হাজীদের দ্বারা সংঘটিত কিছু ভুল-ত্রুটি (বাংলা)

  • earth ভাষা
    (বাংলা)
  • earth সংকলন:
    الشيخ محمد بن صالح العثيمين
PHPWord

 

 

أَخْطَاءٌ يَرْتَكِبُهَا بَعْضُ الحُجَّاجِ

 

 

হাজীদের দ্বারা সংঘটিত কিছু ভুল-ত্রুটি

 

لِفَضِيلَةِ الشَّيْخِ العَلَّامَةِ

مُحَمَّدِ بْنِ صَالِحٍ العُثَيْمِينِ

غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَلِوَالِدَيْهِ وَلِلمُسْلِمِينَ

 

সম্মানিত শাইখ আল্লামা

মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন

আল্লাহ তাকে, তার পিতামাতা ও মুসলিমদেরকে ক্ষমা করুন

 


بِسْمِ اللهِ الرَّحمَنِ الرَّحِيمِ

হাজীদের দ্বারা সংঘটিত কিছু ভুল-ত্রুটি

সম্মানিত শাইখ আল্লামা

মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন

আল্লাহ তা'আলা তাঁকে, তাঁর পিতামাতা এবং মুসলিমদেরকে ক্ষমা করুন।

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের রব। আর আমি সালাত ও সালাম পাঠ করছি আমাদের নবী মুহাম্মদ, তার পরিবার-পরিজন, তার সাহাবীগণ ও কিয়ামাত পর্যন্ত যারা তার হিদায়াত দ্বারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে, তাদের সকলের উপরে। অতঃপর:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ اللَّهَ وَالۡيَوۡمَ الۡأٓخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرٗا21﴾

“অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আর্দশ, তার জন্য যে আশা রাখে আল্লাহ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে।” [আল-আহযাব, আয়াত: ২১] আল্লাহ তা‘য়ালা আরও বলেন:

﴿...فَـَٔامِنُواْ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الۡأُمِّيِّ الَّذِي يُؤۡمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ﴾

“কাজেই তোমারা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূল উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।” [আল-আরাফ, আয়াত: ১৫৮] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ اللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَاللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ31﴾

“বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্‌ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আলে ইমরান, আয়াত: ৩১] তিনি আরও বলেন:

﴿فَتَوَكَّلۡ عَلَى اللَّهِۖ إِنَّكَ عَلَى الۡحَقِّ الۡمُبِينِ 79﴾

“সুতরাং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন; আপনি তো স্পষ্ট সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।” [সূরা আন-নামাল, আয়াত: ৭৯] তিনি আরও বলেন:

﴿...فَمَاذَا بَعۡدَ الۡحَقِّ إِلَّا الضَّلَٰلُۖ فَأَنَّىٰ تُصۡرَفُونَ﴾

“অতএব, সত্য জানার পরে তা ত্যাগ করা, বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী থাকে? কাজেই (এ সুস্পষ্ট সত্য থেকে) তোমাদেরকে কোথায় ফেরানো হচ্ছে?" [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩২]

সুতরাং যা কিছু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিকা ও তাঁর পথ-পদ্ধতির পরিপন্থী তাই বাতিল ও পথভ্রষ্টতা, তা এ কর্মের কর্তার ওপর প্রত্যাখ্যাত হবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ ‌أَمْرُنَا ‌فَهُوَ ‌رَدٌّ».

“যে কেউ এমন কোনো আমল করবে যার উপরে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।”1 অর্থাৎ এটা তার কর্তার উপরই প্রত্যাখাত হবে, তার থেকে কোন কিছু গ্রহণ করা হবে না।

কিছু মুসলিম-আল্লাহ তাদেরকে হিদায়েত দান করুন এবং তাদেরকে তাওফিক দিন- ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন সব কাজ করে থাকে, যা আল্লাহর কিতাব ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতে বর্ণিত নেই; বিশেষ করে হজের সময়, যখন অনেক মানুষ জ্ঞান ছাড়াই ফতোয়া দিতে এগিয়ে আসে। তারা এমনভাবে অগ্রসর হয় যে, ফতোয়া জারির পদটি কিছু লোকের কাছে লোক দেখানো ও খ্যাতি অর্জনের জন্য একটি বাণিজ্যে পরিণত হয়। ফলে এটি নিজেকে ও অন্যদেরকে গোমরাহীতে নিমজ্জিত করে। মুসলিমদের উপর ফরয হলো, ইলম ব্যতীত ফতোয়া দানে দু:সাহস না করা এবং এটি শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই করা; কেননা সে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বাণী অন্যের কাছে পৌঁছানোর কাজে নিয়োজিত। সুতরাং তাকে ফতোয়া দানের সময় আল্লাহ তা‘আলার এ বাণীটি স্মরণে রাখতে হবে যা তিনি তাঁর নবীকে বলেছেন:

﴿وَلَوۡ تَقَوَّلَ عَلَيۡنَا بَعۡضَ الۡأَقَاوِيلِ 44 لَأَخَذۡنَا مِنۡهُ بِالۡيَمِينِ 45 ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡهُ الۡوَتِينَ 46 فَمَا مِنكُم مِّنۡ أَحَدٍ عَنۡهُ حَٰجِزِينَ 47﴾

“তিনি যদি আমার নামে কোন কথা রচনা করে চালাতে চেষ্টা করতেন,

তবে অবশ্যই আমি তাকে পাকড়াও করতাম ডান হাত দিয়ে,

তারপর অবশ্যই আমি কেটে দিতাম তার হৃদপিণ্ডের শিরা,

অতঃপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই, যে তাকে রক্ষা করতে পারে।” [সূরা আল-হাক্কাহ : ৪৪-৪৭] এবং তাঁর এই বাণী:

﴿قُلۡ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الۡفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَ وَالۡإِثۡمَ وَالۡبَغۡيَ بِغَيۡرِ الۡحَقِّ وَأَن تُشۡرِكُواْ بِاللَّهِ مَا لَمۡ يُنَزِّلۡ بِهِۦ سُلۡطَٰنٗا وَأَن تَقُولُواْ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعۡلَمُونَ 33﴾

“বলুন,‘ নিশ্চয় আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা। আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং কোন কিছুকে আল্লাহর শরীক করা- যার কোন সনদ তিনি নাযিল করেননি। আর আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।” [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৩৩]

হাজীদের বেশিরভাগ ভুল এই থেকে হয় –অর্থাৎ: না জেনে ফতোয়া দেওয়া থেকে- এবং প্রমাণ ছাড়াই সাধারণ মানুষের একে অপরের অনুকরণ থেকে।

আর আমরা আল্লাহ তাআলার সাহায্যে এমনই কিছু আমলের বিষয়ে সুন্নাহ ব্যাখ্যা করব যেখানে ভুল বেশি হয়- ভুলগুলোর ব্যাপারে সতর্ক করা সহ। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করেন এবং আমাদের মুসলিম ভাইদের এ থেকে উপকৃত করেন; নিশ্চয় তিনি দানশীল, মহান।

ইহরাম এবং তাতে সংঘটিত ভুলসমূহ:

সহীহাইনে ইবনু ’আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম বাঁধার স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মদিনাবাসীদের জন্য যুল-হুলাইফা, সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহফা, নজদবাসীদের জন্য কারনুল-মানাযিল, ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম। আর তিনি বলেছেন:

«فَهُنَّ لَهُنَّ، وَلِمَنْ أَتَى عَلَيْهِنَّ مِنْ غَيْرِ أَهْلِهِنَّ، لِمَنْ كَانَ ‌يُرِيدُ ‌الْحَجَّ ‌وَالْعُمْرَةَ».

“উল্লিখিত স্থানসমূহ হজ ও ’উমরার নিয়্যাতকারী সেই অঞ্চলের অধিবাসী এবং ঐ সীমারেখা দিয়ে অতিক্রমকারী অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য ইহরাম বাঁধার স্থান।”2

আর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

أنَّ النَّبيَّ ﷺ وَقَّتَ لأَهلِ العِرَاقِ: ذَاتَ عِرْقٍ.

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরাকবাসীদের জন্য যাতু ‘ইরক মীকাত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। আবূ দাউদ ও নাসায়ী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।3

সহীহাইনে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«يُهِلُّ أَهْلُ الْمَدِينَةِ مِنْ ذِي الْحُلَيْفَةِ، وَيُهِلُّ أَهْلُ الشَّامِ مِنَ الْجُحْفَةِ، ‌وَيُهِلُّ ‌أَهْلُ ‌نَجْدٍ ‌مِنْ قَرْنٍ».

“মদিনাবাসী ইহরাম বাঁধবে ’যুল-হুলায়ফা’ থেকে, সিরিয়াবাসী ইহরাম বাঁধবে ’জুহফা’ থেকে এবং নাজদবাসী ইহরাম বাঁধবে ’করন’ থেকে।” হাদীস4

এগুলো সেই মীকাত যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এগুলো এমন শরয়ী সীমারেখা যা শরীয়ত থেকে প্রাপ্ত এবং এর উপরই আমল করতে হবে। কারও জন্য এগুলো পরিবর্তন করা, এর ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন করা অথবা হজ বা উমরাহ করার ইচ্ছা থাকলে ইহরাম ছাড়া এগুলো অতিক্রম করা জায়েজ নয়। কেননা এটি আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘনের শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

﴿...وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ الظَّٰلِمُونَ﴾

“আর যারা আল্লাহর সীমারেখা অতিক্রম করে, তারাই যালিম।“ [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ২২৯] তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর হাদীসে বলেছেন:

«يُهلُّ أَهلُ المدينة... وَيُهِلُّ أهلُ الشَّامِ... وَيُهِلُّ أَهلُ نَجد».

