تَلْخِيصُ كِتَابِ أَحْكَامِ الأُضْحِيَةِ وَالذَّكَاةِ
কুরবানী ও যবেহ সম্পর্কিত বিধানসম্বলিত কিতাবের সারসংক্ষেপ
لِفَضِيلَةِ الشَّيْخِ العَلَّامَةِ
مُحَمَّدِ بْنِ صَالِحٍ العُثَيْمِينِ
غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَلِوَالِدَيْهِ وَلِلمُسْلِمِينَ
সম্মানিত শাইখ আল্লামা মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন
আল্লাহ তা'আলা তাকে, তার পিতা-মাতা এবং মুসলিমদেরকে ক্ষমা করুন
بِسْمِ اللهِ الرَّحمَنِ الرَّحِيمِ
কুরবানী ও যবেহ সম্পর্কিত বিধানসম্বলিত কিতাবের সারসংক্ষেপ
সম্মানিত শাইখ আল্লামা মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন
আল্লাহ তা'আলা তাকে, তার পিতা-মাতা এবং মুসলিমদেরকে ক্ষমা করুন।
পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি
ভূমিকা
নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই, তাঁর কাছেই ইস্তেগফার করি এবং তাঁর কাছেই আমরা তাওবা করি। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের নফসের অনিষ্টতা এবং আমাদের কর্মের অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ তা‘আলা যাকে হিদায়াত দান করেন, তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই, আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথ প্রদর্শনকারীও কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তার ওপর, তার পরিবার ও সকল সাহাবীর ওপর এবং যারা তাদের ইহসানের সঙ্গে অনুসরণ করবে তাদের সবার ওপর অসংখ্য সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন। অতঃপর:
পরকথা, আমি পূর্বে একটি বই লিখেছিলাম কুরবানী ও যবাহের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত, যা ৯৩ পৃষ্ঠায় সম্পন্ন হয়েছিল। এতে কিছু মতভেদ ও লম্বা আলোচনা ছিল যা পাঠকের কাছে দীর্ঘ মনে হতে পারে। তাই আমি মনে করলাম সেই বইটির একটি সংক্ষিপ্তসার লিখব, যেখানে অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো বাদ দেব এবং প্রয়োজন আছে এমন অংশগুলো যোগ করব।1
আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এ কাজকে শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠভাবে গ্রহণ করেন, এটিকে তাঁর শরী‘আতের সুস্পষ্ট বর্ণনা হিসেবে কবুল করেন এবং এটিকে আমাদের ও সমগ্র মুসলিমদের জন উপকারী হিসেবে কবুল করেন। নিশ্চয় তিনি অতি দানশীল ও মহা সম্মানিত।
এই সারসংক্ষেপটিতে নিম্নলিখিত অধ্যায়গুলো রয়েছে:
প্রথম অধ্যায়: কুরবানীর সংজ্ঞা ও বিধান।
দ্বিতীয় অধ্যায়: কুরবানীর শর্তসমূহ সম্পর্কে।
তৃতীয় অধ্যায়: কুরবানীর পশুর মধ্যে জাতগত ও গুণাবলীর দিক থেকে কোনটি উত্তম এবং কোনটি মাকরূহ তার বর্ণনা।
চতুর্থ অধ্যায়: কুরবানী কার পক্ষ থেকে আদায়যোগ্য।
পঞ্চম অধ্যায়: কোন কোন পশুতে কুরবানী নির্ধারিত হয় এবং এর বিধানাবলী।
ষষ্ঠ অধ্যায়: কুরবানীর গোশত কীভাবে খাওয়া ও বণ্টন করা হবে।
সপ্তম অধ্যায়: যে ব্যক্তি কুরবানী দিবে তার জন্য কী কী বর্জনীয়।
অষ্টম অধ্যায়: যবেহ ও এর শর্তাবলী।
নবম অধ্যায়: যবাহের আদব।
দশম অধ্যায়: যবাহের মাকরূহ বিষয়সমূহ।
লেখক
প্রথম অধ্যায়
কুরবানীর সংজ্ঞা ও বিধান
(الأُضْحِيَّةُ) তথা কুরবানী হলো: ঈদুল আযহার দিনগুলোতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যে উট, গরু, ছাগল বা ভেড়া যবেহ করা হয়।
এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা আল্লাহর কিতাব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ এবং মুসলিম উম্মাহর ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ 2﴾
“কাজেই আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।” [সূরা আল-কাউসার: ২] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ 162 لَا شَرِيكَ لَهُۥۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرۡتُ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلۡمُسۡلِمِينَ 163﴾
“(হে রাসূল! আপনি) বলুন, ‘নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।
তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।” [সূরা আল-আনআম: ১৬২-১৬৩] নুসুক মানে কুরবানী, যেমনটি সা‘ঈদ ইবনু যুবাইর রহ. বলেছেন।2 কারো মতে: সকল ইবাদত -যার মধ্যে যবেহও অন্তর্ভুক্ত। এ অর্থ অধিকতর ব্যাপক। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۗ فَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞ فَلَهُ أَسۡلِمُواْ... ﴾
“আর আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য ‘মানসাক’ (কুরবানির নিয়ম) এর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেসবের উপর তারা আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ, কাজেই তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ কর এবং সুসংবাদ দিন বিনীতদেরকে।” [সূরা আল-হাজ্জ: ৩৪]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ، ذَبَحَهُمَا بِيَدِهِ، وَسَمَّى وَكَبَّرَ، وَوَضَعَ رِجْلَهُ عَلَى صِفَاحِهِمَا».
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি সাদা-কালো রং এর শিং ওয়ালা ভেড়া কুরবানী করেন। তিনি ভেড়া দু’টির পার্শ্বে তাঁর পা রেখে ’বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে স্বহস্তেই দু’টিকে যবেহ করেন।”3
আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«أَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي كُلَّ سَنَةٍ».
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় দশ বছর থেকেছেন এবং প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন।” আহমাদ ও তিরমিযী এটি বর্ণনা করেছেন। আর তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।4
’উকবাহ ইবনু আমির জুহানী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণের মধ্যে কতগুলো কুরবানীর পশু বণ্টন করলেন। তখন ’উকবাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর অংশ পড়ল ছয় মাসের একটি বকরীর বাচ্চা। তিনি বলেন, তখন আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমার অংশে পড়েছে একটি বকরীর বাচ্চা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
«ضَحِّ بِهَا»
“সেটাই কুরবানী করে নাও।” সহীহ বুখারী ও মুসলিম।5
বারা ইবনু ‘আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«... وَمَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصَّلَاةِ فَقَدْ تَمَّ نُسُكُهُ، وَأَصَابَ سُنَّةَ الْمُسْلِمِينَ»
“.....যে ব্যক্তি (ঈদের) সালাতের পরে যবেহ করে, তার কুরবানী পরিপূর্ণ হলো এবং সে মুসলিমদের নিয়ম অনুসরণ করল।” এটি সহীহ বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।6
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানী করেছেন, তাঁর সাহাবীরাও (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) কুরবানী করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে কুরবানী মুসলমানদের সুন্নাত অর্থাৎ তাদের রীতি। এজন্য আলেমগণের একাধিক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে মুসলিম উম্মাহ কুরবানীর বিধান সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
তবে এটি কি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ, নাকি ওয়াজিব যা ত্যাগ করা জায়েয নয়- এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেঈ, মালিক ও আহমদ (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মতে-যা অধিকাংশ আলেমের মত-এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।7
আরেক দল আলেমের মতে এটি ওয়াজিব। এটি ইমাম আবু হানিফার মত এবং ইমাম আহমদের দুটি রেওয়ায়েতের একটি।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এই মতটি গ্রহণ করেছেন এবং বলেছেন: এটি ইমাম মালিকের মাযহাবের দুটি মতের একটি, বরং মালিকী মাযহাবের প্রাধান্যপূর্ণ মত এটি।89
কুরবানীর পশু জবেহ করা তার মূল্য সদকা করার চেয়ে উত্তম। কারণ এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথের মুসলিমদের আমল। আর যেহেতু, জবেহ করা আল্লাহর নির্দেশিত নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ যদি এ কাজ ছেড়ে দিয়ে তা সদকায় রূপান্তরিত করে, তবে এই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
যদি কুরবানীর পশুর মূল্য সদকা করা জবেহ করার চেয়ে উত্তম হত, তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই তাঁর উম্মতকে কথা বা কাজ দ্বারা তা বুঝিয়ে দিতেন। কারণ তিনি উম্মতের জন্য কল্যাণের বিষয়টি কখনো গোপন করতেন না। বরং যদি সদকা কুরবানীর সমতুল্য হত, তবুও তিনি তা প্রকাশ করতেন - কেননা এটি কুরবানীর কষ্টকর প্রক্রিয়ার চেয়ে সহজতর। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনই সমতুল্য হওয়া সত্ত্বেও সহজ পদ্ধতি উম্মতকে জানানো থেকে বিরত থাকতেন না।
একবার নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি বলেন:
«مَنْ ضَحَّى مِنْكُمْ فَلَا يُصْبِحَنَّ بَعْدَ ثَالِثَةٍ فِي بَيْتِهِ شَيْءٌ». فَلَمَّا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، نَفْعَلُ كَمَا فَعَلْنَا فِي الْعَامِ الْمَاضِي؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: «كُلُوا، وَأَطْعِمُوا، وَادَّخِرُوا؛ فَإِنَّ ذَلِكَ الْعَامَ كَانَ فِي النَّاسِ جُهْدٌ، فَأَرَدْتُ أَنْ تُعِينُوا فِيهِ»
“তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুরবানী করে, তৃতীয় দিনের পর সকালেও যেন তার ঘরে কুরবানীর মাংসের কিয়দংশও অবশিষ্ট না থাকে।” রাবী (সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া) বলেন, পরবর্তী বছর আসলে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা গত বছর যা করেছি এ বছরও কি সেভাবে করবো? নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না; তোমরা খাও, অন্যদরকেও খাওয়াও এবং (যদি ইচ্ছা করো তবে) জমা করে রেখো। কারণ গত বছর তো মানুষ অভাব-অনটনের মধ্যে ছিল। আর তাই আমি চেয়েছিলাম, তোমরা তাদের সাহায্য করো।” মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি।10
ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন: “যথাসময়ে কুরবানী করা তার মূল্য সদকা করার চেয়ে উত্তম। তিনি বলেন: এ কারণেই যদি কেউ হজ্জের কুরবানী (তামাত্তু ও কিরান হজের কুরবানী) এর পরিবর্তে বহুগুণ বেশি মূল্য সদকা করে, তবুও তা কুরবানীর স্থলাভিষিক্ত হবে না। একই বিধান সাধারণ কুরবানীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।” ইবনুল কাইয়্যিম রহ.-এর বক্তব্য সমাপ্ত।11
***
অধ্যায়:
কুরবানীর ক্ষেত্রে মূল হলো, এটি জীবিত ব্যক্তিদের জন্য শরীয়তসম্মত, যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ নিজেদের ও পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকে আদায় করতেন। আর সাধারণ কিছু মানুষের ধারণা যে কুরবানী শুধু মৃতদের জন্য নির্ধারিত — এর কোনো ভিত্তি নেই।
মৃতদের পক্ষ হতে কুরবানী তিন প্রকার:
প্রথম প্রকার: জীবিতদের সাথে মৃতদের সম্পৃক্ত করে সকলের পক্ষ হতে কুরবানী করা: যেমন কেউ নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করে, এবং নিয়তে জীবিত ও মৃত উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। এর দলীল হলো: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন, যাদের মধ্যে ইতিমধ্যে যারা মারা গেছেন তারাও ছিলেন।12
দ্বিতীয় প্রকার: মৃত ব্যক্তির ওসিয়ত অনুযায়ী তার পক্ষ থেকে কুরবানী করা। এর দলীল হলো আল্লাহ তাআলার বাণী:
﴿فَمَنۢ بَدَّلَهُۥ بَعۡدَ مَا سَمِعَهُۥ فَإِنَّمَآ إِثۡمُهُۥ عَلَى ٱلَّذِينَ يُبَدِّلُونَهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٞ 181﴾
“এটা শুনার পরও যদি কেউ তাতে পরিবর্তন সাধন করে, তবে যারা পরিবর্তন করবে অপরাধ তাদেরই ৷ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮১]
তৃতীয় প্রকার: জীবিতদের থেকে আলাদা করে স্বতন্ত্রভাবে মৃতদের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় কুরবানী করা। এটি জায়েয। হাম্বলি ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন যে, এর সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছবে এবং সে এর দ্বারা উপকৃত হবে – মৃতের পক্ষ হতে সদকা করার উপর কিয়াস করে তারা এটি বলেছেন।13
তবে আমরা মনে করি না যে মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে স্বতন্ত্রভাবে কুরবানী করা সুন্নত। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো মৃত আত্মীয়ের জন্য বিশেষভাবে কুরবানী করেননি - যেমন তার চাচা হামযা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর জন্য করেননি, যিনি ছিলেন তার অত্যন্ত প্রিয় আত্মীয়; অথবা তিনি তার জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণকারী সন্তানদের পক্ষ থেকেও কুরবানী করেননি— তারা হলেন তিনজন বিবাহিত কন্যা ও তিনজন ছোট ছেলে। এমনকি তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রীদের একজন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার পক্ষ থেকেও কুরবানী দেননি। সাহাবাদের মধ্যেও কেউ তার সময়কালে কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়েছেন—এমন কিছু বর্ণিত হয়নি, আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট হোন।
আমরা কিছু লোকের এ কাজটিকেও ভুল মনে করি যে, তারা কেউ মারা গেলে প্রথম বছরে তার পক্ষ থেকে একটি কুরবানী দেয়, যাকে তারা “কবরের কুরবানী ” বলে থাকে। তারা বিশ্বাস করে, এর সওয়াবে অন্য কাউকে অংশী করা জায়েয নয়। কেউ কেউ আবার মৃতদের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় কুরবানী দেয় বা মৃতের ওসিয়তের ভিত্তিতে কুরবানী দেয়, কিন্তু নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয় না। অথচ যদি তারা জানত যে, কেউ নিজের অর্থে নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করলে এতে তার জীবিত ও মৃত উভয় আত্মীয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তারা এমনটা করত না।
***
দ্বিতীয় অধ্যায়
কুরবানীর শর্তাবলী
কুরবানীর জন্য ছয়টি শর্ত রয়েছে:
প্রথম শর্ত: কুরবানীর পশু অবশ্যই গবাদিপশু হতে হবে - যেমন উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া। কারণ আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَلِكُلِّ أُمَّةٖ جَعَلۡنَا مَنسَكٗا لِّيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِ...﴾
“আর আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য ‘মানসাক’ (কুরবানির নিয়ম) এর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেসবের উপর তারা আল্লাহ্র নাম উচ্চারণ করে।” [আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৪] আর “بهيمة الأنعام” (গবাদিপশু) বলতে বোঝানো হয়: উট, গরু ও ছাগল। এটিই আরবদের কাছে পরিচিত অর্থ। ইমাম হাসান বসরী, কাতাদা ও অন্যান্য আলেমগণ এ মত ব্যক্ত করেছেন।14
দ্বিতীয় শর্ত: পশু শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত বয়সে উপনীত হতে হবে। অর্থাৎ ভেড়ার ক্ষেত্রে "জাযাআ" তথা ছয় মাস বয়স এবং অন্যান্য পশুর ক্ষেত্রে "সানিয়্যাহ" তথা এক বছরের হতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً، إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ».
