مِنْ أَحْكَامِ الصِّيَامِ
সিয়ামের কতিপয় বিধি-বিধান
اللَّجْنَةُ العِلْمِيَّةُ
بِرِئَاسَةِ الشُّؤُونِ الدِّينِيَّةِ بِالمَسْجِدِ الحَرَامِ وَالمَسْجِدِ النَّبَوِيِّ
মাসজিদুল হারাম ও মাসজিদে নববীর দ্বীনি বিষয় সম্পর্কিত প্রেসিডেন্সির একাডেমিক কমিটি
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
সিয়ামের কতিপয় বিধি-বিধান
প্রথম অধ্যায়
সওমের অর্থ এবং রমাদানের সিয়াম ওয়াজিব হওয়া প্রসঙ্গ
প্রথমত: সওমের অর্থ:
সিয়াম হল: ফজর উদিত হওয়া থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সওম ভঙ্গকারী সকল ধরনের বস্তু থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করা।
দ্বিতীয়ত: রমাদানের সিয়াম ওয়াজিব হওয়া:
রমাদানের সিয়াম ইসলামের একটি স্তম্ভ, যা ছাড়া একজন মুসলিমের দ্বীন সঠিক হয় না। সিয়াম সব জাতির ওপরই ফরয করা হয়েছে, যদিও তার পদ্ধতি ও সময় ভিন্ন ভিন্ন ছিল; যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ 183﴾
“হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩], আয়াতে উল্লেখিত (كتب) শব্দের অর্থ হল: ফরয করা হয়েছে।
সিয়াম ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার দলীল রয়েছে:
কিতাবের দলীল হল, আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ 183 أَيَّامٗا مَّعۡدُودَٰتٖ...﴾
“হে মুমিনগণ ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।*
নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য।" [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩-১৮৪]।
সুন্নাহর দলীল হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«بُنِيَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَـهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ، وَحَجِّ الْبَيْتِ».
“ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমাদানের সাওম পালন করা, এবং বাইতুল্লাহতে হজ্জ পালন করা।”1
আর ইজমা হলো যে: মুসলিমগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, সওম ওয়াজিব, আর যে ব্যক্তি সওম ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করবে সে কাফির।
দ্বিতীয় অধ্যায়
রমাদান মাসের ফযীলতসমূহ
এই মহিমান্বিত মাসের রয়েছে কতগুলো মহৎ বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ ফযীলত, যা তাকে অন্যান্য মাস থেকে মর্যাদাপূর্ণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হল:
১) এ মাসে কুরআন কারীম অবতীর্ণ হয়েছে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ...﴾
“রমাদান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫]।
২) এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়; এ সময়ে অধিক পরিমাণ সৎ আমলের কারণে।
৩) এ মাসে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়; পাপাচার হ্রাস পাওয়ার কারণে।
এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীতে এসেছে:
«إِذَا جَاءَ رَمَضَانُ، فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ، وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ».
“যখন রমাদান আসে তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় আর জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানগুলোকে শিকলবন্দী করা হয়।”2
৪) এর আরেকটি ফযীলত হল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«مَا مِنْ حَسَنَةٍ يَعْمَلُهَا ابْنُ آدَمَ إِلَّا كُتِبَ لَهُ عَشْرُ حَسَنَاتٍ إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ، قَالَ اللَّهُ: إِلَّا الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ، يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِي، الصِّيَامُ جُنَّةٌ، وَلِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ، وَلَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ».
“আদম সন্তান যে কোনো নেক আমল করে তার বিনিময় হিসেবে তার জন্য দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, 'তবে সওম ছাড়া, তা কেবল আমার জন্যই পালন করা হয়, ফলে আমি নিজেই তার বিনিময় দিয়ে থাকি। কারণ, সওম পালনকারী খানা-পিনা ও পানাহার কেবল আমার কারণেই ছেড়ে দেয়।' সিয়াম ঢাল স্বরূপ। আর সওম পালনকারীদের জন্য রয়েছে দু’টি আনন্দ। একটি ইফতারের সময় আর অপরটি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। একজন সওম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা‘আলার নিকট মিশকের সুগন্ধির থেকেও অধিক প্রিয়।”3 সুতরাং সিয়ামের প্রতিদান বৃদ্ধি কোন সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।
৫) অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় সিয়ামের ক্ষেত্রে ইখলাস বেশী থাকে, কারণ হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেছেন:
«تَرَكَ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ وَشَرَابَهُ مِنْ أَجْلِي».
