যাকাত ও সাওম বিষয়ক দু’টি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা (বাংলা)

গ্রন্থটিতে যাকাত ও সাওম এই দু’টি ফরয ইবাদত বিষয়ক আলোচনা করা হয়েছে। এতে এই দুটি ইবাদতের বিধি-বিধান ও উপকারিতাসমূহ স্পষ্ট করা হয়েছে এবং বান্দাদের ওপর আল্লাহর হকসমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আরও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যাকাতের বিধি-বিধান, যাকাতযোগ্য সম্পদের প্রকারভেদ, রমযানের ফযীলতসমূহ, সাওমের বিধি-বিধান ও আদবসমূহ; এমন ইলমী পদ্ধতিতে যা শরঈ দলীলভিত্তিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষামূলক নির্দেশনার সমন্বয় করে।

  • earth ভাষা
    (বাংলা)
  • earth সংকলন:
    الشيخ عبد العزيز بن باز
PHPWord

 

 

 

رِسَالَتَانِ مُوجَزَتَانِ فِي الزَّكَاةِ وَالصِّيَامِ

 

যাকাতসাওম বিষয়ক দু’টি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা

 

 

سَمَاحَةُ الشَّيْخِ

عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بَازٍ

رَحِمَهُ اللَّهُ

 

মাননীয় শাইখ

আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায

রাহিমাহুল্লাহ

 


بِسْمِ اللهِ الرَّحمَنِ الرَّحِيمِ

প্রথম পুস্তিকা

যাকাত বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

সমস্ত প্রশংসা এক আল্লাহর জন্যসালাতসালাম বর্ষিত হোক সেই নবীর উপর যার পরে আর কোন নবী নেই, তার পরিবারবর্গসাহাবীদের উপর

অতঃপর:

পুস্তিকাটি লেখার অন্যতম কারণ হলো, যাকাতের গুরুত্ব সম্পর্কে মুসলিম ভাইদের স্মরণ করিয়ে দেওয়াউপদেশ দেওয়াবর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম যাকাতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয আদায়ে উদাসীনঅথচ যাকাত ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি স্তম্ভ এবং ইসলামের মহা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান, যা ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব চিন্তা করা যায় না; কিন্তু তা স্বত্বেও মুসলিমগণ সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করে নারাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«بُنِيَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ، وَحَجِّ البَيْتِ».

পাঁচটি বস্তুর ওপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে: এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের সাওম পালন করা এবং বাইতুল্লাহর হজ করা।”1 সহীহ বুখারীমুসলিম

মুসলমানদের উপর যাকাত ফরয হওয়া ইসলামের সুস্পষ্ট সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত এবং এর অনুসারীদের বিষয়াদির দেখাশোনার প্রকাশ্য দৃষ্টান্ত; কারণ এতে অনেক উপকারিতা রয়েছে এবং দরিদ্র মুসলমানদের জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়

যাকাতের অন্যতম উপকারিতার হল: যাকাত ধনীগরীবের মধ্যে ভালোবাসার সেতু বন্ধনকে সুদৃঢ়মজবুত করেকারণ, সাধারণত মানুষের স্বভাব হলো, যে তার প্রতি দয়া করে, তাকেই সে মহব্বত করে, ভালোবাসে

আরেকটি উপকারিতা হলো: যাকাত আত্মাকে পাক-পবিত্রপরিশুদ্ধ করেযাকাত দেওয়ার মাধ্যমে কৃপণতার মতো ঘৃণিত চরিত্র থেকে দূরে থাকা যায়যেমনটি কুরআন করীম যাকাতেরঅর্থের দিক ইঙ্গিত করেছেআল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا...﴾

আপনি তাদের সম্পদ থেকেসদকাগ্রহন করুনএর দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন...।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০৩]

যাকাতের আরেকটি উপকারিতা হলো, অভাবগ্রস্তহত-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়া, অনুগ্রহসহানুভূতি করতে একজন মুসলিমকে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা

এর আরেকটি উপকারিতা হলো, যাকাত দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত লাভ, সম্পদ বৃদ্ধিপ্রতিদান অর্জন করাযেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿...وَمَآ أَنفَقۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَهُوَ يُخۡلِفُهُۥۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلرَّٰزِقِينَ

“... আর তোমরা যা কিছু ব্যয় করবে, তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।” [সূরা সাবা, আয়াত: ৩৯] বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদীসে কুদসীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

«يَا ابْنَ آدَمَ أَنْفِقْ نُنْفِقْ عَلَيْكَ...».

হে আদম সন্তান, তুমি খরচ কর, আমি তোমার ওপর খরচ করব ...।”2ছাড়াও যাকাতের অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে

যারা যাকাত আদায়ে উদাসীনতা দেখায় এবং কৃপণতা করে তাদের বিষয়ে কুরআনে করীমে কঠিন হুমকি এসেছেআল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿...وَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ 34 يَوۡمَ يُحۡمَىٰ عَلَيۡهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوَىٰ بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَجُنُوبُهُمۡ وَظُهُورُهُمۡۖ هَٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِأَنفُسِكُمۡ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمۡ تَكۡنِزُونَ35﴾

আর যারা স্বর্ণরৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করে না আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন।*

যেদিন জাহান্নামের আগুনে সেগুলোকে উত্তপ্ত করা হবে এবং সেসব দিয়ে তাদের কপাল, পাঁজর আর পিঠে দাগ দেয়া হবেবলা হবে, ‘এগুলোই তা যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতেকাজেই তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তার স্বাদ ভোগ কর।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৪, ৩৫] সুতরাং যেসব সম্পদের যাকাত দেওয়া হয় না তা-ই গচ্ছিত মাল, যদ্বারা তার মালিককে কিয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবেযেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন:

«مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ لَا يُؤَدِّي حَقَّهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ القِيَامَةِ صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ؛ فَأُحْمِيَ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ، فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وَجَبِينُهُ وَظَهْرُهُ كُلَّمَا بَرَدَتْ أُعِيدَتْ لَهُ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ العِبَادِ، فَيُرَى سَبِيلَهُ: إِمَّا إِلَى الجَنَّةِ، وَإِمَّا إِلَى النَّارِ».