“তোমরা কমপক্ষে এক বছরের পশু (বকরী) কুরবানী করবে। তবে এটা তোমাদের জন্য দুস্কর হলে তোমরা ছ’মাসের মেষ-শাবক কুরবানী করতে পার।” সহীহ মুসলিম।15
"আল-মুসিন্নাহ" হলো এক বছর বা তার চেয়ে বড় বয়সের পশু।
আর "জাযআ" হলো তার চেয়ে ছোট বয়সের পশু।
উটের সানিয়্যাহ হলো: যার বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে,
গরুর সানিয়্যাহ হলো: যার বয়স দুই বছর পূর্ণ হয়েছে, আর
ছাগলের সানিয়্যাহ হলো: যার বয়স এক বছর পূর্ণ হয়েছে।
জাযআ: যার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। উট, গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে সানিয়্যাহর কম বয়সের পশু দিয়ে কুরবানী শুদ্ধ হবে না। আর ভেড়ার ক্ষেত্রে জাযআর কম বয়সের পশু দিয়ে কুরবানী শুদ্ধ হবে না।
তৃতীয় শর্ত: কুরবানীর পশু এমন সব ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে যা কুরবানী সহীহ হওয়ার অন্তরায়। এ ধরনের ত্রুটি চার প্রকার:
১. স্পষ্ট অন্ধত্ব: যে চোখ গভীরভাবে ঢুকে গেছে বা বেরিয়ে এসেছে বোতামের মতো, অথবা এমন সাদা হয়ে গেছে যা স্পষ্ট অন্ধত্ব প্রমাণ করে।
২. স্পষ্ট রোগ: যে রোগের লক্ষণ পশুতে স্পষ্ট, যেমন এমন জ্বর যা তাকে চারণে অক্ষম করে তোলে এবং ক্ষুধা নষ্ট করে দেয়, বা এমন স্পষ্ট চর্মরোগ যা তার মাংস নষ্ট করে বা স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, অথবা এমন গভীর ক্ষত যা পশুর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে—ইত্যাদি।
৩- স্পষ্ট পঙ্গুত্ব: যে খোঁড়ানোর ফলে পশু অন্যান্য সুস্থ পশুর মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না।
৪- এমন দুর্বলতা বা ক্ষীণতা যা পশুর অস্থিমজ্জা পর্যন্ত নিঃশেষ করে দেয়।
কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কী ধরনের পশু কুরবানী করা উচিত নয়। তখন তিনি আঙ্গুলি দ্বারা গুণে গুণে বলেন:
«أربعاً: الْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا، وَالْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَجْفَاءُ الَّتِي لَا تُنْقِي».
“চার ধরনের পশু হতে বিরত থাকা উচিত। ১। এমন খোড়া যা হাটতে অক্ষম। ২। এমন কানা যা সকলে কাছে স্পষ্ট। ৩। স্পষ্ট রোগা। ৪। এমন কৃশ যার হাড্ডির মজ্জা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে।” বর্ণনায় মালিক, মুয়াত্তা, বারা ইবনু ‘আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।16
সুনানসমূহে বর্ণিত আছে, বারা ইবনু ’আযিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি বললেন:
«أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِي...».
“চার ধরণের দোষযুক্ত পশু কুরবানী করা জায়িয নয়.....।” তিনি অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।17
সুতরাং এই চারটি ত্রুটি এমন ত্রুটি যার ফলে কুরবানী সহীহ হবে না এবং এগুলোর মতো বা এর চেয়েও গুরুতর ত্রুটিও একই হুকুমে পড়ে। সুতরাং নিম্নোক্ত অবস্থায় কুরবানী সহীহ হবে না:
১- এমন অন্ধ পশু, যে তার দুই চোখেই দেখতে পায় না।
২- অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে যার পেট ফুলে গেছে, এমন পশু—যতক্ষণ না সে মলত্যাগ করে এবং তার বিপদ কেটে যায়।
৩- প্রসব বেদনায় কাতর পশু - যে পশুর প্রসব প্রক্রিয়া জটিল আকার ধারণ করেছে, যতক্ষণ না সে ঝুঁকিমুক্ত হয়।
৪- মৃত্যুর মুখোমুখি পশু- যে পশু শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় আছে বা উঁচু স্থান থেকে পড়ে গেছে অথবা অনুরূপ কোনো কারণে মৃত্যুর সম্মুখীন, যতক্ষণ না তা থেকে ঝুঁকি দূর হয়।
৫- স্থায়ীভাবে পঙ্গু পশু: যে পশু কোনো শারীরিক ত্রুটির কারণে হাঁটাচলা করতে অক্ষম।
৬- যে পশুর একটি হাত বা একটি পা কাটা।
এই ত্রুটিগুলোকে পূর্বে উল্লিখিত চারটি ত্রুটির সাথে যুক্ত করলে কুরবানীর অযোগ্য পশুর সংখ্যা দাঁড়ায় দশটি: এই ছয়টি এবং পূর্বে বর্ণিত চারটি ত্রুটিযুক্ত পশু।
চতুর্থ শর্ত: কুরবানীর পশু অবশ্যই কুরবানীদাতার নিজস্ব মালিকানাধীন হতে হবে, অথবা শরীয়ত বা মালিকের পক্ষ থেকে তার জন্য অনুমোদিত হতে হবে। অতএব, যে পশু তার মালিকানাধীন নয়- যেমন জবরদখলকৃত, চুরিকৃত বা মিথ্যা দাবি করে অধিগ্রহণকৃত পশু- তা দিয়ে কুরবানী জায়েয হবে না। কারণ আল্লাহর নাফরমানির মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য অর্জন সহীহ হবে না।
এতিমের অর্থ থেকে অভিভাবক এতিমের পক্ষে কুরবানী করতে পারবেন - যদি এটি স্থানীয় প্রচলিত রীতি হয় এবং কুরবানী না করলে এতিমের মন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনুরূপভাবে,
উকিল বা প্রতিনিধি যদি মালিকের অনুমতিক্রমে তার সম্পদ থেকে কুরবানী দেয়, তবে তা সহীহ হবে।
পঞ্চম শর্ত: কুরবানীর পশুর সঙ্গে অন্য কারো অধিকার সংযুক্ত না থাকা। সুতরাং বন্ধক রাখা পশু দ্বারা কুরবানী সহীহ নয়।।18
ষষ্ঠ শর্ত: কুরবানী শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে করতে হবে। এর সময় হল ঈদের দিন ঈদের নামাযের পর থেকে শুরু করে তাশরীকের শেষ দিন যিলহজ্জের ১৩ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। অর্থাৎ কুরবানীর মোট সময় চার দিন: ঈদের দিন নামাযের পর হতে পরবর্তী তিন দিন।
অতএব, যে ব্যক্তি ঈদের নামায শেষ হওয়ার আগে অথবা ১৩ তারিখ সূর্যাস্তের পরে কুরবানী করবে, তার কুরবানী শুদ্ধ হবে না। কারণ, সহীহ বুখারীতে বারা ইবনে আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلَاةِ؛ فَإِنَّمَا هُوَ لَحْمٌ قَدَّمَهُ لِأَهْلِهِ، وَلَيْسَ مِنَ النُّسُكِ فِي شَيْءٍ».
“যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বে কুরবানী করল, তা শুধু গোশত বলেই গণ্য হবে, যা সে পরিবারবর্গের জন্য পেশ করেছে। এতে কুরবানীর কিছুই নেই।”19
জুনদুব ইবনু সুফিয়ান বাজালী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি কুরবানীর দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন:
«مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ؛ فَلْيُعِدْ مَكَانَهَا أُخْرَى».
“যে ব্যক্তি (কুরবানীর ঈদের) সালাত আদায়ের পুর্বে যবাহ করেছে সে যেন এর স্থলে আবার যবাহ করে।”20
নুবাইশাহ আল-হুজালী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«أَيَّامُ التَّشْرِيقِ أَيَّامُ أَكْلِ وَشُرْبٍ وَذِكْرٍ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ».
“তাশরীকের দিনগুলো হচ্ছে পানাহার ও মহান আল্লাহর যিকির করার দিন।” বর্ণনায় মুসলিম।21
কিন্তু যদি কুরবানীর দিনগুলো পেরিয়ে যাওয়ার কোনো বৈধ ওযর থাকে, যেমন: কুরবানীর পশু তার কোনো অবহেলা ছাড়াই পালিয়ে যায় এবং সময় শেষ হওয়ার পর পাওয়া যায়
অথবা কাউকে কুরবানীর দায়িত্ব দেওয়া হয় আর সে ভুলে সময় পার করে দেয়- তবে ওযরের কারণে সময় শেষ হওয়ার পরও কুরবানী করা জায়েয হবে। এটা সেই ব্যক্তির কিয়াসে (অনুরূপ হুকুমে) পড়ে, যে সালাতের সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে বা ভুলে যায়, পরে জাগ্রত হওয়া বা স্মরণ হওয়ার পর তা আদায় করে নেয়।
কুরবানী নির্ধারিত সময়ে দিন ও রাত—উভয় সময়েই জবাই করা বৈধ। তবে দিনের বেলা জবাই করা উত্তম, আর ঈদের দিন খুতবার পর কুরবানী করাই সর্বোত্তম। প্রতিটি দিনই তার পরবর্তী দিনের চেয়ে উত্তম—কারণ এতে সাওয়াবের কাজে তাড়াতাড়ি করার ফযীলত রয়েছে।
***
তৃতীয় অধ্যায়:
কোন প্রজাতি ও গুণাবলীর পশু কুরবানী করার জন্য উত্তম এবং কোনগুলো কুরবানী করা মাকরূহ
কুরবানীর পশুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রজাতি হলো: উট, তারপর গরু- যদি সেগুলো পূর্ণ কুরবানী করা হয়। তারপর ভেড়া, তারপর ছাগল, তারপর উটের সাত ভাগের এক ভাগ, তারপর গরুর সাত ভাগের এক ভাগ।
আর গুণগত দিক থেকে উত্তম হলো: সবচেয়ে মোটাতাজা, অধিক মাংসবিশিষ্ট, সুন্দর গঠনবিশিষ্ট ও দেখতে অধিক সুন্দর পশু।
সহীহ বুখারীতে আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
"كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ أَقْرَنَيْنِ أَمْلَحَيْنِ".