“মদিনাবাসী ইহরাম বাঁধবে ’যুল-হুলায়ফা’ থেকে, সিরিয়াবাসী ইহরাম বাঁধবে ’জুহফা’ থেকে এবং নাজদবাসী ইহরাম বাঁধবে ’করন’ থেকে।” এটি একটি আদেশবাচক বর্ণনা। আর "ইহলাল" হলো উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করা, যা কেবল ইহরাম বাঁধার পরেই সম্পন্ন হয়।

যে ব্যক্তি হজ বা উমরা করার ইচ্ছা করে, তার জন্য এই মীকাতগুলো থেকে ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব—এগুলো অতিক্রম করার সময় বা যখন সে এগুলোর সমান্তরালে পৌঁছে, চাই সে স্থলপথে, জলপথে বা আকাশপথে আসুক।

যদি কেউ স্থলপথে যায়, তবে সে মীকাতের স্থানে বা এর সমান্তরাল স্থানে (যদি সরাসরি মীকাত না যায়) গিয়ে নামবে। সেখানে ইহরামের পূর্বে করণীয় সব কাজ সম্পন্ন করবে - যেমন গোসল করা, শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং ইহরামের কাপড় পরিধান করা। এরপর স্থান ত্যাগ করার আগেই ইহরাম বাঁধবে।

আর যদি কেউ সমুদ্রপথে যায়, তাহলে নৌযান যদি মীকাতের কাছাকাছি এসে থামে, তবে সে তখন গোসল করবে, সুগন্ধি ব্যবহার করবে এবং নৌযান থামা অবস্থায় ইহরামের কাপড় পরিধান করবে। অতঃপর নৌযান আবার চলার আগেই ইহরাম বাঁধবে।

আর যদি নৌযান মীকাতের কাছে না থামে, তবে তাকে মীকাতের বরাবর আসার আগেই গোসল, সুগন্ধি ব্যবহার এবং ইহরামের কাপড় পরিধান করতে হবে। তারপর যখন নৌযান মীকাতের বরাবর আসবে, তখনই ইহরাম বাঁধবে।

আর যদি সে আকাশপথে যায়, তবে বিমানে আরোহণের সময় গোসল ও সুগন্ধি ব্যবহার করবে এবং মীকাত বরাবর হওয়ার আগেই ইহরামের কাপড় পরিধান করবে। অতঃপর মীকাতের ঠিক সামনে আসার আগেই ইহরাম বাঁধবে, মীকাত আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। কারণ বিমান দ্রুতগতিতে অতিক্রম করে, সুযোগ দেয় না। আর যদি সতর্কতাবশত মীকাতের আগেই ইহরাম বাঁধে তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই, কারণ এতে তার কোনো ক্ষতি হবে না।

তবে কিছু লোক যে ভুলটি করে তা হলো, তারা বিমানে করে মীকাত বা তার সমান্তরাল অঞ্চলের উপর দিয়ে অতিক্রম করার পরও ইহরাম বাঁধে না, বরং জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরণ করা পর্যন্ত ইহরাম বাঁধতে বিলম্ব করে। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশের পরিপন্থী এবং আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘনের শামিল।

সহীহ বুখারীতে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেন: যখন এই দুই শহর (অর্থাৎ বসরা ও কুফা) বিজিত হলো, তখন সেখানকার লোকেরা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এসে বলল: “হে আমীরুল মু’মিনীন! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদবাসীগণের জন্য (মীকাত হিসেবে) ক্বারণ-কে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন; কিন্তু তা আমাদের পথ হতে দূরে। কাজেই আমরা ক্বারণ-সীমা অতিক্রম করতে চাইলে তা হবে আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ‘উমার রাদিয়য়াল্লাহু ‘আনহু বললেন: তা হলে তোমরা লক্ষ্য কর তোমাদের পথে ক্বারণ-এর সম দূরত্বরেখা কোন স্থানটি?”5 অতএব, খুলাফায়ে রাশেদীনের একজন আমীরুল মুমিনীন নির্ধারণ করেছেন যে, যারা সরাসরি মীকাত অতিক্রম করে না, তারা যখন মীকাতের সমান্তরাল স্থান অতিক্রম করবে তখন ইহরাম বাঁধবে। আর যারা আকাশপথে মীকাতের সমান্তরাল হয়, তাদের হুকুম স্থলপথে সমান্তরাল হওয়ার মতোই। উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

যদি কেউ এই ভুল করে ফেলে, অর্থাৎ জেদ্দায় নেমে যায় ইহরাম ছাড়াই, তাহলে তাকে অবশ্যই বিমানে যে মীকাতের সমান্তরাল স্থান অতিক্রম করেছিল সেখানে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে। যদি সে তা না করে এবং জেদ্দা থেকে ইহরাম বাঁধে, তাহলে অধিকাংশ আলেমের মতে তার উপর ফিদইয়া (কুরবানী) ওয়াজিব হবে; যা মক্কায় যবেহ করে সমস্ত গোশত সেখানকার গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। সে নিজে তা খেতে পারবে না কিংবা কোনো ধনীকে দিতে পারবে না, কারণ এটি কাফফারার সমতুল্য।

 


তাওয়াফ ও তাতে আমল সংক্রান্ত ভুলসমূহ:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, তিনি হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করতেন, যা কাবা ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত। তিনি হাজরে আসওয়াদের বাইরের দিক দিয়ে সমগ্র কাবা ঘরকে প্রদক্ষিণ করতেন।

তিনি মক্কায় আসার পর প্রথম তাওয়াফে শুধুমাত্র প্রথম তিন চক্করে রমল (দ্রুত হাঁটা) করতেন। তাওয়াফের সময় তিনি হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করে চুমু দিতেন, কখনও হাত দিয়ে স্পর্শ করে সেই হাতে চুমু দিতেন, আবার কখনও তার সাথে থাকা লাঠি দিয়ে স্পর্শ করে সেই লাঠিতে চুমু দিতেন- যখন তিনি উটের পিঠে সওয়ার অবস্থায় তাওয়াফ করছিলেন।

উটের পিঠে তাওয়াফ করার সময় তিনি প্রতি চক্করে হাজারে আসওয়াদের দিকে ইশারা করতেন। এছাড়া তিনি রুকনে ইয়ামানি স্পর্শ করতেন বলেও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত678910111213

হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করার পদ্ধতির এই পার্থক্য ছিল পরিস্থিতির সহজতার ভিত্তিতে- আল্লাহই সর্বজ্ঞ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেটি সহজভাবে করতে পেরেছেন, সেটিই করেছেন। তার স্পর্শ করা, চুমু দেওয়া বা ইশারা করা- সবই ছিল আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও তাঁর মহত্ত্ব প্রকাশের জন্য, এ বিশ্বাস থেকে নয় যে এই পাথর কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে।

সহীহাইনে রয়েছে, উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হাজরে আসওয়াদে চুম্বনকালে বলেছেন: “আমি অবশ্যই জানি তুমি একটি পাথরমাত্র; না উপকার করতে পার, আর না অপকার। আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।”14

কিছু হাজীর দ্বারা যেসব ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে:

১. হাজরে আসওয়াদ থেকে কিছুটা আগে, অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদ ও ইয়ামানী কোণের মাঝ থেকে তাওয়াফ শুরু করা ।এটি ধর্মে বাড়াবাড়ির অন্তর্ভুক্ত, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। এটি এক অর্থে রমাদানের এক বা দুই দিন আগে সাওম শুরু করার মতো, যার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।1516

কিছু হাজীর দাবি যে তারা সতর্কতামূলক এমনটি করে থাকেন। কিন্তু এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়; কেননা প্রকৃত ও উপকারী সতর্কতা হলো শরীয়তের অনুসরণ করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত সীমারেখা অতিক্রম না করা।

২. ভিড়ের সময় কাবা শরীফের শুধু ছাদযুক্ত অংশের তাওয়াফ করা, অর্থাৎ হাতিমের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তার বিপরীত দরজা পর্যন্ত তাওয়াফ করা, হাতিমের বাকি অংশ ডান দিকে রেখে দেওয়া। এটি একটি মারাত্মক ভুল, এভাবে তাওয়াফ শুদ্ধ হয় না। কারণ বাস্তবে এতে পুরো কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করা হয় না, শুধু অংশবিশেষ প্রদক্ষিণ করা হয়।

৩. সাত চক্করেই রমল (দ্রুত হাঁটা) করা।

৪. হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য প্রচন্ড ধাক্কাধাক্কি করা, এমনকি কখনও কখনও মারামারি ও গালাগালিতে লিপ্ত হওয়া। এতে এমন সব হাতাহাতি ও অশোভন কথাবার্তা হয় যা এই ইবাদতের সাথে, আল্লাহর হারাম মসজিদের এই পবিত্র স্থানের সাথে এবং তাঁর ঘরের ছায়ার নীচে একেবারেই বেমানান। এতে তাওয়াফের, বরং সমগ্র ইবাদতের সওয়াবই কমে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

﴿الۡحَجُّ أَشۡهُرٞ مَّعۡلُومَٰتٞۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الۡحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الۡحَجِّ...﴾

“হজ্ হয় সুবিদিত মাসগুলোতে। তারপর যে কেউ এ মাসগুলোতে হজ্ করা স্থির করে সে হজের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ করবে না।” [আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৭] এই ধাক্কাধাক্কি খুশু' (বিনয়-নম্রতা) নষ্ট করে দেয় এবং আল্লাহ তাআলার যিকির থেকে গাফেল করে তোলে, অথচ এই দুটি হলো তাওয়াফের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য।