“বান্দা আমার জন্যই নিজের কাম-প্রবৃত্তি ও পানাহার বর্জন করে।”।4
৬) আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম পালনকারীদের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, যে দরজা দিয়ে অন্য কেউ প্রবেশ করবে না।
৭) সিয়াম পালনকারীর দু‘আ কবুল হয়; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ دَعْوَةٌ لَا تُرَدُّ».
“সওম পালনকারীর ইফতারের সময়ের দু‘আ প্রত্যাখ্যাত হয় না।”5
৮) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».
“যে ব্যক্তি রমাদানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় সওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।”।6
সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উচিত ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় রমাদানের সওম পালন করা, যাতে সে প্রতিদান লাভ করে ও গুনাহ থেকে মাফ পায়।
তৃতীয় অধ্যায়
যার মাধ্যমে রমাদান মাসের আগমন সাব্যস্ত হয়
রমাদান মাসের প্রবেশ সাব্যস্ত হয় দুটি বিষয়ের যে কোন একটির মাধ্যমে। তা হল:
১) নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِذَا رَأَيْتُمُ الْهِلَالَ فَصُومُوا، وَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَأَفْطِرُوا، فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدُرُوا لَهُ».
“যখন তোমরা নতুন চাঁদ দেখবে তখন সিয়াম রাখবে, আবার যখন তা দেখবে তখন সিয়াম ছাড়বে। আর যদি আকাশ মেঘলা থাকে তবে সময় হিসাব করে (ত্রিশ দিন) পূর্ণ করো।”7 তিনি আরো বলেছেন:
«لَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوُا الْهِلَالَ، وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ».
“তোমরা চাঁদ না দেখে সওম পালন করো না এবং চাঁদ না দেখা পর্যন্ত ইফতার (সিয়াম শেষ) করো না।”8
২) যদি চাঁদ দেখা না যায় তবে শাবান মাসের গণনা ত্রিশ দিন পূর্ণ করতে হবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ لَيْلَةً، فَلَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْهُ، فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِينَ».
“মাস ঊনত্রিশ রাত বিশিষ্ট হয়। তাই তোমরা চাঁদ না দেখে সওম শুরু করবে না। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে তোমরা গণনা ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে।"9
চতুর্থ অধ্যায়
সিয়ামের নিয়ত
প্রতিটি আমল বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত, আর রমাদানের সিয়াম পালনের জন্য অবশ্যই রাত হতে সিয়ামের নিয়ম করতে হবে; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ لَمْ يُبَيِّتِ الصِّيَامَ قَبْلَ الْفَجْرِ، فَلَا صِيَامَ لَهُ».
“যে ব্যক্তি রাত্রে সিয়ামের নিয়ত করে না, তার সিয়াম হবে না। “10
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “যে কেউ জানে যে আগামীকাল রমাদানের দিন এবং সে সিয়াম পালনের ইচ্ছা করে, তাহলেই সে সিয়ামের নিয়ত করে ফেলল, সে তা মুখে উচ্চারণ করুক বা না করুক। এটাই সাধারণ মুসলমানদের কাজ; সবাই সিয়াম পালনের নিয়ত করে থাকে।”11
পঞ্চম অধ্যায়
কার উপর সিয়াম ওয়াজিব?
প্রত্যেক মুসলিম, বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক), ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির উপর
সিয়াম ওয়াজিব।
যদি সে সুস্থ ও মুকীম (অর্থাৎ মুসাফির না হয়) হয়, তবে তার ওপর সিয়াম আদায় করা ওয়াজিব। আর যদি অসুস্থ হয়, তবে তার ওপর পরবর্তীতে তা কাযা করা ওয়াজিব।
আর যদি সে সুস্থ কিন্তু মুসাফির হয়, তবে তার জন্য সিয়াম পালন করা বা তা ভঙ্গ করা উভয়টির অনুমতি রয়েছে; তবে সিয়াম না রাখাই উত্তম।
• সুতরাং সওম কাফেরের ওপর ফরয নয়, আর তা তার পক্ষ থেকে বিশুদ্ধও হবে না। তবে যদি সে মাসের মাঝপথে তাওবা করে (ইসলাম গ্রহণ করে), তাহলে বাকি দিনগুলো সিয়াম পালন করবে। কিন্তু কুফরের অবস্থায় যে দিনগুলো সে সিয়াম থাকেনি, তা কাযা করা তার জন্য আবশ্যক নয়।
• ছোট বাচ্চার ওপর সওম ফরয নয়। তবে যদি সে বুঝদার হয়, তাহলে তার সওম সহীহ হবে, এবং তা তার জন্য নফল হিসেবে গণ্য হবে।
• পাগলের উপর সওম ওয়াজিব নয়, সে যদি পাগল অবস্থায় সিয়াম পালন করে তবে তা বিশুদ্ধ হবে না; নিয়তের অনুপস্থিতির কারণে।
ষষ্ঠ অধ্যায়
কাদের জন্য সিয়াম ভঙ্গের অনুমতি রয়েছে?
নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের জন্য রমযান মাসের সিয়াম না রাখার অনুমতি রয়েছে:
১) এমন রোগী যার জন্য সিয়াম রাখা কষ্টসাধ্য, তার জন্য সিয়াম ভঙ্গ করা মুস্তাহাব।
২) এমন মুসাফির, যার ওপর রমাদান এসেছে সে সফরে থাকাকালীন অবস্থায়, অথবা সে মাসের মধ্যে এমন একটি সফর শুরু করেছে যার দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার বা ততোধিক।
৩) হায়েয ও নেফাসগ্রস্ত নারীর জন্য হায়েয ও নেফাসের সময় সিয়াম থাকা হারাম; কারণ, আয়েশা রাযিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময়ে আমাদের হায়েয হত। আমরা সওম কাযা করতে আদিষ্ট হতাম, কিন্তু সালাত কাযা করতে আদিষ্ট হতাম না।”12
৪) যে ব্যক্তি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আক্রান্ত, যার আরোগ্য লাভের আশা নেই এবং যার কারণে সে স্থায়ীভাবে সিয়াম পালনে অক্ষম, সে সিয়াম থাকবে না এবং প্রতিদিনের বিনিময়ে একজন মিসকিনকে অর্ধ সা‘ (প্রায় ১.৫ কেজি) গম বা অনুরূপ অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য খাওয়াবে। তার ওপর কাযা ওয়াজিব নয়।
৫) অতিবৃদ্ধ ব্যক্তি, যিনি সিয়াম পালনে সক্ষম নন,
তিনি সিয়াম না রেখে প্রতিদিনের বিনিময়ে একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবেন। তাকে কাযা করতে হবে না।
৬) গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী যদি নিজেদের অথবা তাদের সন্তানদের জন্য সিয়াম পালনের কারণে ক্ষতির আশঙ্কা করেন, তবে তারা সিয়াম ভঙ্গ করতে পারবে এবং পরে তা কাযা করবে। যদি তারা শুধু নিজেদের সন্তানদের ক্ষতির আশঙ্কায় সিয়াম ভঙ্গ করেন, তবে তারা কাযা করবেন এবং প্রতিদিনের জন্য একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবেন।
সপ্তম অধ্যায়
সিয়াম বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ:
১- সহবাস করা:
সুতরাং, রমাদানের দিনের বেলায় কেউ যদি সহবাস করে, তবে তার সিয়াম বাতিল হয়ে যাবে। দিনের বাকী অংশে তাকে সকল কিছু থেকে বিরত থাকতে হবে। তার জন্য তাওবা ও ইস্তিগফার করা আবশ্যক। তাকে ঐ দিনের সিয়াম কাযা করতে হবে এবং কাফফারা দিতে হবে। কাফফারা হল: একজন গোলাম আযাদ করা। যদি তা না পারে, তাহলে লাগাতার দুই মাস সিয়াম পালন করা। যদি তাও না পারে, তবে ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য দান করা - প্রত্যেক মিসকীনের জন্য আধা সা' গম বা নিজ এলাকার প্রধান খাদ্যশস্য প্রদান করা।"
২- চুম্বন, স্পর্শ, হস্তমৈথুন বা বারবার দৃষ্টিপাতের কারণে বীর্যপাত ঘটা:
সুতরাং যদি কোনো সিয়ামপালনকারী উল্লিখিত কোনো উপকরণের দ্বারা বীর্যপাত ঘটায়, তবে তার সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে। দিনের বাকী অংশে তাকে সকল কিছু থেকে বিরত থাকতে হবে এবং এই দিনটির কাযা আদায় করতে হবে। তবে তার উপর কাফফারা আবশ্যক নয়। বরং তার জন্য আবশ্যক হলো তাওবা করা, অনুতপ্ত হওয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং কামভাব উদ্দীপক এসব কাজ থেকে দূরে থাকা। কারণ সে তো একটি মহান ইবাদতের মধ্যে রয়েছে।
৩- ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করা:
৪- রোযাদারের দেহ থেকে রক্ত বের করা- হোক তা হিজামা বা শিঙ্গা লাগানোর মাধ্যমে, অথবা শিরায় অস্ত্রপ্রচার বা রক্তদানের মাধ্যমে ।
এ ক্ষেত্রে দলীল হল শিঙ্গা বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«أَفْطَرَ الْحَاجِمُ وَالْمَحْجُومُ».