“দু’শিং বিশিষ্ট সাদা-কালো চিত্রা রং এর দুটি দুম্বা কুরবানী করেন।”22 "আল-কাবশ" (দুম্বা): ভেড়ার প্রজাতির মধ্যে বড় আকারের পশু। "আল-আমলাহ" (সাদা-কালো মিশ্রিত পশু): যে পশুর সাদা রঙের সাথে কালো রঙ মিশ্রিত, অর্থাৎ সাদা প্রাধান্য বিশিষ্ট কালো ছোপযুক্ত পশু।
আর আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«ضَحَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، بِكَبْشٍ أَقْرَنَ فَحِيلٍ، يَأْكُلُ فِي سَوَادٍ، وَيَنْظُرُ فِي سَوَادٍ، وَيَمْشِي فِي سَوَادٍ».
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন শিংবিশিষ্ট মোটাতাজা দুম্বা কুরবানী করেছেন যা কালোর মাঝে আহার করতো, কালোর মাঝে দেখতো ও কালোর মাঝেই হাঁটতো (অর্থাৎ যার মুখমন্ডল, চোখ ও পা কালো বর্ণের ছিলো)।” চারটি সুনান গ্রন্থকার হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।23 হাদীসে উল্লেখিত "الفحيل": প্রজননের জন্য উপযুক্ত পুরুষ পশু। "কালোতে আহার করতো" বাক্যের অর্থ: পশুটির মুখমণ্ডল, চোখের চারপাশ এবং হাত-পায়ের লোম কালো বর্ণের ছিল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুক্তদাস আবু রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
"كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا ضَحَّى اشْتَرَى كَبْشَيْنِ سَمِينَيْنِ".
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর ইচ্ছা করলে দু’টি মোটাতাজা মেষ ক্রয় করতেন।” অন্য শব্দে রয়েছে:
"مَوْجُوأَيْنِ".
দুটি অন্ডকোষ কাটা (খাসী)। মুসনাদ আহমাদ24 "মোটাতাজা”: যে পশু অধিক চর্বি ও গোশতবিশিষ্ট। হাদীসটিতে উল্লেখিত "المَوْجُوء" সাধারণত খাসি করা পশুকে বোঝায়। গোশতের স্বাদ ও গুণগত মানের দিক থেকে এটি প্রায়শই অখাসি পশুর চেয়ে উত্তম হয়। তবে অখাসি পশু দৈহিক গঠন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পূর্ণতার দিক থেকে বেশি পূর্ণ হয়।
এটিই হলো, প্রজাতি ও গুণাবলীর দিক থেকে উত্তম কুরবানীর পশু।
আর কুরবানীর পশুগুলোর মধ্যে মাকরূহ হলো:
১. "আল-আদবা" (আংশিক কর্তিত কান বা শিংবিশিষ্ট পশু): যে পশুর কান বা শিংয়ের অর্ধেক বা তার বেশি অংশ কাটা পড়েছে।
২. "আল-মুকাবালা" (সামনে থেকে আড়াআড়ি কাটা কানবিশিষ্ট পশু): যে পশুর কান সামনের দিক থেকে আড়াআড়িভাবে কাটা।
৩. "আল-মুদাবারা" (পেছন থেকে আড়াআড়ি কাটা কানবিশিষ্ট পশু): যে পশুর কান পেছনের দিক থেকে আড়াআড়িভাবে কাটা।
৪. "আশ-শারকা" (লম্বালম্বি কাটা কানবিশিষ্ট পশু): যে পশুর কান লম্বালম্বিভাবে কাটা।
৫. "আল-খারকা" (ছিদ্রযুক্ত কানবিশিষ্ট পশু): যে পশুর কানে ছিদ্র করা হয়েছে।
৬. "আল-মুসফাররা" (কানের ভেতরের ছিদ্র দেখা যাচ্ছে এমন পশু): যে পশুর কান এতটাই কাটা যে কানের ভেতরের ছিদ্র (শ্রবণতন্ত্র) দেখা যাচ্ছে।
আরেক মতানুযায়ী: (আল-মুসফাররা হলো) অতিরিক্ত রুগ্ন পশু, তবে তা মস্তিষ্ক হারানোর স্তরে পৌঁছেনি।
৭. "আল-মুসতা’সালা" (শিং পড়ে যাওয়া পশু: যে পশুর সম্পূর্ণ শিং পড়ে গেছে।
৮. "আল-বাখকা" (অন্ধ কিন্তু চোখের গোলক অক্ষত পশু): এটি সেই পশু, যার চোখ ফেটে গেছে বা গুরুতরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে—ফলে সে চোখে দেখতে পারে না, কিন্তু চোখের গোলক তার স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে।
৯. "আল-মুশাইয়্যা" (দুর্বলতাজনিতভাবে পিছিয়ে পড়া পশু): এখানে ياء অক্ষরটি যবর দিয়ে পড়লে এর অর্থ হলো, যে পশু দুর্বলতার কারণে পালের সাথে নিজে থেকে চলতে পারে না, অন্যরা তাড়া দিলে তবে চলতে পারে। ياء অক্ষরটিকে যের দিয়েও পড়া যায়। তখন এর অর্থ হবে, এমন পশু যা দুর্বলতার কারণে পালের পিছনে পড়ে থাকে, যেন অন্য পশুদের অনুসরণ করছে।
এগুলোই হলো কুরবানীর জন্য মাকরুহ পশুসমূহ, যেগুলো সম্পর্কে হাদীসে নিষেধ এসেছে— যেন এসব দোষযুক্ত পশু দ্বারা কুরবানী না করা হয়, অথবা এগুলো পরিহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞাকে মাকরুহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে — যাতে এসব হাদীসকে আগে বর্ণিত কুরবানীর তৃতীয় শর্তে উল্লিখিত সাহাবী বারা ইবন আযিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর হাদীসের সাথে সমন্বয় করা যায়।
কুরবানীর এই মাকরূহ পশুগুলোর সাথে অনুরূপ অন্যান্য পশুও যুক্ত হবে। অতএব, নিম্নলিখিত ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কুরবানী করাও মাকরূহ:
১. "আল-বাতরা" (উট, গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে): যে পশুর লেজের অর্ধেক বা তার বেশি অংশ কাটা পড়েছে।
২- যার নিতম্বের কিছু অংশ কাটা হয়েছে, যদি অর্ধেকের কম কাটা হয়, তাহলে মাকরুহ; আর যদি অর্ধেক বা তার বেশি কাটা হয়, তাহলে অধিকাংশ আলেমের মতে, কুরবানী সহীহ হবে না। তবে যার নিতম্ব জন্মগতভাবেই নেই, তা দ্বারা কুরবানী করতে কোনো অসুবিধা নেই।
৩. যে পশুর পুরুষাঙ্গ কাটা পড়েছে।
৪- যে পশুর কিছু দাঁত পড়ে গেছে — এমনকি যদি তা সামনের দাঁত বা তার পাশে থাকা দাঁত হয়। তবে যদি দাঁতের ঘাটতি জন্মগত হয়, তবে মাকরুহ নয়।
৫- যে পশুর স্তনের বোঁটার কোনো অংশ কর্তিত। তবে যদি তা জন্মগতভাবে না থাকে, তাহলে মাকরুহ নয়। আর যদি দুধ বন্ধ হয়ে যায়, অথচ স্তন সুস্থ থাকে, তাহলে অসুবিধা নেই।
এই ৫টি নতুন মাকরূহ পূর্ববর্তী ৯টির সাথে যুক্ত করলে মোট মাকরূহের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪টি।
***
চতুর্থ অধ্যায়:
কুরবানী কার পক্ষ থেকে আদায়যোগ্য
একটি ছাগল/ভেড়া কুরবানী হিসেবে একজন পুরুষ, তার পরিবার-পরিজন এবং যে কোনো মুসলিমের পক্ষ থেকে আদায়যোগ্য। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত,
"أَمَرَ بِكَبْشٍ أَقْرَنَ، يَطَأُ فِي سَوَادٍ، وَيَبْرُكُ فِي سَوَادٍ، وَيَنْظُرُ فِي سَوَادٍ، فَأُتِيَ بِهِ؛ لِيُضَحِّيِ بِهِ، فَقَالَ لَهَا: «يَا عَائِشَةُ، هَلُمِّي الْمُدْيَةَ».
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানী করার জন্য দু’টি শিং বিশিষ্ট দুম্বা আনতে আদেশ দেন, যেটি কালোর মধ্যে চলাফেরা করতো (অর্থাৎ পায়ের গোড়া কালো ছিল), কালোর মধ্যে বসতো (অর্থাৎ পেটের নিম্নাংশ কালো ছিল) এবং কালোর মধ্য দিয়ে দেখতো (অর্থাৎ চোখের চতুর্দিকে কালো ছিল)। সেটি কুরবানী করার জন্যে আনা হলো এবং তিনি আয়িশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে বললেন: “হে আয়িশা! ছুরিটি নিয়ে এসো।” (অর্থাৎ আমাকে ছুরি দাও) তিনি তা নিয়ে আসলেন, পরে তিনি সেটি নিলেন এবং দুম্বাটি ধরে শোয়ালেন। এরপর সেটা যবেহ করলেন (অর্থাৎ যবেহ করার জন্য প্রস্তুতি নিলেন), এবং বললেন:
«بِسْمِ اللهِ، الْلَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ، وَآلِ مُحَمَّدٍ، وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ» ثُمَّ ضَحَّى بِهِ.
“বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ, মুহাম্মাদের পরিবার ও তার উম্মাতের পক্ষ থেকে এটা কবুল করে নাও।” এরপর এটা যবেহ করলেন। সহীহ মুসলিম।25 বন্ধনীর মধ্যে যা রয়েছে তা ব্যাখ্যা মাত্র, হাদীসের মূল অংশ নয়।
আবূ রাফি‘ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
"أَنَّ الَّنِبَّي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ، أَحَدِهِمَا عَنْهُ وَعَنْ آلِهِ، وَاْلآخَرُ عَنْ أُمَّتِهِ جَمِيعَاً".