৫. তাদের এই বিশ্বাস যে হাজরে আসওয়াদ নিজে থেকে উপকার করে। এজন্যই দেখা যায় তারা যখন এটি স্পর্শ করে, তখন তাদের হাত দিয়ে তাদের শরীরের অন্যান্য অংশে মাসেহ করে অথবা সাথে থাকা শিশুদের উপর মাসেহ করে। এ সবই অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা, কারণ উপকার ও ক্ষতি একমাত্র আল্লাহর হাতেই। এ ব্যাপারে খলিফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর উক্তিটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে: “আমি অবশ্যই জানি তুমি একটি পাথরমাত্র; না উপকার করতে পার, আর না অপকার? আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না।”

৬. কিছু হাজী কাবা শরীফের সমস্ত কোণ স্পর্শ করে, এমনকি কখনও কখনও সমস্ত দেয়াল স্পর্শ করে এবং তা দিয়ে মাসেহ করে। এটি অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা; কারণ স্পর্শ করা হলো আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও সম্মান প্রদর্শনের অংশ। তাই এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে তার উপরই সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবা শরীফে শুধুমাত্র দুটি ইয়ামানি রুকন স্পর্শ করেছেন: হাজরে আসওয়াদ (যা কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত) এবং পশ্চিমের ইয়ামানি রুকন

মুসনাদে আহমদে মুজাহিদ রহ. এর সূত্রে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি মু‘আবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর সাথে তাওয়াফ করছিলেন। তাওয়াফের সময় মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু যে রুকনের পাশ দিয়েই যেতেন সেটিই স্পর্শ করতেন। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাকে বললেন: আপনি এ দুটি রুকন কেন স্পর্শ করলেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এ দু’টো রুকন স্পর্শ করেননি। তখন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন: ‘বাইতুল্লাহর কিছুই উপেক্ষণীয় নয়।’ তখন তাকে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন: “নিশ্চয় আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।” তখন মু‘আবিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন: তুমি সত্য বলেছ।17

তাওয়াফ ও তাতে সংঘটিত দোয়া সংক্রান্ত ভুলসমূহ:

এটি প্রমাণিত যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদের নিকট পৌঁছলে আল্লাহু আকবার বলতেন। আর রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে তিনি নিম্নোক্ত দোয়া পড়তেন:18

﴿...رَبَّنَآ ءَاتِنَا فِي الدُّنۡيَا حَسَنَةٗ وَفِي الۡأٓخِرَةِ حَسَنَةٗ وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ﴾

“হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন, আর আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।“19 [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ২০১] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:

«إِنَّمَا ‌جُعِلَ ‌الطَّوَافُ ‌بِالْبَيْتِ، وَبِالصَّفَا وَالمَرْوَةِ، وَرَمْيُ الْجِمَارِ، لِإِقَامَةِ ذِكْرِ اللهِ».

“আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সা‘ঈ ও জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ প্রভৃতির লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহর যিকির প্রতিষ্ঠা করা।”20

তাওয়াফকারীদের দ্বারা সংঘটিত একটি ভুল হলো, তারা প্রতিটি চক্করের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া নির্ধারণ করে, অন্য কোনো দোয়া পড়ে না। যদি চক্কর শেষ হয় কিন্তু দোয়া অসম্পূর্ণ থাকে, তাহলে তারা দোয়া ছেড়ে দেয়, এমনকি একটি শব্দ বাকি থাকলেও, পরবর্তী চক্করের নির্ধারিত দোয়া শুরু করার জন্য। আবার যদি দোয়া শেষ হয় কিন্তু চক্কর শেষ না হয়, তাহলে তারা নীরব থাকে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাওয়াফের প্রতিটি চক্করে আলাদা নির্ধারিত দোয়ার কোনো বর্ণনা প্রমাণিত নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন: "তাওয়াফে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নির্দিষ্ট কোনো যিকির প্রমাণিত নেই - না তার আদেশে, না তার বক্তব্যে, না তার শিক্ষায়। বরং এতে সকল শরয়ী দোয়া পড়া যায়। অনেক মানুষ মিযাবের নিচে ইত্যাদি স্থানে নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে, যার কোনো দলীল নেই"21

অতএব, তাওয়াফকারী তার ইচ্ছানুযায়ী দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করতে পারবে এবং যেকোনো শরীয়তসম্মত যিকির যেমন তাসবিহ, তাহমিদ, তাহলিল, তাকবীর বা কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করতে পারবে।

তাওয়াফকারীদের আরেকটি ভুল হলো, তারা লিখিত দোয়া সংগ্রহ করে তা পড়ে, অথচ এর অর্থ জানে না। অনেক সময় এতে মুদ্রণ বা অনুলিপিকরণের এমন ভুল থাকে যা দোয়ার অর্থ সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। ফলে তারা নিজের অজান্তে নিজেদের বিরুদ্ধে দোয়া করে। আমরা এ ধরনের বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি।

তাওয়াফকারী যদি নিজে বুঝে-শুনে, নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তাহলে এটি তার জন্য উত্তম ও বেশি উপকারী হবে। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণও বেশি হয় এবং তার সুন্নাতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পায়।

তাওয়াফকারীদের দ্বারা সংঘটিত আরেকটি ভুল হলো, কিছু লোক দলবদ্ধভাবে তাওয়াফ করে এবং একজন নেতা উচ্চস্বরে দোয়া শেখায়, যা সবাই একসাথে অনুসরণ করে। এতে শোরগোল সৃষ্টি হয়, অন্যান্য তাওয়াফকারীদের মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং তারা নিজেরা কী বলছে তা বুঝতে পারে না। এটি খুশু নষ্ট করে এবং এই পবিত্র স্থানে আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল লোককে সালাত পড়ার সময় উচ্চস্বরে কিরাত পাঠ করতে দেখে বলেছিলেন:

«كُلُّكُمْ ‌يُنَاجِي ‌رَبَّهُ، فَلَا ‌يَجْهَرُ ‌بَعْضُكُمْ ‌عَلَى ‌بَعْضٍ ‌فِي ‌الْقُرْآنِ».

“তোমরা তো সকলেই (সালাত আদায়কালে) তার রবের নিকট কাকুতি মিনতি করে প্রার্থনা করো। কাজেই কুরআন পাঠের সময় তোমাদের একজন অপরের ওপর যেন উচ্চ আওয়াজ না করে।” মুয়াত্তা মালিক।22 ইবনে আবদুল বার বলেছেন: "এটি সহীহ হাদীস"।23

আর কতই না ভালো হতো যদি এই নেতা (হাজীদের গাইডদাতা) কাবায় আসার পর তাদেরকে থামাতেন এবং বলে দিতেন: "এভাবে কর, এ দোয়া পড়, তোমাদের পছন্দমতো দোয়া কর"। তারপর তাদের সাথে তাওয়াফে চলতেন, যাতে কেউ ভুল না করে। এভাবে তারা খুশু ও প্রশান্তির সাথে তাওয়াফ করত, ভয় ও আশার সাথে তাদের রবের কাছে তাদের বোধগম্য ও কাক্ষিত দোয়া করত, আর অন্য মানুষও তাদের কষ্ট থেকে নিরাপদ থাকত।

তাওয়াফের পরবর্তী দুই রাকাত সালাত ও তাতে সংঘটিত ভুলসমূহ:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে,

أنَّهُ لَمَّا فَرَغَ مِنَ الطَّوَافِ تَقَدَّمَ إِلَى مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ، فَقَرَأَ: ﴿وَاتَّخِذُواْ مِن مَّقَامِ إِبۡرَٰهِـۧمَ مُصَلّٗى﴾ [البقرة: ١٢٥]، فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ وَالمَقَامُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الكَعْبَةِ، وَقَرَأَ فِي الرَّكْعَةِ الْأُولَى: الْفَاتِحَةَ وَ﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا الۡكَٰفِرُونَ﴾ وفي الثانية: سورة الفاتحة و﴿قُلۡ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ﴾.

তিনি তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইবরাহীমে পৌছে এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন: “তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর” [আল বাকারাহ: ১২৫)। তিনি মাকামে ইবরাহীমকে তার ও বায়তুল্লাহর মাঝখানে রেখে দু’ রাকাআত সালাত আদায় করলেন। তিনি প্রথম রাকাআতে সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা ইখলাস পাঠ করেন।2425

এক্ষেত্রে কিছু মানুষের দ্বারা সংঘটিত ভুল হলো, তারা ধারণা করে যে অবশ্যই মাকামে ইবরাহিমের কাছে গিয়েই দুই রাকাত সালাত পড়তে হবে। এতে তারা সেখানে ভিড় জমায়, হজ্জের মৌসুমে তাওয়াফকারীদের কষ্ট দেয় এবং তাদের তাওয়াফে বাধা সৃষ্টি করে। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

তাওয়াফের পরের দুই রাকাত সালাত মাসজিদে হারামের যেকোনো স্থানে আদায় করা যায়। সালাত আদায়কারী মাকামে ইবরাহিমকে নিজ ও কাবার মাঝে রাখতে পারেন, এমনকি তা দূরে হলেও। এভাবে তিনি চত্বরে বা মসজিদের বারান্দাতেও সালাত পড়তে পারেন, কাউকে কষ্ট না দিয়ে কিংবা নিজে কষ্ট না পেয়ে। এতে তিনি খুশু-খুজুর সাথে সালাত আদায় করতে সক্ষম হবেন।

কতই না ভালো হতো যদি মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধায়কগণ মাকামে ইবরাহিমের কাছে সালাত পড়ে তাওয়াফকারীদের কষ্ট দেওয়া থেকে লোকদের নিষেধ করতেন এবং তাদেরকে বুঝিয়ে দিতেন যে, তাওয়াফের পরের দুই রাকাত সালাতের জন্য এ স্থান শর্ত নয়।