“হিজামা প্রদানকারী ও তা গ্রহণকারী তাদের উভয়ের সিয়াম ভেঙ্গে গেল।”13
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন: “হিজামা সিয়াম বিনষ্ট করে এই মত অধিকাংশ হাদীস বিশারদ ফকীহদের মাযহাব; যেমন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল, ইসহাক ইবনে রাহুইয়াহ, ইবনু খুযাইমা, ইবনুল মুনযির প্রমুখ।"14
তবে রোজাদারের থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে রক্ত বের হলে যেমন নাক দিয়ে রক্ত পড়া, আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে রক্তক্ষরণ, দাঁত উঠে যাওয়ার কারণে রক্ত পড়া এবং এ জাতীয় কারণে সিয়ামের উপর কোনো প্রভাব ফেলে না।
৫- বমি করা:
তা হল ইচ্ছাকৃতভাবে পাকস্থলী থেকে খাদ্য বা পানীয় মুখের মাধ্যমে বের করা। তবে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হয় এবং তা নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বের হয়ে যায়, তবে তা সিয়ামের উপর কোনো প্রভাব ফেলে না। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ ذَرَعَهُ الْقَيْءُ فَلَيْسَ عَلَيْهِ قَضَاءٌ، وَمَنْ اسْتَقَاءَ فَلْيَقْضِ».
“কারো অনিচ্ছাকৃত বমি হলে তাকে কাযা করতে হবে না। কিন্তু যে ইচ্ছাকৃত বমি করে, সে রোযা কাজা করবে।”।15 হাদীসে উল্লেখিত (ذرعه) শব্দের অর্থ হল: তার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে।
অষ্টম অধ্যায়
সিয়ামের মুস্তাহাব বিষয়সমূহ:
১) সাহরী খাওয়া: কেননা আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«تَسَحَّرُوا، فَإِنَّ فِي السُّحُورِ بَرَكَةً».
“তোমরা সাহরী গ্রহণ করো; কেননা সাহরীতে বরকত রয়েছে।”।16
২) সাহরী বিলম্ব করে খাওয়া — যতক্ষণ না ফজর উদয় হওয়ার আশঙ্কা হয়।
৩) সূর্যাস্ত নিশ্চিত হলে দ্রুত ইফতার করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَا تَـزَالُ أُمَّتِي بِخَيْرٍ، مَا أَخَّرُوا السُّحُورَ، وَعَجَّلُوا الْفِطْرَ».
“লোকেরা ততদিন কল্যাণের উপর থাকবে যতদিন তারা বিলম্ব করে সাহরী করবে এবং দ্রুত ইফতার করবে।”।17
৪) তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করা মুস্তাহাব। যদি তাজা খেজুর না পায়, তবে শুকনা খেজুর দ্বারা। আর যদি খেজুর না পাওয়া যায়, তবে পানি দ্বারা। কেননা আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
«كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُفْطِرُ عَلَى رُطَبَاتٍ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ رُطَبَاتٌ، فَعَلَى تَمَرَاتٍ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ، حَسَا حَسَوَاتٍ مِنْ مَاءٍ».
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের আগে কিছু তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর না পেতেন, তবে শুকনা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। আর যদি খেজুরও না মিলত, তবে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন।"18
৫) সিয়াম পালনকারীর জন্য ইফতারের সময় তার পছন্দনীয় দু‘আ করা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ دَعْوَةً لَا تُرَدُّ».
“নিশ্চয় সিয়াম পালনকারীর ইফতারের সময়ের দু‘আ প্রত্যাখ্যান করা হয় না।”।19
৬) সকল ধরনের ইবাদত বেশি বেশি পালন করা, যেমন: কুরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর যিকির, কিয়ামুল্লাইল, তারাবীহর সালাত, সুনানে রাতেবা, সাদকা ও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা। কেননা সৎকর্মসমূহ মন্দ কর্মসমূহকে মিটিয়ে দেয়।
নবম অধ্যায়
বিশেষ সতর্কীকরণ:
• সিয়াম পালনকারীর জন্য মিথ্যা, পরনিন্দা ও গালিগালাজ থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তিরস্কার করে, তাহলে সে বলবে: 'নিশ্চয়ই আমি সিয়াম পালনকারী।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«الصِّيَامُ جُنَّةٌ، فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَجْهَلْ، وَإِنِ امْرُؤٌ قَاتَلَهُ أَوْ شَاتَمَهُ، فَلْيَقُلْ: إِنِّي صَائِمٌ، إِنِّي صَائِمٌ».