“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি দুম্বা কুরবানী করতেন। একটি তার ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে এবং অপরটি তার সমস্ত উম্মতের পক্ষ থেকে।” মুসনাদে আহমদ।26
আবূ আইয়ূব আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে লোকেরা তার ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে একটি ছাগল দ্বারা কুরবানী আদায় করত এবং তা নিজেরাও খেত, অন্যান্য লোকদেরকেও খাওয়াত। বর্ণনায় ইবন মাজাহ ও তিরমিযী। ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।27
যখন কোনো ব্যক্তি একটি মেষ বা ছাগল নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করে, তখন তা তার পরিবারের সকল সদস্যের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায় – চাই তারা জীবিত হোক বা মৃত – যাদের জন্য সে নিয়্যত করেছে। যদি সে নির্দিষ্টভাবে কারো জন্য নিয়্যত না করে, তবে সাধারণ ভাষা ও রীতি অনুযায়ী যারা তার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত তাদের সবাই এর অন্তর্ভুক্ত হবে। রীতি অনুযায়ী এতে তার স্ত্রী, সন্তান ও অধীনস্থ আত্মীয়-স্বজনরা শামিল হয়। ভাষাগত দিক থেকে: পরিবারের সদস্য বলতে বোঝায় তার সন্তান-সন্ততি, পিতার বংশধর, দাদার বংশধর এবং দাদার পিতার বংশধর সকলকে।
কুরবানী হিসেবে একটি ছাগলে যা যথেষ্ট হয়, তার জন্য একটি উট বা একটি গরুর সপ্তমাংশও যথেষ্ট। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি উট বা গরুর এক-সপ্তমাংশ নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করে, তবে তা যথেষ্ট হবে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের কুরবানীর ক্ষেত্রে উট বা গরুর এক-সপ্তমাংশকে একটি ছাগল/ভেড়ার সমতুল্য করেছেন। কুরবানীর ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য, কেননা এ বিষয়ে ‘হাদি’ বা হজ্জের কুরবানী ও সাধারণ কুরবানীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
একটি ছাগল/ভেড়া দুই বা ততোধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী হিসাবে গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি তারা একত্রে এটি ক্রয় করে যৌথভাবে কুরবানী করতে চায়। কারণ কুরআন বা সুন্নাহতে এর কোনো দলীল নেই। অনুরূপভাবে আট বা ততোধিক ব্যক্তি একটি উট বা গরুতে শরীক হয়ে কুরবানী দিলে তা জায়েয হবে না। কেননা ইবাদত-বন্দেগী তাওকীফী (শরীয়ত দ্বারা নির্ধারিত), যেখানে পরিমাণ ও পদ্ধতিতে বাড়ানো-কমানোর সুযোগ নেই। তবে এ বিধান সওয়াব বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, সেখানে সীমাহীন শরীকানা জায়েয যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
সেই অনুযায়ী, যদি কোনো গোষ্ঠীর একাধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে ওয়াক্ফের আয় থেকে কুরবানির ওসিয়ত করা হয়ে থাকে— ধরুন, প্রত্যেকেই ওয়াক্ফের আয়ের একটি অংশ থেকে একটি করে কুরবানির পশু দেয়ার ওসিয়ত করেছে— কিন্তু প্রত্যেক ওসিয়ত অনুযায়ী পৃথকভাবে কুরবানির জন্য যথেষ্ট পরিমাণ আয় না থাকে, তাহলে এ সকল ওসিয়ত একত্র করে একটি কুরবানির পশু দেওয়া বৈধ নয়। কারণ, যেমনটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, একটি ছাগল বা ভেড়া একাধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানির জন্য (সওয়াবের বাইরে) যথেষ্ট নয়। সুতরাং, ঐ আয়কে সংরক্ষণ করতে হবে যতক্ষণ না তা একটি কুরবানীর দামের সমান হয়। আর যদি তা খুবই অল্প হয় এবং কয়েক বছরেও পূর্ণ না হয়—তাহলে তা জিলহজের দশ তারিখে সদকা করে দেওয়া হবে।
আর যদি ওসিয়তকারী একজন হয় এবং সে একাধিক কুরবানীর ওসিয়ত করে, আর আয় সব কুরবানীর জন্য যথেষ্ট না হয়, তবে ওসি (নির্বাহক) ইচ্ছা করলে সব কুরবানীর নিয়তে একটি কুরবানী করতে পারবে - কারণ ওসিয়তকারী একজন। অথবা সে চাইলে এক বছর একটি কুরবানী, অন্য বছর আরেকটি কুরবানী করতে পারবে। তবে প্রথম পদ্ধতিই উত্তম।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: কিছু মানুষ মৃত্যুর আগে কুরবানীর জন্য ওয়াক্ফের আয় থেকে নির্দিষ্ট একটি পরিমাণ মূল্য নির্ধারণ করে যান, যা তারা অতিরিক্ত বাড়িয়ে বলে থাকেন এই ধারণায় যে, কুরবানীর পশুর দাম কখনও এতটা বাড়বে না। যেমন কেউ বলে যান: “আমার পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া হোক- এমনকি যদি তা এক রিয়াল পর্যন্ত গিয়ে থাকে।” কারণ তার সময়কালে কুরবানীর পশুর দাম অনেক কম ছিল। কিন্তু পরে এমন কিছু ওসিয়ত বাস্তবায়নকারী ব্যক্তি—যারা আল্লাহকে ভয় করেন না—এই অজুহাত দেখিয়ে কুরবানি বন্ধ করে দেন যে, মরণোত্তর নির্দেশে যেহেতু এক রিয়াল উল্লেখ করা হয়েছিল, অথচ এখন এক রিয়ালে কোনো কুরবানির পশু পাওয়া যায় না, তাই কুরবানি দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ ওয়াক্ফের আয় অনেক বেশি। এটি সম্পূর্ণ হারাম এবং ওই ব্যক্তি এই কাজের জন্য গুনাহগার হবে। তাদের কর্তব্য হল কুরবানী আদায় করা- এমনকি যদি তার দাম হাজার রিয়ালও হয় (যতক্ষণ ওয়াকফের আয় তা বহন করতে পারে)। কারণ, ওসিয়তকারীর এই পরিমাণ নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য ছিল কুরবানীর মূল্যে অতিরঞ্জন করা—মূল্য নির্ধারণ নয়।
***
পঞ্চম অধ্যায়:
কুরবানীর পশু নির্ধারণের পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট বিধান
কুরবানীর পশু দুইটি প্রদ্ধতির যে কোন একটি দ্বারা নির্ধারিত হয়:
প্রথম পদ্ধতি হলো মৌখিকভাবে, যেমন কেউ বলল: "এটি কুরবানীর পশু" - যদি তা নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে বলে। কিন্তু যদি সে ভবিষ্যতে যা করতে চায় তা জানানোর উদ্দেশ্যে বলে, তবে তা দ্বারা পশুটি নির্ধারিত হবে না। কারণ তখন এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে যা করা হবে তা জানানো, বর্তমানে তা নির্ধারণ করা নয়।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: কর্মের মাধ্যমে, যা দুই প্রকার:
প্রথম প্রকার: কুরবানীর নিয়তে পশু জবেহ করা। যখনই কেউ এই নিয়তে পশু জবেহ করবে, তখনই তা কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে।
দ্বিতীয় প্রকার: কুরবানীর নিয়তে পশু ক্রয় করা - যদি তা পূর্বনির্ধারিত পশুর পরিবর্তে ক্রয় করা হয়। যেমন: কেউ একটি পশু কুরবানীর জন্য নির্ধারণ করল, কিন্তু তার অবহেলায় তা নষ্ট হয়ে গেল। তখন সে অন্য পশু ক্রয় করল এই নিয়তে যে এটি নষ্ট হওয়া পশুর পরিবর্তে। এই ক্ষেত্রে, শুধু এই নিয়তে ক্রয় করলেই তা কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কারণ এটি পূর্বনির্ধারিত পশুর বিকল্প, আর বিকল্পের বিধান আসল পশুর মতোই।
কিন্তু যদি পশুটি পূর্বনির্ধারিত পশুর বিকল্প না হয়, তবে শুধু কুরবানীর নিয়তে ক্রয় করলেই তা কুরবানীর জন্য নির্ধারিত হবে না। এটা এমন যে, কেউ যদি একজন দাস ক্রয় করে এই নিয়তে যে তাকে মুক্ত করে দেবে, তবে শুধু ক্রয় করলেই সে মুক্ত হয়ে যায় না। অথবা কেউ যদি কিছু ক্রয় করে ওয়াকফ করার নিয়তে, তবে শুধু ক্রয় করলেই তা ওয়াকফ হয়ে যায় না। ঠিক তেমনি, কেউ যদি একটি পশু কুরবানীর নিয়তে ক্রয় করে, তবে শুধু ক্রয় করলেই তা কুরবানীর পশু হিসেবে নির্ধারিত হবে না।
যখন পশুটি কুরবানীর জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়, তখন তার সাথে কিছু বিধান জড়িত হয়:28
প্রথম বিধান: একবার পশু কুরবানীর জন্য নির্ধারিত হলে, তা বিক্রয়, দান, বন্ধক বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা জায়েয হবে না - যদি তা কুরবানীতে বাধা সৃষ্টি করে। তবে কুরবানীর স্বার্থে এর চেয়ে উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা যাবে, নিজের কোনো স্বার্থে নয়। উদাহরণস্বরূপ: যদি কেউ একটি বকরি কুরবানীর জন্য নির্ধারণ করে, পরে তার মনের মধ্যে এটিকে রাখার ইচ্ছা জাগে (কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে), অতঃপর অনুশোচনা করে এর চেয়ে উত্তম অন্য একটি বকরি দিয়ে পরিবর্তন করতে চায় - যাতে আগেরটিকে রাখতে পারে, তবে এটা তার জন্য জায়েয হবে না। কেননা এটি আল্লাহর জন্য নির্ধারিত বস্তু থেকে নিজের স্বার্থে ফিরে যাওয়া, কুরবানীর কল্যাণার্থে নয়।
দ্বিতীয় বিধান: যদি কেউ কুরবানী নির্ধারণ করার পর মারা যায়, তাহলে ওয়ারিশদের জন্য ঐ পশু কোরবানী করা আবশ্যক হবে। আর যদি সে নির্ধারণ করার আগেই মারা যায়, তাহলে পশুটি ওয়ারিশদের মালিকানায় থাকবে, তারা এতে যা ইচ্ছা করতে পারবে।
তৃতীয় বিধান: কুরবানীর জন্য নির্ধারিত পশু থেকে কোনো উপকার গ্রহণ করা যাবে না। তাই চাষাবাদ ইত্যাদি কাজে এটি ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজন ছাড়া এতে আরোহণও করা যাবে না - প্রয়োজনে ও পশুর কোনো ক্ষতি না হলে তবেই তাতে আরোহন করতে পারবে। আর এমন পরিমাণ দুধ দোহন করা যাবে না যা পশু বা তার বাচ্চার প্রয়োজনের জন্য ক্ষতিকর। তার পশম বা অনুরূপ কিছু কাটা যাবে না, তবে যদি তা পশুর জন্য উপকারী হয়, তাহলে তা কেটে দান করা যাবে, অথবা কাউকে উপহার দেওয়া যাবে, অথবা তা ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু বিক্রি করা যাবে না।
চতুর্থ বিধান: যদি কুরবানীর জন্য নির্ধারিত পশু এমন কোনো ত্রুটিযুক্ত হয় যা কুরবানী কবুলের অন্তরায়, যেমন: কেউ একটি বকরী কিনে কুরবানীর জন্য নির্ধারণ করার পর তা স্পষ্টভাবে অন্ধ হয়ে যায়, তবে এর দুটি অবস্থা হতে পারে:
প্রথম অবস্থা: যদি তা তার নিজের কাজ বা অবহেলার কারণে হয়, তবে তার উপর কর্তব্য হবে সমতুল্য বা তার চেয়ে উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা। কারণ ত্রুটির জন্য সে নিজে দায়ী, তাই তার উপর সমমানের পশু জবেহ করা আবশ্যক হবে, যা সে এর পরিবর্তে কুরবানী করবে। আর ত্রুটিযুক্ত পশুটি তার মালিকানায় থাকবে - সঠিক মত অনুযায়ী - সে ইচ্ছা করলে তা বিক্রি বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করতে পারবে।
দ্বিতীয় অবস্থা: যদি পশুটির ত্রুটি তার কোনো কর্ম বা অবহেলা ছাড়াই সংঘটিত হয়, তবে সে তা জবেহ করবে এবং তা কুরবানী হিসেবে শুদ্ধ হবে; তবে শর্ত হলো, পশুটি নির্ধারণ করার আগে তার ওপর অন্য কোনো কুরবানির দায়িত্ব বা ঋণ থাকা চলবে না। কারণ, এটি তখন তার কাছে একটি আমানত, এবং এটি তার কোনো কাজ বা অবহেলা ছাড়াই দোষগ্রস্ত হয়েছে, সুতরাং এতে তার কোনো গোনাহ বা ক্ষতিপূরণের দায় নেই।
আর যদি নির্ধারণের পূর্বেই তার দায়িত্বে কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে, তবে তার দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাকে একটি সুস্থ পশু দ্বারা তা পরিবর্তন করা আবশ্যক, যা তার উপর ওয়াজিব কুরবানীর শর্ত পূরণ করে।
এর উদাহরণ হলো: কেউ যদি বলে, "আল্লাহর জন্য আমার উপর এই বছর কুরবানী করা মানত করছি" তারপর একটি কুরবানীর পশু ক্রয় করে এবং তা মান্নতের জন্য নির্ধারণ করে, তারপর সেটি এমন একটি দোষে আক্রান্ত হয় যা কুরবানী হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে তার জন্য আবশ্যক হবে যে সে একটি সুস্থ পশু দ্বারা তা পরিবর্তন করবে যা কুরবানীর জন্য উপযুক্ত। দোষযুক্ত পশুটি তখন তার নিজের হবে, কিন্তু যদি সেটি পরিবর্তিত পশুটির চেয়ে দামে বেশি হয়, তাহলে তাকে সেই দামের পার্থক্যের পরিমাণ সদকা করতে হবে।
পঞ্চম বিধান: যদি কুরবানীর পশু হারিয়ে যায় বা চুরি হয়, তবে এরও দুটি অবস্থা রয়েছে:
প্রথম অবস্থা: যদি তা তার অবহেলার কারণে হয়, যেমন: পশুকে নিরাপদ স্থানে না রাখার কারণে পালিয়ে যায় বা চুরি হয়, তবে তার উপর কর্তব্য হবে সমতুল্য বা উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা। সে এটি কুরবানী করবে, আর হারানো বা চুরি হওয়া পশুটি তার মালিকানায় থাকবে- যদি তা ফিরে পায় তবে ইচ্ছামতো বিক্রি বা ব্যবহার করতে পারবে।