সোনা রূপার মালিক যদি এর যাকাত আদায় না করে, তবে কিয়ামতের দিনধন সম্পদকে আগুনের পাত বানানো হবে এবং জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবেতারপর এগুলো দ্বারা তার পার্শ্ব, ললাটপিঠে দাগ দেওয়া হবেযখনই ঠাণ্ডা হবে পূণরায় তা উত্তপ্ত করা হবে -এমন দিন যেদিনের পরিমাণ দুনিয়ার পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবেএভাবে বান্দাদের পরিণতি জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত শাস্তি চলতে থাকবে।”3

তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট, গরুছাগলের মালিকদের বিষয়ে আলোচনা করেন যারা তাদের পশুর যাকাত আদায় করে নাতিনি জানিয়েছেন যে, নিশ্চয় তাদেরকে কিয়ামতের দিন যাকাত না দেওয়ার কারণে শাস্তি দেওয়া হবে

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«مَنْ آتَاهُ اللهُ مَالًا فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يُطَوِّقُهُ يَوْمَ القِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بِلَهْزِمَتَيْهِ (يَعْنِي شِدْقَيْهِ)، ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا مَالُكَ، أَنَا كَنْزُكَ»، ثُمَّ تَلَا النَّبِيُّ ﷺ قَوْلَهُ تَعَالَى: ﴿وَلَا يَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَبۡخَلُونَ بِمَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ هُوَ خَيۡرٗا لَّهُمۖ بَلۡ هُوَ شَرّٞ لَّهُمۡۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِۦ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ...

যাকে আল্লাহ তা‘আলা সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় মালা পরিয়ে দেওয়া হবে, সাপটি তার মুখের দুই পার্শ্বে ছোবল দিয়ে বলতে থাকবে, আমি তোমার সম্পদ, আমিই তোমার জমাকৃত সম্পদ।” তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার এই বাণীটি তিলাওয়াত করেন:

আর আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর, বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকরযা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮০]4

চার ধরনের সম্পদে যাকাত ওয়াজিব হয়:

এক- যমীন থেকে উৎপাদিত ফসলফলমূল

দুই- চতুষ্পদ জন্তু

তিন- স্বর্ণ- রৌপ্য

চার- ব্যবসায়িক মালামাল বা পণ্য

উল্লিখিত চার শ্রেণির সম্পদের প্রত্যেকটিতে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য নির্ধারিত একটি পরিমাণ রয়েছে, তার কম হলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হয় নাফলউৎপাদিত ফসলের যাকাতের নিসাব হল, পাঁচ ওসকআর এক ওসকের পরিমাণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাদ্বারা ষাট সাফলে খেজুর কিসমিস, গম, ভুট্টা, ধান ইত্যাদির মধ্যে যাকাতের নিসাব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাদ্বারা তিনশত সাএক সা-এর পরিমাণ হলো, একজন মাধ্যম আকৃতির লোকের দুই হাত ভর্তি চার কোষ পরিমাণ

এগুলোতে যাকাতের পরিমাণ হলো, এক-দশমাংশ (উশর)- যদিফসল উৎপাদনে পানি সেচ দেওয়ার জন্য তার কোনো কষ্ট করতে না হয়যেমন, বৃষ্টির পানি, নদী, বন্যা বা নালার পানি দ্বারা ফসল চাষ করেছে

আর যদি টাকা খরচা করে, সেচে পানি, ডিপ মেশিন নলকূপ ইত্যাদির মাধ্যমে পানি দিয়ে থাকে তখন তার মধ্যে এক-দশমাংশের অর্ধেক তথা বিশ ভাগের একভাগ যাকাত দিতে হবেযেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদেবিষয়ে সুস্পষ্ট হাদীস বর্ণিত হয়েছে

উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি চতুষ্পদ জন্তুর নিসাবের বিস্তারিত আলোচনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছেআগ্রহীগণ আলেমদেরকে জিজ্ঞাসা করে যাকাতের জরুরি বিধানগুলো জেনে নিতে পারেনযদিপুস্তিকাটি সংক্ষিপ্ত করার ইচ্ছা না থাকত, তাহলে মানুষের উপকারের প্রতি লক্ষ্য রেখে তা বিস্তারিত আলোচনা করতাম

আর রূপার নিসাব হলো, একশ চল্লিশ মিসকালএর পরিমাণ সৌদি আরবের দিরহাম অনুযায়ী ছাপ্পান্ন রিয়াল

আর স্বর্ণের নিসাব হলো বিশ মিসকালবিশ মিসকাল সমান বিরানব্বই গ্রাম

কাজেই যারাপরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য অথবা যে কোনো একটির মালিক হবে এবং তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হবে, তাদেরকে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত প্রদান করতে হবে

লভ্যাংশ সাধারণত মূল সম্পদেরই অংশ, তাই তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়ার কোনো দরকার নেইযেমনিভাবে জন্তুর ক্ষেত্রে মূল সম্পদের ওপর বছর অতিবাহিত হলে এবং মূল জন্তু নিসাব পরিমাণ হলে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য তার থেকে উৎপন্ন বাচ্চাদের ওপর বছর অতিবাহিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই

