মহিমান্বিত আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে হিদায়াত ও সত্য ধর্ম দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার ব্যাপারে মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত।
এক: আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি সাড়া প্রদানকারী।
দ্বিতীয়: সে তার প্রবৃত্তির অনুসারী; অতঃপর মহান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর হিদায়াত ছেড়ে যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কেউ নেই।
সুতরাং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্তি দান করেন এবং আমাদের, আপনাদের ও আমাদের সকল মুসলিম ভাইদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সাড়া দেয়ার তাওফীক দান করেন, তাঁর শরীয়তকে সম্মান করার এবং যা তাঁর শরীয়তের বিরোধী, যেমন বিদআত ও প্রবৃত্তি, তা থেকে সতর্ক থাকার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি দানশীল, মহানুভব।
আর আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসুল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবারবর্গ, সাহাবাগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত সৎভাবে তার অনুসরণকারীদের প্রতি শান্তি নাযিল করুন!
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পঞ্চম পুস্তিকা:
মীলাদুন্নবী ও অন্যান্য মীলাদ উদযাপনের বিধান
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর এবং যারা তার পথ অনুসরণ করে তাদের ওপর।
অতঃপর: অনেকের পক্ষ থেকে বারবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মীলাদ উদযাপনের বিধান সম্পর্কে এবং এ সময় তার জন্য দাঁড়ানো, তাকে সালাম প্রদান করা ও মীলাদে যা কিছু করা হয় সে সম্পর্কে প্রশ্ন এসেছে।
এর উত্তর হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিবস অথবা অন্য কোনো মীলাদ উদযাপন করা জায়েয নয়; কারণ এটি দ্বীন ইসলামে সৃষ্ট নতুন বিদ‘আত। এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং তাদের অনুসরণকারী তাবে‘য়ীগণ উদযাপন করেননি; যারা শ্রেষ্ঠ যুগের মানুষ ছিলেন। তারা সুন্নাহ সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সবচেয়ে বেশি মহব্বত পোষণকারী ও তার শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণকারী ছিলেন। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে বলেছেন:
﴿...وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْ...﴾
রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ কর তা থেকে বিরত থাক
[আল-হাশর: ৭] তিনি আরো বলেন:
﴿...فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ﴾
কাজেই যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের উপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [আন-নূর: ৬৩] তিনি আরো বলেছেন:
﴿لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرٗا21﴾
অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আর্দশ, তার জন্য যে আসা রাখে আল্লাহ্ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহ্কে বেশী স্মরণ করে। [আল-আহযাব: ২১] তিনি আরো বলেন,
﴿وَٱلسَّٰبِقُونَ ٱلۡأَوَّلُونَ مِنَ ٱلۡمُهَٰجِرِينَ وَٱلۡأَنصَارِ وَٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُم بِإِحۡسَٰنٖ رَّضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُ وَأَعَدَّ لَهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي تَحۡتَهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدٗاۚ ذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ100﴾
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তিনি তাদের জন্য তৈরী করেছেন জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এ তো মহাসাফল্য। [আত-তাওবাহ: ১০০] তিনি আরো বলেন,
﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا...﴾
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [আল-মায়েদা: ৩] এই অর্থে অনেক আয়াত রয়েছে। অথচ প্রমাণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنهُ فَهُوَ رَدٌّ».
“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” অর্থাৎ তার উপর এটি প্রত্যাখ্যাত হবে। অপর হাদিসে তিনি বলেন:
«عَلَيكُم بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيَّينَ مِنْ بَعدِي، تَمَسَّكُوا بِهَا، وَعَضُّوا عَلَيهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالةٌ».
“তোমাদের উপর আবশ্যক হলো আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত অনুসরণ করা। আর তোমরা তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা নতুন সৃষ্ট কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি নতুন সৃষ্ট কাজই বিদআত, আর সকল বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।” এই দুইটি হাদীসে বিদ‘আত সৃষ্টি এবং তা পালন করা থেকে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।
এ ধরনের মীলাদ উদযাপন থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করেননি এবং রাসূল আলাইহিস সালাম উম্মতের জন্য যা পালনীয় তা পৌঁছে দেননি! ফলে পরবর্তীরা এসে আল্লাহর শরীয়তে এমন কিছু সংযোজন করলো যা তিনি অনুমোদন করেননি; এই ধারণা থেকে যে এটি তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে। নিঃসন্দেহে, এটি একটি ভয়ানক বিপদ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতা। অথচ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং তাদের ওপর নিআমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বাণী পৌঁছে দিয়েছেন এবং জান্নাতে পৌঁছানোর ও জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার কোনো পথ তিনি উম্মতের জন্য অপ্রকাশিত রাখেননি। যেমন সহীহ হাদীসে আবদুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَا بَعَثَ اللهُ مِن نَبِيٍ إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَيهِ أَن يَدُلَّ أُمَّتَهُ عَلَى خَيرِ مَا يَعْلَمُهُ لَهُم، وَيُنْذِرَهُمْ شَرَّ مَا يَعْلَمُهُ لَهُمْ».
“আল্লাহ্ যখনই কোন নবী প্রেরণ করেন, তখনই তার উপর আবশ্যক ছিল যে তিনি তার উম্মতের জন্য যা কল্যাণকর জানবেন তা তাদেরকে জানিয়ে দিবেন এবং তাদের জন্য যা ক্ষতিকর জানবেন তা থেকে তাদেরকে সতর্ক করবেন।” (সহীহ মুসলিম)।
এটা জানা কথা যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী এবং বাণী প্রচার ও উপদেশ প্রদানে সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ। যদি মীলাদ উদযাপন ধর্মের অংশ হতো যা আল্লাহর পছন্দ, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উম্মতের জন্য স্পষ্ট করতেন, অথবা নিজ জীবদ্দশায় তা পালন করতেন, অথবা তার সাহাবীগণ তা পালন করতেন। যেহেতু এর কিছুই ঘটেনি, তাই জানা গেল যে, এটি ইসলামের কোনো অংশ নয়, বরং এটি নতুন উদ্ভাবিত বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে সতর্ক করেছেন, যেমনটি হাদীসগুলোতে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়ে আরো অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে।
অনেক আলেম মীলাদ উদযাপনের বিরোধিতা করেছেন এবং এর থেকে সতর্ক করেছেন; উল্লেখিত দলীল ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে। কিছু পরবর্তী যুগের আলেম ভিন্নমত পোষণ করেছেন: তারা এটিকে বৈধ বলেছেন যদি এতে কোন অবৈধ কাজ না থাকে; যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রশংসা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং শরী‘আত যা প্রত্যাখ্যান করে এমন অন্যান্য বিষয়। তারা মনে করেছেন যে এটি একটি বিদআতে হাসানা।
অথচ শরী‘আতের মূলনীতি হলো: যে বিষয়ে মানুষের মধ্যে মতবিরোধ হয়, তা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর দিকে প্রত্যার্পণ করা, যেমন আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেছেন:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا59﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, আরও আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের, অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থায় উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর। [আন-নিসা: ৫৯] তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَا ٱخۡتَلَفۡتُمۡ فِيهِ مِن شَيۡءٖ فَحُكۡمُهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ ...﴾
আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করা না কেন---তার ফয়সালা তো আল্লাহরই কাছে। [আশ-শূরা: ১০]
আমরা এই বিষয়টি তথা মীলাদ উদযাপনকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কিতাবের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছি, যেখানে আমরা দেখতে পাই যে, এ কিতাব আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছে যা তিনি নিয়ে এসেছেন সে বিষয়ে এবং যা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে আমাদের সতর্ক করেছে। আমাদেরকে এও জানিয়েছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই উম্মতের জন্য তাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন। আর এই উদযাপন সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে আসেননি। সুতরাং এটি সেই দ্বীনের অংশ নয় যা আল্লাহ আমাদের জন্য পরিপূর্ণ করেছেন এবং যার ক্ষেত্রে আমাদেরকে রাসূলের অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আমরা এটিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের দিকেও ফিরিয়ে দিয়েছি; কিন্তু সেখানে আমরা পাইনি যে তিনি কখনো এটি পালন করেছেন, বা এর আদেশ দিয়েছেন, বা তার সাহাবীগণ এটি পালন করেছেন। ফলে আমরা জানতে পারলাম যে এটি দ্বীনের কোন অংশ নয়, বরং এটি নতুন সৃষ্ট বিদআত এবং ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের তাদের উৎসবের ক্ষেত্রে অনুসরণের অন্তর্ভুক্ত।
এ থেকে প্রতিটি বিবেকবান ও সত্যের প্রতি আগ্রহী এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মীলাদ উদযাপন ইসলামের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং এটি নতুন সৃষ্ট বিদ‘আত, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিত্যাগ করতে এবং তা থেকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এবং জ্ঞানী ব্যক্তির উচিত নয় যে, বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক মানুষকে এটি উদযাপন করতে দেখে বিভ্রান্ত হওয়া; কারণ সত্যের পরিচয় অধিক সংখ্যক কর্মীর মাধ্যমে হয় না, বরং তা হয় শরীয়তের প্রমাণ দ্বারা, যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে বলেছেন:
﴿وَقَالُواْ لَن يَدۡخُلَ ٱلۡجَنَّةَ إِلَّا مَن كَانَ هُودًا أَوۡ نَصَٰرَىٰۗ تِلۡكَ أَمَانِيُّهُمۡۗ قُلۡ هَاتُواْ بُرۡهَٰنَكُمۡ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ111﴾
আর তারা বলে, ‘ইয়াহুদী অথবা নাসারা ছাড়া অন্য কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। এটা তাদের মিথ্যা আশা। বলুন, ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর’। [আল-বাকারাহ: ১১১] তিনি আরো বলেন,
﴿وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ...﴾
আর যদি আপনি যমীনের অধিকাংশ লোকের কথামত চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুত করবে... [আল-আনআম: ১১৬]
তারপর এই মীলাদ উদযাপনসমূহের অধিকাংশই বিদ‘আত হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য ন্যাক্কারজনক বিষয় থেকেও মুক্ত নয়; যেমন: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, গান-বাজনার ব্যবহার, মাদকদ্রব্য ও নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করা এবং অন্যান্য অশুভ কাজ থেকে। এতে অনেক সময় এমন কিছুও ঘটে থাকে যা তার চেয়েও ভয়াবহ, আর তা হলো বড় শিরক। এটি ঘটে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অথবা অন্য কোন অলীর ব্যাপারে অতিরঞ্জন করে এবং তাদেরকে ডাকা, তাদের নিকট ফরিয়াদ করা, তাদের থেকে মদদ চাওয়া ও তাদেরকে গায়েবের জ্ঞানী মনে করা ইত্যাদি কুফরী বিষয়ের মাধ্যমে, যা অনেক মানুষ সংঘটিত করে থাকে যখন তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মীলাদ বা তাদের ভাষায় অলীদের মীলাদ উদযাপন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:
«إِيَّاكُم وَالغُلُوُّ فِي الدِّينِ، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَن كَانَ قَبْلَكُم الغُلُوَّ فِي الدِّينِ».
“তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাক। কেননা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়িই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করেছে।” নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াসসালাম আরো বলেছেন:
«لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، إِنَّمَا أَنَا عَبدٌ، فَقُولُوا: عَبدُ اللهِ وَرَسُولُه».
“তোমরা আমার বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমনটি খৃষ্টানরা ইবন মারইয়্যাম সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি কেবল একজন বান্দা। তাই তোমরা বল, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।” ইমাম বুখারী উমর রাযি. থেকে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
আর আশ্চর্যজনক ও বিস্ময়কর বিষয় হলো: অনেক মানুষ এই বিদআতী উৎসবসমূহে উপস্থিত হতে সক্রিয় ও পরিশ্রমী হয়, এবং এগুলোর পক্ষে সাফাই গায়, অথচ আল্লাহ তাদের উপর যে জুম‘আ ও জামাতে উপস্থিত হওয়া ফরজ করেছেন তা থেকে পিছিয়ে থাকে, তাতে গুরুত্ব দেয় না এবং মনে করে না যে সে একটি বড় মুনকার কাজ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি ঈমানের দুর্বলতা, অন্তর্দৃষ্টির অভাব এবং নানা পাপ ও অবাধ্যতার কারণে হৃদয়ে যে ব্যাপক মরিচা পড়েছে তার ফল। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের এবং সকল মুসলমানদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।
এর মধ্যে রয়েছে: কিছু লোক মনে করে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মীলাদুন্নবীতে উপস্থিত হন; এজন্য তারা তাকে অভিবাদন জানায় এবং স্বাগত জানিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, যা সবচেয়ে বড় মিথ্যা এবং জঘন্য অজ্ঞতা। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন পর্যন্ত তার কবর থেকে বের হবেন না, কারো সাথে যোগাযোগ করবেন না এবং তাদের সমাবেশে উপস্থিত হবেন না। বরং তিনি কিয়ামত পর্যন্ত তার কবরেই অবস্থান করবেন এবং তার রূহ তার রবের কাছে সম্মানিত স্থানে উচ্চ মর্যাদায় অবস্থান করছে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ثُمَّ إِنَّكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ لَمَيِّتُونَ15 ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ16﴾
এরপর তোমরা নিশ্চয় মরবে,
তারপর কেয়ামতের দিন নিশ্চয় তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে। [আল-মুমিনূন: ১৫,১৬]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«أَنَا أَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ القَبْرُ يَومَ القِيَامَةِ، وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ، وَأَوًّلُ مُشَفَّعٍ».
“কিয়ামতের দিন আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর বিদীর্ণ হবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি।” তার উপর তার রবের পক্ষ থেকে বর্ষিত হোক সর্বোত্তম সালাত ও সালাম।
এই দুইটি মহিমান্বিত আয়াত ও পবিত্র হাদীস এবং এ অর্থে বর্ণিত অন্যান্য আয়াত ও হাদীসসমূহ: সবই প্রমাণ করে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অন্যান্য মৃত ব্যক্তিরা কেবল কিয়ামতের দিন তাদের কবর থেকে বের হবেন। এটি মুসলিম আলেমদের মধ্যে সর্বসম্মত বিষয়; এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উচিত এই বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং জাহিল ও অনুরূপ ব্যক্তিদের দ্বারা উদ্ভাবিত বিদ‘আত ও কুসংস্কার থেকে সতর্ক থাকা; যা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়। আল্লাহই সহায়ক, তারই উপর নির্ভরতা, এবং তার সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।
অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত ও সালাম পাঠ: এটি সর্বোত্তম নৈকট্য ও সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
﴿إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَٰٓئِكَتَهُۥ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِيِّۚ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيۡهِ وَسَلِّمُواْ تَسۡلِيمًا56﴾
নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দোআ-ইসতেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও। [আল-আহযাব: ৫৬], নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً؛ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ بِهَا عَشْرًا».
“যে আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন।” এটি সকল সময়ে শরীয়তসম্মত এবং প্রতি ওয়াক্ত সালাতের শেষে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বরং অনেক আলেমের মতে, প্রতিটি সালাতের শেষ তাশাহহুদে এটি পাঠ করা ওয়াজিব। এর সুন্নাত হওয়া বহু ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব পায়; এর মধ্যে রয়েছে আজানের পর, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম উচ্চারণের সময় এবং জুমুআর দিন ও রাতে, যেমনটি অনেক হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে।
আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এবং সকল মুসলিমকে তার দ্বীনের গভীর বুঝ দান করেন ও তাতে দৃঢ় থাকার তাওফীক দান করেন এবং সকলকে সুন্নাতের অনুসরণ ও বিদআত থেকে সতর্ক থাকার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি দানশীল, মহানুভব।
আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবার পরিজন এবং সাহাবীদের ওপর।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
ষষ্ঠ পুস্তিকা:
লাইলাতুল ইসরা ও মেরাজ উদযাপনের বিধান
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর এবং তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর।
অতঃপর: কোন সন্দেহ নেই যে, ইসরা এবং মি‘রাজ আল্লাহর মহান নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম, যা তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতার প্রমাণ এবং আল্লাহর নিকট তার বিশাল মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার অসীম ক্ষমতার নিদর্শন এবং তাঁর সকল সৃষ্টির উপর উচ্চতার প্রমাণ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
﴿سُبۡحَٰنَ ٱلَّذِيٓ أَسۡرَىٰ بِعَبۡدِهِۦ لَيۡلٗا مِّنَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ إِلَى ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡأَقۡصَا ٱلَّذِي بَٰرَكۡنَا حَوۡلَهُۥ لِنُرِيَهُۥ مِنۡ ءَايَٰتِنَآۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ1﴾
পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ত্ৰমণ করালেন, আল-মসজিদুল হারাম থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমরা দিয়েছি বরকত, যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। [আল-ইসরা: ০১]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তাকে আসমানসমূহে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছিল, এমনকি তিনি সপ্তম আসমান অতিক্রম করে গেছিলেন। সেখানে তার প্রতিপালক আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তার সাথে যা ইচ্ছা কথা বললেন এবং তার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছিলেন, কিন্তু আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার তাঁর কাছে ফিরে গিয়ে তা সহজ করার আবেদন করলেন, অবশেষে তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এটি আদায় করার ক্ষেত্রে পাঁচ ওয়াক্ত, কিন্তু সওয়াবের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত; কারণ প্রতিটি নেক আমলের জন্য দশগুণ সওয়াব রয়েছে। আল্লাহর সমস্ত নিয়ামতের জন্য তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
যে রাতে ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে রজব বা অন্য কোনো মাসে সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে সহীহ হাদীসে উল্লেখ হয়নি। এর নির্দিষ্টতার ব্যাপারে যা কিছু এসেছে, তা হাদীস সম্পর্কে বিজ্ঞদের নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। এটি মানুষদের ভুলিয়ে দেওয়ার মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার গভীর হিকমত রয়েছে। যদি এর নির্দিষ্টতা প্রমাণিত হতো, তবুও মুসলিমদের জন্য তা কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা জায়েয হতো না এবং তাদের জন্য তা উদযাপন করাও জায়েয হতো না; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম তা উদযাপন করেননি এবং তা কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করেননি। এবং যদি এ রাত উদযাপন করা শরীয়ত সম্মত হতো, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বা কাজের মাধ্যমে উম্মতের নিকট তা স্পষ্ট করতেন। যদি এমন কিছু ঘটতো, তবে তা জানা যেত ও প্রসিদ্ধ হতো এবং সাহাবীগণ তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। তারা তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে উম্মতের প্রয়োজনীয় সবকিছুই পৌঁছে দিয়েছেন এবং দ্বীনের কোনো বিষয়েই অবহেলা করেননি। বরং তারা সর্বপ্রথম কল্যাণের দিকে অগ্রগামী হয়েছেন। সুতরাং যদি এ রাত উদযাপন করা শরীয়ত সম্মত হতো, তবে তারাই এ কাজে অগ্রগামী হতেন। বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম কল্যাণকামী, তিনি রিসালত সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দিয়েছেন এবং আমানত আদায় করেছেন। সুতরাং যদি এই রাতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও উদযাপন করা আল্লাহর দ্বীনের অংশ হতো, তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা উপেক্ষা করতেন না এবং গোপন রাখতেন না। যেহেতু এমন কিছু ঘটেনি, তাই জানা গেল যে, এর উদযাপন ও এটিকে গুরুত্বারোপ করা ইসলামের অংশ নয়। আল্লাহ এই উম্মতের জন্য তাদের দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং তাদের উপর তাঁর নিআমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। আর তিনি তাদের নিন্দা করেছেন যারা দ্বীনে এমন কিছু প্রবর্তন করে যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি। এ মর্মে তিনি তাঁর সুস্পষ্ট কিতাবে বলেছেন:
﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا...﴾
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [আল-মায়েদা: ৩] তিনি আরো বলেন:
﴿أَمۡ لَهُمۡ شُرَكَٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُۚ وَلَوۡلَا كَلِمَةُ ٱلۡفَصۡلِ لَقُضِيَ بَيۡنَهُمۡۗ وَإِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ21﴾
নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দীন থেকে শরীআত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি? আর ফয়সালার ঘোষণা না থাকলে এদের মাঝে অবশ্যই সিদ্ধান্ত হয়ে যেত। আর যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [আশ-শুরা: ২১]
সহীহ হাদিসসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বিদআত থেকে সতর্ক করেছেন এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, বিদআত হলো পথভ্রষ্টতা। এতে উম্মতকে বিদআতের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে এবং তাদেরকে তা থেকে দূরে থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত একটি হাদিস, যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ؛ فَهُوَ رَدٌّ».