আরেকটি ভুল হলো, কিছু লোক মাকামে ইবরাহিমের পিছনে অকারণে অনেক রাকাত সালাত পড়ে, অথচ যারা তাওয়াফ শেষ করেছে তাদের এই স্থানটির দরকার (দু’রাকাআত আদায়ের জন্য)।

আরেকটি ভুল হলো, কিছু তাওয়াফকারী দুই রাকাত সালাত শেষ করে তাদের নেতার সাথে উচ্চস্বরে দলবদ্ধভাবে দোয়া করে, যা মাকামে ইবরাহিমের পিছনে সালাত পড়া লোকদের জন্য ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এভাবে তারা অন্য মুসল্লীদের উপর সীমালঙ্ঘন করে। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

﴿ادۡعُواْ رَبَّكُمۡ تَضَرُّعٗا وَخُفۡيَةًۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ الۡمُعۡتَدِينَ55﴾

“তোমরা বিনিতভাবে ও গোপনে তোমাদের রবকে ডাক, নিশ্চয় তিনি সীমালংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [আল-আরাফ, আয়াত: ৫৫]

সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ, সেগুলোর উপর দোয়া করা, দুই চিহ্নের মাঝে দৌড় দেয়া এবং এতে সংঘটিত ভুল:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, তিনি যখন সাফার নিকটবর্তী হলেন, তখন পড়লেন:

﴿إِنَّ الصَّفَا وَالۡمَرۡوَةَ مِن شَعَآئِرِ اللَّهِ...﴾

“নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৫৮] অতঃপর তিনি সাফা পাহাড়ের উপরে আরোহণ করলেন, এমনকি তিনি বায়তুল্লাহ দেখতে পেলেন। তিনি ক্বিলামুখী হলেন, দুহাত উঁচু করলেন, আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তিনি ইচ্ছামত দু‘আ করলেন, আল্লাহর একত্ব ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করলেন এবং বললেন:

«لَا إِلَـهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، لَا إِلَـٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ» ثُمَّ دَعَا بَيْنَ ذَلِكَ، فَقَالَ مِثْلَ هَذَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، ثُمَّ نَزَلَ مَاشِيًا، فَلَمَّا انْصَبَّتْ قَدَمَاهُ فِي بَطْنِ الْوَادِي، وَهُوَ مَا بَيْنَ الْعَلَمَيْنِ الْأَخْضَرَيْنِ، سَعَىٰ، حَتَّىٰ إِذَا تَجَاوَزَهُمَا، مَشَىٰ، حَتَّىٰ أَتَى الْمَرْوَةَ، فَفَعَلَ عَلَى الْمَرْوَةِ كَمَا فَعَلَ عَلَى الصَّفَا.

অর্থ: “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব তাঁর এবং তাঁর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, তিনি প্রতিটি জিনিসের উপর শক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন, তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সকল (বিদ্রোহী) বাহিনীকে বিতাড়িত ও পরাভূত করেছেন।” এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করলেন। এভাবে তিনবার দোয়া করলেন।

এরপর তিনি সাফা পাহাড় থেকে নেমে হাঁটলেন, যখন তিনি সেই উপত্যকায় পৌঁছালেন যা দুইটি সবুজ চিহ্নের মাঝে অবস্থিত, তখন তিনি দৌঁড় দিলেন, এরপর যখন সেগুলোর মাঝখান পার হয়ে গেলেন, তখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে লাগলেন—এভাবে মরওয়া পর্যন্ত পৌঁছালেন এবং মরওয়ায়ও তিনি ঠিক একইভাবে করলেন যেমনটি তিনি সাফায় করেছিলেন।26

সাফা-মারওয়ায় কিছু সায়ী কারীর ভুল হলো, তারা সাফা বা মারওয়ায় উঠে কাবার দিকে মুখ করে তিনবার তাকবীর বলে, হাত উঠিয়ে সালাতের মতো ইশারা করে, তারপর নেমে যায়। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাতের বিপরীত। তাদের উচিত হলো, হয়তো সুন্নাত অনুযায়ী সায়ী করা যদি তা তাদের জন্য সহজ হয়, নয়তো উপরোক্ত কাজ সম্পূর্ণ ছেড়ে দেয়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করেননি এমন নতুন আমল সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা।

সায়ীকারীদের দ্বারা সংঘটিত আরেকটি ভুল হলো, তারা সাফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত সমগ্র পথে দ্রুত দৌড়ায়, যা সুন্নাতের বিপরীত। প্রকৃত সুন্নাত হলো শুধুমাত্র দু'টি সবুজ চিহ্নের মধ্যবর্তী অংশে দ্রুত হাঁটা, বাকি অংশে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা। এ ভুল সাধারণত অজ্ঞতাবশত বা তাড়াতাড়ি সায়ী শেষ করার ইচ্ছায় হয়ে থাকে। আল্লাহই একমাত্র সহায়।

আরেকটি ভুল হলো, কিছু নারী দু'টি সবুজ চিহ্নের মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষদের মতো দ্রুত হাঁটে। অথচ নারীরা দ্রুত হাঁটবে না, বরং স্বাভাবিকভাবে হাঁটবে। যেমন ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন: “বাইতুল্লাহর তাওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা‘ঈ করার সময় মহিলাদের রমল নেই।”27

আরেকটি ভুল হলো: কোন কোন সায়ীকারী নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করেন:

﴿إِنَّ الصَّفَا وَالۡمَرۡوَةَ مِن شَعَآئِرِ اللَّهِ...﴾

অর্থ: “নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৫৮] যখনই তারা সাফা বা মারওয়ার দিকে অগ্রসর হয়, তখনই এই এটা পড়ে। তবে সুন্নাত হলো: শুধুমাত্র প্রথম চক্করে সাফার দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় এই আয়াতটি পড়া।

আরেকটি ভুল হলো, কিছু সায়ীকারী প্রতিটি চক্করের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া নির্ধারণ করে, যার কোনো ভিত্তি নেই।

আরাফায় অবস্থান ও তাতে সংঘটিত ভুল:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, তিনি আরাফার দিনে সূর্য হেলে পড়ার আগ পর্যন্ত নামিরায় অবস্থান করেছিলেন। অতঃপর তিনি সওয়ার হলেন, তারপর নেমে এসে যুহর ও আসরের নামাজ দুই রাকাত করে একত্রে আদায় করলেন—এক আজান ও দুই ইকামতের মাধ্যমে (জমা তাকদীম করে)। এরপর তিনি সওয়ার হয়ে তার অবস্থানস্থলে এলেন ও সেখানে দাঁড়ালেন এবং বললেন:

«وَقَفْتُ ‌هَاهُنَا، وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ».

“আমি এখানে (আরাফায়) অবস্থান করলাম। তবে আরাফার সব জায়গাই হচ্ছে অবস্থানের জায়গা।” অতঃপর তিনি কিবলামুখী হয়ে হাত উত্তোলন করে দাঁড়িয়ে থাকলেন, আল্লাহকে স্মরণ করতে ও দোয়া করতে থাকলেন সূর্য অস্ত যাওয়া এবং সূর্যের গোলাকৃতি দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তিনি মুযদালিফার দিকে রওনা হলেন।28

কিন্তু এখানে হাজীরা যেসব ভুল করে থাকে:

১. তাদের কেউ কেউ আরাফার সীমানার বাইরে অবস্থান করে এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানস্থলে থাকে, এরপর আরাফায় না দাঁড়িয়েই মুযদালিফায় চলে যায়। এটি মারাত্মক ভুল যা হজ নষ্ট করে দেয়, কেননা আরাফায় অবস্থান হজের রুকন, এটি ছাড়া হজ শুদ্ধ হয় না। যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে আরাফায় দাঁড়ায়নি তার হজ হয়নি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«الحَجُّ عَرَفَةُ، ‌مَنْ ‌جَاءَ ‌لَيْلَةَ ‌جَمْعٍ قَبْلَ طُلُوعِ الفَجْرِ فَقَدْ أَدْرَكَ الحَجَّ».

“হজ হচ্ছে আরাফায় অবস্থান। সুতরাং যে ব্যক্তি মুযদালিফার রাত্রে ফজর হওয়ার পূর্বে (আরাফায়) এসে পৌঁছবে সে হজ পেয়ে গেল।”29

এই মারাত্মক ভুলের কারণ হলো, মানুষ একে অপরকে অনুসরণ করে বিভ্রান্ত হয়। কারণ কিছু লোক আরাফার সীমানায় পৌঁছার আগেই নেমে যায় এবং সীমানার চিহ্নগুলো খুঁজে দেখে না। ফলে তারা নিজেদের হজ নষ্ট করার পাশাপাশি অন্যদেরও বিভ্রান্ত করে।

হজ কর্তৃপক্ষের জন্য একটি উত্তম পদক্ষেপ হবে- যদি তারা সব হাজীকে বিভিন্ন মাধ্যম ও বহুভাষায় সচেতন করেন এবং মুয়াল্লিমদেরকে এ ব্যাপারে হাজীদের সতর্ক করার দায়িত্ব দেন। এতে মানুষ তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে এবং পরিপূর্ণভাবে হজ আদায় করতে পারবে, যা থেকে তারা দায়মুক্ত হবে।

২- কেউ কেউ সূর্যাস্তের আগেই আরাফা থেকে চলে যায়, এটা নিষেধ; কারণ এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের বিপরীত, তিনি সূর্য পূর্ণ অস্ত যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিলেন। আর সূর্যাস্তের আগে আরাফা থেকে চলে যাওয়া জাহেলি যুগের মানুষের কাজ।

৩- কেউ কেউ দু'আ করার সময় পাহাড়ের (জাবালে আরাফা) দিকে মুখ করে, এমনকি যদি কিবলা তাদের পিছনে, ডানে বা বামেও থাকে। এটি সুন্নতের বিপরীত; কারণ সুন্নত হলো কিবলার দিকে মুখ করা, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছিলেন।

জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ ও এতে সংঘটিত ভুলসমূহ:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত আছে যে, তিনি কুরবানীর দিন সকাল বেলা জামরাতুল আকাবায়- যা মক্কার দিকের সর্বশেষ জামরা- সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেছিলেন, প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে সাথে তাকবীর বলেছিলেন। প্রতিটি কঙ্কর ছিল ছোট নুড়ির মত, অর্থাৎ ছোলার দানার চেয়ে সামান্য বড়।30

সুনান নাসাঈ গ্রন্থে এটি ফযল ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে - যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে সওয়ার ছিলেন মুযদালিফা থেকে মিনার পথে - তিনি বলেন: তিনি (অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দ্রুতবেগে 'মুহাসসির' নামক স্থানে অবতরণ করলেন এবং বললেন:

«عَلَيْكُمْ ‌بِحَصَى ‌الْخَذْفِ الَّذِي يُرْمَى بِهِ الْجَمْرَةُ».