নগদ অর্থ যা বর্তমানে মানুষ বিভিন্ন নামে যেমন, ডলার, রিয়াল, টাকারুপি ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে তার হুকুম স্বর্ণরৌপ্যের মতই; যখন তা স্বর্ণ বা রৌপ্যের মূল্য সমপরিমাণ হয় এবং তার ওপর বছর অতিবাহিত হয়, তখন তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে

টাকার সাথে সম্পৃক্ত হবে মহিলাদের ব্যবহারিক স্বর্ণরূপাআলেমদের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী মহিলাদের ব্যবহারিক স্বর্ণ বা রূপা যদি নিসাব পরিমাণ পৌঁছে থাকে এবং তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হয়, তাতে যাকাত দিতে হবেরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীর ব্যাপকতাই এর প্রমাণ:

«مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ أَوْ فِضَّةٍ لَا يُؤَدِّي زَكَاتَهَا إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ القِيَامَةِ صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ».

সোনা রূপার মালিক যদি এর যাকাত আদায় না করে, তবে কিয়ামতের দিনধন-সম্পদকে তার শাস্তির জন্য আগুনের পাত বানানো হবে।”5 পূর্বে বর্ণিত হাদীদের শেষ পর্যন্ত

ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, একজন মহিলার হাতে স্বর্ণের দু’টি চুড়ি দেখে তিনি বললেন:

«أَتُعْطِينَ زَكَاةَ هَذَا؟». قَالَتْ: لَا. قَالَ: «أَيَسُرُّكِ أَنْ يُسَوِّرَكِ اللهُ بِهِمَا يَوْمَ القِيَامَةِ سِوَارَيْنِ مِنْ نَارٍ!». فَأَلْقَتْهُمَا، وَقَالَتْ: «هُمَا لِلَّهِ وَلِرَسُولِهِ».

তুমি কি এর যাকাত আদায় কর? সে বলল, না, তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, তুমি কি পছন্দ কর যে, কিয়ামতের দিন আগুনের দু’টি চুড়ি তোমাকে পরিয়ে দেওয়া হোক? এরপর তিনি চুড়ি দু’টি খুলে ফেললেন এবং রাসূলের সামনে ফেলে দিয়ে বললেন: এ দু’টি চুড়ি আল্লাহতার রাসূলের জন্য।”6

উম্মে সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, স্বর্ণের কিছু অলংকার তিনি ব্যবহার করতেন, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এগুলো কি গচ্ছিত সম্পদ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

«مَا بَلَغَ أَنْ يُزَكَّى فَزُكِّيَ فَلَيْسَ بِكَنْزٍ».

যে সম্পদ যাকাতের নিসাব পরিমাণ পৌঁছার পর তার যাকাত আদায় করা হয়, তা গচ্ছিত সম্পদ নয়”।7 একই অর্থে আরও একাধিক হাদীস বর্ণিত রয়েছে

আর যেসব মালামাল ব্যবসার উদ্দেশ্যে রাখা হয়, তা বছর শেষে মূল্য নির্ধারণ করে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত হিসেবে বের করতে হবেচাই তার মূল্য স্বর্ণরূপার সমপরিমাণ হোক বা না হোক অথবা অধিক হোকএর প্রমাণ সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন:

«كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَأْمُرُنَا أَنْ نُخْرِجَ الصَّدَقَةَ مِنَ الَّذِي نُعِدُّهُ لِلْبَيْعِ».

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের যে সম্পদ ব্যবসার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত রাখা হত, তা থেকে যাকাত বের করার আদেশ দিতেন।”8

বিক্রির উদ্দেশ্যে ক্রয় করা যমীন, গাড়ি, বাড়ি, পানির মেশিন ইত্যাদি ব্যবসায়িক পণ্যের অন্তর্ভুক্ত

যেসব ঘর-বাড়ি ভাড়া দেওয়ার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে, তার যাকাত হল ভাড়ার উপরভাড়ার টাকার ওপর একবছর পূর্ণ হলে অবশ্যই যাকাত দিতে হবে; কিন্তু মূল বাড়ি-ঘরের ওপর যাকাত দিতে হবে নাকারণ, তা ব্যবসার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়নি

অনুরূপভাবে ভাড়ার গাড়িব্যবহারিক গাড়ি যদি তা ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা না হয়, বরং ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়, তাতে যাকাত দিতে হবে না

আর যদি গাড়ি ভাড়ার টাকা নিসাব পরিমাণ হয় এবং তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হয়, তাহলে অবশ্যই তাকে যাকাত দিতে হবেআর যদি কোনো ব্যক্তি যমীন ক্রয়, বিবাহ, ঋণ পরিশোধখরচা করা ইত্যাদি যে কোনো উদ্দেশ্যে টাকা সঞ্চয় করার পর তা যদি তা নিসাব পরিমাণ হয় এবং তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই যাকাত দিতে হবেকারণ, শরী‘আতের দলীলসমূহধরনের সম্পদের ওপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে ব্যাপক

পূর্বের দলীলগুলোর ভিত্তিতে ওলামাদের সঠিক মত হল, ঋণ যাকাতের প্রতিবন্ধক নয়

অনুরূপভাবে ইয়াতীমপাগলের মাল যদি নিসাব পরিমাণ পৌঁছে এবং তার ওপর এক বছর অতিবাহিত হয়, বছর শেষে জমহুর আলেমদের মতে অভিভাবকদের ওপর তাদের পক্ষ থেকে যাকাত দেওয়া ওয়াজিবযাকাত বিষয়ক দলীলসমূহের ব্যাপকতা এর প্রমাণযেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে যখন ইয়ামেনে প্রেরণ করেন, তিনি তাকে বলেন:

«إِنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ، وَتُرَدُّ فِي فُقَرَائِهِمْ».

আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর যাকাত ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে নেওয়া হবে এবং তাদের গরীবদের মধ্যে বণ্টন করা হবে9

যাকাত আল্লাহর হক, সুতরাং যে যাকাত খাওয়ার উপযুক্ত নয় যাকাতের মাল দিয়ে তাকে সহানুভূতি দেখানোর কোনো অবকাশ নেই এবং যাকাতের মাল নিজের কোনো উপকারে বা ক্ষতি থেকে বাঁচা, সম্পদ রক্ষা এবং দুর্নাম গোছানোর জন্য ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেইবরং একজন মুসলিমের ওপর ওয়াজিব হলো, যাকাতের মাল তার প্রকৃত পাওনাদারকে নিঃস্বার্থভাবে খুশি মনে আল্লাহকে রাজি খুশি করা উদ্দেশ্যে পৌঁছে দেওয়া, যাতে সে দায় মুক্ত হয় এবং অধিক সাওয়াবের অধিকারী হয়

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কারীমে যাকাতের বিভিন্ন শ্রেণির পাওনাদারদের বিষয়টি সু-স্পষ্ট করেছেনআল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿إِنَّمَا ٱلصَّدَقَٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡعَٰمِلِينَ عَلَيۡهَا وَٱلۡمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمۡ وَفِي ٱلرِّقَابِ وَٱلۡغَٰرِمِينَ وَفِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِۖ فَرِيضَةٗ مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٞ60﴾

সদকা তো শুধু ফকীর, মিসকীনসদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তিতে, ঋণ ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহ্‌র পথেমুসাফিরদের জন্যএটা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নির্ধারিতআর আল্লাহ্সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৬০]

আল্লাহর দু’টি মহান নাম দ্বারা আয়াতটি শেষ করা দ্বারা স্বীয় বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকেকথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদের অবস্থাতাদের মধ্যে যারা সাদাকাহ খাওয়ার উপযুক্ত আর যারা উপযুক্ত নয় তাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত রয়েছেন এবং তিনি তার শরী‘আতপরিমাণ নির্ধারণ বিষয়ে প্রজ্ঞাবানফলে তিনি সবকিছুই যথাযথ উপযুক্ত স্থানে প্রয়োগ করেনযদিও অধিকাংশ মানুষের নিকট তার হিকমতের অনেক রহস্যই অজ্ঞাত; যাতে বান্দাগণ তার শরী‘আতের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং তার হুকুমের প্রতি অনুগত থাকে

আল্লাহর প্রতি আমাদের কামনা, যেন তিনি আমাদেরমুসলিমদের তা দ্বীন বুঝার তাওফীক দেন, তা সাথে মু‘আমালায় সততা দান করেন, তা সন্তুষ্টি অর্জনে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার তাওফীক দেন এবং তিনি যেন আমাদেরকে তা ক্ষোভের কারণসমূহ থেকে রক্ষা করেননিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতাবান্দাদের অতি নিকটে

আর সালাতসালাম নাযিল হোক তাঁর বান্দারাসূল মুহাম্মদ-এর ওপর এবং তার পরিবারবর্গসাহাবীদের ওপর

 

মাননীয় শাইখ আব্দুলআযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায

ইলমী গবেষণা এবং ফতোয়া, দাওয়াগাইড বিষয় অফিস প্রধান

 

 

***

 


দ্বিতীয় পুস্তিকা

রমযানের সিয়ামকিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে,
সাথে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান যা অনেক মানুষের নিকট অজানা

আব্দুল আযীয আব্দুল্লাহ ইবন বায রহ.-এর পক্ষ থেকেসব মুসলিম ভাইদের প্রতি যারা এটি দেখবেনআল্লাহ আমাকেতাদেরকে ঈমানদারদের পথে পরিচালনা করুন এবং কুরআনসুন্নাহ বুঝার তাওফীক দিন- আমীন

আপনাদের সবার ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমতবারাকাত নাযিল হোক

অতঃপর, রমযান মাসে সাওম পালন করা, রাতে সালাতে দাঁড়ানোর মাধ্যমে কিয়ামুল লাইল করা এবংমাসে নেক আমলের প্রতি প্রতিযোগিতামূলক অগ্রসর হওয়ার ফযীলত বিষয়ে এটি একটি সংক্ষিপ্তগুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। এ ছাড়াওপুস্তিকাটিতে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান যা অনেকের কাছেই অজানা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, যখন রমযান মাস আসতো তখন তিনি তার সাহাবীদেরকে রমযান মাসের সু-সংবাদ দিতেন এবং জানিয়ে দিতেন যে, এটি এমন একটি মাস যাতে রহমতজান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, বিতাড়িত শয়তানকে শিকলবদ্ধ করা হয়তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِذَا كَانَتْ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الجَنَّةِ فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ فَلَمْ يُفْتَحْ مِنْهَا بَابٌ، وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ، وَيُنَادِي مُنَادٍ: يَا بَاغِيَ الخَيْرِ أَقْبِلْ، وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ. وَلِلَّهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ، وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ».