“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” সহীহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় এসেছে:
«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيهِ أَمْرَنَا؛ فَهُوَ رَدٌّ».
“যে কেউ এমন আমল করল যা আমাদের শরী‘আতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” সহীহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমু‘আর দিন তার খুতবায় বলতেন:
«أَمَا بَعْدَ، فَإِنَّ خَيرَ الحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ، وَخَيرَ الهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ ﷺ، وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ».
“অতঃপর, সবচেয়ে উত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। সবচেয়ে উত্তম হিদায়াত হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াত। সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে দ্বীনের মাঝে নতুন কিছু তৈরী করা (বিদ‘আত), আর প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।” ইমাম নাসায়ী জাইয়্যিদ সনদে এতে আরো বৃদ্ধি করেছেন:
«وَكُلَّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ».
“আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতা জাহান্নামে নিয়ে যায়।” সুনান গ্রন্থে এসেছে, ইরবায বিন সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন মর্মস্পর্শী ভাষণ দিলেন, তাতে অন্তর ভীত হলো এবং চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরল। আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! মনে হচ্ছে এটি বিদায়ী ভাষণ। সুতরাং আমাদেরকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন:
«أُوصِيكُم بِتَقْوَى اللهِ وَالسَّمعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ تَأَمَّرَ عَلَيكُم عَبدٌ، فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُم فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيكُم بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الخلُفَاءِ الرَّاشِدِينَ المَهْدِيِّينَ مِنْ بَعْدِي، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُم وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٍ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ».
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন, শ্রবণ ও আনুগত্যের উপদেশ দিচ্ছি, যদিও তোমাদের উপর একজন ক্রীতদাসকে আমীর বানানো হয়। কারণ, তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে তারা অচিরেই প্রচুর মতবিরোধ দেখবে। তখন তোমাদের উপর আবশ্যক হবে আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাত অনুসরণ করা। আর তোমরা তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা নতুন সৃষ্ট কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি নতুন সৃষ্ট কাজই বিদআত, আর সকল বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের পরবর্তী সালাফে সালেহীন থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, তারা বিদআত থেকে সতর্ক করেছেন এবং তা থেকে বিরত থাকার কঠোর আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, এটি দ্বীনের মধ্যে সংযোজন ও এমন বিধান যাতে আল্লাহর অনুমোদন নেই। এটি আল্লাহর শত্রু ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ, যারা তাদের ধর্মে সংযোজন করেছে এবং এমন কিছু উদ্ভাবন করেছে, যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি। এছাড়াও, বিদআতের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো ইসলামকে অসম্পূর্ণ মনে করা এবং এটিকে পরিপূর্ণ না হওয়ার অপবাদ দেওয়া। এটি যে কত বড় বিভ্রান্তি ও নিন্দনীয় কাজ, তা স্পষ্ট। পাশাপাশি, এটি আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর বিপরীত অবস্থান গ্রহণের শামিল:
﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ...﴾
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম [আল-মায়েদা: ৩] তদ্রূপ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধিতা যা বিদ‘আত থেকে সতর্ক করে এবং তা থেকে পলায়ন করার নির্দেশ দেয়।
এ পর্যন্ত যা উল্লেখ করা হয়েছে, আমি আশা করি এতে সত্য অনুসন্ধানকারীর জন্য যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে, যা তাকে এই বিদআত—অর্থাৎ, ইসরা ও মিরাজের রাত উদযাপনকে অস্বীকার করার এবং তা থেকে সতর্ক থাকার জন্য যথেষ্ট হবে। তাছাড়া এটি ইসলামের কোনো অংশও নয়।
মুসলমানদের জন্য উপদেশ প্রদান এবং আল্লাহ তাদের জন্য যে দ্বীন নির্ধারণ করেছেন তা বর্ণনা করা এবং ইলম গোপন করার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে আল্লাহ যে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন তার জন্য; আমি আমার মুসলিম ভাইদেরকে এই বিদ‘আতের ব্যাপারে সতর্ক করার মনস্থির করেছি; যা অনেক স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি কিছু মানুষ এটিকে দ্বীনের অংশ মনে করছে।
আল্লাহর নিকট প্রার্থনা যে, তিনি যেন সকল মুসলিমের অবস্থা সংশোধন করে দেন, তাদেরকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন, এবং আমাদেরকে ও তাদেরকে হক আঁকড়ে ধরার ও তাতে দৃঢ় থাকার তাওফীক দান করেন,আর যা এর বিপরীত তা পরিত্যাগ করার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি এর অভিভাবক এবং এর উপর ক্ষমতাবান।
আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর সালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
সপ্তম পুস্তিকা:
মধ্য শাবানের রাত (শবে বরাত) উদযাপনের বিধান
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করেছেন এবং আমাদের ওপর নি‘আমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ- এর ওপর, যিনি ছিলেন তাওবা ও রহমতের নবী।
অতঃপর: আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا...﴾
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [আল-মায়েদা: ৩] তিনি আরো বলেন,
﴿أَمۡ لَهُمۡ شُرَكَٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُ...﴾
নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দীন থেকে শরীআত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি... [আশ-শুরা: ২১] সহীহাইনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ؛ فَهُوَ رَدٌّ».
“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনো মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” এবং সহীহ মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার খুতবায় বলতেন:
«أَمَّا بَعْدُ: فَإِنَّ خَيرَ الحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ، وَخَيرَ الهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيهِ وَسَلَّمَ، وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ».
“অতঃপর: নিশ্চয় সবচেয়ে উত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। সবচেয়ে উত্তম হিদায়াত হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াত। সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে (দ্বীনের মধ্যে) নবআবিস্কৃত কাজ (বিদ‘আত), আর প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।” এ বিষয়ে বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই উম্মতের জন্য তাদের দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং তাদের উপর তাঁর নিআমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। এবং তাঁর নবী -আলাইহিস সালাম- এর ইন্তেকাল হয়নি যতক্ষণ না তিনি সুস্পষ্টভাবে তা পৌঁছে দিয়েছেন এবং উম্মতের জন্য আল্লাহ যে কথা ও কাজে বিধান দিয়েছেন তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করেছেন যে, তার পরবর্তীতে মানুষ যা কিছু দ্বীনের মধ্যে সৃষ্টি করে এবং ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করে, তা সবই বিদ‘আত এবং তা সৃষ্টিকারীর দিকে প্রত্যাখ্যাত হবে, যদিও তার উদ্দেশ্য ভালো হয়। এই বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ বুঝতে পেরেছিলেন। তেমনি তাদের পর ইসলামের আলেমগণও বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তারা বিদ‘আতকে অস্বীকার করেছেন এবং তা থেকে সতর্ক করেছেন। যেমনটি, যারা সুন্নাহর মর্যাদা ও বিদ‘আতের অস্বীকৃতি নিয়ে লিখেছেন, যেমন ইমাম ইবনে ওয়াযযাহ, তারতূশী, আবু শামা প্রমূখগণ উল্লেখ করেছেন।
কিছু লোকের উদ্ভাবিত বিদআতের মধ্যে একটি হলো: মধ্য শা'বানের রাত উদযাপন করা এবং তার দিনকে সিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট করা। এর উপর নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল নেই। এ রাতের ফযীলত সম্পর্কে দুর্বল হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যার উপর নির্ভর করা জায়েয নয়।
পক্ষান্তরে এ রাতের সালাতের ফযীলত সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তা সবই ভিত্তিহীন, যেমনটি বহু আলেমগণ উল্লেখ করেছেন। ইনশাআল্লাহ, তাদের কিছু বক্তব্য সামনে উল্লেখ করা হবে।
এ বিষয়ে শাম অঞ্চলের কিছু সালাফ আলেম ও অন্যান্যদের আছারও বর্ণিত হয়েছে।
অধিকাংশ আলেমদের ঐক্যমতে, এ উদযাপন বিদ‘আত এবং এ সংক্রান্ত ফযীলতের হাদীসগুলো সবই দুর্বল, যার কিছু কিছু বানোয়াট। এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন: হাফিয ইবন রজব তার (লাতায়িফুল মাআরিফ) গ্রন্থে এবং অন্যান্যরা। জানা কথা যে, দুর্বল হাদীস কেবল সেই ইবাদতসমূহের ক্ষেত্রে আমল করা যেতে পারে, যেগুলোর মূল সহীহ দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু মধ্য শাবানের রাত উদযাপনের ব্যাপারে কোনো সহীহ ভিত্তি নেই- যাতে দুর্বল হাদীস দ্বারা একে সমর্থন করা যায়। এই মহান নীতিটি উল্লেখ করেছেন ইমাম আবু আব্বাস শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ।
হে পাঠক! আমি আপনার জন্য এই বিষয়ে কিছু আহলুল ইলমের বাণী উল্লেখ করছি, যাতে আপনি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন।
সম্মানিত আলেমগণ -(রহিমাহুমুল্লাহ)- সর্বসম্মতিক্রমে একমত যে, মানুষের মধ্যে যে বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, সেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কিতাব ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া আবশ্যক। যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয় বা এ দুইয়ের একটির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, সেটিই অনুসরণযোগ্য শরীয়ত। আর যা কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত, তা বর্জন করা আবশ্যক। আর যে ইবাদত এ দুইয়ের মধ্যে উল্লেখিত হয়নি, তা বিদ‘আত এবং তা করা জায়েয নয়, তার দিকে আহবান ও উৎসাহিত করা তো দূরের কথা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا59﴾
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, আরও আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের, অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থায় উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর। [আন-নিসা: ৫৯] তিনি আরো বলেন,
﴿َمَا ٱخۡتَلَفۡتُمۡ فِيهِ مِن شَيۡءٖ فَحُكۡمُهُۥٓ إِلَى ٱللَّهِ...﴾
আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করা না কেন---তার ফয়সালা তো আল্লাহরই কাছে... [আশ-শূরা: ১০] তিনি আরো বলেন,
﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡ...﴾
বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন... [আলে ইমরান: ৩১] তিনি আরো বলেন:
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا65﴾
কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়। [আন-নিসা: ৬৫] এ বিষয়ে আরো অনেক আয়াত রয়েছে, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মতবিরোধের বিষয়গুলো কিতাব ও সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যক এবং এ দুয়ের ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা আবশ্যক। আর এটাই ঈমানের দাবি এবং দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দাদের জন্য কল্যাণকর ও উত্তম পরিণাম।
হাফিয ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ তার কিতাব (লাতায়িফুল মাআরিফ)-এ এই বিষয়ে পূর্ববর্তী কথার পর বলেন:
“মধ্য শা‘বানের রাতের ফযীলত সম্পর্কে শামের তাবেঈগণ যেমন খালিদ ইবনু মা‘দান, মাকহুল, লুকমান ইবনু আমির প্রমুখ এ রাতকে গুরুত্ব দিতেন এবং ইবাদতে সাধনা করতেন। তাদের থেকেই লোকেরা এ রাতের ফযীলত ও মহিমা গ্রহণ করেছে। বলা হয় যে: তাদের কাছে এ বিষয়ে কিছু ইসরাইলি বর্ণনা পৌঁছেছিল। যখন এই বিষয়টি বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসিদ্ধ হয়ে গেল, তখন মানুষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই বর্ণনাগুলো গ্রহণ করে এবং এ রাতকে সম্মানিত মনে করতে শুরু করে। বসরার কিছু ইবাদতগুজার ও অন্যদের মধ্যেও এ মত গ্রহণকারীদের একটি দল ছিল। তবে এটিকে হিজাযের অধিকাংশ আলেম প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাদের মধ্যে আতা, ইবনু আবি মুলাইকা রয়েছেন। এটা আবদুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম মদিনার ফকীহদের থেকে বর্ণনা করেছেন। এটি ইমাম মালিকের অনুসারী ও অন্যদের মত। তারা বলেছেন: এটি সম্পূর্ণরূপে বিদ‘আত।
শামের আলেমগণ এ রাতটি যাপনের পদ্ধতি সম্পর্কে দুইটি মতে মতানৈক্য করেছেন:
প্রথমত: মসজিদে সমষ্টিগতভাবে এ রাতে জেগে আমল করা মুস্তাহাব। এই রাতে খালিদ ইবনু মাআদান, লুকমান ইবনু আমির এবং অন্যান্যরা তাদের সুন্দরতম পোশাক পরিধান করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন ও সুরমা লাগাতেন এবং মসজিদে অবস্থান করতেন। ইসহাক ইবনু রাহুইয়া তাদের সাথে একমত পোষণ করেছেন। তিনি মসজিদে জামাতের সাথে কিয়ামুল্লাইল করা সম্পর্কে বলেছেন: “এটি বিদ‘আত নয়।” হারব আল-কিরমানী তার মাসায়েলে এটি উল্লেখ করেছেন।
দ্বিতীয়ত: মসজিদে সালাত, কিসসা ও দো‘আর জন্য একত্র হওয়া মাকরূহ, তবে ব্যক্তিগতভাবে সালাত আদায় করা মাকরূহ নয়। এটি হলো শামের ইমাম, ফকীহ ও আলেম আওযাঈর মত। আর এ মতটিই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় অধিকতর নিকটবর্তী।” তিনি এও বলেন যে: 'ইমাম আহমদ এর পক্ষ থেকে মধ্য শা'বানের রাত সম্পর্কে কোনো বক্তব্য জানা যায় না। তবে তার ঈদের রাতের কিয়ামের দুই বর্ণনার মধ্যে একটি থেকে মধ্য শা'বানের রাতের কিয়াম মুস্তাহাব হওয়ার দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। কারণ (এক বর্ণনায়) তিনি জামাতে কিয়ামকে মুস্তাহাব বলেননি; কেননা এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাহাবীদের থেকে বর্ণিত হয়নি। আবার তিনি এটিকে অপর বর্ণনায় মুস্তাহাব বলেছেন, আবদুর রহমান ইবনু ইয়াজীদ ইবনু আসওয়াদ এর উপর আমল করার কারণে, যিনি তাবেঈদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তেমনি মধ্য শাবানের রাতের কিয়াম, এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তার সাহাবীদের থেকে কিছুই প্রমাণিত হয়নি। তবে শামের প্রসিদ্ধ ফকীহ তাবেঈদের একটি দল থেকে এটি প্রমাণিত।
হাফিয ইবন রজব রাহিমাহুল্লাহর বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য শেষ হলো, এবং এতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মধ্য শা'বানের রাত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা তার সাহাবীদের থেকে কিছুই প্রমাণিত হয়নি।
আর এ রাতে একাকী কিয়ামুল্লাইল আদায় করা মুস্তাহাব মর্মে ইমাম আওযায়ী রহিমাহুল্লাহর মত প্রদান এবং হাফিয ইবনু রজবের এই মতটি গ্রহণ করা নিতান্তই দুর্বল ও অপ্রচলিত; কারণ কোনো বিষয় যদি শরী‘আতসম্মত হওয়ার ব্যাপারে শরী‘আতী দলীল দ্বারা প্রমাণিত না হয়, তবে মুসলিমের জন্য তা আল্লাহর দ্বীনে নতুন কিছু সৃষ্টি করা জায়েয নয়, তা একাকী হোক বা জামাতে, গোপনে বা প্রকাশ্যে হোক; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ সাধারণ উক্তির কারণে:
«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيهِ أَمْرُنَا؛ فَهُوَ رَدٌّ».