“তোমরা কংকর তুলে নাও, যা জামরায় নিক্ষেপ করা হয়।” তিনি বলেন: আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাত দ্বারা ইশারা করছিলেন, যেমনভাবে কোনো ব্যক্তি ছোট নুড়ি নিক্ষেপ করে থাকে।31

মুসনাদে আহমদে এসেছে: ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, -তবে ইয়াহইয়া রহ. বলেন, আওফ জানে না যে, বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ছিল নাকি ফযল?- তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরাতুল ’আকাবার ভোরে তাঁর উষ্ট্রীর পিঠে আরোহিত অবস্থায় বলেন:

«هَاتِ ‌الْقُطْ ‌لِي» فَلَقَطْتُ لَهُ حَصَيَاتٍ هُنَّ حَصَى الْخَذْفِ، فَوَضَعَهُنَّ فِي يَدِهِ، فَقَالَ: «بِأَمْثَالِ هَؤُلَاءِ» مَرَّتَيْنِ، وَقَالَ بِيَدِهِ - فَأَشَارَ يَحْيَى أَنَّهُ رَفَعَهَا - وَقَالَ: «إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ، فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِالْغُلُوِّ فِي الدِّينِ».

“আমার জন্য কঙ্কর সংগ্রহ করে নাও। আমি তার জন্য সাতটি কঙ্কর সংগ্রহ করলাম। তা ছিল আকারে ক্ষুদ্র। তিনি তা নিজের হাতের তালুতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলেন: এই আকারের ক্ষুদ্র কঙ্কর নিক্ষেপ করবে। তিনি এ কথা দুবার বলেছেন এবং তিনি হাতের ইশারা দিয়ে বললেন -বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া ইঙ্গিত করলেন যে, তিনি এগুলো হাতে তুলে নিয়েছেন- এবং বলেছেন: “দীনের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে তোমরা সাবধান থাকো। কেননা তোমাদের পূর্বেকার লোকেদেরকে দীনের ব্যাপারে তাদের বাড়াবাড়ি ধ্বংস করেছে।”32

উম্মে সুলায়মান বিনতে আমর ইবনুল আহওয়াস (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে নহরের দিনে (১০ই যিলহজ) ‘জামরাহ আকাবা’তে ওয়াদির নিম্নভাগের দিক থেকে পাথর নিক্ষেপ করতে দেখেছি, আর তিনি বলছিলেন:

«يَا أَيُّهَا النَّاسُ، ‌لَا ‌يَقْتُلْ ‌بَعْضُكُمْ ‌بَعْضًا؛ إِذَا رَمَيْتُمُ الْجَمْرَةَ فَارْمُوهَا بِمِثْلِ حَصَى الْخَذْفِ».

“হে মানুষ! তোমাদের কেউ যেন একে অপরকে হত্যা না করে। আর যখন তোমরা জামরাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করো, তখন ছোলা থেকে সামান্য বড় আকারের কঙ্কর দ্বারা নিক্ষেপ করো।” মুসনাদে আহমাদ।33

সহীহ বুখারীতে রয়েছে, ইবনু ’উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি প্রথম জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে তাকবীর বলতেন। তারপর সামনে অগ্রসর হয়ে সমতল ভূমিতে এসে কেবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে উভয় হাত তুলে দু’আ করতেন। তারপর মধ্যবর্তী জামরায় কঙ্কর মারতেন এবং একটু বাঁ দিকে চলে সমতল ভূমিতে এসে কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তার উভয় হাত উঠিয়ে দু’আ করতেন। এরপর বাতনে ওয়াদী থেকে জমরায়ে ’আকাবায় কঙ্কর মারতেন। এর কাছে তিনি বিলম্ব না করে ফিরে আসতেন এবং বলতেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এরূপ করতে দেখেছি।34

ইমাম আহমদ ও আবূ দাঊদ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِنَّمَا ‌جُعِلَ ‌الطَّوَافُ ‌بِالْبَيْتِ وَبِالصَّفَا وَالمَرْوَةِ وَرَمْيُ الْجِمَارِ لِإِقَامَةِ ذِكْرِ اللَّهِ».

“আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সা‘ঈ ও জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ প্রভৃতির লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহর যিকির প্রতিষ্ঠা করা।”35

হজ্জ পালনকারীদের দ্বারা সংঘটিত কিছু সাধারণ ভুল:

১. তাদের এই ধারণা যে মুযদালিফা থেকে অবশ্যই কঙ্কর সংগ্রহ করতে হবে; তারা রাতের অন্ধকারেই কঙ্কর সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেদের কষ্ট দেয়, মিনার দিনগুলোতে এই কঙ্কর সাথে নিয়ে ঘুরে, এমনকি কারো কঙ্কর হারিয়ে গেলে তারা অত্যন্ত দুঃখিত হয় এবং সাথীদের কাছ থেকে মুযদালিফার অতিরিক্ত কঙ্কর চেয়ে বেড়ায়

পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে জানা গেল যে, এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোনো বর্ণনা নেই। তিনি তার সওয়ারীর উপর বসা অবস্থায় ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে কঙ্কর সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তখন তিনি জামারার নিকটেই ছিলেন, কেননা মুযদালিফা থেকে রওনা হওয়ার পর এর আগে তিনি থেমেছিলেন এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। আর এটাই ছিল কঙ্করের প্রয়োজনের সময়, তাই প্রয়োজনের আগে তা সংগ্রহ করার নির্দেশ দেননি- কারণ তাতে কোনো উপকার নেই এবং তা বহন করা কষ্টকর।

২. তাদের এই বিশ্বাস যে, জামারায় পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে তারা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করছে, তাই তারা জামারাগুলোকে 'শয়তান' নামে অভিহিত করে। তারা বলে: "আমরা বড় বা ছোট শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করলাম", অথবা "আমরা শয়তানদের পিতাকে কংকর নিক্ষেপ করলাম"- তাদের উদ্দেশ্য, জামরাতুল আকাবা (বড় জামরা)। এ ধরনের অশোভন শব্দাবলি এই পবিত্র স্থানের মর্যাদার সাথে বেমানান।

আরও দেখা যায় তারা প্রচণ্ড জোরে, হিংস্রভাবে, চিৎকার করে এবং গালিগালাজ করে তাদের ধারণা অনুযায়ী এসব 'শয়তান'-কে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে। এমনকি আমরা দেখেছি কেউ কেউ জামারার উপর উঠে জুতো দিয়ে আঘাত করে এবং বড় বড় পাথর দিয়ে রাগান্বিতভাবে আক্রমণ করে। অন্যদের নিক্ষেপিত পাথর তাদেরকে আঘাত করলেও তারা আরও রেগে যায় এবং আরো জোরে আঘাত করতে থাকে। চারপাশের মানুষ এ দৃশ্য দেখে হাসাহাসি করে, মনে হয় যেন কোনো হাস্যরসাত্মক নাটক চলছে। জামারা সেতু নির্মাণ ও স্তম্ভ উঁচু করার আগে আমরা এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি।

আর এ সমস্ত কিছুই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের সেই ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর যে, হাজীরা শয়তানকে পাথর মারছে। অথচ এ বিশ্বাসের পেছনে নির্ভরযোগ্য কোনো সঠিক ভিত্তি নেই। পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে আপনারা জেনেছেন জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপের বিধান প্রণয়নের হিকমত হলো, মহান আল্লাহর যিকির প্রতিষ্ঠা করা। এজন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের পর তাকবীর বলতেন।

৩. বড় জামারায় বড় বড় পাথর, জুতা, বুট ও কাঠের টুকরো নিক্ষেপ করা। এটি একটি গুরুতর ভুল যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি নিজে 'খাযাফ' বা ছোট নুড়ি কংকর নিক্ষেপ করেছেন এবং উম্মতকে অনুরূপ নিক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ধর্মে বাড়াবাড়ি করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।

এ মারাত্মক ভুলের মূল কারণ: পূর্বোল্লেখিত সেই ভ্রান্ত ধারণা যে তারা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করছে।

৪. কেউ কেউ আবার জামারার দিকে রূঢ়তা ও হিংস্রতার সাথে এগিয়ে যায়, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে না এবং আল্লাহর বান্দাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না। ফলে তাদের এই কাজের কারণে মুসলিমদের কষ্ট দেওয়া, তাদের ক্ষতি করা, গালাগালি ও মারামারি ইত্যাদি ঘটে। এতে এই ইবাদত ও এই পবিত্র স্থানটি গালাগালি ও লড়াইয়ের দৃশ্যে পরিণত হয়। আর এর ফলে সেই মূল উদ্দেশ্য থেকে বের হয়ে যায় যে জন্য এটি প্রবর্তন করা হয়েছিল এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে করতেন তা থেকে বিচ্যুত হয়। মুসনাদ গ্রন্থে কুদামাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আম্মার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَوْمَ النَّحْرِ يَرْمِي جَمْرَةَ الْعَقَبَةِ عَلَى نَاقَةٍ لَهُ صَهْبَاءَ، ‌لَا ‌ضَرْبَ ‌وَلَا ‌طَرْدَ، وَلَا إِلَيْكَ إِلَيْكَ.

“আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার সাদা ও লাল মিশ্রিত রঙের উটনীর উপর থেকে কুরবানির দিনে জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। সেখানে কোন রকম মারপিট, কোন ধাক্কাধাক্কি এবং সরে যাও সরে যাও ইত্যাদি কিছু ছিল না।” তিরমিযী, তিনি এটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।36

৫. কেউ কেউ তাশরীকের দিনগুলোতে প্রথম ও দ্বিতীয় জামরায় (ছোট ও মধ্যম জামরা)কংকর নিক্ষেপের পর দাঁড়িয়ে দু‘আ করে না। অথচ আপনি ইতিমধ্যে জেনেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুটি জামরায় কংকর নিক্ষেপের পর কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াতেন, দু’হাত উঠিয়ে দীর্ঘক্ষণ দু‘আ করতেন।

লোকদের দাঁড়িয়ে দু‘আ করা ছেড়ে দেওয়ার কারণ হলো, সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা, অথবা অধিকাংশ মানুষের তাড়াহুড়ো করা ও ইবাদত থেকে দ্রুত অব্যাহতি পাওয়ার প্রবণতা।

কতইনা ভালো হতো, যদি হাজী সাহেব হজ্জের বিধি-বিধান আগে শিখে নিতেন, যাতে তিনি জেনে-বুঝে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করতে পারেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যথাযথ অনুসরণ করতে পারেন। কোনো ব্যক্তি যদি কোনো দেশে ভ্রমণের ইচ্ছা করে, তবে আপনি দেখবেন, সে আগেই ঐ দেশের পথ-ঘাট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে নিচ্ছে, যাতে সঠিক পথনির্দেশনা পেয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। তাহলে যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার দিকে এবং তাঁর জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া পথে চলতে চায়, তার কি উচিত নয় সেই পথ সম্পর্কে আগে জিজ্ঞাসা করা, যাতে সে তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে?

৬. কেউ কেউ এক মুঠোয় সবগুলো কঙ্কর একসাথে নিক্ষেপ করে, যা একটি মারাত্মক ভুল। আলেমগণ বলেছেন: যদি কেউ এক মুঠোয় একাধিক কঙ্কর নিক্ষেপ করে, তবে তা শুধুমাত্র একটি কঙ্কর হিসেবেই গণ্য হবে। তাই প্রতিটি কঙ্কর আলাদা আলাদাভাবে নিক্ষেপ করা ওয়াজিব- ঠিক যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছিলেন।

৭. কঙ্কর নিক্ষেপের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয় এমন অতিরিক্ত দোয়া যুক্ত করা, যেমন এভাবে বলা: "করুনাময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং শয়তানের ক্রোধের জন্য"। কখনো তারা এ দোয়া পড়ে কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত তাকবীর ছেড়ে দেয়। সর্বোত্তম হলো: কোন প্রকার বাড়ানো বা কমানো ব্যতীত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ থাকা।

৮. কেউ কেউ নিজে সরাসরি জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপে অবহেলা করে। ফলে দেখা যায়, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যদেরকে নিজেদের পক্ষ থেকে কঙ্কর নিক্ষেপের দায়িত্ব দেয় - ভিড় ও কষ্ট এড়ানোর জন্য। এটা আল্লাহ তাআলার নির্দেশের পরিপন্থী, যিনি বলেন:

﴿وَأَتِمُّواْ الۡحَجَّ وَالۡعُمۡرَةَ لِلَّهِ...﴾

“তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও উমরা সম্পন্ন করো।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৬]

সক্ষম ব্যক্তির উপর নিজ হাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। তাকে কষ্ট ও পরিশ্রম সহ্য করতে হবে। নিশ্চয় হজ্ এক ধরনের জিহাদ, যাতে ক্লান্তি ও কষ্ট অবশ্যম্ভাবী। তাই হাজীদের উচিত তাদের রবকে ভয় করা এবং আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুযায়ী যথাসাধ্য তাদের হজের কার্যাবলি পূর্ণরূপে আদায় করা।

 

বিদায়ী তাওয়াফ ও তাতে সংঘটিত ভুলসমূহ:

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

«أُمِرَ ‌النَّاسُ ‌أَنْ ‌يَكُونَ ‌آخِرُ ‌عَهْدِهِمْ ‌بِالْبَيْتِ، ‌إِلَّا ‌أَنَّهُ ‌خُفِّفَ ‌عَنِ ‌الْحَائِضِ».

“মানুষদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে, যেন তাদের সর্বশেষ কাজ হয় বায়তুল্লাহর (বিদায়ী) তাওয়াফ। তবে ঋতুবতী নারীর জন্য এ বিষয়ে শিথিল (মাফ) করা হয়েছে।”37

আর মুসলিমের অন্য বর্ণনায় ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন:

"লোকেরা (মিনা থেকে) সবদিকে ফিরে যেত। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

«‌لَا ‌يَنْفِرَنَّ ‌أَحَدٌ ‌حَتَّى ‌يَكُونَ ‌آخِرُ ‌عَهْدِهِ ‌بِالْبَيْتِ».

"তোমাদের মধ্যে কেউ যেন মক্কা ত্যাগ না করে, যতক্ষণ না তার শেষ কাজ বাইতুল্লাহর সাথে (বিদায়ী তাওয়াফ) থাকে।”38

আর আবু দাউদে হাদীসটি এ শব্দে এসেছে:

«‌حَتَّى ‌يَكُونَ ‌آخِرُ ‌عَهْدِهِ ‌الطَّوَافَ ‌بِالْبَيْتِ».

"যতক্ষণ না তার শেষ কাজ বাইতুল্লাহর সাথে (বিদায়ী তাওয়াফ) থাকে।”39

সহীহাইনে উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আমার অসুস্থতার কথা জানালে তিনি বললেন:

«‌طُوفِي ‌مِنْ ‌وَرَاءِ ‌النَّاسِ ‌وَأَنْتِ ‌رَاكِبَةٌ»، فَطُفْتُ وَرَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُصَلِّي إِلَى جَانِبِ الْبَيْتِ، وَيَقْرَأُ بـ :﴿وَالطُّورِ 1 وَكِتَٰبٖ مَّسۡطُورٖ2 ﴾.

“তুমি সওয়ার হয়ে লোকেদের পিছনে থেকে তাওয়াফ করে নাও। তারপর আমি তাওয়াফ করছিলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বার পাশে সালাত আদায় করছিলেন এবং তিনি সূরা আত-তূর তিলাওয়াত করছিলেন।”40

নাসায়ীতে বর্ণিত আছে, উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি (অসুস্থতার কারণে) বিদায়ী তাওয়াফ করতে পারিনি, তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:

«إِذَا ‌أُقِيمَتِ ‌الصَّلَاةُ، ‌فَطُوفِي ‌عَلَى ‌بَعِيرِكَ، مِنْ وَرَاءِ النَّاسِ».

“যখন সালাত শুরু হবে, তখন তোমার উটে আরোহণ করে তুমি লোকের পেছনে তাওয়াফ আদায় করে নিবে।”41

সহীহ বুখারীতে আনাস ইবন মালিম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত:

أنَّ النَّبيَّ ﷺ صَلَّى الظُّهرَ وَالعَصرَ وَالمَغربَ وَالعَشاءَ، ثُمَّ رَقَدَ رَقْدةً بِالمُحَصَّبِ، ثمَّ رَكِبَ إلى البيتِ، فَطَافَ بِهِ.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর, ’আসর, মাগরিব ও ’ইশার সালাত আদায়ের পর মুহাসসাবে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকেন, পরে সাওয়ার হয়ে বায়তুরল্লাহর দিকে গেলেন এবং বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করলেন।42

সহীহাইনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাফিয়া রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বিদায় হজের সময় তাওয়াফে ইফাদার পরে ঋতুবতী হয়ে পড়েন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

‌‌«‌أَحَابِسَتُنَا ‌هِيَ؟» فَقَالوا: إِنَّهَا قَدْ أَفَاضَتْ، وَطَافَتْ بِالبيت. قال: «‌فلتَنفِرْ ‌إذن»[43].

“সে কি আমাদের (মদিনার পথে প্রত্যাবর্তনে) বাঁধ সাধল? তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি তো তাওয়াফে যিয়ারাহ আদায় করে নিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তাহলে সেও রওয়ানা করুক।”43

মুয়াত্তা মালিকে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার ইবন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন: “বায়তুল্লাহর তাওয়াফ না করে হাজীগণের কেউ যেন মক্কা হতে না ফিরে। কারণ হজ্জের শেষ আমল হল বায়তুল্লাহর তাওয়াফ।”44

এতে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত আছে যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মার্-যাহরান থেকে এক ব্যক্তিকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, যে বাইতুল্লাহর বিদায়ী তাওয়াফ না করেই চলে গিয়েছিল, অবশেষে সে বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করল।45

 

এ ক্ষেত্রে কিছু লোক যেসব ভুল করে থাকে:

১-কেউ কেউ মিনা থেকে চলে যাওয়ার দিন জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপের আগেই বের হয়ে গিয়ে বিদায়ী তাওয়াফ করে, তারপর আবার মিনায় ফিরে যায়, জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করে এবং সেখান থেকে নিজ দেশের জন্য রওনা হয়। এটি জায়েয নয়। কারণ এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশের পরিপন্থী যে, হাজীদের শেষ কাজ বাইতুল্লাহর সাথে হোক। যে ব্যক্তি বিদায়ী তাওয়াফের পর কঙ্কর নিক্ষেপ করল, সে তার শেষ কাজ বাইতুল্লাহর পরিবর্তে জামারাকে বানাল। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হজ্জের সকল কাজ সম্পূর্ণ করে চূড়ান্তভাবে বের হওয়ার সময়ই বিদায়ী তাওয়াফ করেছিলেন। আর তিনিই বলেছেন:

«خُذُوا ‌عَنِّي ‌مَنَاسِكَكُمْ».