রমযান মাসের প্রথম রাতে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, তার কোনো দরজা বন্ধ করা হয় নাজাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলেমাসে জাহান্নামের কোন দরজা খোলা হয় নাআর শয়তানদের শিকল পরানো হয়আর একজন আহ্বানকারীবলে আহ্বান করতে থাকে যে, হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী! কল্যাণের দিকে অগ্রসর হওআর হে অনিষ্টতার পথিক! অনিষ্টতা থেকে বিরত থাকআর আল্লাহর জন্য রয়েছে বহু সংখ্যক লোককে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান এবং তা প্রতি রাতেই।”

তিনি আরো বলতেন:

«جَاءَكُمْ شَهْرُ رَمَضَانَ شَهْرُ بَرَكَةٍ يَغْشَاكُمُ اللهُ فِيهِ: فَيُنْزِلُ الرَّحْمَةَ وَيَحُطُّ الخَطَايَا، وَيَسْتَجِيبُ الدُّعَاءَ، يَنْظُرُ اللهُ إِلَى تَنَافُسِكُمْ فِيهِ فَيُبَاهِي بِكُمْ مَلَائِكَتَهُ؛ فَأَرُوا اللهَ مِنْ أَنْفُسِكُمْ خَيْرًا؛ فَإِنَّ الشَّقِيَّ مَنْ حُرِمَ فِيهِ رَحْمَةَ اللهِ».

তোমাদের সামনে রমযান মাস উপস্থিত হয়েছে, বরকতের মাসতাতে রয়েছে কল্যাণ যা দিয়ে আল্লাহ তোমাদের ঢেকে ফেলবেনফলে রহমত নাযিল হবে, আর তাতে গুনাহ দূরীভূত হবে, দো‘ কবুল হবে, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের প্রতিযোগিতার প্রতি লক্ষ্য করবেন এবং তিনি তার ফিরিশতাদের মাঝে তোমাদের নিয়ে গর্ব করেনসুতরাং তোমরা তোমাদের নিজেদের বিষয়ে আল্লাহর জন্য ভালোনেক আমলসমূহ প্রদর্শন করোকারণ, হতভাগা সেই ব্যক্তি, যেমাসে মহান আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।”

তিনি আরো বলতেন:

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় রমযান মাসের সাওম পালন করবে তার অতীত জীবনের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবেযে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় রমযান মাসের কিয়ামুল্লাইল পালন করবে তার অতীত জীবনের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবেআর যে ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় কদরের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করে, তার অতীতের গুণাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”

তিনি আরো বলতেন:

«يَقُولُ اللهُ: كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ الحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ إِلَّا الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ؛ تَرَكَ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ وَشَرَابَهُ مِنْ أَجْلِي. لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ. وَلَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِيحِ المِسْكِ».

আল্লাহ বলেন: “আদম সন্তানের যে কোনো নেক আমল যা সে পালন করে থাকে তার বিনিময় হিসেবে তার জন্য দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত সাওয়াব লিপিবদ্ধ হয়আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তবে সাওম ছাড়া, তা কেবল আমার জন্যই পালন করা হয়, ফলে আমি নিজেই তার বিনিময় দিয়ে থাকিকারণ, সে তার প্রবৃত্তিপানাহার কেবল আমার কারণেই ছেড়ে দেয়আর সাওম পালনকারীদের জন্য রয়েছে দু’টি আনন্দ: একটি ইফতারের সময় আর অপরটি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়একজন সাওম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা‘আলার নিকট মিশকের সুগন্ধির থেকেও অধিক প্রিয়।”

রমযানের সওম পালন করাকিয়াম করা এবং যেকোন সওমের ফযীলত বিষয়ক অসংখ্য হাদীস রয়েছে

সুতরাং একজন মুমিনের জন্য উচিত হবেসুযোগটি যথাযথভাবে কাজে লাগানো, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের ওপর রমযান মাস পাওয়ার সুযোগ দিয়ে যে দয়া করেছেন তা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হওয়ামন্দ আমল থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে কাজে লাগানোআল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর যা ফরয করেছেন তা আদায় করতে সচেষ্ট হওয়া এবং বিশেষ করে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের প্রতি যত্নবান হওয়াকারণ, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত হলো ইসলামের আসল খুঁটি এবং আল্লাহতার রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সবচেয়ে বড় ফরযকাজেই প্রত্যেক মুসলিম নর নারীর উপর ওয়াজিব হলো, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং অত্যন্ত মনোযোগধীরস্থীরভাবে সময়মত আদায় করা

পুরুষদের ক্ষেত্রে সালাতের গুরুত্বপূর্ণ ফরয হলো, সালাতসমূহকে আল্লাহ যেসব ঘরকে সমুন্নত রাখতেতার নাম স্মরণ করতে আদেশ করেছেন সে ঘরসমূহে তথা মসজিদে জামা‘আতের সাথে আদায় করাযেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱرۡكَعُواْ مَعَ ٱلرَّٰكِعِينَ 43﴾

আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করোযাকাত দাও এবং রুকূ’কারীদের সাথে রুকূ করো”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿حَٰفِظُواْ عَلَى ٱلصَّلَوَٰتِ وَٱلصَّلَوٰةِ ٱلۡوُسۡطَىٰ وَقُومُواْ لِلَّهِ قَٰنِتِينَ 238﴾

তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষত মধ্যবর্তী সালাতের প্রতি এবং আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে তোমরা দাঁড়াও বিনীতভাবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৩৮] তিনি আরো বলেছেন:

﴿قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ 1 ٱلَّذِينَ هُمۡ فِي صَلَاتِهِمۡ خَٰشِعُونَ 2﴾

অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ,*

যারা তাদের সালাতে ভীত-অবনত”, [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১, ২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَٱلَّذِينَ هُمۡ عَلَىٰ صَلَوَٰتِهِمۡ يُحَافِظُونَ 9 أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡوَٰرِثُونَ 10 ٱلَّذِينَ يَرِثُونَ ٱلۡفِرۡدَوۡسَ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ 11﴾

আর যারা নিজেদের সালাতে থাকে যত্নবানতারাই হচ্ছে উত্তরাধিকারীআর যারা উত্তরাধিকারী হবে জান্নাতুল ফিরদাউসের, তারা সেখানে থাকবে চিরকাল।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ৯-১১] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ».