“যে কেউ এমন আমল করল যা আমাদের শরী‘আতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” এ ছাড়াও আরো অন্যান্য দলীল যা বিদ‘আতকে প্রত্যাখ্যান ও তা থেকে সতর্ক থাকার প্রমাণ বহন করে।
ইমাম আবু বকর তারতুশী রহিমাহুল্লাহ তার ‘কিতাবুল হাওয়াদিস ওয়াল বিদা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
“ইবনু ওয়াদ্দাহ হতে বর্ণিত, যায়েদ ইবনু আসলাম বলেন: আমরা আমাদের কোনো শায়খ বা ফকীহকে মধ্য শা‘বানের দিকে মনোযোগ দিতে দেখিনি, এবং মাকহুলের হাদীসের প্রতিও মনোযোগ দিতে দেখিনি, এবং তারা এর জন্য অন্য রাতের ওপর কোনো বিশেষ ফযীলত দেখেননি।”
ইবনু আবী মুলায়কাহকে বলা হলো, যিয়াদ আন-নুমাইরী বলে: “ মধ্য শা'বানের রাতের সওয়াব লাইলাতুল-কদরের সওয়াবের সমান।” তিনি উত্তরে বললেন: “যদি আমি তা শুনতাম এবং আমার হাতে লাঠি থাকতো, তবে আমি তাকে আঘাত করতাম।” আর যিয়াদ ছিলেন একজন কাহিনীকার। (কথা শেষ)
আল্লামা শাওকানী -রাহিমাহুল্লাহ- তার «আল-ফাওয়ায়েদ আল-মাজমুআ» গ্রন্থে যা বলেছেন তা হলো:
“হাদীস: “হে আলী, যে ব্যক্তি শাবান মাসের মধ্যরাতে একশত রাকাত সালাত আদায় করবে এবং প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা ও সূরা ইখলাস দশবার করে পাঠ করবে; আল্লাহ তার সকল প্রয়োজন পূরণ করবেন।” এর শেষ পর্যন্ত। এটি মাওযু, বানোয়াট হাদিস এবং এর বর্ণনায় যে সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা এমন যে, কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তি এর মাওযু হওয়া নিয়ে সন্দেহ করবে না এবং এর বর্ণনাকারীগণ অজ্ঞাত। এটি আরো দ্বিতীয় ও তৃতীয় সনদে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু সবই মাওযু এবং এর বর্ণনাকারীগণ অজ্ঞাত। তিনি 'মুখতাসার' গ্রন্থে বলেছেন: মধ্য শা'বান রাতের সালাতের হাদীসটি বাতিল। ইবনু হিব্বানে বর্ণিত আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীস: “যখন মধ্য শা'বানের রাত আসে, তখন তার রাতে সালাত আদায় কর এবং দিনে রোযা রাখ”, এটি দুর্বল। তিনি 'আল-লাআলি'গ্রন্থে বলেছেন: 'মধ্য শাবানের রাতে একশো রাকাত সালাত, প্রত্যেক রাকাতে দশবার ইখলাস' এর দীর্ঘ ফযীলত থাকা সত্ত্বেও, দাইলামি ও অন্যান্যদের মতে এটি মাওযু। এবং এর তিনটি সনদের অধিকাংশ বর্ণনাকারী অজ্ঞাত দুর্বল। তিনি বললেন: «এবং সূরা ইখলাস ত্রিশবার পাঠ করার মাধ্যমে বারো রাকাত সালাত আদায় করা» বিষয়ক হাদিসটি মাওযু, «এবং চৌদ্দ রাকাত» সালাত আদায় সংক্রান্ত হাদিসটিও মাওযু।
এই হাদীস দ্বারা কিছু ফকীহগণ যেমন ইহইয়াউল উলূমের লেখক এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ প্রতারিত হয়েছেন। মধ্য শা‘বানের রাতের সালাতের বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে, যার সবই বাতিল ও মাওযু। এটি তিরমিযীর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসের বিপরীত নয়, যেখানে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাকি কবরস্থানে গমন করেন এবং মধ্য শা‘বানের রাতে মহান রব দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন ও কিলাব গোত্রের ভেড়ার পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক লোককে ক্ষমা করেন। কারণ আলোচ্য বিষয় হলো—এই রাতের বিশেষ নামাজ সংক্রান্ত তৈরি করা (মনগড়া) আমল সম্পর্কে। যদিও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার এ হাদীসটি দুর্বল এবং সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। যেমন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর রাতের সালাত বিষয়ক উল্লেখিত হাদীসটিও এই সালাতের বাতিল হওয়াকে খণ্ডন করে না, যদিও এতে দুর্বলতা রয়েছে যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি।
হাফিয ইরাকী বলেন: “লাইলাতুন নিসফের সালাতের হাদীসটি মাওযু এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যারোপ।” ইমাম নববী তার গ্রন্থ (আল-মাজমু’) এ বলেন: ‘সালাতুর রাগায়িব নামে পরিচিত সালাত, যা বারো রাকাত, মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে, রজব মাসের প্রথম শুক্রবার রাতে আদায় করা হয় এবং মধ্য শা‘বানের রাতের সালাত যা একশ রাকাত, এই দুই সালাত বিদ‘আত ও নিন্দনীয়। এগুলো (কূতুল কুলূব) এবং (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন) গ্রন্থে উল্লেখিত হওয়ায় বিভ্রান্ত হবেন না, এবং তাতে উল্লেখিত হাদীসের কারণে বিভ্রান্ত হবেন না, কেননা এগুলো সবই বাতিল। কিছু ইমাম যাদের উপর এর হুকুম স্পষ্ট হয়নি এবং যারা এটা মুস্তাহাব হওয়া সম্পর্কে পুস্তিকা রচনা করেছেন, তাদের দ্বারাও বিভ্রান্ত হবেন না, কেননা তারা এতে ভুল করেছেন।’
শাইখ ইমাম আবু মুহাম্মাদ আবদুর রহমান ইবন ইসমাইল
আল-মাকদিসী এগুলো বাতিল প্রমাণে একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা অত্যন্ত সুন্দর ও উৎকৃষ্ট। এই বিষয়ে আলিমদের বক্তব্য অনেক এবং যদি আমরা এই বিষয়ে আমাদের জানা সমস্ত বক্তব্য উল্লেখ করতে যাই, তবে সে আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে। তবে আমরা যেটুকু উল্লেখ করেছি, আশা করা যায় তা সত্য অনুসন্ধানকারীর জন্য যথেষ্ট ও সন্তোষজনক হবে।
উপরোক্ত আয়াতসমূহ, হাদীসসমূহ এবং আলেমদের বক্তব্য থেকে সত্যের অনুসন্ধানকারী ব্যক্তির জন্য স্পষ্ট হয় যে, মধ্য শা‘বানের রাত উদযাপন করা, তা সালাতের মাধ্যমে হোক বা অন্য কোনোভাবে, এবং এ দিনের রোযা নির্দিষ্ট করা; অধিকাংশ আলেমদের নিকট একটি নিন্দনীয় বিদ‘আত, যার শরয়ী কোনো ভিত্তি নেই। বরং এটি সাহাবীগণের যুগের পর ইসলামের নামে আবিস্কৃত হয়েছে। এ বিষয়ে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সত্যের অনুসন্ধানকারীর জন্য আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর এ বাণীই যথেষ্ট:
﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ...﴾
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম [আল-মায়েদা: ৩] এবং এ অর্থে আরো যে আয়াতসমূহ এসেছে। তাছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী:
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ».
“যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” এবং এ অর্থে বর্ণিত অন্যান্য হাদীস।
সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَا تَخُصُّوا لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ بِقِيَامٍ مِنْ بَيْنِ اللَّيَالِي، وَلَا تَخُصُّوا يَوْمَهَا بِالصِّيَامِ مِنْ بَيْنِ الْأَيَّامِ، إِلَّا أَنْ يَكُونَ فِي صَوْمٍ يَصُومُهُ أَحَدُكُمْ».
“রাতসমূহের মাঝে তোমরা কেবল জুমূআর রাতকে কিয়ামের জন্য নির্ধারন করে নিও না। অনুরূপভাবে দিনসমূহের মধ্যে কেবল জুমু’আর দিনকে সিয়াম পালনের জন্য নির্দিষ্ট করে নিও না। তবে তা যদি কারো নিয়মিত সাওম পালন করার দিনে পড়ে তাহলে সে সাওম পালন করতে পারবে।” অতএব যদি কোনো রাতকে বিশেষ ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা বৈধ হতো, তবে জুমুআর রাত অন্য রাতের চেয়ে অগ্রগণ্য হতো; কারণ, এ দিনটি হচ্ছে যেসব দিনে সূর্য ওঠে তার মধ্যে উত্তম; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী। কাজেই যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন নির্দিষ্ট রাতগুলোতে কিয়াম করার ব্যাপারে সতর্ক করেন, তখন তা প্রমাণ করে যে অন্যান্য রাতগুলোতে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা আরও বেশি অনুচিত, কোন রাতকে নির্দিষ্ট কোন ইবাদতের সাথে খাস করা জায়েয নয়; যদি না নির্দিষ্ট করার জন্য কোনো সহীহ দলিল থাকে।
যেহেতু লাইলাতুল কদর এবং রমযানের রাতগুলোতে কিয়াম করা ও ইবাদতে সাধনা করা শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে, সেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে জানিয়েছে, উম্মতকে কিয়াম করার জন্য উৎসাহিত করেছেন, এবং তিনি নিজেও তা পালন করেছেন, যেমন সহীহাইন-এ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন:
«مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».
“যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় কিয়ামুল লাইল পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। আর যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়।” সুতরাং যদি মধ্য শা‘বানের রাত, বা রজব মাসের প্রথম জুমুআর রাত, বা ইসরা ও মিরাজের রাতকে কোন উৎসব বা ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা শরীয়ত সম্মত হতো, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই উম্মতকে এর প্রতি নির্দেশনা দিতেন, অথবা নিজেই তা পালন করতেন। যদি এমন কিছু ঘটতো, তবে সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম তা উম্মতের কাছে পৌঁছে দিতেন এবং তা গোপন করতেন না। তারা ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ এবং নবীগণের পর সর্বোত্তম কল্যাণকামী। আল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং তাদের সন্তুষ্ট করুন।
তুমি একটু আগেই আলেমদের কথায় জেনেছ যে, রজব মাসের প্রথম জুমুআর রাত ও মধ্য শা‘বানের রাতের ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কিছুই প্রমাণিত হয়নি, এবং সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও কিছু প্রমাণিত হয়নি। সুতরাং জানা গেল যে, এ দু’টি রাত উদযাপন করা ইসলামে নতুন উদ্ভাবিত বিদ‘আত। অনুরূপভাবে এ রাতগুলোকে কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করাও একটি নিন্দনীয় বিদ‘আত। অনুরূপভাবে রজব মাসের সাতাশতম রাত, যা কিছু লোক মনে করে যে এটি ইসরা ও মিরাজের রাত, তা কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা জায়েয নয়, যেমন এ রাত উদযাপন করাও জায়েয নয়; পূর্বোক্ত প্রমাণের কারণে। এটি প্রযোজ্য হত যদি রাতটি নির্দিষ্টভাবে জানা যেত, সুতরাং আলেমদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী ইসরার রাতটি সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না- তাহলে বিষয়টি কেমন হতে পারে?! আর যে ব্যক্তি বলেছেন: এটি হলো রজব মাসের সাতাশতম রাত, তার এ কথা ভিত্তিহীন এবং সহীহ হাদীসে এর কোনো প্রমাণ নেই। আর জনৈক ব্যক্তি উত্তম বলেছেন যে:
“সবচেয়ে উত্তম বিষয় হলো হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত পূর্ববর্তী বিষয়সমূহ... আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নতুন উদ্ভাবিত বিদ‘আতসমূহ।”
আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের এবং সকল মুসলিমকে সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার এবং তাতে দৃঢ় থাকার তাওফীক দান করেন, আর যা এর বিরোধী তা থেকে সতর্ক থাকার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি দানশীল, মহানুভব।
আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আল্লাহর বান্দা ও রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবার পরিজন এবং সব সাহাবীর ওপর।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
অষ্টম পত্র:
একটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অসিয়তের ব্যাপারে জরুরী সতর্কবার্তা, যা সম্বন্ধ করা হয়েছে
মসজিদে নববীর খাদেম শাইখ আহমদ-এর দিকে।
এটি আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায এর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি যারা এই পুস্তিকাটি পাঠ করবেন, আল্লাহ তাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে রক্ষা করুন এবং আমাদের ও তাদেরকে মূর্খ-সীমালঙ্ঘনকারীদের মিথ্যা অপবাদ থেকে রক্ষা করুন, আমীন।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
অতঃপর, আমি মসজিদে নববী শরীফের খাদেম শাইখ আহমদ এর নামে একটি বক্তব্য সম্পর্কে অবগত হয়েছি, যার শিরোনাম: “মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মসজিদে নববী শরীফের খাদেম শাইখ আহমদ এর পক্ষ হতে অসিয়ত”, এতে তিনি বলেছেন:
“এক শুক্রবার রাতে আমি জেগে ছিলাম এবং কুরআন তিলাওয়াত করছিলাম। এরপর আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ পাঠ করলাম। যখন তা শেষ করলাম, তখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম। স্বপ্নে আমি সেই মহান ব্যক্তিত্বকে দেখলাম, যিনি কুরআনের আয়াত এবং মহৎ বিধান নিয়ে এসেছেন, বিশ্বজগতের জন্য রহমত, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বললেন: হে শেখ আহমদ, আমি বললাম: লাব্বাইক, হে রাসূলুল্লাহ, হে আল্লাহর সবচেয়ে সম্মানিত সৃষ্টি! তিনি আমাকে বললেন, “আমি মানুষের কু-কর্মের কারণে লজ্জিত, এবং আমি আমার রবের ও ফেরেশতাদের সম্মুখীন হতে পারছি না; কারণ জুমু‘আ থেকে জুমু‘আ পর্যন্ত এক লক্ষ ষাট হাজার লোক ইসলামের বাইরে মারা গেছে।” অতঃপর তিনি কিছু পাপের কথা উল্লেখ করলেন, যা মানুষের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। অতঃপর তিনি বললেন: - এই অসিয়তটি তাদের প্রতি দয়ালু, পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে। অতঃপর তিনি কিয়ামাতের কিছু আলামত উল্লেখ করলেন, তারপর বললেন: - হে শেখ আহমদ, তাদেরকে এই অসিয়ত জানিয়ে দাও; কারণ এটি লওহে মাহফুজ থেকে তাকদীরের কলম দ্বারা লিপিবদ্ধ। যে ব্যক্তি এটি লিখবে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে, বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠাবে; তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মিত হবে। আর যে এটি লিখবে না এবং পাঠাবে না, তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ হারাম হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি এটি লিখবে; যদি সে গরীব হয়, আল্লাহ তাকে ধনী করবেন, অথবা যদি সে ঋণগ্রস্ত হয়, আল্লাহ তার ঋণ পরিশোধ করবেন, অথবা তার উপর কোনো গুনাহ থাকলে আল্লাহ তাকে এবং তার পিতামাতাকে এ অসিয়তের বরকতে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যে এটি লিখবে না, তার মুখ দুনিয়া ও আখিরাতে কালো হবে।’ তিনি আরো বললেন: ‘আল্লাহর নামে তিনবার কসম করে বলছি, এটাই সত্য। আর যদি আমি মিথ্যাবাদী হই, তাহলে যেন ইসলামহীন দুনিয়া থেকে বিদায় নেই। যে ব্যক্তি এতে বিশ্বাস করবে, সে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে। আর যে এতে অবিশ্বাস করবে, সে কাফির হবে।”
এটি হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আরোপিত মিথ্যা অসিয়াতের সারাংশ। আমরা বহু বছর ধরে বহুবার এই মিথ্যা অসিয়াত শুনেছি, যা মাঝে মাঝে মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়, যদিও এর শব্দগুলিতে ভিন্নতা রয়েছে। এই মিথ্যাবাদী লোকটি বলে: সে স্বপ্নে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছে এবং তার থেকে এই উপদেশ গ্রহণ করেছে। প্রিয় পাঠক! আমরা যে শেষ প্রচারপত্রের কথা উল্লেখ করেছি, তাতে মিথ্যাবাদী দাবি করেছে যে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘুমানোর প্রস্তুতির সময় দেখেছে। এর অর্থ হচ্ছে: সে তাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে!