“তোমরা আমার কাছ থেকে হজের আহকাম গ্রহণ কর।”46 আর উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণনা সুস্পষ্ট যে, বাইতুল্লাহর তাওয়াফই হলো হজ্জের শেষ কাজ।

অতএব, যে ব্যক্তি বিদায়ী তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর কঙ্কর নিক্ষেপ করে, তার বিদায়ী তাওয়াফ আদায় হবে না। কারণ, তা সঠিক সময়ে সম্পন্ন হয়নি। তার উপর কর্তব্য হলো: কঙ্কর নিক্ষেপের পর পুনরায় বিদায়ী তাওয়াফ করা। যদি পুনরায় তাওয়াফ না করে, তবে তার হুকুম বিদায়ী তাওয়াফ বর্জনকারীর মতোই হবে।

২. বিদায়ী তাওয়াফের পর মক্কায় অবস্থান করা, ফলে তাদের শেষ কাজ বাইতুল্লাহর সাথে সম্পন্ন হয় না। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ ও আমলের বিপরীত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে, হাজীর শেষ সাক্ষাত যেন বাইতুল্লাহর সাথেই হয়। তিনি নিজে শুধুমাত্র প্রস্থানের সময়ই বিদায়ী তাওয়াফ করেছিলেন এবং তার সাহাবীগণও অনুরূপ করেছিলেন।

তবে আলেমগণ প্রয়োজন দেখা দিলে বিদায়ী তাওয়াফের পর মক্কায় অবস্থানের ব্যাপারে রুখসাত দিয়েছেন, যেমন: বিদায়ী তাওয়াফের পর সালাতের সময় হলে তা পড়া, কিংবা জানাযা উপস্থিত হলে তাতে অংশগ্রহণ করা, অথবা সফর সংক্রান্ত কোনো প্রয়োজন যেমন জিনিসপত্র কেনা বা সফরসঙ্গীর অপেক্ষা করা ইত্যাদি। তবে যে ব্যক্তি অনুমোদিত কারণ ছাড়া বিদায়ী তাওয়াফের পর মক্কায় অবস্থান করে, তার উপর পুনরায় বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব।

৩. কেউ কেউ বিদায়ী তাওয়াফ শেষে মসজিদ থেকে পিছনের দিকে হেটে বের হয়। তারা এভাবে বের হওয়াকে কাবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন মনে করে থাকে। এটি সুন্নাতের পরিপন্থী এবং একটি বিদআত, যা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন:

«‌كُلُّ ‌بِدْعَةٍ ‌ضَلَالَةٌ».

“প্রত্যেক বিদ‘আত গোমরাহী।”47 বিদআত হলো: এমন যে কোনো বিশ্বাস বা ইবাদত যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীনের পদ্ধতির বিপরীতে নতুনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। যে ব্যক্তি কাবাকে সম্মান করার দাবিতে পিছনের দিকে হেঁটে বের হয়, সে কি মনে করে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেয়ে কাবাকে বেশি সম্মান করছে?! নাকি মনে করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার খোলাফায়ে রাশেদীন এ ধরনের সম্মান প্রদর্শনের পদ্ধতি জানতেন না?!

৪. কেউ কেউ আবার বিদায়ী তাওয়াফ শেষে মসজিদের দরজায় কাবার দিকে ফিরে দাঁড়ায় এবং সেখানে কাবাকে বিদায় জানানোর মত করে দোয়া করে। এটি বিদআত, কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা খুলাফায়ে রাশেদীন থেকে এ আমল প্রমাণিত নয়। আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে শরীয়ত অনুমোদিত নয় এমন নতুন পদ্ধতি সৃষ্টি করা বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«‌مَنْ ‌أَحْدَثَ ‌فِي ‌أَمْرِنَا مَا لَيْسَ مِنْهُ، فَهُوَ رَدٌّ».

“যে ব্যক্তি আমাদের এ দীনে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।”48 অর্থাৎ, এটি তার উপর প্রত্যাখ্যাত হবে।

অতএব, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য হলো, তার ইবাদতসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাতের অনুসরণ করা, যাতে আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমা লাভ করতে পারেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

﴿قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ اللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَاللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ31﴾

“বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্‌ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১] আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ যেমন তার পালনকৃত আমলগুলোর ক্ষেত্রে হবে, তেমনি তার বর্জনকৃত বিষয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন তার যুগে কোনো কাজ করার কারণ থাকা সত্ত্বেও তিনি তা করেননি, তখন তা প্রমাণ করে যে এ কাজটি শরীয়ত ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে পরিত্যাজ্য। তাই আল্লাহর দীনে নতুন কিছু সৃষ্টি করা জায়েয নয়, এমনকি যদি তা মানুষের পছন্দ ও প্রবৃত্তির অনুকূলেও হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿وَلَوِ اتَّبَعَ الۡحَقُّ أَهۡوَآءَهُمۡ لَفَسَدَتِ السَّمَٰوَٰتُ وَالۡأَرۡضُ وَمَن فِيهِنَّۚ بَلۡ أَتَيۡنَٰهُم بِذِكۡرِهِمۡ...﴾

“আর সত্য যদি তাদের কামনা-বাসনার অনুগামী হতো, তবে আসমানসমূহ, জমিন ও এতদুভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছু ধ্বংস হয়ে যেতো। বরং আমি তাদেরকে দিয়েছি তাদের উপদেশবাণী।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ৭১] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ ‌تَبَعًا ‌لِمَا جِئْتُ بِهِ».

“তোমাদের কেউ ঈমানাদর হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনীত আদর্শের অধীন হয়।”49

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর সরল পথে পরিচালিত করেন, আমাদের হৃদয়কে সত্য থেকে বিচ্যুত না করেন, এবং তাঁর পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করেন। নিশ্চয় তিনি মহান দাতা। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার এবং সকল সাহাবীর উপর।

সমাপ্ত: ১৯ শে শাবান, ১৩৯৮ হিজরি

রচনায়: আল্লাহর দয়ার মুখাপেক্ষী

মুহাম্মাদ সালিহ আল-উসাইমীন

আল্লাহ তা'আলা তাকে, তার পিতামাতা এবং মুসলিমদেরকে ক্ষমা করুন।

 

 

***

সূচিপত্র

 

ইহরাম এবং তাতে সংঘটিত ভুলসমূহ: 6

তাওয়াফ ও তাতে আমল সংক্রান্ত ভুলসমূহ: 12

কিছু হাজীর দ্বারা যেসব ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে: 14

তাওয়াফ ও তাতে সংঘটিত দোয়া সংক্রান্ত ভুলসমূহ: 18

তাওয়াফের পরবর্তী দুই রাকাত সালাত ও তাতে সংঘটিত ভুলসমূহ: 22

সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ, সেগুলোর উপর দোয়া করা, দুই চিহ্নের মাঝে দৌড় দেয়া এবং এতে সংঘটিত ভুল: 24

আরাফায় অবস্থান ও তাতে সংঘটিত ভুল: 27

কিন্তু এখানে হাজীরা যেসব ভুল করে থাকে: 28

জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ ও এতে সংঘটিত ভুলসমূহ: 30

হজ্জ পালনকারীদের দ্বারা সংঘটিত কিছু সাধারণ ভুল: 34

বিদায়ী তাওয়াফ ও তাতে সংঘটিত ভুলসমূহ: 40

এ ক্ষেত্রে কিছু লোক যেসব ভুল করে থাকে: 44

 

***

 


সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: সিরিয়াবাসীদের ইহরাম বাঁধার স্থান, হাদীস নং (১৫২৬); মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: হজের মীকাতসমূহ, হাদীস নং (১১৮১)।

আবূ দাউদ, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: মীকাতসমূহ, হাদীস নং (১৭৩৯); নাসায়ী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: ইরাকবাসীদের মীকাত, হাদীস নং (২৬৫৭)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: মদীনাবাসীদের মীকাতের স্থান, হাদীস নং (১৫২৫); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: হজ ও উমরার মীকাত, হাদীস নং (১৩/১১৮২)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: যাতু ‘ইরাক হল ইরাকবাসীদের মীকাত, হাদীস নং (১৫৩১)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: যে শুধু দুই ইয়ামানি রুকন স্পর্শ করে, হাদীস নং (১৬০৯); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: তাওয়াফে দুই ইয়ামানি রুকন স্পর্শ করা মুস্তাহাব, হাদীস নং (১২৬৭); ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: তাওয়াফকালে হাজারে আসওয়াদের নিকট পৌঁছলে ইশারা করা, হাদীস নং (১৬১২); ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: উটের পিঠে চড়ে তাওয়াফ করার বৈধতা, হাদীস নং (১২৭৫); আবু তুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

১০] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: হজ্জ ও উমরায় রমল (দ্রুত হাঁটা) করা', হাদীস নং (১৬০৬); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: তাওয়াফে ইয়ামানি দুই রুকন স্পর্শ করা মুস্তাহাব, হাদীস নং (১২৬৮/২৪৬); ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা, হাদীস নং (১৬১১); ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: মক্কায় আগমনের সময় হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা', হাদীস নং (১৬০৩); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: তাওয়াফে রমল (দ্রুত হাঁটা) করা মুস্তাহাব, হাদীস নং (১২৬১); ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত।আরো বর্ণিত হয়েছে: সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হজ্জ, হাদীস নং (১২১৮); জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে।