দ্বিতীয় অবস্থা: যদি তার কোনো অবহেলা ছাড়াই এমনটি ঘটে, তবে তার উপর কোনো দায়িত্ব নেই। তবে এমনটি হবে, নির্ধারণ করার পূর্বে যদি তার দায়িত্বে কুরবানী ওয়াজিব না হয়ে থাকে। কারণ তখন তা তার কাছে আমানত; যদি সে অবহেলা না করে তবে আমানতদারের ওপর দায়বদ্ধতা নেই; কিন্তু যদি পশুটি ফিরে পায়, তবে তাকে তা কুরবানী করতে হবে, এমনকি কুরবানীর সময় পার হয়ে গেলেও। অনুরূপভাবে যদি চোর তার কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে, তবে অবশ্যই সেই অর্থ দিয়ে মালিককে সমতুল্য পশু কুরবানী করতে হবে।
আর যদি নির্ধারণের পূর্বেই তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে, তবে তাকে অবশ্যই তার ওয়াজিব পূরণের জন্য যথেষ্ট পশু জবেহ করতে হবে। আর যদি হারানো পশু ফিরে পায়, তবে তা তারই থাকবে, ইচ্ছামতো বিক্রি বা ব্যবহার করতে পারবে। তবে যদি পরিবর্তিত পশুটি হারানো পশুর চেয়ে নিম্নমানের হয়, তবে তাকে মূল্যের পার্থক্য সদকা করতে হবে।
ষষ্ঠ বিধান: যদি কুরবানীর পশু নষ্ট হয়ে যায়, তবে এর তিনটি অবস্থা:
প্রথম অবস্থা: যদি তা মানুষের কর্ম ছাড়াই নষ্ট হয়, যেমন: রোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পশুর নিজের কর্মের কারণে মারা যায়, তবে তার উপর কোনো দায়িত্ব নেই। তবে এমনটি হবে, নির্ধারণ করার পূর্বে যদি তার দায়িত্বে কুরবানী ওয়াজিব না হয়ে থাকে। কারণ তা তার নিকট আমানত ছিল এবং এমন কারণে নষ্ট হয়েছে যেখানে জিম্মাদারি প্রযোজ্য নয়। আর যদি নির্ধারণের পূর্বেই ওয়াজিব হয়ে থাকে, তবে তাকে অবশ্যই তার দায়িত্ব পূরণের জন্য যথেষ্ট পশু জবেহ করতে হবে।
দ্বিতীয় অবস্থা: যদি তা মালিকের কর্মের কারণে নষ্ট হয়, তবে তাকে অবশ্যই সমতুল্য বা তাঁর চেয়ে উত্তম পশু জবেহ করতে হবে, কারণ এতে তার জিম্মাদারি রয়েছে।
তৃতীয় অবস্থা: যদি তা মালিক ছাড়া অন্য মানুষের কর্মের কারণে নষ্ট হয়, তবে যদি জরিমানা আদায় করা সম্ভব না হয় (যেমন: ডাকাত), তবে এর বিধান প্রথম অবস্থার মতোই।
আর যদি জরিমানা আদায় করা সম্ভব হয় (যেমন: কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি তা জবেহ করে খেয়ে ফেলে বা মেরে ফেলে), তবে তাকে অবশ্যই সমতুল্য পশু মালিককে দিতে হবে, যাতে সে তা কুরবানী করতে পারে। তবে মালিক যদি তাকে ক্ষমা করে দেয় এবং নিজেই দায়িত্ব নেয় তবে ভিন্ন কথা।
সপ্তম বিধান: যদি কুরবানীর সময়ের আগেই তা জবেহ করা হয়, এমনকি কুরবানীর নিয়তেও, তবে এর বিধান পূর্বে বর্ণিত নষ্ট হওয়ার মতোই।
আর যদি কুরবানীর সময়ে জবেহ করা হয়, তবে যদি জবেহকারী মালিক বা তার প্রতিনিধি হয়, তবে কুরবানী শুদ্ধ হবে। আর যদি জবেহকারী মালিক বা প্রতিনিধি না হয়, তবে তিনটি অবস্থা:
প্রথম অবস্থা: যদি সে মালিকের পক্ষ থেকে নিয়ত করে, তবে সঠিক মতানুযায়ী মালিক যদি রাজি হয় তবে শুদ্ধ হবে, আর যদি রাজি না হয় শুদ্ধ হবে না। তখন জবেহকারীকে সমতুল্য পশু মালিককে দিতে হবে, যাতে সে কুরবানী করতে পারে। তবে যদি মালিক তাকে সেই দায় থেকে মুক্ত করে দেন, তাহলে সে যা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য ছিল, তার মূল্য নির্ধারণ করবে।
কেউ কেউ বলেন: মালিকের অসম্মতিতেও শুদ্ধ হবে। এটি ইমাম আহমাদ, শাফেয়ী ও আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত।29
দ্বিতীয় অবস্থা: যদি সে নিজের পক্ষ থেকে নিয়ত করে, তবে যদি জানে যে পশুটি অন্যের, তবে তা তার বা অন্যের পক্ষ থেকে শুদ্ধ হবে না। তাকে সমতুল্য পশু মালিককে দিতে হবে, যাতে সে কুরবানী করতে পারে। তবে মালিক যদি তাকে ক্ষমা করে দেয় এবং সে যা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য ছিল, তার মূল্য নির্ধারণ করে তবে ভিন্ন কথা। কেউ কেউ বলেন: এটি মালিকের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে, তবে জবাইকারীকে যেটুকু মাংস বিতরণ করেছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
আর যদি সে না জানে যে এটি অন্য কারো পশু; তাহলে এটি মালিকের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আর যদি জবাইকারী এর মাংস বিতরণ করে দেয়, তাহলে তাকে অনুরূপ মাংস মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে — যদি না মালিক তার এই বিতরণে সন্তুষ্ট থাকে।
তৃতীয় অবস্থা: যদি সে কারো পক্ষ থেকে নিয়ত না করে, তবে কারো পক্ষ থেকেই শুদ্ধ হবে না, কারণ নিয়ত নেই। কেউ কেউ বলেন: তখন মালিকের পক্ষ থেকে শুদ্ধ হবে।
আর পূর্বোক্ত যে কোনো অবস্থায় যদি এটি মালিকের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়, তাহলে যদি মাংস বাকি থাকে, তবে মালিক তা নিয়ে কুরবানীর নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করবে। আর যদি জবাইকারী কুরবানীর নিয়ম অনুযায়ী মাংস বিতরণ করে থাকে এবং মালিক এতে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে জবাইকারীর ওপর কোনো দায় নেই। কিন্তু যদি মালিক এতে সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে জবাইকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যাতে মালিক কুরবানীর নিয়ম অনুযায়ী তা বিতরণ করতে পারে।
দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
১. যদি কুরবানীর পশু জবাই করার পর নষ্ট নষ্ট হয়ে যায়, বা চুরি হয়ে যায়, অথবা এমন কেউ নিয়ে যায় যার কাছ থেকে ফেরত পাওয়া যায় না এবং মালিক অবহেলা না করে থাকে, তবে তার উপর কোনো দায়িত্ব নেই। আর যদি অবহেলা করে, তবে সে যেটুকু সদকা করা ওয়াজিব হয় সেটুকুর দায়িত্ব নিবে এবং তা সদকা করে দিবে।
২. যদি নির্ধারণের পর কুরবানীর পশু বাচ্চা দেয়, তবে বাচ্চাটির বিধান পূর্বে বর্ণিত সবকিছুতেই মায়ের মতোই। আর যদি নির্ধারণের পূর্বে বাচ্চা দেয়, তবে বাচ্চাটি স্বতন্ত্র বিধানের অধীন, মায়ের কুরবানীর সাথে যুক্ত হবে না, কারণ বাচ্চা প্রসবের পরই মা কুরবানীর জন্য নির্ধারিত হয়েছে।
***
ষষ্ঠ অধ্যায়
কুরবানীর গোশত খাওয়া ও বণ্টনের বিধান
কুরবানীদাতার জন্য তার কুরবানীর গোশত খাওয়া, হাদিয়া দেওয়া ও সদকা করা শরীয়তসম্মত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿...فَكُلُواْ مِنۡهَا وَأَطۡعِمُواْ ٱلۡبَآئِسَ ٱلۡفَقِيرَ﴾
“সুতরাং তোমরা তা থেকে খাও এবং দুঃস্থ, দরিদ্রকে খাওয়াও।” [আল-হাজ্জ, আয়াত: ২৮] এবং আল্লাহর বাণী:
﴿...فَكُلُواْ مِنۡهَا وَأَطۡعِمُواْ ٱلۡقَانِعَ وَٱلۡمُعۡتَرَّ...﴾
“তখন তোমরা তা থেকে খাও। যে অভাবী, মানুষের কাছে হাত পাতে না এবং যে অভাবী চেয়ে বেড়ায়-তাদেরকে খেতে দাও।” [আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৬] আয়াতে উল্লেখিত "القانع" অর্থ: যে বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে চায়।
"المُعْتَرُّ" অর্থ: যিনি কিছু না চেয়ে দান গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সালামা ইবনুল আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«كُلُوا، وَأَطْعِمُوا، وَادَّخِرُوا».
“তোমরা খাও, অন্যদরকেও খাওয়াও এবং (চাইলে) জমা করে রাখো।” বর্ণনায় সহীহ বুখারী।30 "অন্যদেরকে খাওয়ানো" এর মধ্যে ধনীকে হাদিয়া দেওয়া এবং দরিদ্রকে সদকা করা উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«كُلُوا، وَادَّخِرُوا، وَتَصَدَّقُوا».
“তোমরা খাও, (চাইলে) জমা করে রাখো এবং দান করো।” বর্ণনায় মুসলিম।31
কুরবানীর গোশত কতটুকু খাবে, কতটুকু হাদিয়া দেবে আর কতটুকু সদকা করবে - এ বিষয়ে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। তবে এ বিষয়ে যে কোন মত গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে। উত্তম মত হলো: এক তৃতীয়াংশ নিজে খাবে, এক তৃতীয়াংশ হাদিয়া দেবে এবং এক তৃতীয়াংশ সদকা করবে। আর যে পরিমাণ খাওয়া জায়েয, তা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করাও জায়েয - যতক্ষণ না তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়। তবে যদি দুর্ভিক্ষের বছর হয়, তবে তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা জায়েয হবে না। কারণ, সালামা ইবনুল আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ ضَحَّى مِنْكُمْ فَلَا يُصْبِحَنَّ بَعْدَ ثَالِثَةٍ وَبَقِيَ فِي بَيْتِهِ مِنْهُ شَيْءٌ» فَلَمَّا كَانَ العَامُ المُقْبِلُ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، نَفْعَلُ كَمَا فَعَلْنَا فِي الْعَامِ الْمَاضِي؟ فَقَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُوا وَأَطْعِمُوا وَادَّخِرُوا، فَإِنَّ ذَلِكَ العَامَ كَانَ بِالنَّاسِ جَهْدٌ، فَأَرَدْتُ أَنْ تُعِينُوا فِيهَا».
“তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুরবানী করে, তৃতীয় দিনের পর সকালেও যেন তার ঘরে কুরবানীর গোস্তের কিয়দংশও অবশিষ্ট না থাকে।” রাবী (সালামাহ্ ইবনুল আক্ওয়া) বলেন, পরবর্তী বছর আসলে সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা গত বছর যা করেছি এ বছরও কি সেভাবে করবো? নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না; তোমরা খাও, অন্যদরকেও খাওয়াও এবং (যদি ইচ্ছা করো তবে) জমা করে রেখো। কারণ গত বছর তো মানুষ অভাব-অনটনের মধ্যে ছিল। আর তাই আমি চেয়েছিলাম, তোমরা তাদের সাহায্য করো।” মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি।32
কুরবানীর গোশত খাওয়া ও হাদিয়া দেওয়ার বৈধতার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই - তা নফল হোক বা ওয়াজিব, জীবিতের পক্ষ থেকে হোক বা মৃতের, কিংবা ওসিয়তের মাধ্যমে হোক। কারণ ওসি (ওসিয়ত পালনকারী নির্বাহক) ওসিয়তকারীর স্থলাভিষিক্ত হয়, আর ওসিয়তকারী নিজে খাবে, হাদিয়া দিবে ও সদকা করবে। আর এটি মানুষের মধ্যে প্রচলিত স্বীকৃত রীতি, আর রীতিগতভাবে প্রচলিত বিষয়টি শাব্দিকভাবে উল্লিখিত বিষয়ের মতোই গণ্য হয়।
প্রতিনিধির ক্ষেত্রে: যদি মালিক তাকে খাওয়া, হাদিয়া দেওয়া ও সদকা করার অনুমতি দেয়, অথবা প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বা প্রচলিত রীতি থেকে তা বোঝা যায়, তবে সে তা করতে পারবে। অন্যথায় তাকে গোশত মালিকের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, এবং বণ্টনের দায়িত্ব মনিবেরই থাকবে।
আর কুরবানীর কোনো অংশ বিক্রি করা হারাম - গোশত হোক বা অন্য কিছু, এমনকি চামড়াও। আর কসাইকে মজুরি হিসেবে কুরবানীর কোনো অংশ দেওয়াও যাবে না - তা আংশিক হোক বা সম্পূর্ণ, কারণ এটি বিক্রিরই নামান্তর।
আর যাকে এর কিছু অংশ হাদিয়া বা সদকা হিসেবে দেওয়া হয়েছে, সে তা ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারবে - এমনকি বিক্রিও করতে পারবে। তবে সে ব্যক্তি যার কাছ থেকে হাদিয়া বা সদকা পেয়েছে, তার কাছে তা বিক্রি করা যাবে না।
***
সপ্তম অধ্যায়
কুরবানীদাতার জন্য বর্জনীয় বিষয়
যখন কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে এবং জিলহজ মাস শুরু হয়ে যায় — তা চাঁদ দেখার মাধ্যমে হোক অথবা জিলকদ মাস ত্রিশ দিন পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে — তখন তার জন্য নিজের চুল, নখ বা ত্বক থেকে কিছু কাটা হারাম হয়ে যায়, যতক্ষণ না সে তার কুরবানীর পশু জবেহ করে। উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ - وفي لفظ: إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ- وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ؛ فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعَرِهِ وَأَظْفَارِهِ».