এই মিথ্যাবাদী উক্ত অসিয়তে বহু বিষয় দাবি করেছে; যা সবচেয়ে স্পষ্ট মিথ্যা এবং সবচেয়ে স্পষ্ট অসত্য। ইনশাআল্লাহ, আমি শীঘ্রই এই বক্তব্যে আপনাকে এ সম্পর্কে সতর্ক করব। আমি পূর্ববর্তী বছরগুলোতে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছি এবং মানুষকে দেখিয়েছি যে এটি সবচেয়ে স্পষ্ট মিথ্যা এবং সবচেয়ে স্পষ্ট অসত্য। যখন আমি এই শেষ প্রচারপত্রটি দেখলাম, তখন এর অসারতা প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও এবং এর মিথ্যাবাদীর মিথ্যাচারের ঔদ্ধত্য সত্ত্বেও এ সম্পর্কে লেখার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। আমি কখনো ভাবিনি যে এর অসারতা এমন কারো কাছে প্রচারিত হবে যার ন্যূনতম অন্তর্দৃষ্টি বা সুস্থ প্রকৃতি রয়েছে। কিন্তু অনেক ভাই আমাকে জানিয়েছেন যে, এটি অনেক মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং তারা এটি নিজেদের মধ্যে বিনিময় করেছে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ এটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে; তাই আমি মনে করি আমার মতো লোকদের জন্য এ সম্পর্কে লেখা আবশ্যক, এর মিথ্যা হওয়া স্পষ্ট করার জন্য এবং এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে আরোপিত মিথ্যা যাতে কেউ প্রতারিত না হয়। আর জ্ঞান ও ঈমানের অধিকারী অথবা সঠিক স্বভাব ও সুস্থ বিবেকের অধিকারী যে কেউ এগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, সে বুঝতে পারবে যে, বহু দিক থেকে এটি মিথ্যা ও রটনা হিসেবে পরিগণিত।
আমি শাইখ আহমাদ রাহিমাহুল্লাহর কিছু আত্মীয়কে এই মিথ্যা অসিয়ত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা আমাকে উত্তর দিলেন যে, এটি শাইখ আহমাদের উপর আরোপিত মিথ্যা এবং মূলত তিনি কখনো এটি বলেননি। উল্লেখিত শেখ আহমদ কিছুদিন পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন। যদি ধরে নেওয়া হয় যে, উল্লেখিত শেখ আহমদ অথবা তার চেয়েও বড় কেউ দাবি করে যে, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে বা জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে এবং তাকে এই অসিয়ত করেছে, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারব যে, সে মিথ্যাবাদী অথবা যে তাকে এ কথা বলেছে সে শয়তান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নন। এর কারণ অনেকগুলো, তন্মধ্যে:
প্রথমত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার মৃত্যুর পর জাগ্রত অবস্থায় দেখা যায় না। মূর্খ সুফিদের মধ্যে যারা দাবি করে যে, তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছে, অথবা তিনি মীলাদুন্নবীতে উপস্থিত হন, অথবা এ ধরনের কিছু ঘটে; তারা চরম ভুল করেছে এবং তাদের ওপর চরম বিভ্রান্তি চাপানো হয়েছে। তারা একটি বড় ভুলে পড়েছে এবং কিতাব, সুন্নাহ ও আলেমদের ঐক্যমতের বিরোধিতা করেছে; কারণ মৃতরা কেবল কিয়ামতের দিন কবর থেকে বের হবে, দুনিয়ায় নয়। আর যে ব্যক্তি এর বিপরীত কথা বলে, সে স্পষ্ট মিথ্যাবাদী অথবা বিভ্রান্ত, সে সঠিক পথ চিনতে পারেনি যা সালাফে সালেহীন চিনেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ও তাদের অনুসারীগণ যার অনুসরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ثُمَّ إِنَّكُم بَعۡدَ ذَٰلِكَ لَمَيِّتُونَ15 ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ16﴾
এরপর তোমরা নিশ্চয় মরবে,
“তারপর কেয়ামতের দিন নিশ্চয় তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে।” [আল-মুমিনূন: ১৫, ১৬] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«أَنَا أَوَّلُ مَنْ تَنْشَقُّ عَنْهُ الْأَرْضُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ».
“কিয়ামতের দিন আমিই প্রথম ব্যক্তি যার জন্য জমিন বিদীর্ণ হবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি।” এ বিষয়ে অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো সত্যের বিপরীত কিছু বলেন না; জীবিত অবস্থায় বা মৃত্যুর পর। এই অসিয়ত তার শরীয়তের স্পষ্ট বিরোধিতা করে, যার অনেকগুলো কারণ রয়েছে - যা সামনে আসছে -। বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখা যেতে পারে। যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার মহিমান্বিত রূপে স্বপ্নে দেখেছে, সে তাকেই দেখেছে; কারণ শয়তান তার রূপ ধারণ করতে পারে না, যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে। কিন্তু আসল বিষয়টি নির্ভর করে দর্শনকারীর ঈমান, তার সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, স্মৃতিশক্তি, ধর্মনিষ্ঠা এবং বিশ্বস্ততার উপর। সে কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার প্রকৃত রূপে দেখেছে, নাকি অন্য কোনো রূপে?
যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় বলা কোনো হাদীস এমন সূত্র থেকে আসে যা নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ রাবীদের দ্বারা প্রমাণিত নয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তার দ্বারা দলীল প্রমাণ করা যাবে না। অথবা যদি তা নির্ভরযোগ্য ও সঠিক রাবীদের দ্বারা আসে, কিন্তু এমন রাবীর বর্ণনার সাথে বিরোধ করে যিনি তাদের চেয়ে অধিক হিফযকারী এবং বিশ্বাসযোগ্য, এবং যার সাথে উভয় বর্ণনাকে একত্র করা সম্ভব নয়, তবে একটিকে মানসূখ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং অন্যটি নাসেখ বা রহিতকারী হিসেবে কার্যকর গণ্য হবে, যেখানে শর্তসাপেক্ষে তা সম্ভব হয়। আর যদি একত্র করা বা মানসূখ করা সম্ভব না হয়, তবে কম হিফযকারী ও কম ন্যায়পরায়ণ রাবীর বর্ণনাকে পরিত্যক্ত করতে হবে এবং তা শায বলে গণ্য করতে হবে, যা দ্বারা আমল করা যাবে না।
তাহলে কিভাবে এমন একটি অসিয়ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে যার প্রণেতা অজানা, যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে তা প্রচার করেছেন, এবং যার ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততা অজানা? এই অবস্থায় এটি পরিত্যাজ্য এবং এর প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়, যদিও এতে এমন কিছু না থাকে যা শরীয়তের বিরোধী। তাহলে কিভাবে যখন অসিয়তটি এমন অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে যা এর অসারতা প্রমাণ করে এবং এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে মিথ্যা আরোপকারী, এবং এমন একটি ধর্মীয় বিধান অন্তর্ভুক্ত করে যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি?!
অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ قَالَ عَلَيَّ مَا لَمْ أَقُلْ؛ فَلْيَتَـبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ».
“যে ব্যক্তি আমার ওপর এমন কিছু বলবে যা আমি বলিনি, সে যেন তার অবস্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নিল।” এ অসিয়তের রটনাকারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে এমন কিছু বলেছে যা তিনি বলেননি, এবং তার উপর গুরুতর মিথ্যাচার করেছে। সুতরাং সে এই বিরাট শাস্তির জন্য সে কতই না উপযুক্ত, এবং যদি সে তওবা না করে ও মানুষের কাছে এই অসিয়তের মিথ্যাচার প্রকাশ না করে, তবে সে এ শাস্তির কতই না প্রাপ্য। কারণ যে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে মিথ্যা প্রচার করে এবং তা ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত করে, তার তওবা তখনই গ্রহণযোগ্য হবে যখন সে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করবে এবং দেখাবে; যাতে মানুষ তার মিথ্যাচার থেকে ফিরে আসা এবং নিজেকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করা সম্পর্কে জানতে পারে; আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكۡتُمُونَ مَآ أَنزَلۡنَا مِنَ ٱلۡبَيِّنَٰتِ وَٱلۡهُدَىٰ مِنۢ بَعۡدِ مَا بَيَّنَّٰهُ لِلنَّاسِ فِي ٱلۡكِتَٰبِ أُوْلَٰٓئِكَ يَلۡعَنُهُمُ ٱللَّهُ وَيَلۡعَنُهُمُ ٱللَّٰعِنُونَ159 إِلَّا ٱلَّذِينَ تَابُواْ وَأَصۡلَحُواْ وَبَيَّنُواْ فَأُوْلَٰٓئِكَ أَتُوبُ عَلَيۡهِمۡ وَأَنَا ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ160﴾
নিশ্চয় যারা গোপন করে আমরা যেসব সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়াত নাযিল করেছি, মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পর, তাদেরকে আল্লাহ্ লা'নত করেন এবং লা'নতকারীগণও তাদেরকে লা'নত করেন।
তবে যারা তাওবা করেছে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করেছে এবং সত্যকে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে। অতএব, এদের তাওবা আমি কবুল করব। আর আমি অধিক তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [আল-বাকারাহ: ১৫৯, ১৬০] এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা স্পষ্ট করেছেন যে, যে কেউ সত্য কিছু গোপন করে, তার তওবা শুধুমাত্র নিজের সংশোধন ও সুস্পষ্ট ঘোষণার পরই গ্রহণযোগ্য হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করে তাদের উপর নি‘আমাতকে সম্পূর্ণ করেছেন। আর তার নিকট পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত ওহী করেছেন এবং পূর্ণতা ও সুস্পষ্টভাবে বর্ণনার তিনি তার মৃত্যু দিয়েছেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন:
﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا...﴾
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [আল-মায়েদা: ৩]
এই অসিয়তের মিথ্যাচারকারী চতুর্দশ শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়েছিল, যে নতুন একটি ধর্মের আড়ালে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে তার বিধান গ্রহণকারীদের জন্য জান্নাতে প্রবেশের প্রতিশ্রুতি এবং তার বিধান গ্রহণ না করাদের কারণে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া ও জাহান্নামে প্রবেশের শাস্তি নির্ধারিত হবে বলে দাবি করেছে। সে চায় যে এই মিথ্যা অসিয়তকে কুরআনের চেয়ে মহৎ ও উত্তম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে; যেহেতু সে মিথ্যা দাবি করেছে: যে ব্যক্তি এটি লিখবে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে, বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠাবে; তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মিত হবে। আর যে এটি লিখবে না এবং পাঠাবে না, তার জন্য কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুপারিশ হারাম হয়ে যাবে। এটি সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যা, এই মিথ্যা অসিয়তের মিথ্যাচারের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ এবং এর মিথ্যাবাদীর লজ্জাহীনতা ও মিথ্যা বলার ওপর তার দুঃসাহসের প্রমাণ; কারণ যে ব্যক্তি কুরআন কারীম লিখে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রেরণ করে, যদি সে কুরআন কারীমের ওপর আমল না করে তবে তার জন্য এই মর্যাদা অর্জিত হয় না। তাহলে এই মিথ্যার লেখক ও তা এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রেরণকারীর জন্য কিভাবে এই মর্যাদা অর্জিত হবে?! যে ব্যক্তি কুরআন লিখেনি এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠায়নি, যদি সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান রাখে এবং তার শরী‘আতের অনুসরণ করে, সে তার শাফা‘আত থেকে বঞ্চিত হবে না। এই এক মিথ্যাই এই অসিয়তটির অসারতা প্রমাণ করতে যথেষ্ট, এবং এর প্রচারকারীর মিথ্যাচার, তার লজ্জাহীনতা, নির্বুদ্ধিতা এবং তিনি যে সঠিক পথের বিষয়ে রাসুল (সা.) এর শিক্ষা জানতেন না, তার প্রমাণ বহন করে।
এ অসিয়তে উল্লেখিত বিষয়গুলোর বাইরে আরও কিছু বিষয় রয়েছে, যা সবই এর অসারতা ও মিথ্যাচার প্রমাণ করে। এর রটনাকারী যদি হাজারবার বা তারও বেশি শপথ করে এর সত্যতার পক্ষে, কিংবা নিজের উপর সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ও কঠোরতম নিন্দা ডেকে আনে, তবুও সে সত্যবাদী হবে না, এবং এটি সত্য হবে না। বরং আল্লাহর কসম, এটি সবচেয়ে বড় ও নিকৃষ্ট মিথ্যাচারগুলোর একটি। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এবং আমাদের কাছে উপস্থিত ফেরেশতাদেরকে সাক্ষী রাখছি। এবং মুসলিমদের মধ্যে যারা এই লেখাটি সম্পর্কে জানতে পারবে তাদেরকেও- আমাদের পক্ষ থেকে এটি সেই সাক্ষ্য, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রভুর কাছে উপস্থিত হবো: যে এই অসিয়তটি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামে মিথ্যা ও রটনা, আল্লাহ তাআলা এই মিথ্যুককে অপমানিত করুন এবং তার সঙ্গে সেই আচরণ করুন যা তার প্রাপ্য।
এই অসিয়তের মিথ্যা ও অসারতা প্রমাণ করার জন্য পূর্বে উল্লেখিত বিষয় ছাড়াও এতে বর্ণিত মূলপাঠও অনেক বিষয় প্রমাণ করে, তন্মধ্যে:
প্রথম বিষয়: এতে বলা হয়েছে: (কারণ শুক্রবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত এক লক্ষ ষাট হাজার লোক ইসলামের বাইরে মারা গেছে); কারণ এটি গায়েবী বিষয়, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর অহী বন্ধ হয়ে গেছে। আর তিনি জীবিত অবস্থায় গায়েব জানতেন না, তাহলে মৃত্যুর পর কিভাবে জানবেন; কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِي خَزَآئِنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ...﴾
বলুন , ‘আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমর নিকট আল্লাহ্র ভান্ডারসমূহ আছে, আর আমি গায়েবোও জানি না... [আল-আনআম: ৫০] আল্লাহর আরেকটি বাণী:
﴿قُل لَّا يَعۡلَمُ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٱلۡغَيۡبَ إِلَّا ٱللَّهُ...﴾
বলুন, ‘আল্লাহ্ ব্যতীত আসমান ও যমীনে কেউই গায়েব জানে না...’ [আন-নামল: ৬৫] সহীহ হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«يُذَادُ رِجَالٌ عَنْ حَوْضِي يَوْمَ القِيَامَةِ، فَأَقُولُ: يَا رَبِّ! أَصْحَابِي أَصْحَابِي، فَيُقَالُ لِي: إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ، فَأَقُولُ كَمَا قَالَ العَبْدُ الصَّالِحُ: ﴿وَكُنتُ عَلَيۡهِمۡ شَهِيدٗا مَّا دُمۡتُ فِيهِمۡۖ فَلَمَّا تَوَفَّيۡتَنِي كُنتَ أَنتَ ٱلرَّقِيبَ عَلَيۡهِمۡۚ وَأَنتَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ شَهِيدٌ﴾ [المائدة: 117]».
“কিয়ামতের দিন আমার হাউয থেকে কতিপয় লোককে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে। তখন আমি বলব: হে আমার রব! এরা আমার সঙ্গী, আমার সঙ্গী। তখন আমাকে বলা হবে: তোমার পরে তারা কী ধরণের নতুন কাজের উদ্ভাবন (বিদআত) করেছিল, তা তুমি জানো না। তখন আমি সৎকর্মশীল ব্যক্তির (ঈসা) মতো বলব: ‘এবং আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের কাজকর্মের সাক্ষী; কিন্তু যখন আপনি আমাকে তুলে নিলেন, তখন আপনিই তো ছিলেন তাদের কাজকর্মের পর্যবেক্ষক এবং আপনিই সকল বিষয়ে সাক্ষী।’ [মায়েদা: ১১৭]”
দ্বিতীয় বিষয়: -এই অসিয়তের অসারতা ও মিথ্যা প্রমাণকারী বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলে-: এতে বলা হয়েছে: (যে ব্যক্তি এটি লিখবে; যদি সে গরীব হয়, আল্লাহ তাকে ধনী করবেন, অথবা যদি সে ঋণগ্রস্ত হয়, আল্লাহ তার ঋণ পরিশোধ করবেন, অথবা তার উপর কোনো গুনাহ থাকলে আল্লাহ তাকে এবং তার পিতামাতাকে এ অসিয়তের বরকতে ক্ষমা করবেন) ইত্যাদি। এটি সবচেয়ে বড় মিথ্যাচারগুলোর একটি এবং এর রটনাকারীর মিথ্যাচারের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ। তার আল্লাহ ও বান্দাদের প্রতি লজ্জাহীনতার প্রমাণ; কারণ এই তিনটি বিষয় কুরআন কারীম শুধু লেখার মাধ্যমে অর্জিত হয় না, তাহলে কিভাবে তা এই মিথ্যা অসিয়ত লেখকের জন্য হতে পারে?! বরং এই কপট ব্যক্তি মানুষকে ধোঁকা দিতে এবং তাদেরকে এই উপদেশের সাথে জড়িয়ে রাখতে চায়; যাতে তারা এটি লিখে এবং এই মিথ্যা ফজিলতের সাথে জড়িয়ে থাকে। আর যেন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে উপায় নির্ধারণ করেছেন এবং যেগুলোকে ধন-সম্পদ অর্জন, ঋণমুক্তি ও গুনাহ মাফের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, তা তারা পরিত্যাগ করে। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই অপমানের কারণ এবং প্রবৃত্তি ও শয়তানের আনুগত্য থেকে।
তৃতীয় বিষয়: -এই অসিয়তের অসরাতার প্রমাণকারী হলো: এতে বলা হয়েছে: (আর আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যে এটি লিখবে না, তার মুখ দুনিয়া ও আখিরাতে কালো হবে)। এটিও সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যাচারগুলোর একটি এবং এই অসিয়তের মিথ্যার ও এর রটনাকারীর মিথ্যাবাদীতার প্রমাণের স্পষ্ট প্রমাণ। কিভাবে একজন বুদ্ধিমান মানুষ মেনে নিতে পারে যে, কোন অজ্ঞাত ব্যক্তি চতুর্থ শতাব্দীতে এমন একটি মিথ্যা অসিয়ত রচনা করবে, যা সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে তৈরি করেছে এবং দাবি করছে যে, যে এটি লিখবে না, তার মুখ দুনিয়া ও আখিরাতে কালো হয়ে যাবে, আর যে এটি লিখবে সে দারিদ্র্যের পর ধনী হবে, ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হবে, এবং তার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে!!