ইমাম বায়হাকী তার আস-সুনান আল-কুবরা গ্রন্থে (৫/৯০), ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে যায়, হাদীস নং (১৬৯১, ১৬৯২); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: তামাত্তু’ হজ আদায়কারীর উপর কুরবানী ওয়াজিব, হাদীস নং (১২২৭, ১২২৮); ইবনে উমার ও আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত।আরো বর্ণিত হয়েছে: সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হজ্জ, হাদীস নং (১২১৮); জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: হাজরে আসওয়াদ সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে, হাদীস নং (১৫৯৭); মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা মুস্তাহাব, হাদীস নং (১২৭০)।

১৬] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সাওম, পরিচ্ছেদ: রমজানের এক বা দুই দিন আগে সাওম রাখা নিষিদ্ধ, হাদীস নং (১৯১৪); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সিয়াম, পরিচ্ছেদ: রমযানের এক বা দুই দিন পূর্বে সাওম রাখা যাবে না, হাদীস নং (১৯১৪)। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

নাসায়ী, অধ্যায়: হজের বিধান, পরিচ্ছেদ: কঙ্কর সংগ্রহ, হাদীস নং (৩০৫৯); ইবনে মাজাহ, অধ্যায়: হজের বিধান, পরিচ্ছেদ: কঙ্কর নিক্ষেপের পরিমাণ, হাদীস নং (৩০২৯)। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

তিরমিযী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা, হাদীস নং (৮৫৮); মুসনাদ আহমদ (১/৩৩২)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: রুকনের নিকটে তাকবীর পাঠ, হাদীস নং (১৬১৩) ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস।

আবূ দাঊদ, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: তাওয়াফের সময় দু‘আ পাঠ, হাদীস নং (১৮৯২); মুসনাদ আহমদ (৩/৪১১), আব্দুল্লাহ ইবনু সায়িব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।

আবূ দাঊদ, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: রমল করা, হাদীস নং (১৮৮৮); তিরমিযী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: কীভাবে কঙ্কর নিক্ষেপ করবে? হাদীস নং (৯০২); আহমদ (৬/৬৪) আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত হাদীস।

মাজমুউল ফাতাওয়া (২৬/১২২)।

ইমাম মালিক বর্ণনা করেছেন, অধ্যায়: সালাতের ওয়াক্ত, পরিচ্ছেদ: সালাতের ভিতরে কাজ, হাদীস নং (২১৩) ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়ার বর্ণনা, তাহকীক: বাশশার আওয়াদ।

আত-তামহীদ (২৩/৩১৯)।

সহীহ ‍মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজের বিবরণ, হাদীস নং (১২১৮) মুরসাল।

সহীহ ‍মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজের বিবরণ, হাদীস নং (১২১৮) জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।

সহীহ ‍মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হজের বিবরণ, হাদীস নং (১২১৮), জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।

ইবনু আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ, (৫/১৬৪), হাদীস নং (১৩০৯৭), আল-রুশদ প্রকাশনী।

সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হজের বিবরণ এবং আরাফার সব জায়গাই অবস্থানের জায়গা, হাদীস নং (১২১৮); জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।

আবূ দাঊদ, অধ্যায়: হজের কার্যাদি, পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি আরাফায় অবস্থান পেল না, হাদীস নং (১৯৪৯); তিরমিযী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি মুযদালিফায় ইমামকে পাবে সে হজ পেল বলে গন্য হবে, হাদীস নং (৮৮৯); নাসায়ী, অধ্যায়: জের কার্যাদি, পরিচ্ছেদ: আরাফার ময়দান অবস্থান ফরয হওয়া প্রসঙ্গে, হাদীস নং (৩০১৯); ইবন মাজাহ, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি মুযদালিফার রাতে ফজরের পূর্বে আরাফাতে আসে, হাদীস নং (৩০১৫); মুসনাদ আহমদ (৪/৩০৯); আব্দুর রহমান ইবন ইয়া‘মার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: যদি কেউ দুটি জামরা (ছোট ও মধ্যম) লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করে, হাদীস নং (১৭৫১); মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হজ্, হাদীস নং (১২১৮)। জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

সুনান নাসাঈ, অধ্যায়: হজের বিধান, পরিচ্ছেদ: কঙ্কর কোথা থেকে সংগ্রহ করবে?, হাদীস নং (৩০৬০)। মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ শুরু করা পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ অব্যাহত রাখা সুন্নাত, হাদীস নং (১২৮২)।

মুসনাদ আহমদ (১/৩৪৭); নাসায়ী, অধ্যায়: মানাসিক, পরিচ্ছেদ: কঙ্কর সংগ্রহ করা, হাদীস নং (৩০৫৯); ইবন মাজাহ, অধ্যায়: মানাসিক, পরিচ্ছেদ: জামরায় নিক্ষেপের কঙ্করের আকার, হাদীস নং (৩০২৯)।

মুসনাদে আহমদ (৩/৫০৩); আবূ দাঊদ, অধ্যায়: মানাসিক, পরিচ্ছেদ: জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা, হাদীস নং (১৯৬৬)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: যখন দু জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করবে, তখন কিবলামুখী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াবে, হাদীস নং (১৭৫১)।

আবূ দাঊদ, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: রমল করা, হাদীস নং (১৮৮৮); তিরমিযী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: কীভাবে কঙ্কর নিক্ষেপ করবে? হাদীস নং (৯০২); আহমদ (৬/৬৪)।

তিরমিযী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: জামরায় কঙ্কর মারার সময় লোকদের সরিয়ে দেয়া মাকরুহ, হাদীস নং (৯০৩); নাসায়ী, অধ্যায়: মানাসিক, পরিচ্ছেদ: জামারার দিকে সওয়ার হয়ে গমন করা, হাদীস নং (৩০৬৩); ইবন মাজাহ, অধ্যায়: মানাসিক, পরিচ্ছেদ: আরোহী হয়ে জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা, হাদীস নং (৩০৩৫); আহমদ (৩/৪১৩)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: বিদায়ী তাওয়াফ, হাদীস নং (১৭৫৫); মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব হওয়া প্রসঙ্গে, হাদীস নং (৩৮০/১৩২৮)।

মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব হওয়া প্রসঙ্গে, হাদীস নং (১৩২৭)।

আবূ দাঊদ, অধ্যায়: মানাসিক, পরিচ্ছেদ: বিদায়ী তাওয়াফ, হাদীস নং (২০০২)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: অসুস্থ ব্যক্তির সওয়ারীতে চড়ে তাওয়াফ করা, হাদীস নং (১৬৩৩); মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: 'উট বা অন্য বাহনে চড়ে তাওয়াফ করার বৈধতা, হাদীস নং (১২৭৬)।

নাসায়ী, অধ্যায়: মানাসিক, পরিচ্ছেদ: নারীদের সাথে পুরুষের তাওয়াফ, হাদীস নং (২৯২৯)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: বিদায়ী তাওয়াফ, হাদীস নং (১৭৫৬)।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: মাগাযী, পরিচ্ছেদ: বিদায় হজ, হাদীস নং (৪৪০১); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব হওয়া প্রসঙ্গে, হাদীস নং (১২১১/৩৮২)।

মুয়াত্তা মালিক, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: বায়তুল্লাহর বিদায়ী তাওয়াফ, হাদীস নং (১০৭৯) ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া এর বর্ণনা, তাহকীক: বাশশার আওয়াদ।

মুয়াত্তা মালিক, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: বায়তুল্লাহর বিদায়ী তাওয়াফ, হাদীস নং (১০৮১) ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া এর বর্ণনা, তাহকীক: বাশশার আওয়াদ।

সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: ঈদের দিন সওয়ার অবস্থায় জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপের সুন্নাত, হাদীস নং (১২৯৭)। জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: জুমুআহ, পরিচ্ছেদ: সালাত ও খুতবা সংক্ষিপ্তকরণ, হাদীস নং (৮৬৭) জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।

সহীহ বুখারী, অধ্যায়: সন্ধি-সমঝোতা, পরিচ্ছেদ: যখন মানুষ অন্যায় সন্ধি করে, হাদীস নং (২৬৯৭); মুসলিম, অধ্যায়: বিচার-ফয়সালা , পরিচ্ছেদ: অন্যায্য রায় বাতিল করা, হাদীস নং (১৭১৮)। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে হাদীসটি বর্ণিত।

ইবনে আবি আসিম এর আস-সুন্নাহ (পৃষ্ঠা ১২), হাদীস নং (১৫); খতীব আল-বাগদাদীর তারীখে বাগদাদ (৬/২১); এবং আল-বাগাভীর শারহুস সুন্নাহ (১/২১২), হাদীস নং (১০৪)। আরও দেখুন: ইবনে রজব রহ. এর জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম-এ বর্ণিত আরবাঈন নববিয়্যা-এর ৪১ নং হাদীসের ব্যাখ্যা।

সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: বিচার-ফয়সালা, পরিচ্ছেদ: ভ্রান্ত রায় বাতিলকরণ, হাদীস নং (১৮/১৭১৮); সম অর্থে হাদীসটি ইমাম বুখারী তার সহীহ বুখারীতে বর্ণনা করেছেন, অধ্যায়: সন্ধি, পরিচ্ছেদ: অন্যায়ের উপর লোকেরা সন্ধিবদ্ধ হলে তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য, হাদীস নং (২৬৯৭), আয়েশা রদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত হাদীস।