“সিয়াম ঢাল স্বরূপ। সুতরাং সে অশ্লীল কথা বলবে না এবং মূর্খের মতো আচরণ করবে না। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে লড়াই করে, তবে সে যেন বলে: ‘আমি সিয়াম পালনকারী, এ কথাটি দুইবার বলবে।”।20
• সিয়াম পালনকারীর জন্য নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে: কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়ার ব্যাপারে অতিরঞ্জন করা; কারণ এতে পানি পেটের ভিতরে চলে যেতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«وَبَالِغْ فِي الِاسْتِنْشَاقِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا».
“ভালোভাবে নাকের মধ্যে পানি প্রবেশ করাবে, তবে সিয়াম পালনকারী হলে ভিন্ন কথা।”21
• মিসওয়াক করা সিয়ামের কোনো ক্ষতি করে না। বরং বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এটি সিয়াম পালনকারী ও অন্যান্যদের জন্য সকাল-সন্ধ্যা উভয় সময়ে মুস্তাহাব ও প্রশংসনীয় কাজ।
দশম অধ্যায়
রমাদানের সিয়াম কাযা করা প্রসঙ্গে:
যে ব্যক্তি রমাদানে কোনো বৈধ কারণ যেমন শরয়ী ওযর যা সিয়াম ভঙ্গ করা বৈধ করে বা হারাম উপায়ে (যেমন ইচ্ছাকৃত সহবাস করা) সিয়াম ভঙ্গ করবে, তার উপর কাযা করা ওয়াজিব। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿...فَعِدَّةٞ مِّنۡ أَيَّامٍ أُخَرَ...﴾
“তাহলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে।” [সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৪।] তার জন্য দ্রুত কাযা করা মুস্তাহাব, যাতে দায়িত্বমুক্ত হতে পারে। আর ধারাবাহিকভাবে কাযা আদায় করা মুস্তাহাব, কারণ কাযা আদায়ের নিয়ম মূল (রমাদানের) নিয়মের অনুরূপ। তবে কাযা আদায়ে বিলম্ব করাও জায়েয, কারণ এর সময়সীমা প্রশস্ত।
অনুরূপভাবে সে কাযা বিরতি দিয়েও আদায় করতে পারবে। তবে শাবান মাসে যদি অবশিষ্ট দিনের সংখ্যা তার বাকি সিয়ামের সমান হয়, তাহলে ইজমা অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে আদায় করা তার উপর ওয়াজিব হবে - সময় সংকীর্ণতার কারণে। আর পরবর্তী রমাদানের পর পর্যন্ত কোনো শরয়ী ওযর ছাড়া কাযা বিলম্বিত করা জায়েজ নয়।
• সুতরাং কোন ব্যক্তি পরবর্তী রমাদানের পর পর্যন্ত বিলম্ব করলে তার দু’টি অবস্থা:
সে হয়ত বিলম্ব করেছে কোন শরয়ী ওযরের কারণে, যেমন: তার অসুস্থতা পরবর্তী রমাদান পর্যন্ত অব্যাহত ছিল; এ ধরণের ব্যক্তিকে শুধুমাত্র কাযা আদায় করতে হবে।
অথবা সে বিলম্ব করেছে কোন শরয়ী ওযর ছাড়াই। এ ধরণের ব্যক্তির কাযা করা ও প্রতিদিনের পরিবর্তে একজন মিসকিনকে আধা সা‘ পরিমাণ দেশের প্রচলিত খাদ্য খাওয়ানো ওয়াজিব।
• যার উপর রমাদানের কাযা বাকি আছে তার নফল সিয়াম রাখার বিধান: যার উপর রমাদানের কিছু কাযা সিয়াম বাকি আছে, তার জন্য নফল সিয়াম রাখার পূর্বে দ্রুত কাযা আদায় করা উত্তম। তবে যদি নফল সিয়াম সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হয় যেমন আরাফা ও আশুরার সিয়াম, তাহলে তা কাযার পূর্বেই রাখবে। কেননা কাযার সময় প্রশস্ত, পক্ষান্তরে আশুরা ও আরাফার সিয়াম নির্দিষ্ট সময়ে না রাখলে তা হাতছাড়া হয়ে যায়। তবে শাওয়ালের ছয় সিয়াম কাযা আদায়ের পূর্বে রাখবে না।