আমাদের মধ্যে আর তাদের (অমুসলিমদের) মধ্যে চুক্তি হলো সালাতসুতরাং যে সালাত ছেড়ে দিল সে কাফের হয়ে গেল।”

সালাতের পর গুরুত্বপূর্ণ ফরয হলো, যাকাত আদায় করাযেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَۚ وَذَٰلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ 5﴾

আর তাদেরকে কেবলনির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে এবং সালাত কায়েম করেযাকাত প্ৰদান করেআর এটাই সঠিক দীন।” [সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

﴿وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ 56﴾

আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমাদের উপর রহমত করা যায়।” [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৫৬]

আল্লাহর মহান কিতাবতাঁর রাসূলের সুন্নাত প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তি তার সম্পদের যাকাত দেয় না তাকে কিয়ামতের দিন অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে

সালাতযাকাতের পর গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো, রমযানের সওম পালন করাসওম ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ; যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীতে উল্লেখ করা হয়েছে:

«بُنِيَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ، وَإِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ، وَحَجِّ البَيْتِ».

পাঁচটি বস্তুর ওপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বান্দারাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমযানের সওম পালন করা এবং বাইতুল্লাহর হজ করা।”

একজন মুসলিমের ওপর ফরয হলো, সওম পালনকিয়ামুল লাইল করার ক্ষেত্রে সেগুলোকে আল্লাহ তা‘আলা যেসব কথাকর্ম হারাম করেছেন তা থেকে রক্ষা করাকারণ, সওম দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর আনুগত্য করা, আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, আর স্বীয় মাওলার আনুগত্য করার মাধ্যমে প্রবৃত্তির চাহিদার বিপরীতে চলার জন্য মানবাত্মার সাথে সার্বক্ষণিক সংগ্রাম করাআল্লাহ তা‘আলা যে সব বিষয়সমূহ নিষেধ করেছেন তার ওপর ধৈর্যের অনুশীলন করাসওমের উদ্দেশ্য শুধু খাওয়া, পান করাযাবতীয় সওম ভঙ্গকারী বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকাই নয়। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায়, যাতে তিনি বলেন:

«الصِّيَامُ جُنَّةٌ، فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ: إِنِّي صَائِمٌ».

সওম ঢালস্বরূপ, ফলে সাওম পালনকারী যেন অশ্লীলঅপকর্ম না করে, যদি কোনো লোক তার সাথে বিবাদ করে বা গালি দেয় সে যেন বলে আমি সাওম পালনকারী।” বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالعَمَلَ بِهِ وَالجَهْلَ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ».

যে ব্যক্তি মিথ্যা কথাতদনুযায়ী আমল করা ছাড়ল না, তার খাবার এবং পানীয় পরিত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” উল্লিখিত হাদীস এবংছাড়া আরও অন্যান্য হাদীস দ্বারাকথা প্রমাণিত যে, একজন সওম পালনকারীর ওপর ওয়াজিব হলো, আল্লাহ তা‘আলা যেসব বিষয়কে নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহ তা‘আলা যা করার নির্দেশ দিয়েছেন তা যথাযথভাবে পালন করাআর এর মাধ্যমে আশা করা যায় যে, একজন সওম পালনকারী আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রাপ্ত হবেন, জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভ করবেন এবং তার সিয়ামকিয়াম কবুল হবে

রমযান সম্পর্কে এমন কতক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যা কিছু মানুষের নিকট অস্পষ্টতন্মধ্যে:

একজন মুসলিমের ওপর ওয়াজিব হলো, ঈমানসাওয়াবের আশায় সওম পালন করালৌকিকতা বা সুখ্যাতি লাভের উদ্দেশ্যে সওম পালন করবে নাআর নিজ এলাকা, পরিবারআত্মীয় স্বজনদের অনুকরণে সওম পালন করবে না, বরং সওমকারণে পালন করবে যে, আল্লাহ তা‘আলা তার ওপর সওম পালন করা ফরয করেছেন এবং সওম পালন করার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাকে মহা বিনিময়সাওয়াব দেবেনঅনুরূপভাবে রমযানের কিয়ামুল-লাইল একজন মুসলিম ঈমানসাওয়াবের আশায় করবে, পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে করবে না। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ».

যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় রমযান মাসের সওম পালন করবে তার অতীত জীবনের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবেযে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় রমযান মাসের কিয়ামুল্লাইল পালন করবে তার অতীত জীবনের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবেআর যে ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় কদরের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করে, তার অতীতের গুণাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”

সওম সম্পর্কিয় আরও যে সব বিষয়ের বিধান কতক মানুষের নিকট অস্পষ্ট তা হলো, একজন সওম পালনকারী আঘাত পেয়ে জখম হলো, তার নাক দিয়ে রক্ত বের হলো, বমি করল, অনিচ্ছাকৃতভাবে তার পেটে পানি চলে গেল ইত্যাদিএগুলো কোনো কিছুই তার সওমকে ভঙ্গ করবে নাকিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছা করে বমি করে, তাহলে তার সওম ভেঙ্গে যাবেকারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«مَنْ ذَرَعَهُ القَيْءُ فَلَا قَضَاءَ عَلَيْهِ، وَمَنِ اسْتَقَاءَ فَعَلَيْهِ القَضَاءُ».