আল্লাহ কতই না পবিত্র, এটি একটি মহা অপবাদ!! প্রমাণ ও বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয় যে, এই মিথ্যাবাদীর কথা মিথ্যা, সে আল্লাহর উপর বড় দুঃসাহস দেখিয়েছে এবং আল্লাহ ও মানুষের কাছে তার লজ্জার অভাব রয়েছে। বহু মানুষই তো তা লেখেনি, অথচ তাদের মুখ কালো হয়নি। অপরদিকে বিশাল সংখ্যক লোক রয়েছে, যারা বহুবার তা লিখেছে, তবুও তাদের ঋণ পরিশোধ হয়নি, তাদের দারিদ্র্য দূর হয়নি। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই হৃদয়ের বিভ্রান্তি ও পাপের কলুষতা থেকে। এগুলো এমন গুণাবলী ও প্রতিদান যা শরীয়ত সেই ব্যক্তির জন্যও নির্ধারণ করেনি যিনি সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব কুরআন মাজীদ লিখেছেন। তাহলে কিভাবে তা সেই ব্যক্তির জন্য হতে পারে যে এ মিথ্যা অসিয়ত লিখেছে যা বিভিন্ন প্রকারের বাতিল ও বহু প্রকারের কুফরীতে ভরপুর? সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ কত সহনশীল সেই ব্যক্তির প্রতি যে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যার দুঃসাহস দেখায়।
চতুর্থ বিষয়: -এই অসিয়তের মিথ্যা ও এর রটনাকারীর মিথ্যাবাদীতা প্রমাণের স্পষ্ট একটি প্রমাণ হলো-: এতে বলা হয়েছে: (যে ব্যক্তি এতে বিশ্বাস করবে, সে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে। আর যে এতে অবিশ্বাস করবে, সে কাফির হবে), এটিও মিথ্যার প্রতি এক অতি দুঃসাহসী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যাচার; এই মিথ্যাবাদী সকল মানুষকে তার মিথ্যাটি বিশ্বাস করার জন্য আহ্বান করছে এবং দাবি করছে যে, এর মাধ্যমে তারা জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচবে এবং যে কেউ এটিকে মিথ্যা বলবে, সে কাফির হয়ে যাবে। এই মিথ্যাবাদী আল্লাহর ওপর মিথ্যার দুঃসাহস দেখিয়েছে, আল্লাহর কসম, সে সত্যের বিপরীত কথা বলেছে। যে কেউ এটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করবে, সে-ই কাফির হওয়ার যোগ্য, যে এটিকে মিথ্যা বলবে সে নয়; কারণ এটি একটি মিথ্যা, বাতিল ও ভিত্তিহীন মিথ্যাচার। আমরা আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে এটি মিথ্যা এবং এর রটনাকারী একজন মিথ্যুক, যে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া মানুষের জন্য নতুন শরীয়ত প্রবর্তন করতে চায় এবং তাদের দীনে এমন কিছু প্রবেশ করাতে চায় যা তার অংশ নয়। আল্লাহ এই উম্মতের জন্য এই মিথ্যা রটনার চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বেই দীনকে পূর্ণ ও সম্পূর্ণ করেছেন। সুতরাং আপনারা সতর্ক থাকুন: হে পাঠকবৃন্দ ও ভাইয়েরা, এবং এই ধরনের মিথ্যাচারকে বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকুন, যেন এগুলো আপনাদের মধ্যে প্রচলিত না হয়। কেননা সত্যের উপর নূর থাকে যা তার অনুসন্ধানকারীর কাছে বিভ্রান্তিকর হয় না। সুতরাং প্রমাণ দ্বারা সত্যকে অনুসন্ধান করুন এবং আপনাদের কাছে যা অস্পষ্ট তা সম্পর্কে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞাসা করুন। মিথ্যাবাদীদের শপথে প্রতারিত হবেন না, কেননা লাঞ্ছিত ইবলিস আপনাদের পিতা আদম ও মাতা হাওয়ার কাছে শপথ করেছিল যে, সে তাদের কল্যাণকামী, অথচ সে ছিল সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক ও মিথ্যাবাদী। যেমন আল্লাহ তা'আলা তার সম্পর্কে বলেছেন:
﴿وَقَاسَمَهُمَآ إِنِّي لَكُمَا لَمِنَ ٱلنَّٰصِحِينَ21﴾
আর সে তাদের উভয়ের কাছে শপথ করে বলল, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের শুভাকাংখীদের একজন।' [আল-আরাফ: ২১] অতএব, তার থেকে সতর্ক থাকুন এবং তার অনুসারীদের মধ্যে যারা মিথ্যাচার করে তাদের থেকেও সতর্ক থাকুন। তাদের কতই না মিথ্যা শপথ, বিশ্বাসঘাতক চুক্তি, এবং বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্ট করার জন্য সুসজ্জিত কথাবার্তা রয়েছে! তবে এ মিথ্যাবাদী যে প্রকাশ্য অন্যায়কার্যের কথা উল্লেখ করেছে, তা সত্যিই ঘটছে। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ এ থেকে চূড়ান্ত সতর্কতা প্রদান করেছে। এতে রয়েছে পথনির্দেশনা ও পরিপূর্ণতা।
আর কিয়ামতের শর্তাবলী সম্পর্কে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা হাদীস শরীফে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামতের আলামতসমূহ কি হবে, এবং কুরআন মাজীদেও এর কিছু উল্লেখ রয়েছে। যে ব্যক্তি তা জানতে চায়, সে তা সঠিকভাবে সুনান গ্রন্থ এবং ইলম ও ঈমানের অধিকারী আলেমদের রচনাবলীতে পাবে। মানুষের এ ধরনের মিথ্যাবাদী ও বিভ্রান্তিকর ব্যক্তির ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, যারা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দেয়। আল্লাহ আমাকে, আপনাদেরকে এবং সকল মুসলিমদেরকে শয়তানের ক্ষতি, বিভ্রান্তিকর ফিতনা, পথভ্রষ্টদের ভ্রষ্টতা এবং আল্লাহর শত্রুদের মিথ্যা প্ররোচনা থেকে রক্ষা করুন- যারা আল্লাহর নূরকে তাদের মুখের মাধ্যমে নিভিয়ে দিতে চায় এবং মানুষের ধর্মকে বিভ্রান্ত করতে চায়। আল্লাহ তার নূরকে পূর্ণ করবেন এবং তার দ্বীনকে সাহায্য করবেন, যদিও শয়তান এবং তাদের অনুসারী কাফের ও নাস্তিকরা তা অপছন্দ করে। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করেন, এবং তাদেরকে হক অনুসরণ করার, তাতে দৃঢ় থাকার এবং সকল পাপ থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে তওবা করার তাওফীক দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু এবং সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আমাদের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক। আর সুউচ্চ ও সুমহান আল্লাহর তাওফীক ব্যতীত মন্দ কাজ থেকে বাঁচার সামর্থ্য কিংবা ভাল কাজ করার কোন শক্তি আমাদের নেই।
সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের রব আল্লাহর জন্য, আর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর বান্দা ও রাসূল সত্যবাদী আল-আমীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবারবর্গ, সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা সঠিকভাবে তাদের অনুসরণ করবে তাদের সকলের ওপর।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
নবম পুস্তিকা: যাদু ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের হুকুম এবং এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ18
সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, দরুদ ও সালাম সেই নবীর উপর যার পরে আর কোন নবী নেই। অতঃপর:
সম্প্রতি কিছু দেশে যাদু বা জ্যোতিষশাস্ত্র দ্বারা চিকিৎসা দাবি করা অনেক যাদুকর মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং তারা অজ্ঞ সাধারণ মানুষের ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার কারণে, আমি আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের জন্য নসিহত হিসেবে এতে ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য যে গুরুতর ক্ষতি রয়েছে তা বর্ণনা করা সমীচীন মনে করছি। কেননা এর মাধ্যমে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের দ্বারস্ত হওয়া এবং আল্লাহর আদেশ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশের বিরোধিতা করা হয়।
এ মর্মে আল্লাহ সাহায্য চেয়ে আমি বলছি যে, চিকিৎসা গ্রহণ করা সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ এবং একজন মুসলিমের জন্য এটা জায়েয যে, সে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, সার্জন, স্নায়ুবিদ অথবা অনুরূপ কোনো চিকিৎসকের কাছে গিয়ে তাদের রোগ শনাক্ত করাবেন এবং শারিয়ত সম্মত ও বৈধ ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা নেবেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে উপযুক্ত হয়। কেননা তা সাধারণ উপকরণ গ্রহণের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহর প্রতি ভরসার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। আল্লাহ তায়ালা রোগ পাঠিয়েছেন এবং তার সাথে ঔষধও পাঠিয়েছেন, যে জানার সে জেনেছে, আর যে এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকার সে অজ্ঞই রয়ে গেছে। তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের রোগমুক্তি হারাম কিছুতে রাখেননি।
কাজেই রোগীকে নিজের রোগ সম্পর্কে জানার জন্য গণকদের কাছে যাওয়া বৈধ নয়, যারা অদৃশ্য বিষয় জানার দাবি করে। অনুরূপভাবে তাদের কথা বিশ্বাস করাও জায়েয নয়, কারণ তারা গোপন বিষয় সম্পর্কে অনুমান করে কথা বলে অথবা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে জিনদের উপস্থিত করে তাদের সহযোগিতা চায়। যদি তারা গায়েব জানার দাবি করে, তবে তাদের হুকুম হলো কুফর ও পথভ্রষ্টতা।
ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ يَوْمًا».
“যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে আসলো, তারপর তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করল, তার চল্লিশ দিনের সালাত কবুল করা হবে না।”
“যে ব্যক্তি গণকের কাছে আসলো, অতঃপর গণক যা বললো তা সত্য বলে বিশ্বাস করলো, সে মূলতঃ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা অস্বীকার করলো।”
«مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ».
“যে ব্যক্তি গণকের কাছে আসলো, অতঃপর সে যা বললো তা সত্য বলে বিশ্বাস করলো, সে মূলতঃ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা অস্বীকার করলো।” আবূ দাউদ ও অন্যান্য সুনান গ্রন্থকারগণ এটা বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম হাকেম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত এই শব্দকে সহীহ বলেছেন:
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ».
“যে ব্যক্তি জ্যোতিষী বা গণকের কাছে আসলো, অতঃপর সে যা বললো তা সত্য বলে বিশ্বাস করলো, সে মূলতঃ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যা নাযিল করা হয়েছে তা অস্বীকার করলো।”
ইমরান ইবনু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ أَوْ تُطُيِّرَ لَهُ، أَوْ تَكَهَّنَ أَوْ تُكُهِّنَ لَهُ، أَوْ سَحَرَ أَوْ سُحِرَ لَهُ، وَمَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ﷺ».
“সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে কু-লক্ষণে বিশ্বাস করে বা তার জন্য কু-লক্ষণ গ্রহণ করা হয় অথবা যে গণনা করে বা তার জন্য গণনা করা হয় অথবা যে যাদু করে বা তার জন্য যাদু করা হয়। আর যে ব্যক্তি কোনো গণকের নিকট আসল এবং সে যা বলল, তা বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা অস্বীকার করল।” জায়্যেদ সনদে এটি বাযযার বর্ণনা করেছেন।
এ হাদীসগুলোতে জ্যোতিষী, গণক, যাদুকর এবং তাদের মতো ব্যক্তিদের কাছে যাওয়া, তাদের থেকে কিছু জানতে চাওয়া এবং তাদের কথা বিশ্বাস করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। হাদীসগুলোতে এ জন্য শাস্তির হুমকিও দেয়া হয়েছে;
অতএব, তাদের কিছু বিষয়ের সত্যতা দেখে বা তাদের কাছে আসা লোকদের সংখ্যার আধিক্য দেখে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। কারণ, তারা অজ্ঞ, তাদের দ্বারা মানুষের বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক নয়; কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে যাওয়া, তাদের প্রশ্ন করা এবং তাদের কথায় বিশ্বাস করার ব্যাপারে নিষেধ করেছেন; কারণ এতে রয়েছে বড় পাপ, মহা বিপদ এবং ভয়ানক পরিণতি। তাছাড়া এরা হচ্ছে মিথ্যাবাদী ও পাপী।
অনুরূপভাব এই হাদীসগুলিতে গণক এবং যাদুকরের কুফরীর প্রমাণ রয়েছে। কারণ তারা গায়েবের বিষয় জানার দাবি করে, যা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া যেহেতু তারা তাদের উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে কেবল জিনদের সেবা এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের ইবাদত করার মাধ্যমে, যা আল্লাহর সাথে কুফরী ও শিরক। আর যারা তাদের গায়েব জানার দাবিকে বিশ্বাস করে, তারাও তাদের মতো হবে। আর যে কেউ এসব বিষয় এমন ব্যক্তির কাছ থেকে গ্রহণ করে যে এসব কাজে লিপ্ত, তার সাথে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সম্পর্ক নেই।
তেমনিভাবে মুসলিমের জন্য এটা জায়েয নয় যে, এরা যেগুলোকে চিকিৎসা হিসেবে দাবি করে তা মেনে নিবে। যেমন তাবিজ-কবজ বা তামা গলিয়ে পড়ানো এবং এ ধরনের অন্যান্য কুসংস্কার; যা তারা করে থাকে। কারণ এগুলো হলো গণকগিরি এবং মানুষের ওপর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার অন্তর্ভুক্ত। আর যে ব্যক্তি এতে সন্তুষ্ট হয়, সে মূলত তাদের মিথ্যার ও কুফরীর পক্ষে সাহায্য করে।
এছাড়া কোন মুসলিমের জন্য এটাও জায়েয নয় যে, কেউ তাদের কাছে যাবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে তার ছেলে বা আত্মীয়র কার সাথে বিবাহ হবে, অথবা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের পরিবারের মধ্যে কী ধরনের ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, শত্রুতা বা বিচ্ছেদ হবে, ইত্যাদি; কেননা এগুলো গায়েবী বিষয় যা মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
অতএব, শাসকবর্গ, প্রশাসন এবং অন্যান্য যারা ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রাখেন, তাদের উপর কর্তব্য হলো গণক, যাদুকর ও তাদের মতো লোকদের কাছে গমনের বিষয়টি নিষিদ্ধ করা। যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের বাজার ও অন্যান্য স্থানে যেতে বাধা দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে প্রতিবাদ করা। সাথে যারা তাদের কাছে যায় তাদেরকেও নিষেধ করা।
আর যাদু-টোনাও এমনি: কেননা এটাও কুফরীমূলক হারাম কাজ, যেমনটি সূরা আল-বাকারাতে মহান আল্লাহ দু’জন ফেরেশতার বিষয়ে বলেছেন:
﴿...وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنۡ أَحَدٍ حَتَّىٰ يَقُولَآ إِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَةٞ فَلَا تَكۡفُرۡۖ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنۡهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِۦ بَيۡنَ ٱلۡمَرۡءِ وَزَوۡجِهِۦۚ وَمَا هُم بِضَآرِّينَ بِهِۦ مِنۡ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذۡنِ ٱللَّهِۚ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡۚ وَلَقَدۡ عَلِمُواْ لَمَنِ ٱشۡتَرَىٰهُ مَا لَهُۥ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنۡ خَلَٰقٖۚ وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡاْ بِهِۦٓ أَنفُسَهُمۡۚ لَوۡ كَانُواْ يَعۡلَمُونَ﴾
...তারা উভয়েই এই কথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, ‘আমরা নিছক একটি পরীক্ষা ; কাজেই তুমি কুফরী করো না।’ তা সত্বেও তারা ফিরিশতাদ্বয়ের কাছ থেকে এমন যাদু শিখতো যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতো। অথচ তারা আল্লাহ্র অনুমতি ব্যাতীত তা দ্বারা কারো ক্ষতি করতে পারতো না। আর তারা তা-ই শিখতো যা তাদের ক্ষতি করতো এবং কোনো উপকারে আসত না আর তারা নিশ্চিত জানে যে, যে কেউ তা খরিদ করে, (অর্থাৎ যাদুর আশ্রয় নেয়) তার জন্য আখেরাতে কোনো অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে, তা খুবই মন্দ, যদি তারা জানতো! [আল-বাকারাহ: ১০২]
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, যাদু করা কুফরী কাজ এবং যাদুকররা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে। এছাড়া, তা থেকে বুঝা যায় যে, উপকার বা ক্ষতি করার যাদুর নিজের কোনো ক্ষমতা নেই, বরং তা আল্লাহর জাগতিক নির্ধারিত ইচ্ছার আলোকে প্রভাব ফেলে থাকে। কেননা আল্লাহই ভাল-মন্দের স্রষ্ট্রা।
তেমনিভাবে আয়াতটি প্রমাণ করে যে, যারা যাদুবিদ্যা অর্জন করে, তারা মূলত এমন কিছু অর্জন করে যা তাদের ক্ষতি করে, উপকার করে না এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট কোন অংশ নেই। এটি একটি কঠোর হুমকি, যা প্রমাণ করে যে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত, এবং তারা নিজেদেরকে সস্তা দামে বিক্রি করেছে। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের এই কাজের জন্য তাদের নিন্দা করেছেন, তিনি বলেছেন:
﴿...وَلَبِئۡسَ مَا شَرَوۡاْ بِهِۦٓ أَنفُسَهُمۡۚ لَوۡ كَانُواْ يَعۡلَمُونَ﴾
যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে, তা খুবই মন্দ, যদি তারা জানতো ! [আল-বাকারা: ১০২] এ আয়াতে (شراء) বলতে উদ্দেশ্য বিক্রয় করা।
এসব মিথ্যাচারীদের কারণে ক্ষতি ব্যাপকতা লাভ করেছে এবং বিপদ আরও তীব্র হয়েছে, যারা এই বিদ্যা মুশরিকদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে এবং তা দ্বারা দুর্বল মনের মানুষদের বিভ্রান্ত করছে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, এবং তিনি সবচেয়ে উত্তম অভিভাবক।
আমরা যাদুকর, গণক এবং অন্যান্য যাদুমন্ত্রে বিশ্বাসী লোকদের কুপ্রভাব থেকে আল্লাহর কাছে সুস্থতা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করি। আর আমরা প্রার্থনা করি যে, আল্লাহ যেন মুসলিমদেরকে তাদের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করেন এবং মুসলিম শাসকদেরকে তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে ও আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করেন, যাতে মানুষ তাদের ক্ষতি ও মন্দ কাজ থেকে মুক্তি পায়। নিশ্চয় তিনি মহান ও উদার।
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এমন ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছেন, যার মাধ্যমে তারা যাদু সংঘটিত হওয়ার আগেই তার ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকতে পারে। আর যদি তা ঘটে যায়, তবে কীভাবে এর প্রতিকার করতে হবে তা স্পষ্ট করেছেন, যা তাঁর পক্ষ থেকে তাদের জন্য দয়া ও অনুগ্রহ এবং এটি তাদের প্রতি তাঁর নিয়ামতের পূর্ণতা প্রকাশ করে।
নিচে সেই বিষয়গুলো উল্লেখ করা হল, যার মাধ্যমে যাদু সংঘটিত হওয়ার আগে তার বিপদ থেকে বাঁচা যায় এবং সংঘটিত হওয়ার পর যা দ্বারা এর প্রতিকার করা যায়; শরীয়ত অনুমোদিত পদ্ধতির আলোকে। এগুলোর বিবরণ নিম্নরূপ:
প্রথমত: যা কিছু দ্বারা যাদু সংঘটিত হওয়ার আগে তার কুপ্রভাব থেকে বাঁচা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী হলো: শরিয়তসম্মত যিকির, দোয়া ও ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে আত্মরক্ষা করা। এগুলোর অন্যতম হলো প্রত্যেক ফরয সালাতের সালাম ফিরানোর পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করা। বস্তুত আয়াতুল কুরসী হলো কুরআনুল কারীমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। আয়াতটি হলো:
﴿ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُۚ لَا تَأۡخُذُهُۥ سِنَةٞ وَلَا نَوۡمٞۚ لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيۡءٖ مِّنۡ عِلۡمِهِۦٓ إِلَّا بِمَا شَآءَۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَۖ وَلَا يَـُٔودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ255﴾
আল্লাহ্, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা রয়েছে ও যমীনে যা রয়েছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর ‘কুরসী’ আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান। [আল-বাকারাহ: ২৫৫] অনুরূপভাবে এটা ঘুমানোর সময়ও পাঠ করা। বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ فِي لَيْلَةٍ، لَمْ يَزَلْ عَلَيْهِ مِنَ اللَّهِ حَافِظٌ، وَلَا يَقْرَبُهُ شَيْطَانٌ حَتَّى يُصْبِحَ».
“যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসী পাঠ করে, ভোর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর একজন হেফাযতকারী নিয়োজিত থাকে এবং সকাল হওয়া পর্যন্ত শয়তান তার নিকটবর্তী হতে পারে না।’’
এর অন্তর্ভুক্ত হলো, নিচের সূরাগুলো তিলাওয়াত করা:
﴿قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ1﴾
বলুন, ‘তিনি আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়,’
﴿قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلۡفَلَقِ1﴾
বলুন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের
﴿قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ1﴾
বলুন, ‘আমি আশ্ৰয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের, [আন-নাস: ১] প্রত্যেক ফরয সালাতের পর। এবং এই তিনটি সূরা ফজরের সালাতের পর দিনের শুরুতে, মাগরিবের সালাতের পর রাতের শুরুতে তিনবার করে পাঠ করা।
এগুলোর অন্তর্ভুক্ত হলো: রাতের শুরুতে সূরা আল-বাকারার শেষ দু’আয়াত পাঠ করা। আয়াত দুটি হলো:
﴿ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِۦۚ وَقَالُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَاۖ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ285﴾
রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহ্র উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে: আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্তাবর্তনস্থল। ... সূরার শেষ পর্যন্ত।
কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন:
«مَنْ قَرَأَ الآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ البَقَرَةِ فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ».
“যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাক্বারার শেষ দুটি আয়াত তিলাওয়াত করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।” এর অর্থ হচ্ছে -আল্লাহই ভাল জানেন-: এ দুটি আয়াত তার জন্য সকল অনিষ্ট হতে যথেষ্ট।
এগুলোর অন্যতম হলো: রাতে বা দিনে এবং ঘরে, মাঠে, আকাশে বা সমুদ্রে অবতরণ করার সময়ে বেশি বেশি (আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ কালাম দ্বারা তার কাছে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে) আশ্রয় চাওয়া। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«مَن نَزَلَ مَنْزِلًا فَقالَ: أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِن شَرِّ ما خَلَقَ، لَمْ يَضُرَّهُ شَيءٌ حتَّى يَرْتَحِلَ مِن مَنْزِلِهِ ذَلِكَ».
“যে ব্যক্তি কোথাও অবতরণ করে এ দু`আ পাঠ করে: (أعوذ بكلمات الله التَّامَّات من شرِّ ما خلَق) অর্থাৎ “আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালাম দিয়ে তাঁর নিকট তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট হতে আশ্রয় চাই”, সে ঐ জায়গা থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত কোন কিছুই তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।”
তদ্রুপভাবে, মুসলিম ব্যক্তি দিন ও রাতের শুরুতে তিনবার করে পাঠ করবে:
«بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيءٌ فِي الأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ، وَهُوَ السَّمِيعُ العَلِيمُ».
অর্থ: ‘আল্লাহর নামে, যার নামের সাথে আসমান ও জমিনে কোনো বস্তু কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।’
কেননা এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এটি সব ধরনের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার মাধ্যম।
দ্বিতীয়ত: যাদু সংঘটিত হওয়ার পর যা দ্বারা এর প্রতিকার করা যায়। এটিও বেশ কয়েকটি উপায়ে করা সম্ভব:
প্রথমত: আল্লাহর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনা করা এবং তাঁর কাছে বিপদ দূর করা ও কষ্ট লাঘবের জন্য দুআ করা।
দ্বিতীয়ত: যাদুর অবস্থান জানার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, যেমন মাটিতে, পাহাড়ে বা অন্য কোথাও। যদি যাদুর স্থান জানা যায় এবং তা বের করে নষ্ট করা যায়, তাহলে যাদু বাতিল হয়ে যায়। এটি যাদুর সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসাগুলোর মধ্যে একটি।
তৃতীয়ত: শরীয়তসম্মত যিকির ও দুআ দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা। এগুলো অনেক রয়েছে, তন্মধ্যে:
যা প্রমাণিত হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বাণীতে:
«اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَأْسَ، وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا».
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি মানুষের রব, ব্যাধি নিবারণকারী, সুস্থতা দান করুন, আপনিই সুস্থতা দানকারী। আপনি ব্যতীত আর কোনো সুস্থতা দানকারী নেই। এমন সুস্থতা যা আর কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।” এটি তিনবার পাঠ করবে।
এর অন্তর্ভুক্ত হলো: এমন একটি রুকিয়া (ঝাড়ফুঁক) যা দিয়ে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে রুকিয়া করেছিলেন, এবং তা ছিল এই কথা:
«بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ».
অর্থ: “আমি আপনাকে আল্লাহর নাম নিয়ে প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু থেকে এবং প্রত্যেক আত্মা অথবা বদনজরের অনিষ্ট থেকে মুক্তি পেতে ঝাড়ফুঁক করছি। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন। আল্লাহর নাম নিয়ে আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি।” এটা তিনবার করে পাঠ করবে।
তন্মধ্যে আরেকটি উপায় হলো, যা পুরুষের জন্য উপকারী, যদি সে তার স্ত্রীর সাথে সহবাসে বাধাপ্রাপ্ত হয়: তাকে সাতটি তাজা বড়ই পাতা নিতে হবে, সেগুলো পাথর বা অনুরূপ কিছু দিয়ে পিষে একটি পাত্রে রাখবে। তারপর এতে এমন পরিমাণ পানি ঢালতে হবে যা তার গোসলের জন্য যথেষ্ট হবে এবং তাতে নিম্নের বিষয়গুলো পাঠ করবে:
আয়াতুল কুরসী
﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡكَٰفِرُونَ1﴾
বলুন, ‘হে কাফিররা! [আল-কাফিরূন: ১], ও
﴿قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ1﴾
বলুন, ‘তিনি আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়,’ [আল-ইখলাস: ১], ও
﴿قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلۡفَلَقِ1﴾
বলুন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের [আল-ফালাক : ১], ও
﴿قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ1﴾
বলুন, ‘আমি আশ্ৰয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের, [আন-নাস: ১]
এবং সূরা আল-আ’রাফের যাদু সংক্রান্ত আয়াতসমূহ। সেগুলো হলো মহান আল্লাহর বাণী:
﴿وَأَوۡحَيۡنَآ إِلَىٰ مُوسَىٰٓ أَنۡ أَلۡقِ عَصَاكَۖ فَإِذَا هِيَ تَلۡقَفُ مَا يَأۡفِكُونَ117 فَوَقَعَ ٱلۡحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ118 فَغُلِبُواْ هُنَالِكَ وَٱنقَلَبُواْ صَٰغِرِينَ119﴾
আর আমরা মূসার কাছে ওহী পাঠালাম যে, ‘আপনি আপনার লাঠি নিক্ষেপ করুন'। সাথে সাথে সেটা তারা যে অলীক বস্তু বানিয়েছিল তা গিলে ফেলতে লাগল;
“ফলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হল এবং তারা যা করছিল তা বাতিল হয়ে গেল।*
সুতরাং সেখানে তারা পরাভূত হল ও লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে গেল।” [আল-আরাফ: ১১৭-১১৯]
অনুরূপভাবে সূরা ইউনুসের আয়াতগুলো। সেগুলো হলো মহান আল্লাহর বাণী:
﴿وَقَالَ فِرۡعَوۡنُ ٱئۡتُونِي بِكُلِّ سَٰحِرٍ عَلِيمٖ79 فَلَمَّا جَآءَ ٱلسَّحَرَةُ قَالَ لَهُم مُّوسَىٰٓ أَلۡقُواْ مَآ أَنتُم مُّلۡقُونَ80 فَلَمَّآ أَلۡقَوۡاْ قَالَ مُوسَىٰ مَا جِئۡتُم بِهِ ٱلسِّحۡرُۖ إِنَّ ٱللَّهَ سَيُبۡطِلُهُۥٓ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُصۡلِحُ عَمَلَ ٱلۡمُفۡسِدِينَ81 وَيُحِقُّ ٱللَّهُ ٱلۡحَقَّ بِكَلِمَٰتِهِۦ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُجۡرِمُونَ82﴾
আর ফির’আউন বলল, ‘তোমরা আমার কাছে সমস্ত সুদক্ষ জাদুকরকে নিয়ে আস।‘
অতঃপর যখন জাদুকরেরা আসল তখন তাদেরকে মূসা বললেন, ‘তোমাদের যা নিক্ষেপ করার, নিক্ষেপ কর।’
অতঃপর যখন তারা নিক্ষেপ করল, তখন মূসা বললেন, ‘তোমরা যা এনেছ তা জাদু, নিশ্চয় আল্লাহ্ সেগুলোকে অসার করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ অশান্তি সৃষ্টিকারীদের কাজ সার্থক করেন না।’
আর অপরাধীরা অপ্রীতিকর মনে করলেও আল্লাহ্ তাঁর বাণীর মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।” [ইউনুস: ৭৯-৮২]
অনুরূপভাবে সূরা ত্ব-হা এর এই আয়াতগুলো:
﴿قَالُواْ يَٰمُوسَىٰٓ إِمَّآ أَن تُلۡقِيَ وَإِمَّآ أَن نَّكُونَ أَوَّلَ مَنۡ أَلۡقَىٰ65 قَالَ بَلۡ أَلۡقُواْۖ فَإِذَا حِبَالُهُمۡ وَعِصِيُّهُمۡ يُخَيَّلُ إِلَيۡهِ مِن سِحۡرِهِمۡ أَنَّهَا تَسۡعَىٰ66 فَأَوۡجَسَ فِي نَفۡسِهِۦ خِيفَةٗ مُّوسَىٰ67 قُلۡنَا لَا تَخَفۡ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡأَعۡلَىٰ68 وَأَلۡقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلۡقَفۡ مَا صَنَعُوٓاْۖ إِنَّمَا صَنَعُواْ كَيۡدُ سَٰحِرٖۖ وَلَا يُفۡلِحُ ٱلسَّاحِرُ حَيۡثُ أَتَىٰ69﴾
তারা বলল, ‘হে মূসা! হয় তুমি নিক্ষেপ কর নতুবা আমরাই প্রথম নিক্ষেপকারী হই।
মূসা বললেন, ‘বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর তাদের জাদু-প্রভাবে হঠাৎ মূসার মনে হল তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে।*
তখন মূসা তার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করলেন।*
আমি বললাম, ‘ভয় করবেন না, আপনিই উপরে থাকবেন।*
আর আপনার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ করুন, এটা তারা যা করেছে তা খেয়ে ফেলবে। তারা যা করেছে তা তো শুধু জাদুকরের কৌশল। আর জাদুকর যেখানেই আসুক, সফল হবে না।” [ত্বহা : ৬৫-৬৯]
পানির ওপর উল্লেখিত বিষয়সমূহ পড়ার পর, ঐ পানি থেকে তিন ঢোক পান করবে এবং বাকি অংশ দিয়ে গোসল করবে। এতে আল্লাহ্র ইচ্ছায় রোগ দূর হয়ে যাবে। তবে প্রয়োজনে এটি দুই বা তার বেশিবার ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ না রোগ সেরে যায়।
এই যিকির, ঝাড়ফুঁক ও পদ্ধতিগুলো যাদুর অনিষ্টতা এবং অন্যান্য ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে বড় উপায়। এগুলো যাদু আক্রান্ত হওয়ার পর তা দূর করতেও সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার; যদি কেউ সততা, বিশ্বাস, আল্লাহর উপর আস্থা ও ভরসা রেখে এবং তার নির্দেশের প্রতি অন্তর উন্মুক্ত করে নিয়মিত পাঠ করে।
যাদু থেকে রক্ষা পাওয়া এবং তার চিকিৎসা করার এই উপায়গুলো আমার পক্ষে উপস্থাপন করা সম্ভব হল। আর আল্লাহ্ই একমাত্র তাওফীকদাতা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে, আর তা হলো—যাদুকে যাদুর মাধ্যমে নিরাময় করা, যা জিনদের সন্তুষ্ট করার জন্য পশু উৎসর্গ বা অন্যান্য নৈকট্যের মাধ্যমে করা হয়; এটি জায়েয নয়। কারণ এটি শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত, বরং এটি শিরকে আকবারের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে যাদুর চিকিৎসা করার জন্য জ্যোতিষী, গণক বা ভেলকিবাজদের সাহায্য চাওয়া এবং তাদের কথামতো চলাও বৈধ নয়। কারণ তারা ঈমানদার নয়, বরং তারা মিথ্যাবাদী ও পাপাচারী যারা গায়বের জ্ঞান দাবি করে এবং মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে যাওয়া, তাদের প্রশ্ন করা এবং তাদের বিশ্বাস করা থেকে সতর্ক করেছেন, যেমনটি এই পুস্তিকার শুরুতেই এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কাজেই এটি থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে "নুশরা" সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন:
«هِيَ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ».
“এটা হচ্ছে শয়তানের কাজ।” এটি জাইয়্যিদ সনদে ইমাম আহমাদ ও আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।
নুশরা হলো যাদুগ্রস্ত ব্যক্তি থেকে যাদু অপসারণ করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্তব্য দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল সেই নুশরা, যা জাহিলিয়াতের যুগের লোকেরা ব্যবহার করত। এটি হলো: যাদুকরের কাছে যাদু অপসারণের অনুরোধ করা, অথবা আরেক যাদুকরের মাধ্যমে একই ধরনের যাদু দিয়ে তা অপসারণ করা।
তবে শরিয়তসম্মত ঝাড়ফুঁক ও দুআ এবং হালাল ওষুধের মাধ্যমে যাদু অপসারণ করতে কোন সমস্যা নেই, যেমনটি আগে আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম ও শাইখ আবদুর রহমান বিন হাসান রহঃ ‘ফাতহুল মজীদ’-এ স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন এবং অন্যান্য আলিমগণও এ বিষয়ে একই মন্তব্য করেছেন।
আল্লাহ্র কাছে কামনা করি, তিনি মুসলমানদেরকে সব ধরনের বিপদ থেকে নিরাপদ রাখুন, তাদের দ্বীন রক্ষা করুন, তাতে গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাদেরকে তার শরীয়ত বিরুদ্ধ সবকিছু থেকে হেফাযতে রাখুন।
আর আল্লাহ তাঁর বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদ, তার পরিবার ও সাহাবীদের প্রতি সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
দশম পুস্তিকা: কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ থেকে সতর্কীকরণ
আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর।
অতঃপর: ইসলামিক সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের তৃতীয় সংখ্যায় "মাসের মুসলিম সংবাদ" বিভাগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন আমি দেখেছি। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জর্ডানের হাশেমি কিংডমের ইসলামিক সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি আবিষ্কৃত রাহিব গ্রামের গুহার উপর একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এই গুহাটি সম্পর্কে বলা হয় যে, এখানেই কুরআনে উল্লিখিত আসহাবে কাহফ (গুহাবাসী) ঘুমিয়ে ছিলেন। সমাপ্ত।
আল্লাহ এবং তাঁর বান্দাদের জন্য উপদেশ প্রদানের বাধ্যবাধকতার কারণে; আমি জর্ডানের হাশেমি রাজ্যের ইসলামিক সায়েন্সেস অ্যাসোসিয়েশনের ম্যাগাজিনে একটি বক্তব্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি; যার মূল বিষয়বস্তু: উল্লেখিত গুহার উপর মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্পর্কে অ্যাসোসিয়েশনকে উপদেশ প্রদান করা; কারণ, নবী ও সৎকর্মশীলদের কবর এবং তাদের নিদর্শনের উপর মসজিদ নির্মাণ করা থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শরীয়ত নিষেধ করেছে, সতর্ক করেছে এবং যারা এটি করে তাদেরকে লা‘নত করেছে। কারণ এটি শির্কের মাধ্যম এবং নবী ও সৎকর্মশীলদের নিয়ে অতিরঞ্জনের শামিল। বাস্তবতা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, শরীয়ত যা নিয়ে এসেছে তা সত্য ও তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং এটি একটি উজ্জ্বল প্রমাণ ও অকাট্য দলীল যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন এবং উম্মতের কাছে যা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন তা সত্য। যে কেউ ইসলামী বিশ্বের অবস্থা এবং কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ, সেগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, এর ওপর কার্পেটিং ও সৌন্দর্যবর্ধন এবং এর জন্য খাদেম নিয়োগ-এর কারণে তাতে ঘটে যাওয়া শিরক ও অতিরঞ্জন পর্যবেক্ষণ করে দেখবে, সে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, এগুলো শিরকের মাধ্যম। ইসলামী শরীয়তের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এগুলো থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং এসব নির্মাণ থেকে সতর্ক করা।
এ বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে তা হলো, ইমাম বুখারী ও মুসলিম -রহমাতুল্লাহি আলাইহিমা- বর্ণনা করেছেন যে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى، اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ، قالَتْ عَائِشَةُ: يُحَذِّرُ مَا صَنَعُوا، قالَتْ: وَلَوْلَا ذَلِكَ لَأُبْرِزَ قَبْرُهُ، غَيْرَ أَنَّهُ خُشِيَ أَنْ يُتَّخَذَ مَسْجِدًا».