এই পর্যন্তই সংকলন করা সম্ভব হয়েছে। আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাঃ- এর উপর, তার পরিবার ও সাহাবীদের উপর অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।
***
সূচিপত্র
প্রথম অধ্যায় 2
সওমের অর্থ এবং রমাদানের সিয়াম ওয়াজিব হওয়া প্রসঙ্গ 2
দ্বিতীয় অধ্যায় 3
রমাদান মাসের ফযীলতসমূহ 3
তৃতীয় অধ্যায় 6
যার মাধ্যমে রমাদান মাসের আগমন সাব্যস্ত হয় 6
চতুর্থ অধ্যায় 7
সিয়ামের নিয়ত 7
পঞ্চম অধ্যায় 8
কার উপর সিয়াম ওয়াজিব? 8
ষষ্ঠ অধ্যায় 9
কাদের জন্য সিয়াম ভঙ্গের অনুমতি রয়েছে? 9
সপ্তম অধ্যায় 10
সিয়াম বিনষ্টকারী বিষয়সমূহ: 10
অষ্টম অধ্যায় 12
সিয়ামের মুস্তাহাব বিষয়সমূহ: 12
নবম অধ্যায় 14
বিশেষ সতর্কীকরণ: 14
দশম অধ্যায় 15
রমাদানের সিয়াম কাযা করা প্রসঙ্গে: 15
***
bn419v1.0 - 22/02/2026
মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (৩/২৫ হাদীস নং ১৮৯৮) এবং মুসলিম (২/৭৫৮ হাদীস নং ১০৭৯)।
নাসায়ী, সুনানুল কুবরা (৩/১৩১ হাদীস নং ২৫৩৬)।
পূর্বে উল্লেখিত হাদীসটির তাখরীজ দেখুন।
সুনানে ইবনে মাজাহ (১/৭৭৫ হাদীস নং ১৭৫৩)।
মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (১/১৬ হাদীস নং ৩৮) এবং মুসলিম (১/৫২৩ হাদীস নং ৭৬০)।
মুসনাদে আহমাদ (১০/৪০২, হাদীস নং ৬৩২৩), নাসায়ী, সুনানুল কুবরা (৩/১০২, হাদীস নং ২৪৪৬)।
মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (৩/২৭ হাদীস নং ১৯০৬) এবং মুসলিম (২/৭৫৯ হাদীস নং ১০৮০)।
মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (৩/২৭ হাদীস নং ১৯০৭) এবং মুসলিম (২/৭৬২ হাদীস নং ১০৮১)।
নাসায়ী, সুনানুল কুবরা (৩/১৭০ হাদীস নং ২৬৫২)।
আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা (২/৪৬৯)।
সহীহ মুসলিম (১/২৬৫ হাদীস নং ৩৩৫)।
সহীহ বুখারী ( ৩/৩৩ হাদীস নং: ১৯৩৭) ও মুসনাদে আহমাদ (৪৩/২৭৮ হাদীস নং ২৬২১৭)।
মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৫/২৫২।
মুসনাদে আহমাদ (১৬/২৮৩, হাদীস নং ১০৪৬৩) ও তিরমিযী আল-জামিউল কাবীরে (২/৯১, হাদীস নং ৭২০)।
মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (৩/২৯ হাদীস নং ১৯২৩) এবং মুসলিম (২/৭৭০ হাদীস নং ১০৯৫)।
মুসনাদে আহমাদ (৩৫/৩৯৯ হাদীস নং ১২৫০৭)।
সুনানে আবু দাউদ (২/৩০৬ হাদীস নং: ২৩৫৬)।
সুনানে ইবনু মাজাহ (১/৭৭৫ হাদীস নং ১৭৫৩)।
সহীহ বুখারী (৩/২৪ হাদীস নং: ১৮৯৪)।
সুনানে আবু দাউদ (২/৩০৮ হাদীস নং ২৩৬৬), তিরমিযী- জামেউল কাবীর (২/১৪৭ হাদীস নং ৭৮৮)।
মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (১/১১ হাদীস নং ৮) এবং মুসলিম (১/৩৪ হাদীস নং ১৬)।