সওম পালন অবস্থায় যার অনিচ্ছায় বমি হয়, তার সওম ভাঙবে না, আর যে ইচ্ছাকৃত বমি করে তাকে সওমের কাযা করতে হবে।”

অনুরূপভাবে যদি কোনো সওম পালনকারীর গোসল ফরয হওয়ার পর ফরয গোসল করতে ফজর উদয় পর্যন্ত দেরি করে তবে তার সওম ভঙ্গ হবে নাঅনুরূপ যদি কোনো ঋতুবতী বা প্রসূতি নারী ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বে পবিত্র হওয়া সত্বেও সে গোসল না করে এবং ফজর উদয়ের পর গোসল করে, তাকে অবশ্যই সওম পালন করতে হবেগোসল করতে ফজর উদয় পর্যন্ত দেরি করা সওম রাখার জন্য কোনো বাধা নয়; কিন্তু তার জন্য সূর্যোদয় পর্যন্ত দেরি করা কোন ক্রমেই উচিত নয়বরং তার ওপর ওয়াজিব হলো, সূর্যোদয়ের পূর্বে গোসল করে পবিত্র হয়ে ফজরের সালাত আদায় করাঅনুরূপভাবে নাপাক ব্যক্তির জন্য সূর্যোদয় পর্যন্ত গোসল দেরিতে করা উচিনয়বরং তার ওপরও ওয়াজিব হলো, সূর্যোদয়ের পূর্বে গোসল করাফজর সালাত আদায় করাপুরুষদের জন্য আবশ্যক যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পবিত্র হয়ে যাওয়া, যাতে ফজরের সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করতে পারে

অনুরূপভাবে আরও যে সব কারণগুলো সওম নষ্ট করে না তা হলো, রক্ত পরীক্ষা করা, ইনজেকশন দেওয়া যদি তা খাদ্য জাতীয় না হয়তবে ইনজেকশনকে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেওয়া উত্তম, যদি দেরি করা সম্ভব হয় এবং তাতে কোনো অসুবিধা দেখা না দেয়কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ».

তুমি সংশয়যুক্ত বিষয় ছেড়ে এমন বিষয় গ্রহণ করো যাতে সন্দেহসংশয় নেই।”

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন:

«مَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ».

যে ব্যক্তি সংশয়যুক্ত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকল, সে তার দ্বীনসম্ভ্রমের সংরক্ষণ করল।”

আরও যেসব বিধান কতক মানুষের নিকট অস্পষ্ট তা হলো, সালাতে ধীর-স্থিরতা অবলম্বন না করাচাই নফল সালাত হোক অথবা ফরয সালাতঅথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, সালাতে ধীর-স্থিরতা অবলম্বন সালাতের রুকনসমূহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকনধীর-স্থিরতা অবলম্বন ছাড়া সালাত শুদ্ধ হয় নাআর ধীরস্থিরতা হলো, সালাতে বিনয়ী হওয়াতাড়াহুড়া না করে মনোযোগ সহকারে সালাত আদায় করা, যাতে সালাত আদায়কারীর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বীয় অবস্থানে ফিরে আসেঅধিকাংশ মানুষকে দেখা যায় রমযানে তারাবীহর সালাত আদায় করে অথচ সালাতে কী আদায় করে তা সে নিজেও বুঝে না এবং সালাতে ধীর-স্থিরতা অবলম্বন করে না; বরং তারা সালাতকে কাকের ঠোকর দেওয়ার মত আদায় করে মাত্র। এ ধরনের সালাত বাতিল এবং সালাত আদায়কারী গুনাহগার হয় এবং কোনো সাওয়াবের অধিকারী হয় না

আরও যে সব বিধান কতক মানুষের নিকট অস্পষ্ট তা হলো, কতক মানুষ মনে করে তারাবীহর সালাত বিশ রাকাতের কম পড়া যাবে না, আবার কতক মনে করে এগার বা তের রাকাতের বেশি পড়া যাবে নাএগুলো সবই অমূলক এবং কুরআনসুন্নাহ বিরোধী ধারণা

অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাতের সালাতে বেশি বা কম করার অবকাশ রয়েছেরাতের সালাতের এমন কোন সংখ্যা নির্ধারিত করা নেই যার বিপরীত করা যাবে না; বরং বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের সালাত রমযানরমযানের বাহিরে কখনো এগারো রাকাত কখনো তের রাকাত আবার কখনো তার চেয়ে কম বা বেশি আদায় করেছেনআর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাতের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:

«مَثْنَى مَثْنَى، فَإِذَا خَشِيَ أَحَدُكُمُ الصُّبْحَ صَلَّى رَكْعَةً وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا قَدْ صَلَّى».

দুই রাকাত দুই রাকাত করেআর যখন সকাল হওয়ার আশঙ্কা কর, তখন এক রাকাত পড়ে নাওতাহলে তুমি যা পড়লে তাকে বিজোড় বানিয়ে দিলে।” সহীহ বুখারীমুসলিম

রমযানরমযানের বাহিরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের সালাতের রাকাত সংখ্যা নির্ধারণ করেননিআরকারণেই সাহাবীগণ উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগে কখনো তেইশ রাকাত আবার কখনো এগারো রাকাত আদায় করেছেনসুতরাং উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের যুগে উভয়টিই সাহাবীগণের আমল থেকে প্রমাণিত

সালাফদের কেউ কেউ রাতের সালাত ছত্রিশ রাকাত এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেনআবার কেউ কেউ একচল্লিশ রাকাত পড়তেন বলেও প্রমাণিতসাহাবীগণেরআমলগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহঅন্যান্য আহলে ইলমগণতিনি বলেন, রাতের সালাতের ক্ষেত্রে রাকাত বিষয়ে কম-বেশ করার অবকাশ রয়েছেতিনি আরও বলেন, তবে উত্তম হলো, যে ব্যক্তি ক্বিরাত, রুকুসাজদাহ দীর্ঘ করবে সে রাকাত সংখ্যা কম করবেআর যে ক্বিরাত, রুকুসাজদাহ সংক্ষেপ করবে সে রাকাত সংখ্যা বাড়াবেশাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ.-এর কথার অর্থ এটিই