“আল্লাহ ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে অভিসম্পাত করুন, তারা তাদের নবীদের সমাধিসমূহকে উপাসনালয়ে পরিণত করেছে।’’ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: তিনি তাদের কৃতকর্ম থেকে সতর্ক করছিলেন। তিনি বলেন: যদি তা না হতো তাহলে তার কবরকে প্রকাশ করা হতো। কিন্তু তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, তার কবরকে সেজদার স্থান বানানো হতে পারে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আরো বর্ণিত আছে যে, “উম্মু সালামা ও উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাবশায় তাদের দেখা একটি গির্জা এবং তাতে যেসব ছবি ছিল তা উল্লেখ করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
«أُولَئِكَ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ؛ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ».
“তারা এমন জাতি যে, তাদের মধ্যে কোনো নেককার ব্যক্তি মারা গেলে তার কবরের উপর তারা মসজিদ নির্মাণ করত এবং তাতে ঐসব চিত্রকর্ম অংকন করত। তারা হলো, আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট সৃষ্টি।”
সহীহ মুসলিমে জুনদুব ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার ইন্তেকালের পাঁচ দিন পূর্বে এ কথা বলতে শুনেছি:
«إِنِّي أَبْرَأُ إِلَى اللَّهِ أَنْ يَكُونَ لِي مِنْكُمْ خَلِيلٌ، فَإِنَّ اللَّهَ قَدِ اتَّخَذَنِي خَلِيلًا، كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا، وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أُمَّتِي خَلِيلًا، لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلًا، أَلَا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ، فَإِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ».
"তোমাদের কেউ আমার খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) হওয়া থেকে আমি আল্লাহর কাছে নিষ্কৃতি চাইছি; কেননা আল্লাহ তা‘আলা আমাকে খলীলরূপে গ্রহণ করেছেন, যেমনভাবে খলীলরূপে গ্রহণ করেছেন ইবরাহীম ‘আলাইহিস সালামকে। আমি যদি আমার উম্মাতের মধ্যে কাউকে খলীলরূপে গ্রহণ করতাম, তবে আবূ বকরকেই গ্রহণ করতাম। সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেককারদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়েছিল। সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানিও না। আমি তোমাদের তা থেকে নিষেধ করছি।” এই বিষয়ে অনেক হাদীস রয়েছে।
চার মাযহাবের ইমামগণ এবং অন্যান্য মুসলিম আলেমগণ কবরের উপর মসজিদ নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন এবং এ থেকে সতর্ক করেছেন; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করণার্থে এবং উম্মতের কল্যাণের জন্য তাদেরকে সতর্ক করার জন্য, যেন তারা পূর্ববর্তী ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের মতো অতিরঞ্জনের মধ্যে না পড়ে এবং এই উম্মতের পথভ্রষ্টদের মতো না হয়।
অতএব, জর্ডানের ইসলামিক সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন এবং অন্যান্য মুসলিমদের উপর ওয়াজিব হচ্ছে সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, ইমামদের পথ অনুসরণ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা থেকে সতর্ক করেছেন তা থেকে সতর্ক থাকা; কেননা এতে রয়েছে বান্দাদের সংশোধন, সুখ এবং দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি। কিছু মানুষ এই বিষয়ে আসহাবুল কাহাফের কাহিনীতে উল্লেখিত আল্লাহর মহিমান্বিত বাণী দ্বারা দলীল প্রদান করে থাকে:
﴿...قَالَ ٱلَّذِينَ غَلَبُواْ عَلَىٰٓ أَمۡرِهِمۡ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيۡهِم مَّسۡجِدٗا﴾
বলল, ‘আমরা তো নিশ্চয় তাদের পাশে মসজিদ নির্মাণ করব।’ [আল-কাহাফ: ২১]
এর জবাব হলো: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সেই সময়ের নেতৃবৃন্দ ও ক্ষমতাধরদের সম্পর্কে জানিয়ে দেন যে, তারা এ কথাটি বলেছিল। এটি তাদের প্রতি সন্তুষ্টি বা সমর্থনের জন্য নয়, বরং তাদের কাজের নিন্দা, দোষারোপ এবং তাদের কাজ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে। এর ওপর প্রমাণ হল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যার উপর এই আয়াত নাযিল করা হয়েছে এবং যিনি এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞানী; তিনি তার উম্মতকে কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ থেকে নিষেধ করেছেন, তাদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এবং যারা এ কাজ করেছে তাদেরকে লানত ও নিন্দা করেছেন।
যদি এটি জায়েয হতো তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত কঠোরভাবে সতর্ক করতেন না এবং এত অধিক গুরুত্বারোপ করতেন না যে, তিনি এমন কাজ সম্পাদনকারীকে লা‘নত করেছেন এবং সংবাদ দিয়েছেন যে, সে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। আর এটুকুই সত্যের অনুসন্ধানকারীর জন্য যথেষ্ট ও সন্তোষজনক। যদি ধরে নিই যে, আমাদের পূর্ববর্তী জাতির জন্য কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা বৈধ ছিল; তবুও আমাদের জন্য তাদের অনুসরণ করা বৈধ নয়; কেননা আমাদের শরী‘আত পূর্ববর্তী সকল শরী‘আতকে রহিত করেছে, এবং আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন শেষ নবী, তার শরী‘আত পূর্ণাঙ্গ ও সার্বজনীন। তিনি আমাদেরকে কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ থেকে নিষেধ করেছেন; সুতরাং তার বিরোধিতা করা আমাদের জন্য জায়েয নয়। বরং তার আনুগত্য করা, যা তিনি নিয়ে এসেছেন তা আঁকড়ে ধরা এবং পুরাতন শরী‘আত ও তাদের নিকট পছন্দনীয় রীতিসমূহ পরিত্যাগ করা আমাদের জন্য আবশ্যক; কেননা আল্লাহর শরী‘আতের চেয়ে পূর্ণাঙ্গ কিছু নেই এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথনির্দেশের চেয়ে উত্তম কোনো পথনির্দেশ নেই।
আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদের এবং সকল মুসলিমকে তাঁর দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকার এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়াহ আঁকড়ে ধরার তাওফীক দান করেন; কথা ও কাজ, প্রকাশ্য ও গোপন এবং সকল বিষয়ে, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করি। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন এবং অতি সন্নিকটে।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবারবর্গ, সাহাবীগণ এবং যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার হিদায়াতের অনুসরণ করবে তাদের উপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
একাদশতম পুস্তিকা: মসজিদে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা সম্পর্কে
আল্লাহর নামে শুরু করছি। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যই। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের ওপর, তার পরিবারবর্গ এবং যারা তার পথ অনুসরণ করেছে তাদের ওপর। অতঃপর:
১৭/৪/১৪১৫ হিজরিতে প্রকাশিত ‘আল-খারতূম’ পত্রিকাটি পড়ছিলাম। আমি এতে উম্মু দুরমান শহরের মসজিদের পাশে সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আল-হাসান আল-ইদ্রিসিকে তার বাবার কবরের পাশে সমাধি করা হয়েছে বলে একটি বিবৃতি পেয়েছি... শেষ পর্যন্ত।
আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু মুসলিমদেরকে নসিহত করা এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করাকে আবশ্যক করেছেন, তাই এ বিষয়ে সতর্ক করা সমীচীন মনে করলাম যে, মসজিদে কাউকে দাফন করা জায়েয নয়; বরং এটি শির্কের একটি মাধ্যম। তাছাড়া এটি ইয়াহুদি ও খ্রীষ্টানদের কাজ, যাদেরকে আল্লাহ নিন্দা করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা‘নত করেছেন। যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَعَنَ اللَّهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى، اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ».
“ইয়াহূদী ও নাসারাদরে প্রতি আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবীদের কবরকে মাসজিদে পরিণত করেছে।” সহীহ মুসলিমে জুনদুব ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«أَلَا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مَسَاجِدَ، أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ؛ فَإِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ».
“জেনে রাখো! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবরগুলোকে মসজিদ বানাতো। খবরদার, তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানাবে না; আমি তোমাদেরকে তা থেকে নিষেধ করছি।” এ বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে।
সুতরাং পৃথিবীর সবখানেই মুসলিমদের - রাষ্ট্র ও জনগণ- উপর ফরয হলো আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে তাঁকে ভয় করা, তিনি যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা এবং তাদের মৃতদেরকে মসজিদের বাইরে দাফন করা। যেমনভাবে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ মৃতদেরকে মসজিদের বাইরে দাফন করেছেন। অনুরূপভাবে তাদেরকে ইহসানের সাথে অনুসরণকারী তাবেয়ীগণও একই কাজ করেছেন।
অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর দুই সঙ্গী আবূ বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার কবর মসজিদে হওয়া মৃত ব্যক্তিকে মসজিদে দাফন করার স্বপক্ষে কোন দলিল নয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসালামকে তার গৃহে - আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার ঘরে- দাফন করা হয়েছিল। অতঃপর তার দুই সঙ্গীকে তার সাথে দাফন করা হয়েছিল। অতঃপর যখন ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালেক মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন, তখন হিজরি প্রথম শতাব্দীর শুরুতে তিনি এতে কক্ষটি অন্তর্ভুক্ত করেন। যদিও আহলে ইলমরা এ থেকে তাকে নিষেধ করেছিলেন; কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন যে, এটি সম্প্রসারণকে বাধা দেয় না এবং এ বিষয়টি সকলের কাছেই স্পষ্ট এবং কোন অস্পষ্ট ছিল না।
সুতরাং, প্রতিটি মুসলিমের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তার দুই সাহাবী (আবূ বকর ও উমার) রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে মসজিদে দাফন করা হয়নি। সম্প্রসারণের কারণে তাদের কবরকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মসজিদে দাফনের বৈধতার প্রমাণ নয়। যেহেতু তাদের কবর মসজিদে নেই; বরং তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে শায়িত আছেন। তাছাড়া ওয়ালিদের কর্মকাণ্ড এই ব্যাপারে কারো কাছে দলিল-প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; বরং দলিল-প্রমাণ হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ এবং উম্মাহর সালফে সালেহীনের ইজমা। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন এবং আমাদেরকে তাদের অনুসারীদের মধ্যে কল্যাণে অন্তর্ভুক্ত করুন।
নসীহত ও দায়মুক্তির জন্য এটি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে: ১৪/০৫/১৪১৫ হিজরীতে।
আল্লাহই তাওফীকের মালিক। আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তার পরিবার, সাহাবীগণ এবং তাদের অনুসারীদের উপর আল্লাহ সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
***
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
দ্বাদশ পুস্তিকা: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী‘আত থেকে বের হওয়ার সুযোগ আছে বলে যে দাবী করে তার কুফর ও ভ্রষ্টতার বর্ণনা
সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর, সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক নবী ও রাসূলদের মধ্যে সর্বশেষ রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মাদ এবং তার পরিবারবর্গ ও সমস্ত সাহাবীর উপর।
অতঃপর: আমি ‘আশ-শারকুল আওসাত’ পত্রিকার সংখ্যা (৫৮২৪) এবং তারিখ ৫/৬/১৪১৫ হিজরীতে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ দেখেছি, যা লিখেছেন নিজেকে আব্দুল ফাত্তাহ আল-হায়েক নামে পরিচয়দাতা একজন। এর শিরোনাম ছিল: (ভুল ধারণা)।
প্রবন্ধটির সারসংক্ষেপ হলো: এটি ইসলামের মৌলিক এমন বিষয়কে অস্বীকার করে, যা প্রয়োজনীয় জ্ঞান, স্পষ্ট দলিল ও ইজমার মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত; আর তা হলো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সার্বজনীনতাকে অস্বীকার করা। তার দাবি, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করে না এবং তার আনুগত্য করে না, বরং ইহুদী বা খৃষ্টান হিসেবে থাকে, সেও সঠিক দ্বীনের ওপর আছে। এরপর সে বিশ্বজগতের রবের ওপর দুঃসাহস দেখিয়েছে; কাফির ও অবাধ্যদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর হিকমাহকে অবজ্ঞা করে এবং এটিকে অর্থহীন বলে অভিহিত করেছে!
সে শরীয়তের নসসমূহকে বিকৃত করেছে এবং সেগুলোকে ভুল স্থানে প্রয়োগ করেছে , নিজের খেয়াল অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেছেন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সার্বজনীনতা এবং যে ব্যক্তি তার সম্পর্কে শুনেছে কিন্তু তাকে অনুসরণ করেনি তার কুফর সম্পর্কে সুস্পষ্ট দলিল ও নসসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইসলামের বাইরে অন্য কোনো দ্বীন কবুল করবেন না, এ ধরনের সুস্পষ্ট নসসমূহ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন; যাতে তার কথার দ্বারা মূর্খরা প্রতারিত করতে পারে। এবং সে যা করেছে তা স্পষ্ট কুফরী, ইসলাম থেকে মুরতাদ হওয়া এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, যেমনটি জ্ঞান ও ঈমানের অধিকারী ব্যক্তিরা এই প্রবন্ধ পাঠ করে জানতে পারে।
মুসলিম শাসকের উপর ওয়াজিব হলো: তাকে আদালতে প্রেরণ করা; যেন তাকে তওবা করানো যায়, এবং শরীয়ত মোতাবেক তার উপর হুকুম প্রয়োগ করা যায়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সার্বজনীনতা এবং সকল জিন ও মানবের উপর তার অনুসরণ করা ফরয হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আর মুসলমানদের মধ্যে যাদের নূন্যতম জ্ঞান আছে, তারা এ বিষয়টিতে অজ্ঞ নয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا ٱلَّذِي لَهُۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحۡيِۦ وَيُمِيتُۖ فَـَٔامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِ ٱلنَّبِيِّ ٱلۡأُمِّيِّ ٱلَّذِي يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَٱتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ158﴾
বলুন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই; তিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহ্র প্রতি ও তাঁর রাসূল উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।’ [আল-আরাফ: ১৫৮] তিনি আরো বলেন,
﴿...وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانُ لِأُنذِرَكُم بِهِۦ وَمَنۢ بَلَغَ...﴾
...আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট তা পৌঁছবে তাদেরকে এ দ্বারা সতর্ক করতে পারি... [আল-আনআম: ১৯] তিনি আরো বলেন,
﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ31﴾
বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ [আলে ইমরান: ৩১] তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ85﴾
আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। [আলে-ইমরান: ৮৫]। তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا كَآفَّةٗ لِّلنَّاسِ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗا...﴾
আর আমরা তো আপনাকে সমগ্ৰ মানুষের জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি... [সাবা: ২৮] তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ107﴾
আর আমরা তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু রহমতরূপেই পাঠিয়েছি [আল-আম্বিয়া: ১০৭] তিনি আরো বলেন,
﴿...وَقُل لِّلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ وَٱلۡأُمِّيِّـۧنَ ءَأَسۡلَمۡتُمۡۚ فَإِنۡ أَسۡلَمُواْ فَقَدِ ٱهۡتَدَواْۖ وَّإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا عَلَيۡكَ ٱلۡبَلَٰغُۗ وَٱللَّهُ بَصِيرُۢ بِٱلۡعِبَادِ﴾
আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বলুন, ‘তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ?’ যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয় তারা হেদায়াত পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে আপনার কর্তব্য শুধু প্রচার করা। আর আল্লাহ্ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। [আলে ইমরান: ২০] তিনি আরো বলেছেন:
﴿تَبَارَكَ ٱلَّذِي نَزَّلَ ٱلۡفُرۡقَانَ عَلَىٰ عَبۡدِهِۦ لِيَكُونَ لِلۡعَٰلَمِينَ نَذِيرًا1﴾
কত বরকতময় তিনি! যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন, সৃষ্টিজগতের জন্য সতর্ককারী হওয়ার জন্য। [আল-ফুরকান: ১]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«أُعْطِيتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ قَبْلِي: نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيرَةَ شَهْرٍ، وَجُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا، فَأَيُّمَا رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي أَدْرَكَتْهُ الصَّلَاةُ، فَلْيُصَلّ، وَأُحِلَّتْ لِيَ الْمَغَانِمُ، وَلَمْ تُحَلَّ لِأَحَدٍ قَبْلِي، وَأُعْطِيتُ الشَّفَاعَةَ، وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً، وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ عَامَّةً».
“আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে কাউকে দেওয়া হয়নি: (১) আমাকে এমন প্রভাব দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে যে, একমাস দূরত্বেও তা প্রতিফলিত হয়; (২) সমস্ত যমীন আমার জন্য পবিত্র ও সালাত আদায়ের উপযোগী করা হয়েছে। কাজেই আমার উম্মতের যে কোন লোক যেকোন স্থানে ওয়াক্ত হলেই সালাত আদায় করতে পারবে; (৩) আমার জন্য গানীমাতের মাল হালাল করে দেওয়া হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কারো জন্য হালাল করা হয়নি; (৪) আমাকে (ব্যাপক) শাফা‘আতের অধিকার দেয়া হয়েছে; (৫) সমস্ত নবী প্রেরিত হতেন কেবল তাদের সম্প্রদায়ের জন্য, আর আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য।”
এটি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সার্বজনীনতা ও সকল মানবজাতির জন্য প্রযোজ্যতার স্পষ্ট বর্ণনা। আর এটি পূর্ববর্তী সকল শারী‘আত রহিত করেছে। যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করবে না এবং তার আনুগত্য করবে না, সে কাফির ও অবাধ্য এবং শাস্তির উপযুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...وَمَن يَكۡفُرۡ بِهِۦ مِنَ ٱلۡأَحۡزَابِ فَٱلنَّارُ مَوۡعِدُهُۥ...﴾
অন্যান্য দলের যারা তাতে কুফরী করে, আগুনই তাদের প্রতিশ্রুত স্থান [হুদ: ১৭] তিনি আরো বলেন,
﴿...فَلۡيَحۡذَرِ ٱلَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنۡ أَمۡرِهِۦٓ أَن تُصِيبَهُمۡ فِتۡنَةٌ أَوۡ يُصِيبَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ﴾
কাজেই যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের উপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [আন-নূর: ৬৩] তিনি আরো বলেন,
﴿وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُۥ يُدۡخِلۡهُ نَارًا خَٰلِدٗا فِيهَا وَلَهُۥ عَذَابٞ مُّهِينٞ14﴾
আর কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হলে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমা লংঘন করলে তিনি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রয়েছে। [আন-নিসা: ১৪] তিনি আরো বলেন,
﴿...وَمَن يَتَبَدَّلِ ٱلۡكُفۡرَ بِٱلۡإِيمَٰنِ فَقَدۡ ضَلَّ سَوَآءَ ٱلسَّبِيلِ﴾
আর যে ঈমানকে কুফরে পরিবর্তন করবে, সে অবশ্যই সরল পথ হারাল। [আল-বাকারা: ১০৮] এই অর্থে অনেক আয়াত রয়েছে।
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যকে তাঁর নিজের আনুগত্যের সাথে সংযুক্ত করেছেন এবং স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু বিশ্বাস করবে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার নিকট থেকে ফরয ও নফল কোনো কিছুই গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ85﴾
আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। [আলে-ইমরান: ৮৫]। তিনি আরো বলেন,
﴿مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ...﴾
কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল [আন-নিসা: ৮০] তিনি আরো বলেন,
﴿قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ وَإِنْ تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا...﴾
বলুন, ‘তোমরা আল্লাহ্র আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর।’ তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনিই দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী; আর তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে। [আন-নূর: ৫৪] তিনি আরো বলেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ 6﴾
নিশ্চয় কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরি করেছে তারা এবং মুশরিকরা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; তারাই সৃষ্টির অধম। [আল-বাইয়্যিনাহ: ৬]
মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ؛ لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ، يَهُودِيٌّ وَلَا نَصْرَانِيٌّ، ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ؛ إِلَّا كَانَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ».
“যার হাতে আমার জীবন, তার শপথ করে বলছি, এ উম্মতের যে কেউ, চাই সে ইহুদী হোক বা খৃষ্টান হোক আমার আগমনের সংবাদ পাওয়ার পর সে আমি যে বিষয়াবলী নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার প্রতি ঈমান না এনে মারা যাবে, সে অবশ্যই জাহান্নামী হবে। “
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কর্ম ও কথার মাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন যে, যারা ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করেনি তাদের ধর্ম মিথ্যা। তিনি ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, যেমনভাবে তিনি অন্য কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তিনি তাদের কাছ থেকে জিজিয়া কর আদায় করেছেন, যাতে তারা ইসলামের প্রচারের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের মধ্যে যে কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে চায়, সে যেন তার জনগণকে ভয় না পায়, যে তারা তাকে বাধা দিবে, নিষেধ করবে বা হত্যা করবে।
বুখারী ও মুসলিম রাহিমাহুমুল্লাহ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমরা মসজিদে অবস্থান করছিলাম, এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে বললেন:
«انْطَلِقُوا إِلَى يَهُودَ، فَخَرَجْنَا مَعَهُ حَتَّى جِئْنَا بَيْتَ الْمِدْرَاسِ، فَقَامَ النَّبِيُّ ﷺ، فَنَادَاهُمْ فَقَالَ :يَا مَعْشَرَ يَهُودَ، أَسْلِمُوا تَسْلَمُوا، فَقَالُوا: قَدْ بَلَّغْتَ يَا أَبَا الْقَاسِمِ، فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: ذَلِكَ أُرِيدُ، أَسْلِمُوا تَسْلَمُوا، فَقَالُوا: قَدْ بَلَّغْتَ يَا أَبَا الْقَاسِمِ، فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: ذَلِكَ أُرِيدُ، ثُمَّ قَالَهَا الثَّالِثَةَ...».
"তোমরা ইহুদীদের কাছে যাও। তারপর আমরা তার সাথে বের হলাম এবং বায়তুল মাদরাসে পৌঁছালাম। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন: হে ইহুদীগণ, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করলে শান্তিতে থাকবে। তারা বলল: হে আবুল কাসিম! তুমি ইতোমধ্যেই পৌঁছে দিয়েছ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন: এটাই আমি চাই, ইসলাম গ্রহণ করো, শান্তিতে থাকবে। তারা বলল: হে আবুল কাসিম! তুমি ইতোমধ্যেই পৌঁছে দিয়েছ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন: এটাই আমি চাই। তারপর তিনি তৃতীয়বারও একই কথা বললেন...।” .
অর্থাৎ, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদীদের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানালেন এবং বললেন: «ইসলাম গ্রহণ করো, শান্তিতে থাকবে», এ কথাটি তাদেরকে বারবার বললেন।
অনুরূপভাবে: তিনি হিরাকলের নিকট তার পত্র প্রেরণ করেন তাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানিয়ে এবং তাকে জানান যে, যদি সে বিরত থাকে তবে তার উপর তাদের পাপও বর্তাবে যারা তার বিরত থাকার কারণে ইসলাম থেকে বিরত থাকে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, হিরাকল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র আনতে বললেন এবং তা পড়লেন, তাতে লেখা ছিল:
«بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ، سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، أَمَّا بَعْدُ: فَإِنِّي أَدْعُوكَ بِدِعَايَةِ الْإِسْلَامِ، أَسْلِمْ تَسْلَمْ، وَأَسْلِمْ يُؤْتِكَ اللَّهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ، فَإِنَّ عَلَيْكَ إِثْمَ الْأَرِيسِيِّينَ وَ
"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে হেরাক্লিয়াস, রোমের মহান সম্রাটের প্রতি। হেদায়েতের অনুসারীদের প্রতি সালাম। অতঃপর: আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদ থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। আর যদি আপনি মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে আপনার উপর আরিসিয়ানদের পাপ বর্তাবে।"
﴿يَٰٓأَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ تَعَالَوۡاْ إِلَىٰ كَلِمَةٖ سَوَآءِۭ بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمۡ أَلَّا نَعۡبُدَ إِلَّا ٱللَّهَ وَلَا نُشۡرِكَ بِهِۦ شَيۡـٔٗا وَلَا يَتَّخِذَ بَعۡضُنَا بَعۡضًا أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِۚ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَقُولُواْ ٱشۡهَدُواْ بِأَنَّا مُسۡلِمُونَ64﴾
হে আহ্লে কিতাবগণ! এস সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া একে অন্যকে রব হিসেবে গ্রহণ না করি। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম। [আলে ইমরান: ৬৪]”।
তারপর যখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিল এবং ইসলামে প্রবেশ করতে অস্বীকার করল; তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ -রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম- তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন এবং তাদের উপর জিযিয়া কর আরোপ করলেন।
তাদের বিভ্রান্তির নিশ্চয়তা এবং তারা যে মিথ্যা ধর্মে রয়েছে, যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দ্বীন দ্বারা বাতিল হয়েছে, তা প্রমাণের জন্য আল্লাহ মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা প্রতিদিন, প্রতিটি সালাতে এবং প্রতিটি রাকআত-এ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন যে, আল্লাহ যেন তাদেরকে সঠিক, গ্রহণযোগ্য এবং সোজা পথ প্রদর্শন করেন। আর তা হলো: ইসলাম। এবং তাকে গযবপ্রাপ্তদের পথ থেকে দূরে রাখার জন্য প্রার্থনা করেন, তারা হচ্ছে: ইহুদী এবং তাদের মতো যারা জানে যে তারা বাতিলের উপর আছে, তবুও তাতে অটল থাকে। অনুরূপভাবে তাকে পথভ্রষ্টদের পথ থেকে দূরে রাখার জন্যও প্রার্থনা করেন, যারা ইলম বিহীন ইবাদাত করে এবং দাবি করে যে তারা সঠিক পথে আছে, অথচ তারা ভ্রষ্টতার পথে আছে। আর তারা হচ্ছে: খৃষ্টান এবং অন্যান্য জাতি যারা ভ্রষ্টতা ও মূর্খতার উপর ইবাদাত করে। এ সবকিছু এজন্য যে: যেন মুসলিম ব্যক্তি নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করে যে, ইসলাম ছাড়া সকল ধর্মই বাতিল এবং যে ব্যক্তি ইসলামের বাইরে আল্লাহর ইবাদত করে সে পথভ্রষ্ট। আর যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস পোষণ করে না, সে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই বিষয়ে কিতাব ও সুন্নাহতে অনেক দলিল রয়েছে।
অতএব, প্রবন্ধটির লেখক আব্দুল ফাত্তাহ্কে অবশ্যই খাঁটি তাওবা করতে হবে এবং একটি প্রবন্ধ লিখে তার তাওবার ঘোষণা করতে হবে। আর যে আল্লাহর কাছে সত্যিকারের তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন; কারণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন:
﴿...وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ﴾
হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহ্র দিকে ফিরে আস, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ [আন-নূর: ৩১]। তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿وَٱلَّذِينَ لَا يَدۡعُونَ مَعَ ٱللَّهِ إِلَٰهًا ءَاخَرَ وَلَا يَقۡتُلُونَ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّ وَلَا يَزۡنُونَۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ يَلۡقَ أَثَامٗا68 يُضَٰعَفۡ لَهُ ٱلۡعَذَابُ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَيَخۡلُدۡ فِيهِۦ مُهَانًا69 إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ عَمَلٗا صَٰلِحٗا فَأُوْلَٰٓئِكَ يُبَدِّلُ ٱللَّهُ سَيِّـَٔاتِهِمۡ حَسَنَٰتٖۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا70﴾
এবং তারা আল্লাহ্র সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না। আর আল্লাহ্ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। আর তারা ব্যভিচার করে না; যে এগুলো করে, সে শাস্তি ভোগ করবে।
কিয়ামতের দিন তার শাস্তি বর্ধিতভাবে প্ৰদান করা হবে এবং সেখানে সে স্থায়ী হবে হীন অবস্থায়;
তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, ফলে আল্লাহ্ তাদের গুণাহসমূহ নেক দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [আল-ফুরকান: ৬৮-৭০] তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«الإِسْلَامُ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ، وَالتَّوبَةُ تَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهَا».
“ইসলাম পূর্বের সমস্ত পাপকে মিটিয়ে দেয়, আর তাওবাহ তার পূর্বের সকল পাপ মূছে দেয়।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকটি বাণী:
«التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبَ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ».
“গুনাহ থেকে তাওবা করা ব্যক্তি এমন, যেন তার কোন গুনাহ নেই।”
এ বিষয়ে অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে হককে হক হিসেবে দেখা ও তার আনুগত্য করার তাওফীক দেন, আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে দেখা ও তা থেকে বাঁচার তাওফীক দেন। তিনি যেন আমাদের, লেখক আব্দুল ফাত্তাহ এবং সকল মুসলিমদেরকে খাঁটি তওবা করার তাওফীক দান করেন। আমাদের সকলকে বিভ্রান্তিকর ফিতনা, প্রবৃত্তির আনুগত্য এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তিনি এর অভিভাবক এবং এর উপর ক্ষমতাবান।
আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবার পরিজন, সাহাবীগণ এবং যারা কিয়ামত পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করবে তাদের সকলের ওপর।
***
সূচিপত্র
বিশুদ্ধ আকিদা এবং এর পরিপন্থী বিষয়সমূহ 2
প্রথম মূলনীতি: আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা। আর এটি কয়েকটি বিষয়কে শামিল করে, তন্মধ্যে: 6
দ্বিতীয় মূলনীতি: ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান, যার মধ্যে দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত: 22
তৃতীয় মুলনীতি: কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, যার মধ্যে দু’টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত: 24
চতুর্থ মূলনীতি: রাসূলগণের প্রতি ঈমান 27
পঞ্চম মূলনীতি: আখিরাতের প্রতি ঈমান আনা 28
ষষ্ঠ মূলনীতি: তাকদীরের প্রতি ঈমান 29
বিশুদ্ধ আকীদার পরিপন্থী আকীদাসমূহ 36
দ্বিতীয় পত্র: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বিপদে সাহায্য চাওয়ার হুকুম সম্পর্কে 46
তৃতীয় পত্র 67
জিন ও শয়তানের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং তাদের জন্য মানত করার বিধান সম্পর্কে। 67
চতুর্থ পত্র: 92
বিদ‘আতী ও শিরকী আওরাদ (তন্ত্র-মন্ত্র) দ্বারা ইবাদতের হুকুম 92
পঞ্চম পুস্তিকা: 120
মীলাদুন্নবী ও অন্যান্য মীলাদ উদযাপনের বিধান 121
ষষ্ঠ পুস্তিকা: 134
লাইলাতুল ইসরা ও মেরাজ উদযাপনের বিধান 134
সপ্তম পুস্তিকা: 143
মধ্য শাবানের রাত (শবে বরাত) উদযাপনের বিধান 143
অষ্টম পত্র: 160
একটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অসিয়তের ব্যাপারে জরুরী সতর্কবার্তা, যা সম্বন্ধ করা হয়েছে 160
মসজিদে নববীর খাদেম শাইখ আহমদ-এর দিকে। 160
নবম পুস্তিকা: যাদু ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের হুকুম এবং এর সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহ 179
দশম পুস্তিকা: কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ থেকে সতর্কীকরণ 198
একাদশতম পুস্তিকা: মসজিদে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা সম্পর্কে 205
দ্বাদশ পুস্তিকা: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী‘আত থেকে বের হওয়ার সুযোগ আছে বলে যে দাবী করে তার কুফর ও ভ্রষ্টতার বর্ণনা 209
***
সহীহ বুখারী (২৮৫৬), সহীহ মুসলিম (৩০)
লালাকাঈ, শারহু উসূলিল ইতিকাদ (৭৩৫), ইবনু আব্দুল বার, জামিউল উলুম ওয়া ফাদলিহি (১৮০১), তবে তারা সিফাতের আয়াতসমূহের পরিবর্তে হাদীসসমূহ উল্লেখ করেছেন। তার শব্দ হল: “এই হাদীসগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই বর্ণনা কর। এতে কোন তর্ক করো না”।
বায়হাকি, আল-আসমা ওয়াস-সিফাত (৮৬৫), ইবনু তাইমিয়্যাহ “আল-হামাবিয়াহ”(২৬৯) গ্রন্থে এর সনদ সহীহ বলেছেন। যাহাবী “আল-আরয” গ্রন্থে (২|২২৩) বলেন: এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য ইমাম।
লালাকাঈ, শারহু উসূলিল ইতিকাদ (৯৩০), বায়হাকি, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (৯৫৫)।
লালাকাঈ, শারহু উসুলিল ইতিকাদ (৬৬৫), বায়হাকি, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (৮৬৮)
লালাকাঈ, শারহু উসূলিল ইতিকাদ (৬৬৪), আবূ নুয়াইম, আল-হিলয়াহ (৬/৩২৫), বায়হাকি, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (৬৬৩)।
আল-মুযাক্কি, আল-মুযাক্কিয়াত (২৯), ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১২০), লালাকাঈ, শারহু উসূলিল ইতিকাদ (৬৬৩)
দারিমি, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (৬৭), বায়হাকি, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (৯০৩)।
আয-যাহাবি, আল-উলু (৪৬৪), আলবানি বলেছেন, এই সনদটি সহীহ, তার বর্ণনাকারীগণ প্রসিদ্ধ নির্ভরযোগ্য। মুখতাসারুল উলু (পৃ.১৮৪)
তাফসীর ইবনে কাসীর (৩/৪২৬,৪২৭)।
বুখারী (২২), আবূ সাঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,
সহীহ মুসলিম (২৯৯৬), আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীস।
বুখারী (৩৬৫১), মুসলিম (২৫৩৩), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত।
মুসলিম (১৯২০), সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীস।
ইবনু মাযাহ (৩৯৫২) সাওবান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস। ইবনু হিব্বান (৬৭১৪) ও হাকিম (৮৬৫৩), তারা হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
তিরমিযী (২৬৪১), আব্দুল্লাহ ইবনু আমর -রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস। মুনাভী রহঃ বলেন, “এর বর্ণনায় আব্দুর রহমান ইবনু যিয়াদ আফরিকি রয়েছেন, ইমাম যাহাবী বলেন, তারা সবাই তাকে দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। (ফায়যুল কাদীর (৫/৩৪৭), আলবানী এটি সহীহ বলেছেন। সহীহ আল-জামি (৫৩৪৩)।
মুসলিম (৮)
সহীহ বুখারী (২৮৫৬), সহীহ মুসলিম (৩০)