“তোমরা যখন যিলহজ মাসের (নতুন চাঁদ দেখতে পাও), অন্য বর্ণনায় এসেছে: তোমাদের মাঝে যখন যিলহজের প্রথম দশক শুরু হয়- আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে, তবে সে যেন তার চুল না ছাটে ও নখ না কাটে।” বর্ণনায় আহমদ ও মুসলিম।33 অন্য শব্দে রয়েছে:
«فَلَا يَأْخُذْ مِنْ شَعَرِهِ وَأَظْفَارِهِ شَيْئَاً حَتَّى يُضَحِّيَ».
“(যে লোকের কাছে কুরবানীর পশু আছে সে যেন যিলহজের নতুন চাঁদ দেখার পর) কুরবানী করা পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটে।34 অন্য শব্দে রয়েছে:
«فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعَرِهِ وَلَا بَشَرِهِ شَيْئَاً».
“(যখন যিলহাজ মাসের প্রথম দশদিন উপস্থিত হয়, আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে), তবে সে যেন তার চুল ও নখের কিছুই স্পর্শ না করে (কর্তন না করে)।”35
আর যদি কেউ জিলহজের প্রথম দশকের মধ্যে কুরবানীর নিয়ত করে, তবে সে তার নিয়ত করার মুহূর্ত থেকে চুল-নখ কাটা বর্জন করবে। তবে নিয়ত করার আগে যা কেটেছে, তার উপর কোনো গুনাহ নেই।
এ নিষেধাজ্ঞার পেছনে হিকমত হলো: কুরবানী দানকারী ব্যক্তি যখন হজ্বকারীর সঙ্গে কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতে অংশ নেয়—যেমন আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা —তখন সে তার সঙ্গে ইহরামের কিছু বৈশিষ্ট্যেও অংশগ্রহণ করে, যেমন চুল ইত্যাদি কাটা থেকে বিরত থাকা।
এই হুকুম কেবল তার জন্যই প্রযোজ্য যে নিজে কুরবানী দেয়, আর যার পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া হয়—তার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ».
"যখন তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে।" তিনি বলেননি: "অথবা যার পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া হবে"। অন্যদিকে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকেও কুরবানী করতেন, কিন্তু তাদেরকে চুল-নখ না কাটার নির্দেশ দিয়েছেন মর্মে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।36
অতএব, কুরবানীদাতার পরিবার-পরিজনের জন্য জিলহজের প্রথম দশকে চুল, নখ ও ত্বক কাটা সম্পূর্ণ জায়েয।
যদি কুরবানীর ইচ্ছাকারী ব্যক্তি তার চুল, নখ বা ত্বক থেকে কিছু কেটে ফেলে, তবে তার উপর কর্তব্য হবে আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবা করা এবং পুনরায় এমন না করা। তার উপর কোনো কাফফারা নেই, আর এটি তাকে কুরবানী করা থেকে বিরত রাখবে না - যেমন কিছু সাধারণ লোক মনে করে।
যদি কেউ ভুলে বা অজ্ঞতাবশত তা থেকে কিছু কেটে ফেলে, কিংবা ইচ্ছা ছাড়াই চুল পড়ে যায়, তবে তার কোনো গোনাহ নেই। আর যদি তার তা নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে সে তা নিতে পারবে এবং তার উপর কোনো কিছুই নেই। যেমন: তার নখ ভেঙে তাকে কষ্ট দেয়, তাই সে তা কেটে ফেলে, অথবা চুল চোখে পড়ে যায়, তাই সে তা সরিয়ে ফেলে, অথবা কোনো আঘাতের চিকিৎসা বা অন্য কোনো কারণে যদি চুল কাটা প্রয়োজন হয়।
***
অষ্টম অধ্যায়
যবেহ ও তার শর্তাবলী
যবেহ হলো:সেই কাজটি করা যার মাধ্যমে এমন প্রাণী হালাল হয়ে যায়, যা এ পদ্ধতি ছাড়া হালাল হয় না; যেমন: নহর (গলা চিরে যবাই), যবেহ (গলা কেটে যবাই), অথবা আঘাত।
নহর হল উটের জন্য, যবেহ হলো অন্যান্য গবাদিপশু (যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া)-র জন্য। আর আঘাতের মাধ্যমে যবাই করা সেই প্রাণীর জন্য, যাকে কেবল এভাবেই কাবু করা সম্ভব হয় (যেমন শিকার করা বন্য জন্তু, যাকে জবাইয়ের সুযোগ পাওয়া যায় না)।
যবেহের জন্য নয়টি শর্ত রয়েছে:
১. যবেহকারী বিবেকবান ও বোধসম্পন্ন হতে হবে: অতএব, পাগল, মাতাল, নাবালেগ শিশু বা বুদ্ধিভ্রষ্ট বৃদ্ধের জবেহকৃত প্রাণী হালাল নয়।
২. যবেহকারী মুসলিম বা আহলে কিতাব হতে হবে; আহলে কিতাব হলো, ইয়াহুদী বা খ্রীষ্টান ধর্মের অনুসারী।
• মুসলিমের ক্ষেত্রে: পুরুষ/নারী, নেককার/ফাসেক, পবিত্র/অপবিত্র সকলের জবেহ হালাল।
• আহলে কিতাবের ক্ষেত্রে: বাবা-মা আহলে কিতাব হোক বা না হোক, তাদের জবেহ হালাল।
মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, আহলে কিতাবের যবেহ হালাল, আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর ভিত্তিতে:
﴿...وَطَعَامُ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ حِلّٞ لَّكُمۡ...﴾
“এবং যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে, তাদের খাবার তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো।” [আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫] আর যেহেতু, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইহুদি নারী কর্তৃক উপহার দেওয়া বকরীর গোশত খেয়েছেন এবং এক ইহুদির আমন্ত্রণে যবের রুটি ও বাসী চর্বি খেয়েছেন।3738
পক্ষান্তরে আহলে কিতাব ছাড়া অন্যান্য কাফিরদের যবেহকৃত প্রাণী হালাল নয়। আল্লাহর এ বাণীর কারণে:
﴿...وَطَعَامُ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ...﴾
"আহলে কিতাবদের খাবার তোমাদের জন্য হালাল" কেননা,
﴿...ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ...﴾
"আহলে কিতাব” বা “যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে” এটি এমন একটি বিশেষণ, যার দ্বারা বোঝা যায় শুধু আহলে কিতাবদের ক্ষেত্রে এই অনুমতি। অন্য কাফিরদের ক্ষেত্রে এই অনুমতি নেই। ইমাম আহমাদ (রহ.) বলেন: "এ বিষয়ে কেউ মতভেদ করেছে বলে আমি জানি না, যদি না সে বিদআতী হয়"। খাজিন (রহ.) তার তাফসিরে এ বিষয়ে ইজমা বর্ণনা করেছেন।39
• অতএব, কমিউনিস্ট ও মুশরিকদের যবাই করা (জবাই করা পশু) হালাল নয়। তাদের শিরক (অংশীবাদ) হোক কর্মে—যেমন মূর্তিকে সেজদা করা, অথবা কথায়—যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকা; তাতে কোনো পার্থক্য নেই। সালাত ত্যাগকারীর যবেহও হারাম; কারণ, প্রাধান্যপূর্ণ মত অনুযায়ী সে কাফির, চাই তার নামাজত্যাগ অবহেলাবশত হোক বা সালাতের ফরজ বিধান অস্বীকার করে হোক। তদ্রুপ যে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ফরজ বিধান অস্বীকার করে তার যবেহও হারাম (এমনকি সে সালাত পড়লেও), তবে যদি সে নওমুসলিম হওয়ার কারণে অজ্ঞ থাকে তাহলে ভিন্ন ব্যাপার।
মুসলিম বা আহলে কিতাবের যবেহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা আবশ্যক নয় - তারা কিভাবে যবেহ করেছে বা আল্লাহর নাম নিয়েছে কিনা। বরং এমন করা উচিতও নয়, কারণ এটি ধর্মে বাড়াবাড়ির শামিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের যবেহকৃত গোশত খেয়েছেন, অথচ তাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি।
সহীহ বুখারি ও অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, কিছু লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল: "কিছু লোক আমাদের কাছে এমন গোশত নিয়ে আসে যার ব্যাপারে আমরা জানি না তারা আল্লাহর নাম নিয়েছে কিনা?" তিনি উত্তরে বললেন:
«سَمُّوا عَلَيْهِ أَنْتُمْ، وَكُلُوهُ»، قالت: وكانوا حديثي عهد بكفر.
“তোমরাই এর উপর বিসমিল্লাহ পড় এবং তা খাও। ’আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন: প্রশ্নকারী দলটি ছিল কুফর থেকে নতুন ইসলাম গ্রহণকারী।”40 কাজেই, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কোনো প্রশ্ন না করেই তা খেতে নির্দেশ দিলেন -যদিও গোশত আনয়নকারী ব্যক্তিরা ইসলামের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, কারণ তারা তখনও নতুন মুসলিম ছিল (কুফর থেকে সদ্য ফিরে এসেছিল)।
তৃতীয় শর্ত: যবেহর ইচ্ছা থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿...إِلَّا مَا ذَكَّيۡتُمۡ...﴾
"তোমরা যা যবেহ করো তা ব্যতীত" ]সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩[। আর যবেহ একটি বিশেষ কাজ যা নিয়ত ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। যদি কেউ যবেহর ইচ্ছা না করে, যেমন: কোনো পশু আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার্থে তা যবেহ করে, তবে তা হালাল হবে না।
চতুর্থ শর্ত: যবেহ শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য যবেহ করা হয়, যেমন: মূর্তি, কবরবাসী, বাদশাহ বা পিতা-মাতার সম্মানে যবেহ করা হয়, তবে তা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ...﴾
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী...” আল্লাহর এ বাণী পর্যন্ত:
﴿...وَمَا ذُبِحَ عَلَى ٱلنُّصُبِ...﴾
“আর যা মূর্তি পূজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে।” [আল-মায়েদা, আয়াত: ৩]
পঞ্চম শর্ত: যবেহর সময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নাম নেওয়া যাবে না। যেমন: নবীর নামে, জিবরাইলের নামে, অমুকের নামে বলা। যদি আল্লাহর নামের সাথে অন্য কারো নামও উল্লেখ করা হয়, তবুও তা হারাম হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ...﴾
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী...” আল্লাহর এ বাণী পর্যন্ত:
﴿...وَمَآ أُهِلَّ لِغَيۡرِ ٱللَّهِ...﴾
“এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে।” [আল-মায়েদা, আয়াত: ৩] বিশুদ্ধ হাদীসে কুদসীতে মহান আল্লাহ বলেন:
«مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ فِيهِ مَعِيَ غَيْرِي؛ تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ».
“যদি কেউ এমন কাজ করে যাতে সে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, আমি তাকে ও তার শির্ককে বর্জন করি।”41
ষষ্ঠ শর্ত: যবেহর সময় আল্লাহ তাআলার নাম উল্লেখ করতে হবে। অর্থাৎ জবেহ করার সময় বলতে হবে: "বিসমিল্লাহ"। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ إِن كُنتُم بِـَٔايَٰتِهِۦ مُؤۡمِنِينَ 118﴾
“সুতরাং (হে মানুষ!) তোমরা আহার করো তা (সে প্রাণী) থেকে, যা আল্লাহর নামে যবহ করা হয়েছে; যদি তোমরা তাঁর আয়াতসমূহের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো।” [আল-আনআম, আয়াত: ১১৮] এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:
«مَا أَنْهَرَ الدَّمَ، وَذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ، فَكُلُوا».