আর যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে সে অবশ্যই জানতে পারবে যে, উত্তম হলো, রমযানরমযানের বাহিরে এগারো রাকাত বা তের রাকাত সালাত আদায় করাকারণ, এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকাংশ সময়ের আমলের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়াও তা মুসল্লীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ এবং সালাতে বিনয়ধীর-স্থিরতার অধিক সহায়কআর যদি কোনো ব্যক্তি বেশি আদায় করে তাতে কোনো অসুবিধা বা ক্ষতি নেইযেমনটি পূর্বে উল্লেখ করেছি

আর যে ব্যক্তি রমযানে কিয়ামুল-লাইল ইমামের সাথে পালন করে, তার জন্য উত্তম হলো, ইমামের অনুকরণ করা এবং তার সাথে সালাত শেষ করাকারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا قَامَ مَعَ الإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ كَتَبَ اللَّهُ لَهُ قِيَامَ لَيْلَةٍ».

যে ব্যক্তি ইমামের সাথে শেষ করে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত কিয়ামুল-লাইল করে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য পুরো রাত কিয়ামুল-লাইল করার সাওয়াব লিপিবদ্ধ করেন।”

প্রতিটি মুসলিমের জন্য উচিহলো, এ মহান মাসের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ইবাদত পালনে প্রচেষ্টা করাযেমন, বেশি বেশি নফল সালাত আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, কুরআনে বর্ণিত নিদর্শনসমূহ নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা এবং কুরআন বুঝার চেষ্টা করা, তাসবীহ, (সুবহানাল্লাহ) তাহমীদ, (আল-হামদুলিল্লাহ) তাকবীর, (আল্লাহু আকবার) ও তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বেশি বেশি আদায় করা, তাওবা-ইস্তেগফার করা, মানুষকে ইসলামের প্রতি দা‘ওয়াত দেওয়া, ভালো কাজের আদেশমন্দ কাজ হতে বারণ করা, গরীব, মিসকীনঅসহায় মানুষদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা, মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করা, আত্মীয়তার বন্ধনকে অটুট রাখা, প্রতিবেশীকে সম্মান করা, অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাওয়া ইত্যাদিকারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বে উল্লিখিত হাদীসে বলেন:

«يَنْظُرُ اللهُ إِلَى تَنَافُسِكُمْ فِيهِ، فَيُبَاهِي بِكُمْ مَلَائِكَتَهُ؛ فَأَرُوا اللهَ مِنْ أَنْفُسِكُمْ خَيْرًا، فَإِنَّ الشَّقِيَّ مَنْ حُرِمَ فِيهِ رَحْمَةَ اللهِ».

আল্লাহ তা‘আলামাসে তোমাদের প্রতিযোগিতার প্রতি লক্ষ্য করেনতারপর তিনি তার ফিরিশতাদের মধ্যে তোমাদের নিয়ে গর্ব করেনসুতরাং তোমরা তোমাদের নিজেদের থেকে আল্লাহর জন্য ভালোনেক আমলসমূহ তুলে ধরকারণ, হতভাগা সেই ব্যক্তি যেমাসে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।”

অন্য হাদীসে তিনি আরও বলেন:

«مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنْ خِصَالِ الخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَمَنْ أَدَّى فِيهِ فَرِيضَةً كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ».

যে ব্যক্তিমাসে কোনো নেক আমল করল, সে যেন অন্য মাসে একটি ফরয আদায় করলআর যে একটি ফরয আদায় করল, সে যেন সত্তরটি ফরয আদায় করল।”

বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হাদীসে তিনি আরো বলেন:

«عُمْرَةٌ فِي رَمَضَانَ تَعْدِلُ حَجَّةً، أَوْ قَالَ: حَجَّةً مَعِي».

রমযানে উমরা পালন করা হজের সমানঅথবা তিনি বলেন: “আমার সাথে হজ করার সমান।”

মহান মাসে বিভিন্ন ধরনের নেক আমলের প্রতি মনোযোগীপ্রতিযোগী হওয়ার হাদীসসাহাবীগণের বর্ণনা অসংখ্য

আল্লাহর নিকট আমাদের কামনা আল্লাহ তা‘আলা যেন, আমাদেরকে এবং সমগ্র মুসলিম জাতিকে এমন সব আমল করার তাওফীক দেন, যাতে রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টিআল্লাহ তা‘আলা যেন আমাদের সিয়ামকিয়ামকে কবুল করেন, আমাদের অবস্থাকে সংশোধন করে দেন, আর আমাদের সকলকে যাবতীয় ফিতনা থেকে হিফাযত করেনঅনুরূপভাবে আমাদের কামনা, তিনি যেন আমাদের নেতৃত্বদানকারীদের সংশোধন করে দেন এবং হকের ওপর তাদের একত্র করেনতিনিইসবের সত্যিকার অভিভাবক এবং সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশীল

ওয়াস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

 

***

সূচিপত্র

 

যাকাত বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা 2

দ্বিতীয় পুস্তিকা 16

রমযানের সিয়াম ও কিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে, সাথে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধি-বিধান যা অনেক মানুষের নিকট অজানা। 16

 

***


সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৯৯৩)।

সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯৮৭)।

সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ১৩৩৮)।

সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯৮৭)।

সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ১৫৬৩), এবং নাসায়ী (হাদীস নং ২২৭০); এর সনদটি হাসান

সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ১৫৬৪)।

সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ১৫৬২)।

সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ১৩৯৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ১৯)।

সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ০৮), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ১৬)।