“রক্ত প্রবাহিত করতে সক্ষম এমন যে কোন জিনিস দিয়ে আল্লাহ তা’আলার নাম নিয়ে যবেহ করলে, তোমরা তা খাও।” সহীহ বুখারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এটি বর্ণনা করেছেন।42
যদি কেউ আল্লাহ তাআলার নাম উল্লেখ না করে, তবে তা হালাল হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَلَا تَأۡكُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ...﴾
“আর যাতে আল্লাহ্র নাম নেয়া হয়নি তার কিছুই তোমারা খেও না।” [আল-আন‘আম, আয়াত: ১২১] ইচ্ছাকৃতভাবে জেনে শুনে আল্লাহর নাম বাদ দেওয়া, ভুলে যাওয়া বা অজ্ঞতাবশত বাদ পড়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ এই আয়াতের সাধারণ অর্থ, আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসমিল্লাহ বলাকে হালাল হওয়ার শর্ত করেছেন, আর শর্ত ভুলে বা অজ্ঞতায় রহিত হয় না। যেমন কেউ (ভুলে/অজ্ঞতায়) রক্ত প্রবাহিত না করে প্রাণ নিলে তা হারাম, তেমনি বিসমিল্লাহ বলা ছাড়া যবেহও হারাম। কারণ উভয় বিষয়ে বক্তব্য একই বক্তার পক্ষ থেকে, তাই পার্থক্য করা যুক্তিসঙ্গত নয়।43
আর যদি যবেহকারী বোবা হয় এবং বিসমিল্লাহ উচ্চারণে অক্ষম হয়, তবে তা ইঙ্গিত দ্বারা প্রকাশ করাই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ...﴾
‘অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহ্র তাকওয়া অবলম্বন কর।” [আত-তাগাবুন, আয়াত: ১৬]
সপ্তম শর্ত: যবেহ এমন ধারালো বস্তু দ্বারা করতে হবে যা রক্ত প্রবাহিত করতে সক্ষম - যেমন লোহা, পাথর, কাচ বা অনুরূপ কিছু। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَا أَنْهَرَ الدَّمَ، وَذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ، فَكُلُوا، مَا لَمْ يَكُنْ سِنَّا أَوْ ظُفْراً، وَسَأُحَدِّثُكُمْ عَنْ ذَلِكَ: أَمَّا السِّنُّ فَعَظْمٌ، وَأَمَّا الظُّفْرُ فَمُدَى الْحَبَشَةِ».
“রক্ত প্রবাহিত করতে সক্ষম এমন যে কোন জিনিস দিয়ে আল্লাহ তা’আলার নাম নিয়ে যবেহ করলে তোমরা তা খাও।” হাদীসের ইমামগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারীর অন্য বর্ণনায় রয়েছে:44
«غَيْرَ السِّنِّ وَالظُّفْرِ؛ فَإِنَّ السِّنَّ عَظْمٌ، وَالظُّفْرَ مُدَى الْحَبَشَةِ».
“কিন্তু দাঁত ও নখ দিয়ে নয়। কারণ দাঁত হল হাড়, আর নখ হল হাবশীদের ছুরি।”45
আর সহীহাইনে বর্ণিত আছে:
أَنْ جَارِيَةً لِكَعْبِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ كَانَتْ تَرْعَى غَنَمًا لَهُ بِسِلَعٍ، فَأَبْصَرَتْ بِشَاةٍ مِنَ الْغَنَمِ مَوْتًا، فَكَسَرَتْ حَجَرًا، فَذَبَحَتْهَا بِهِ، فَذَكَرُوا ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَمَرَهُمْ بِأَكْلِهَا.
কা‘ব ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর একটি দাসী ’সালা’ নামক স্থানে তার বকরী চরাত। এক সময় সে দেখতে পেল পালের একটি বকরী মারা যাচ্ছে। সে একটি পাথর ভেঙ্গে তা দিয়ে সেটি যবাহ করল। তারা বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালে তিনি তা খাওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন।”46
যদি কেউ ধারালো বস্তু ছাড়া প্রাণ বের করে, যেমন: শ্বাসরোধ করে বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে, তবে তা হারাম হবে। তবে যদি এভাবে প্রাণীকে সংজ্ঞাহীন করা হয় (কিন্তু প্রাণ থাকে), পরে শরীয়তসম্মতভাবে যবেহ করা হয়, তবে তা হালাল হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿حُرِّمَتۡ عَلَيۡكُمُ ٱلۡمَيۡتَةُ...﴾
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী...” আল্লাহর এ বাণী পর্যন্ত:
﴿...وَٱلۡمُنۡخَنِقَةُ وَٱلۡمَوۡقُوذَةُ وَٱلۡمُتَرَدِّيَةُ وَٱلنَّطِيحَةُ وَمَآ أَكَلَ ٱلسَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيۡتُمۡ...﴾
“গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু, অন্য প্রাণীর শিঙের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে- তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছ তা ছাড়া..।” [আল-মায়েদা, আয়াত: ৩]
প্রাণ থাকার দুটি লক্ষণ রয়েছে:
১. প্রাণীর নড়াচড়া করা
২. তার থেকে সবেগে লাল রক্ত বের হওয়া
অষ্টম শর্ত: রক্ত প্রবাহিত করা, অর্থাৎ যবেহর মাধ্যমে রক্ত বের করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«مَا أَنْهَرَ الدَّمَ، وَذُكِرَ اسْمُ اللهِ عَلَيْهِ؛ فَكُلُوا».
“রক্ত প্রবাহিত করতে সক্ষম এমন যে কোন জিনিস দিয়ে আল্লাহ তা’আলার নাম নিয়ে যবেহ করলে, তোমরা তা খাও।”47
অতঃপর, যদি প্রাণীটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে - যেমন পালিয়ে যাওয়া প্রাণী, কূপে বা গুহায় পড়ে যাওয়া প্রাণী ইত্যাদি - তবে দেহের যেকোনো অংশ থেকে রক্ত প্রবাহিত করাই যথেষ্ট। তবে উত্তম হলো এমন স্থান নির্বাচন করা যাতে প্রাণ দ্রুত বের হয়, কারণ এটি প্রাণীর জন্য কম যন্ত্রণাদায়ক।
আর যদি প্রাণীটি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে অবশ্যই গলার নিম্নাংশ থেকে চোয়াল পর্যন্ত এমনভাবে রক্ত প্রবাহিত করতে হবে যাতে দুটি ‘শাহরগ’ কাটা পড়ে। ‘শাহরগ’ দুটি হলো, শ্বাসনালীর দুই পাশে অবস্থিত দুটি মোটা শিরা।
এটি সম্পূর্ণরূপে করতে হলে শ্বাসনালী (হলকুম) এবং খাদ্যনালী (মারি) কাটতে হবে, যাতে প্রাণীর জীবনীশক্তি (রক্ত) এবং তার মাধ্যম (শ্বাসনালী ও খাদ্যনালী) উভয়ই বন্ধ হয়। তবে শুধু শাহরগ দুটি কাটলেও যবেহ শুদ্ধ হবে।
নবম শর্ত: যবেহকৃত প্রাণীটি শরীয়তসম্মতভাবে যবেহর অনুমতি প্রাপ্ত হতে হবে। অনুমতিহীন প্রাণী দুই প্রকার:
১. আল্লাহর হকের কারণে হারাম। যেমন, হারাম এলাকার শিকার বা ইহরাম অবস্থার শিকার - এটি যবেহ করলেও হালাল হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿...أُحِلَّتۡ لَكُم بَهِيمَةُ ٱلۡأَنۡعَٰمِ إِلَّا مَا يُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ غَيۡرَ مُحِلِّي ٱلصَّيۡدِ وَأَنتُمۡ حُرُمٌ...﴾
“যা তোমাদের নিকট বর্ণিত হচ্ছে তা ছাড়া গৃহপালিতা চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য হালাল করা হল, তবে ইহরাম অবস্থায় শিকার করাকে বৈধ মনে করবে না।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ১] এ মর্মে তাঁর আরেকটি বাণী:
﴿أُحِلَّ لَكُمۡ صَيۡدُ ٱلۡبَحۡرِ وَطَعَامُهُۥ مَتَٰعٗا لَّكُمۡ وَلِلسَّيَّارَةِۖ وَحُرِّمَ عَلَيۡكُمۡ صَيۡدُ ٱلۡبَرِّ مَا دُمۡتُمۡ حُرُمٗا...﴾
“তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে সমুদ্রের শিকার ও তার খাদ্য; তোমাদের ও মুসাফিরদের ভোগের জন্য। আর স্থলের শিকার তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে যতক্ষণ তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাক।” [আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৯৬]
দ্বিতীয় প্রকার: সৃষ্টির হকের কারনে যা হারাম, যেমন জবরদখলকৃত বা চুরিকৃত পশু যা জালিম ব্যক্তি বা চোর যবেহ করে। এ ধরনের পশুর হালাল হওয়া সম্পর্কে আলেমদের দুটি মত রয়েছে। এ দুটি মত ও তাদের দলীল মূল গ্রন্থের ৮৮-৯০ পৃষ্ঠায় দেখুন।
***
নবম অধ্যায়
যবেহর আদব
যবেহর কিছু আদব রয়েছে যা পালন করা উচিত, তবে এগুলো যবেহকৃত প্রাণী হালাল হওয়ার জন্য শর্ত নয়। এগুলো হলো:
১. যবাহের সময় পশুটিকে কিবলামুখী করা।
২- পশু যবেহ করার ক্ষেত্রে তাদের প্রতি সদাচরণ করা, অর্থাৎ ধারালো অস্ত্র দিয়ে যবেহর স্থানে দ্রুত ও জোরে চালিয়ে দেওয়া। কেউ কেউ বলেছেন: এটি আবশ্যক আদবের অন্তর্ভুক্ত; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ স্পষ্ট বাণী তা নির্দেশ করে:
«إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَةَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ».
“নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিটি বস্তুতে সদাচরণকে জরুরী করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা যখন হত্যা করবে,তখন ভালভাবে হত্যা করো এবং যখন জবাই করবে, তখন ভালভালে জবাই করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজ ছুরি ধারাল করে নেয় এবং যবেহকৃত পশুকে আরাম দেয়।” হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।48 এ মতটিই সঠিক।
৩. উটের ক্ষেত্রে নহর (গলার নিচে ছুরি চালানো) এবং অন্যান্য পশুর ক্ষেত্রে যবেহ (গলার উপরে ছুরি চালানো) করা হবে। উটকে দাঁড় করিয়ে তার সামনের বাম পা বেঁধে নহর করতে হবে। যদি এটা কঠিন হয় তবে হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় নহর করা যাবে। অন্যান্য পশুকে বাম কাতে শুইয়ে যবেহ করতে হবে। যদি যবেহকারী বামহাতি হয় এবং ডান কাতে শুইয়ে যবেহ করলে পশুর জন্য আরামদায়ক হয়, তবে তা করা যাবে।
সুন্নত হলো যে, সে তার পা কুরবানীর জন্তুটির ঘাড়ে রাখবে; যেন সে জন্তুটিকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর জন্তুর উপরে চেপে বসা বা তার পা ধরে রাখার কোনো দলীল নেই সুন্নাহ থেকে।
কিছু আলেম উল্লেখ করেছেন যে, পা ধরে না রাখার একটি উপকার হলো—জন্তুর নড়াচড়া ও ছটফট করার ফলে রক্ত বেশি পরিমাণে প্রবাহিত হয়।
৪- শাহরগ দুটি কাটার পাশাপাশি শ্বাসনালী (হলকুম) এবং খাদ্যনালী (মারি)ও কাটা। বিস্তারিত দেখুন যবেহর শর্তসমূহের অষ্টম শর্তে।
৫- ছুরি ধার দেওয়ার সময় তা জন্তুর দৃষ্টির আড়ালে রাখা, যেন তা কেবল যবেহর সময়ই দেখে।
৬. বিসমিল্লাহ বলার পর "আল্লাহু আকবার" বলা।
৭. কুরবানী বা আকিকার পশু যবেহ করার সময় বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলার পর যার পক্ষ থেকে যবেহ করা হচ্ছে তার নাম নেওয়া এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য এভাবে কবুল চাওয়া: "বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা, 'আন্নী' (নিজের পক্ষে হলে) অথবা 'আন ফুলান'-ফুলান এর স্থলে নাম বলবে- (অন্য কারো পক্ষে হলে), আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নী' (নিজের পক্ষে হলে) অথবা 'মিন ফুলান' -ফুলান এর স্থলে নাম বলবে- (অন্য কারো পক্ষে হলে)"।
দশম অধ্যায়
যবেহর মাকরূহ বিষয়াবলী
যবেহর কিছু অপছন্দনীয় কাজ যা পরিহার করা উচিত:
১. ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে যবেহ করা - কারো মতে এটি হারাম, এটাই সঠিক মত।
২. পশু দেখতে থাকা অবস্থায় ছুরি ধার দেয়া।
৩. এক পশুর চোখের সামনে অন্য পশু যবেহ করা।
৪. যবেহর পর প্রাণ বের হওয়ার আগে পশুকে কষ্ট দেয়া, যেমন: মৃত্যুর আগে গলা মোচড়ানো, চামড়া ছাড়ানো বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটা। কারো মতে এটি হারাম, এটাই সঠিক মত।
এখানে আমাদের "কুরবানী ও যবেহর বিধান" গ্রন্থের সংক্ষিপ্তসার শেষ হলো। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন এটি ও মূল গ্রন্থটি দ্বারা উপকার দান করে। এটি সম্পন্ন হয়েছে ১৪০০ হিজরির ১৩ই যিলহজ বুধবার বিকেলে।
সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের রব আল্লাহর জন্য। আর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ, তার পরিবার ও সকল সাহাবীর উপর।
***
সূচিপত্র
প্রথম অধ্যায় 4
কুরবানীর সংজ্ঞা ও বিধান 4
অধ্যায়: 11
দ্বিতীয় অধ্যায় 13
কুরবানীর শর্তাবলী 13
তৃতীয় অধ্যায়: 21
কোন প্রজাতি ও গুণাবলীর পশু কুরবানী করার জন্য উত্তম এবং কোনগুলো কুরবানী করা মাকরূহ 21
চতুর্থ অধ্যায়: 26
কুরবানী কার পক্ষ থেকে আদায়যোগ্য 26
পঞ্চম অধ্যায়: 32
কুরবানীর পশু নির্ধারণের পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট বিধান 32
ষষ্ঠ অধ্যায় 41
কুরবানীর গোশত খাওয়া ও বণ্টনের বিধান 41
সপ্তম অধ্যায় 45
কুরবানীদাতার জন্য বর্জনীয় বিষয় 45
অষ্টম অধ্যায় 48
যবেহ ও তার শর্তাবলী 48
নবম অধ্যায় 59
যবেহর আদব 59
দশম অধ্যায় 62
যবেহর মাকরূহ বিষয়াবলী 62
বর্ণনায় আব্দুর রাজ্জাক, তাফসীর (১/২২৩); ইবনু জারীর, তাফসীর, (১০/৪৭)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: জবাহের সময় তাকবীর বলা, হাদীস নং (৫৫৬৫); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুবরানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর পশুর প্রতি সদয় আচরণ করা মুস্তাহাব, হাদীস নং (১৯৬৬)।
বর্ণনায় তিরমিযী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানী করা সুন্নাত হওয়ার দলিল, হাদীস নং (১৫০৭); আহমদ (২/৩৮)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: ইমাম কর্তৃক জনগণের মধ্যে কুরবানীর পশু বণ্টন, হাদীস নং (৫৫৪৭); মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর পশুর বয়স, হাদীস নং (১৯৬৫)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর সুন্নত, হাদীস নং (৫৫৪৬); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর সময়, হাদীস নং (১৯৬১)।
'আশ-শারহুস সাগীর' (লেখক : ইমাম আদ-দুরদীর আল-মালিকী) (২/১৩৭), 'নিহায়াতুল মুহতাজ' (৮/২), 'আল-ইনসাফ' (৯/৪১৯)।
উভয় পক্ষের দলীল ও তার পর্যালোচনা মূল গ্রন্থে (৭-১৫ পৃষ্ঠা) দ্রষ্টব্য। [লেখক]ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর বক্তব্য দেখুন: «মাজমুউল ফাতাওয়া» (২৩/১৬২-১৬৩)।
"আদ-দুররুল মুখতার" (৫/১৯৯), "আল-ইনসাফ" (৯/৪১৯)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর গোশত থেকে কতটুকু খাওয়া যাবে, আর কতটুকু সঞ্চয় করে রাখা যাবে, হাদীস নং (৫৫৬৯); মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: (ইসলামের সূচনালগ্নে) তিনদিনের পরে কুরবানীর গোশত খাওয়া সম্বন্ধে যে নিষেধাজ্ঞা অর্পিত হয়েছিল তার বর্ণনা, হাদীস নং (১৯৭৪)।
তুহফাতুল মাওদুদ বি আহকামিল মাওলূদ (পৃষ্ঠা ১১২), তাহক্বীক: আল-হিলালী।
সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর পশু উত্তম হওয়া মুস্তাহাব হাদিস নং ১৯৬৭ (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে)
"আল-ইনসাফ মাআল মুকনি ওয়াশ শারহুল কাবীর" (৬/২৬১)
ইমাম তাবারী তার তাফসীর গ্রন্থে (৮/১২) এটি বর্ণনা করেছেন।
সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর পশুর বয়স, হাদীস নং (১৯৬৩), জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
মুয়াত্তা মালিক, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কি ধরনের পশু কুরবানী করা দুরস্ত নহে, হাদীস নং (১৩৮৭)।
হাদীসটির শব্দ আবূ দাউদের, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: যে ধরণের পশু দ্বারা কুরবানী করা মাকরূহ, হাদীস নং (২৮০২); নাসায়ী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: খোড়া পশু, হাদীস নং (৪৩৭৫); ইবনু মাজাহ, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: যেসব পশু দ্বারা কুরবানী করা মাকরূহ, হাদীস নং (৩১৪৪); আহমদ (৪/৩০০)।
এই পাঁচটি শর্ত কুরবানীর পাশাপাশি সকল শরীয়তসম্মত যবেহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেমন তামাত্তু ও কিরান হজ্জের কুরবানী, আকীকা ইত্যাদি।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর সুন্নাত, হাদীস নং (৫৫৪৫); মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানী করার সময়, হাদীস নং (৭/১৯৬১)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি সালাত আদায়ের পূর্বে যবাহ করে সে যেন পুনরায় যবাহ করে, হাদীস নং (৫৫৬২); মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানী করার সময়, হাদীস নং (১৯৬০)।
সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সিয়াম, পরিচ্ছেদ: আইয়্যামে তাশরীকে সাওম পালন করা হারাম, হাদীস নং (১১৪১)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: যবাহের পশুর পার্শ্বদেশ পা দিয়ে চেপে ধরা, হাদীস নং (৫৫৬৪); মুসলিম, অধ্যায়: কুবরানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর পশুর প্রতি সদায় আচরণ করা মুস্তাহাব, হাদীস নং (১৯৬৬)।
আবূ দাঊদ, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর জন্য কোন ধরণের পশু উত্তম? হাদীস নং (২৭৯৬); তিরমিযী, অধ্যায়: কুরবানী, কুরবানীর জন্য যে ধরণের পশু উত্তম, হাদীস নং (১৪৯৬); নাসায়ী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: দুম্বা কুরবানী করা, হাদীস নং (৪৩৯৫); ইবন মাজাহ, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর জন্য যে ধরণের পশু উত্তম, হাদীস নং (৩১২৮)।
মুসনাদ আহমাদ (৬/৩৯১)। অন্যদিকে "মাওজুআইন" শব্দটি ইবনে মাজাহ "কুরবানী" অধ্যায়ে "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কুরবানী" পরিচ্ছেদে (হাদিস নং ৩১২২) এবং ইমাম আহমাদ (৬/২২০) আবু রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া অন্য সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর জন্য পছন্দনীয় পশু, হাদীস নং (১৯৬৭)।
আহমদ, মুসনাদ (৬/৩৯১)।
তিরমিযী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: একটি ছাগলই একটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট, হাদীস নং (১৫০৫); ইবন মাজাহ, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি তার পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানী করে, হাদীস নং (৩১৪৭)।
হজ্জের কুরবানী এর ক্ষেত্রেও এই বিধানগুলো সাধারণ কুরবানীর মতোই প্রযোজ্য। [লেখক]
"মুনতাহাল ইরাদাত" বাহুতীর ব্যাখ্যাসহ (২/৬১০), "আল-ইখতিয়ার লি তা'লিলিল মুখতার" (৫/২১), "আদ-দুররুল মুখতার" ইবনে আবেদীনের টীকাসহ (৫/২০৯)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর গোস্ত কতটুকু খাওয়া যাবে, হাদীস নং (৫৫৬৯)।
সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: (ইসলামের সূচনালগ্নে) তিনদিনের পরে কুরবানীর গোশত খাওয়া সম্বন্ধে যে নিষেধাজ্ঞা অর্পিত হয়েছিল তার বর্ণনা, হাদীস নং (১৯৭১)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: কুরবানীর গোশত থেকে কতটুকু খাওয়া যাবে, আর কতটুকু সঞ্চয় করে রাখা যাবে, হাদীস নং (৫৫৬৯); সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: (ইসলামের সূচনালগ্নে) তিনদিনের পরে কুরবানীর গোশত খাওয়া সম্বন্ধে যে নিষেধাজ্ঞা অর্পিত হয়েছিল তার বর্ণনা, হাদীস নং (১৯৭৪)। হাদীসের শব্দচয়ন ইমাম বুখারীর।
সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: যে ব্যক্তি যিলহজ মাসের প্রথম দশদিনে প্রবেশ করল এবং কুরবানী দেয়ার ইচ্ছা করল তার জন্য চুল ও নখ কর্তন নিষেধ, হাদীস নং (১৯৭৭); আহমদ (৬/২৮৯)।
সহীহ মুসলিম, পূর্বোক্ত অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে, হাদীস নং (৪২/১৯৭৭)।
সহীহ মুসলিম, পূর্বোক্ত অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে, হাদীস নং (৩৯/১৯৭৭)।
পূর্বে ৬ পৃষ্ঠায় এর সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
মুসনাদ আহমাদ (৩/২১০) (আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস)
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: হিবা, পরিচ্ছেদ: মুশরিকদের হাদিয়া গ্রহণ, হাদিস নং (২৬১৭); মুসলিম, অধ্যায়: সালাম, পরিচ্ছেদ: বিষ, হাদিস নং (২১৯০) (আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস)।
তাফসিরুল খাজিন (১/৪৬৭)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যবেহ, পরিচ্ছেদ: বেদুঈন ও তাদের মত লোকদের যবেহ্কৃত জন্তু, হাদীস নং (৫৫০৭)।
মুসলিম, অধ্যায়: দুনিয়াবিমুখতা, পরিচ্ছেদ: লৌকিকতা হারাম, হাদীস নং (২৯৮৫), আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: অংশীদারিত্ব, পরিচ্ছেদ: বকরী বন্টন, হাদীস নং (২৪৮৮); মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছদ: দাঁত ব্যতীত অন্য কোন বস্তু দিয়ে যা রক্ত প্রবাহিত করা হয়, তা খাওয়া জায়েয, হাদীস নং (১৯৬৮), রাফি‘ ইবনু খাদীজ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
মূল গ্রন্থের ৭১-৭৭ পৃষ্ঠা দেখুন। [লেখক]।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: অংশীদারিত্ব, পরিচ্ছেদ: বকরী বন্টন, হাদীস নং (২৪৮৮); মুসলিম, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: যা রক্ত ঝরায় তা দিয়েই যাবাহ করা বৈধ, তবে দাঁত-নখ ও সকল হাড় ব্যতীত, হাদীস নং (১৯৬৮); আবূ দাঊদ, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: পাথর দ্বারা জবাই করা, হাদীস নং (২৮২১); তিরমিযী, অধ্যায়: শিকার, পরিচ্ছেদ: বাঁশ ইত্যাদির চোকলা বা ফালি দ্বারা যবেহ করা, হাদীস নং (১৪৯১); নাসায়ী, অধ্যায়: কুরবানী, পরিচ্ছেদ: দাঁত দ্বারা যবেহ করা, হাদীস নং (৪৪০৯); ইবন মাজাহ, অধ্যায়: যবেহ, পরিচ্ছেদ: যা দ্বারা যবেহ করা যাবে, হাদীস নং (৩১৭৮); আহমদ (৩/৪৬৩), রাফি‘ ইবনু খাদীজ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যবেহ, পরিচ্ছেদ: যখন কোন সম্প্রদায়ের উট পালিয়ে যায়, তখন কেউ যদি তাকে তীর নিক্ষেপ করে এবং তাতে সে মারা যায়, হাদীস নং (৫৫৪৪)।
সহীহ বুখারী, অধ্যায়: যবেহ, পরিচ্ছেদ: বাঁশ, পাথর ও লোহা দ্বারা রক্ত প্রবাহিত করলে এর হুকুম, হাদীস নং (৫৫০১)।
পূর্বে ২৯ পৃষ্ঠায় এর সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: শিকার করা, পরিচ্ছেদ: যবেহ ও হত্যার সময় পশুর প্রতি সদয় আচরণ করা, হাদীস নং (১৯৫৫), শাদ্দাদ ইবনু আউস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীস।
এটি ১৩৯৬ হিজরীতে রজব মাসে লেখা হয়েছিল।